নাগরিক কথা

অ-মানবিক আমরা

অ-মানবিক আমরা

ছোটবেলায় আমরা ‘সামাজিক বিজ্ঞান’ নামে একটা বিষয় পড়তাম, এখন যেটা ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ নামে পড়ানো হয়। আমার ধারণা খুব বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী এটাকে পছন্দ করে না। পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক কারণ সেখানে আনন্দ পাওয়ার মত কোন ব্যাপার নেই। আছে সাল-তারিখ-নাম সমৃদ্ধ ইতিহাস, নাগরিকের অধিকার কর্তব্য শিখানো পৌরনীতি, সামান্য অর্থনীতি আর একটু খানি ভূগোল। নিরানন্দ ব্যাপার গুলো মুখস্থ করতে হয় এবং খাতায় উগড়ে দিয়ে আসতে হয়। দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, আমাদের শিক্ষকরাও এগুলোকে খুব একটা উত্তেজনাপূর্ণ করে উপস্থাপন করেন না বা করার আগ্রহ পান না। কিন্তু আসলেই কি বিষয় গুলো নিরানন্দের?

ইতিহাস দিয়েই শুরু করি। সত্যিকার অর্থে আমাদের এখানে ইতিহাস পড়ানো হয় কিছু সন-তারিখ-নাম আর কিছু নির্লিপ্ত ঘটনাবলীর বিবরণ দিয়ে। কিন্তু ইতিহাস হচ্ছে অনেকটা সিনেমা দেখার মত ব্যাপার। অতীতের দিকে তাকিয়ে আমরা অনেক বিচ্ছিন্ন ডট কানেক্ট করতে পারি, একটা সম্পূর্ণ ঘটনা আমাদের সামনে ভেসে ওঠে যা কোন অংশে একটা উত্তেজনাপূর্ণ সিনেমার থেকে কম কিছু নয়।

যে মৌর্য, পাল, মোঘল সাম্রাজ্য কিংবা ব্রিটিশ শাসনামলের কথা আমরা সন তারিখ পড়েই শেষ করি সেগুলো আসলে অসংখ্য মানুষের অসংখ্য ঘটনার সমষ্টি। নানা ভাবে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। আমাদের এখানে ইতিহাস পাঠ অনেকটা সিনেমা না দেখে কেবল সিনেমা শেষের টাইটেলটুকু পড়ে নিয়েই সিনেমার কাহিনী বুঝতে চাওয়ার মত ব্যাপার। পাল আমলকে বলা হয় এই অঞ্চলের ইতিহাসে সব থেকে সমৃদ্ধশালী সময়। কেন বলা হয়? কী হয়েছিল সে সময়? বা আমরা যে গুপ্ত, মৌর্য, মোঘল, ব্রিটিশদের কথা পড়ি- সে সময় মানুষ কেমন ছিল? প্রাচীন কাল থেকেই কি এদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস একই ছিল, যেমনটা এখন আছে? শুরু থেকেই কি আমাদের পোশাক এমনই ছিল? বিবাহের প্রথা? নারী পুরুষের সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল? আমাদের সামাজিক- সাংস্কৃতিক বিবর্তন ঠিক কীভাবে হল? আমাদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমরা ধারণ করি, সেগুলো কীভাবে তৈরি হল? ইতিহাস পড়া ও পড়ানো উচিত এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানার জন্য এবং এমন প্রশ্ন করার জন্য।

সত্যিকথা বলতে আমরা ইতিহাস এভাবে পড়ি না বলে আমরা আমাদের শিকড়টা ঠিক ভাবে চিনি না। আমরা এখনো বাঙালি না মুসলমান- এই অহেতুক আত্মসংকটে ভুগি। আমরা এখনো আমাদের সংস্কৃতিকে চিনি না। নিজেদের অনেক কিছুকে বলি অপসংস্কৃতি বা হিন্দুয়ানী কালচার। আবার বাইরে থেকে আরোপিত অনেক কিছুকে মনে করি নিজেদের। সোজা কথা, আমরা আসলে আমাদেরকেই চিনিনা। এই না চেনার কারণ হচ্ছে আমাদের ইতিহাস পাঠে অনীহা এবং ভুল ভাবে ইতিহাস পড়া। আমরা যদি সঠিক ভাবে ইতিহাস চর্চা করতাম তাহলে অন্তত আমরা নিজেদের চিনতাম, নিজেদের বিবর্তনটা কীভাবে হচ্ছে সেটা বুঝতাম এবং নিজেদের নিয়ে অহেতুক গর্ব করা থেকে বিরত থাকতাম।

