নাগরিক কথা

“সেই রাতটার কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না…”

নিমন্ত্রণের যত বিড়ম্বনা!!!

কানাডায় আসার পর দাওয়াত খাওয়া ও দাওয়াত দেয়া নিয়ে কত যে কনফ্লিক্ট প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে দেখেছি, তার ইয়ত্তা নেই। এইসব দেখে আমি পারতপক্ষে চেষ্টা করি কারও বাসায় দাওয়াতে না যেতে। কেউ আমার বাসায় আসতে চাইলে কখনও না করি না, তবে কারও বাসায় দাওয়াত দিলে যেতে চাই না। আর যেতে হলেও গিয়ে যতক্ষণ থাকি, একটা আতঙ্ক ও বিব্রতকর অবস্থার মাঝে থাকি। এই অবস্থা কেন, সেটা বলতে হলে অনেক বিস্তারিত লিখতে হবে, আজ এত বিস্তারিত না লিখে ছোট করে কিছুটা প্রেক্ষাপট এবং একটি ঘটনা লিখব।

তখন নতুন এসেছি। ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্দিন যাচ্ছে। দেশ থেকে টাকা যা এনেছিলাম সেটার পুরোটাই টিউশন ফি দিতে হয়েছে, বাসা ভাড়ার এডভান্স ৫০০ ডলার ও মাসটা চলার জন্যে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে। একটা বাসা নিয়েছিলাম চারজন মিলে, ১০৩৫ ডলার ভাড়ায়। এক মাসের এডভান্স ও চলতি মাসের ভাড়া সহ ২০৭০ ডলার দিতে হয়েছিল শুরুতেই চারজনকে, জনপ্রতি ৫০০ এর কিছু বেশি। সেই বাসায় শুরুতে আমরা চারজন শেয়ার করে খেলেও বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হওয়াতে মাস তিনেকের মাথায় আলাদা করে খাওয়া শুরু করা হয়।

পয়সা বাঁচাতে আমি সকালে নাস্তা করতাম না। নিজে রান্না করতাম, ইকনমি খাবার হিসেবে এক পিস মুরগি/মাছ, এক পিস আলু আর একটুখানি ঝোল দিয়ে এক বেলা পার করে দিতাম। একটা মুরগি (আট ডলারের মত দাম ছিল তখন কম বেশি) কিনে রান্না করলে আমার দশ দিনের মত চলে যেত। যদিও দুই-তিন দিন যাওয়ার পর একই রান্না আর খেতে ইচ্ছে করত না, তবে কোনভাবে সেটা গলধঃকরণ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হতো। আমার তখন মাসিক খাবারের খরচ ছিল গড়ে ৩৫ ডলারের কিছু বেশি। এইভাবে দীর্ঘ আট মাস আমি কাটিয়েছি।

সেই সময়টাতে খুব মনে হতো, আহা, আশেপাশে এত বাংলাদেশী বড় ভাই-ভাবীরা থাকেন, কেউ যদি একটু দাওয়াত দিতেন, একটু ভাল মন্দ খেতাম! কিন্তু কেউ আমাদের দাওয়াত দিতেন না কখনও। ছোট শহর, মূলত ইউনিভার্সিটি বেইজড, তারপরও পাশাপাশি দু’টা বিল্ডিংয়ে প্রচুর বাংলাদেশি পরিবার থাকতেন, প্রতিদিনই কারও না কারও বাসায় অন্যদের সবার দাওয়াত থাকত, অন্তত উইকেন্ডে তো থাকতই, আমরা সেখানে ছিলাম ব্রাত্য। প্রথম প্রথম মনে হতো, ফ্যামিলি নেই তাই হয়তো কেউ ডাকে না, কিন্তু কিছুদিন যেতেই বুঝলাম আমাদের ঠিক উপরতলায় থাকা আরও কয়েকজন ব্যাচেলর/সেমি ব্যাচেলরও নিয়মিত দাওয়াত পান, আমরাই পাই না।

আরও দিন গেল, আস্তে আস্তে বুঝে গেলাম বাংলাদেশি কমিউনিটি গুলোতে মানুষদের ক্লাসিফিকেশনের মূল ফিচারগুলো কী কী! কেউ কেউ আছেন কানাডিয়ান সিটিজেন, এরা কুলীন ব্রাহ্মণ গোত্রের মানুষ। ক্লাসিফিকেশন পিরামিডে এরা সর্বোচ্চ স্তরের সম্মানিত ব্যক্তি ও সুমহান মর্যাদার অধিকারী। কমিউনিটির অন্যান্যদেরকে এদের তোয়াজ, সম্মান ও তৈল প্রদান করে চলতে হবে। যদিও উনাদের কোন ক্ষমতা নাই, তবু বাঙালির স্বভাব হচ্ছে কেউ না কেউকে তোয়াজ করে নিজের রক্তে প্রবাহিত গোলামির ধারা বজায় রাখা, তাই বাকিরা উনাদেরকে সম্মান করতেন। দ্বিতীয় স্তরের সম্মানপ্রাপ্তদের মাঝে আছেন পারমানেন্ট রেসিডেন্ট বা PR-গণ। তৃতীয় স্তরের সম্মানপ্রাপ্তদের মাঝে আছেন চাকরিজীবি ও গাড়ির মালিকগণ, সেটা ভাঙাচেরা গাড়ি হলেও হবে। চতুর্থস্তরের সম্মানপ্রাপ্তদের মাঝে আছেন ভাল ফান্ডিং পাওয়া ছাত্রগণ। আর পঞ্চম ও সর্বনিম্ন স্তরে ছিলাম আমরা – সদ্য আগত অল্প ফান্ডিং প্রাপ্ত একবেলা আধাপেটা খেয়ে বেঁচে থাকা ছাত্ররা। অনেক পরে আবিষ্কার করেছিলাম, আমার বাসায় আমার সঙ্গে থাকা রুমমেটরা আসলে ভালই অর্থবিত্তের মালিক, কেবল আমার সঙ্গে যতক্ষণ তাঁরা থাকতেন, নিদারুণ দারিদ্র্যের ভাব ধরে থাকতেন।

যা হোক, অন্যরা অন্তত তখন জানতেন যে, আমরা মেথর গোত্রীয়। ক্লাসিফিকেশন অনুযায়ী সম্মানটা এভাবে ভাগ হতো যে – সিটিজেনরা সবার সব দাওয়াতেই দাওয়াত পেতেন। এটা মোটামুটি মাস্ট ছিল। PR রা মোটামুটি সব দাওয়াতেই দাওয়াত পেতেন, যদি না কারও সঙ্গে কারও পারসোনাল কনফ্লিক্ট থেকে থাকে! তৃতীয় স্তরের এরা ছিলেন কিছুটা ভালনারেবল, নিজেদের গ্রুপের বাইরে সচরাচর এরা দাওয়াত পেতেন না। পঞ্চম স্তরে থাকা আমরা ছিলাম কামলা শ্রেণী, কোথাও কাবিখা তথা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী থাকলে আমরা দাওয়াত পেতাম নয়তো না। যেমন, কারও বাচ্চার জন্মদিন হবে, কমিউনিটি সেন্টার সাজানো থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান শেষে সেন্টার পরিষ্কার করা পর্যন্ত কাজ করার জন্যে কামলা লাগবে। পঞ্চম শ্রেণীর কামলারা এইসব ক্ষেত্রে দাওয়াত পেত। কী ভয়াবহ সুশৃঙ্খল ছিল সেইসব অলিখিত নিয়মগুলো, কেউ ভুল করত না!

আমাদের বিল্ডিংয়ে স্ত্রী-কে নিয়ে থাকতেন এক বাংলাদেশি বড় ভাই। তাঁর বাসায় একবার আমাদের উপর-তলায় থাকা কয়েকজন ব্যচেলর দাওয়াত পেলেন। ব্যচেলররা ছিলেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীভুক্ত। আমরা জানতাম যে উনাদের ঐ ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত আছে, তবে ব্যাচেলর হলেও আমাদের নেই, তবে আমরা ততদিনে সেই সব ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বিষয়টা নিয়ে আমি মাথা ঘামালাম না।

রাত সাড়ে দশটার দিকে ঐ বড় ভাইয়ের নাম্বার থেকে আমার রুমমেটের নাম্বারে ফোন আসল। তিনি আমাকে চাইলেন, কারণ আমার নিজের কোন ফোন ছিল না। তিনি আমাকে বললেন, তোরা কি ভাত খেয়ে ফেলেছিস? আমি বললাম, না খাই নাই এখনও। উনি বললেন, আমার বাসায় চলে আয়, আমার বাসায় ডিনার কর। আমি বললাম, না ভাই, থ্যাংকস। আমাদের রান্না আছে। উনি বললেন, আরে তোদের আগেই বলতাম, ফোন নাম্বার ছিল না দেখে বলতে পারিনি। প্লিজ চলে আয়।

আমি কিছু বললাম না। আমি সচরাচর কারও অনুরোধ ফেলতে পারি না, তখন আরও পারতাম না, কাজেই আমি মনে মনে রাজী হয়ে গেলাম যাওয়ার জন্য। আমার রুমমেটদের রাজী করাতে কষ্ট করতে হল না। ওঁরা ক্ষুধার্ত ছিলেন এবং আমি নিশ্চিত, আমার মতই প্রতিদিন একই রান্না খেতে তাঁদেরও ভাল লাগত না। যা হোক আমরা উপরে রওয়ানা দিলাম।

গিয়ে দেখি এলাহী কারবার। প্রথম স্তর থেকে চতুর্থ স্তরের সকল মান্যবরই মোটামুটি উপস্থিত, অনেকে চলে গেছেন, অনেকে চলে যাচ্ছেন। তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের মান্যবরদের বয়স মোটামুটি কম। হয় ব্যচেলর, নয়তো বাচ্চাহীন দম্পতি – কেবলমাত্র এরা কার্ড, ক্যারামবোর্ড এইসব নিয়ে বসে গেছেন খেলতে। বড় ভাই আমাদের বললেন, ‘বেশি কিছু নাই, তোরা সব খেয়ে শেষ করে দে। আমাদের খাওয়া শেষ।’ খাবার টেবিলের সামনে গিয়ে দেখলাম – কথা সত্য। বেশি কিছু নাই। একটা বোলে দুই তিন চামচ পোলাও আছে, একটা বাটিতে একটু পানির উপর কয়েক টুকরা শসা টমেটো ভাসছে, একটা বাটিতে কিছুটা মাংসের ঝোল-দারচিনি-এলাচ, আর একটা বাটিতে দু’টা মুরগির পিস, একটার আবার অর্ধেকটা কেউ খুবলে নিয়ে খেয়েছে।

ভাইয়ের ‘সবকিছুই খেয়ে যেতে হবে’ শুনে মনে পড়ল শৈশবে প্রতিটা ইফতারির পর একটা বাচ্চা নিয়ে এক ভিখিরিনী আসতেন আমাদের বাড়িতে। আমার মা বেঁচে যাওয়া ইফতারি, আগের দিনের সেহরির পান্তা ভাত এর ‘সবকিছুই’ সেই ভিখিরিনীকে দিয়ে দিতেন। তখন পলিথিন এত সহজপ্রাপ্য ছিল না হয়তো, অথবা অন্তত ভিখিরিনীটির কাছে এভেইলেবল ছিল না, ভিখিরিনীটি আগের দিনের পলিথিন এক গ্লাস পানি দিয়ে ড্রেনের উপর ধুয়ে সেই পলিথিনেই আবার আজকের খাবার ঢেলে নিয়ে চলে যেতেন। ধোয়ার সময় পানির ছিটেফোঁটা পড়ত ভিখিরিনীর বাচ্চাটার হাতে পায়ে, বাচ্চাটা সেটাই চেটে চেটে খেত। এতগুলো বছর পরও আমার দৃশ্যটা স্পষ্ট মনে আছে, কারণ সেই দৃশ্যটা ছিল খুবই অমানবিক। সেই বড় ভাইয়ের অর্ধেক খুবলে খাওয়া মুরগির পিসের সামনে দাঁড়িয়ে, উচ্ছিষ্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সেই ভিখিরিনীর মত মনে হল। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, ফোন নাম্বার ছিল না দেখে দাওয়াত দেননি উনি বিষয়টা মোটেও এটা না। বিষয়টা হচ্ছে, এই উচ্ছিষ্টগুলো গারবেজ করতে যাওয়ার কষ্ট করার চেয়ে পঞ্চম শ্রেণীর কিছু অচ্ছুৎকে খাইয়ে দেয়া ভাল, তাই তিনি মূল গেস্টরা চলে যাওয়ার পর আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন/ডেকে এনেছেন।

আমি কিছু নিলাম না, বলা যায়, নেয়ার রুচি বোধ করলাম না, দেয়ালের পাশে গড়াগড়ি খেতে থাকা একটা কোকের ক্যান খুলে নিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লাম। বড় ভাইটি তখন চাকরি করেন, বিশাল একটা টিভি কিনেছেন, আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেখানে কোক স্টুডিও চলছিল। বসে বসে একটা গান শুনলাম। আমার রুমমেটরা কী খেয়েছিল, আমি দেখার রুচি বোধ করে নি আর। চলে আসলাম কিছুক্ষণ পর। প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝেও দীর্ঘ সময় বারান্দায় বসে রইলাম। সেদিন দুপুরেও খাওয়া হয়নি, সম্ভবত ল্যাব ছিল। কোক থেকে প্রাপ্ত এনার্জিটুকু চলে গেল দ্রুতই, ভেতরে ঢুকে ফ্রিজ থেকে আমার সেই এক পিস মুরগি, এক পিস আলু, আর একটু ঝোল প্লেটে নিয়ে নোংরা মাইক্রেওয়েভে গরম করে খেলাম। আমাদের ময়লা ডাইনিং টেবিলটাতে খেতে বসে নিজের উপরই কেমন যেন ঘেন্না হচ্ছিল আমার। আমি অচ্ছুৎ দেখে না, সেই বড় ভাইটি আর আমি একই প্রজাতির প্রাণী দেখে। আমি সেই রাতেই জানতাম, সেই রাতটার কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেছে প্রায়, সত্যিই সেই রাতটার কথা আমি আর ভুলতে পারিনি।

সবাই যে এমন ছিলেন তা নয়। আমাদের ফ্লোরেই ছিলেন হালিম ভাই, এখনকার ডক্টর আব্দুল হালিম। তিনিও খুব স্ট্রাগল করছিলেন সেই সময়টাতে, তিনটা বাচ্চা আর যৎসামান্য পিএইচডি ফান্ডিংয়ে তিনিও চলতে পারতেন না, তবুও তিনিই প্রথম ব্যক্তি সেই শহরে যিনি কোরবানির ঈদের দিন এক বাটি সদ্য রান্না করা মাংস নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছিলেন, ছেলেগুলো কী খাবে সেটা ভেবে। সেটাই শেষ নয়, তিনিই প্রথম সেই শহরে আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছিলে সেই ঈদের রাতটিতে। পাঁচ বছর পর আবার যখন একটি কোরবানির ঈদ চলে আসছে, কেন যেন সেই সময়গুলোর কথা খুব মনে পড়ছে আমার। সেই শহরে সেই সময়ে থাকা কারও সঙ্গেই আমার কোন যোগাযোগ নেই আর, তবে হালিম ভাইদের সঙ্গে এখনও আছে। টাকার মূল্যে যাঁরা মানুষ মাপেন না, তাঁদের সঙ্গে না চাইলেও যোগাযোগটা থেকেই যায়।

সেই বড়ভাইটি অবশ্য পরবর্তীতে একদিন আমাদের ফ্রাইড চিকেন খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই দিনের সেই ব্যবহারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে, তবে আমি সেই বড় ভাইটিকে এবং সেই শহরে থাকা আরও অনেক বড় ভাইকে ক্ষমা করতে পারি নি কোনদিন।

Most Popular

To Top