শুধু ইতিহাস না। মানবিক বিভাগের অন্যান্য বিষয় গুলোর প্রতিও আমাদের এক ধরণেই উন্নাসিকতা আছে। অর্থনীতির মত একটা বিষয়কে আমরা মনে করি ‘খারাপ ছাত্ররা পড়বে’ টাইপ বিষয়! অভিজাত ‘সাইন্স’ আর সম্পদশালী ‘বিজনেস’ ছাড়া নিতান্ত বাধ্য না হলে আমরা আমাদের সন্তানদের আর্টস পড়তে উৎসাহিত করি না। অথচ অর্থনীতি, যা কিনা মানবিকের বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়, সেটাকে আমি মনে করি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট। আমাদের জীবনের, আমাদের সমাজের, রাষ্ট্রের প্রতিটি ঘটনার পিছনে অর্থনীতির কার্যকরণ কাজ করে। মাধ্যমিক পর্যন্ত সামাজিক বিজ্ঞানে যেটুকু অর্থনীতি পড়ানো হয়, এই চাহিদা-যোগান- উৎপাদনের সংজ্ঞা মুখস্থ করা, সেটুকু এই বিশাল কার্যকরণ বুঝতে সহায়ক নয়। অর্থনীতি বুঝি না বলে আমরা যে কোন ঘটনা ঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না। উদ্ভট সব যুক্তি হাজির করি। আবার যুক্তিবিদ্যাটা সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না বলে যুক্তিটাও ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি না আমরা!

যেহেতু আমাদের পড়াশুনা চাকরি কেন্দ্রিক, তাই মানবিকের প্রতি আমরা সেভাবে গুরুত্ব দেই না। দেখা যায় অধিকাংশ সময় মেয়েদের এবং কেউ যদি খারাপ রেজাল্ট করে তাদের- মানবিকে পড়তে দেয়া হয়। অনেক ‘বড় বড়’ স্কুলে মাধ্যমিক লেভেলে আর্টস পড়ানোই হয় না। এসএসসি তে যারা রেজাল্ট খারাপ করে, তারা আবার অনেকে এইচএসসিতে আর্টসে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অনেকে গ্রুপ চেঞ্জ করে বা করতে বাধ্য হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানবিকে গুরুত্ব বাড়ানো উচিত। আমাদের দেশের বাস্তবতায় মানবিকের বিষয় গুলোতে এখন সব থেকে বেশি গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণার জন্য সুযোগ, টার্গেট গ্রুপ, তথ্য উপাত্ত মানবিকের বিষয় গুলোতেই বেশি আমাদের এখানে। যেসব দেশ বা জাতি বিজ্ঞানে উন্নতি করেছে বা করছে তারা আগে দর্শন- সামাজিক বিজ্ঞানে উন্নতি করেছে। যা কিনা তাদের প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির পথ দেখিয়েছে।

আমাদের এখানে বিজ্ঞানে গবেষণার বালাই নেই, সেই নোট শিট মুখস্থ করে লিখে দিয়ে আসা পর্যন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের বিজ্ঞানচর্চা। এখানে নতুন আইডিয়া তৈরি, নতুন কিছু উদ্ভাবন, মৌলিক গবেষণার জন্য যে উর্বর ক্ষেত্র দরকার- সেটাই অনুপস্থিত। আর এই উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে দর্শন ইতিহাস সাহিত্য অর্থনীতির মত বিষয় গুলো। আমরা যদি আমাদের সমাজকেই বুঝতে না পারি, কীভাবে নতুন চিন্তা করতে হয় তাই না জানি, আমাদের গতি প্রকৃতি ঠাহর করতে না পারি তবে এই সমাজের জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন করব কীভাবে? উপযুক্ত উর্বর মাঠ প্রস্তুত না থাকলে বিদেশ থেকে উচ্চফলনশীল বীজ আনলেই কি ভালো ফসল পাওয়া যাবে?

আর্টসের বিষয় গুলোকে ঠুনকো মনে করার কোন কারণ নেই। বরঞ্চ আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এগুলোর গুরুত্বই অনেক বেশি। এসব বিষয় নিয়েই গবেষণা হবে, হচ্ছেও কিছু কিছু এবং হতেই হবে। সময়ের প্রয়োজনেই আমাদের এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, পলিসি মেকিং সব কিছুর জন্য আমাদের এগুলোর সাহায্য নিতে হবে। ফলে ভবিষ্যতে এসব বিষয় রিলেটেড কর্মক্ষেত্রও তৈরি হবে।

তবে যেহেতু আমরা পড়াশুনা করি স্রেফ পয়সা রোজগারের জন্য, তাই বিজ্ঞান মানবিক বা বাণিজ্য কোনটাই আসলে আমরা ঠিক ভাবে শিখি না, জানি না, পড়ি না। প্রথমত, বিজ্ঞান মানবিক বাণিজ্য সব গুলোরই গুরুত্ব আছে নিজ নিজ এরিয়াতে। তবে বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় মানবিকের প্রতি আমাদের বেশি নজর দেয়া উচিত। আমরা যদি এই মুহুর্তে মৌলিক কিছু করতে পারি, তবে সেটা এই ক্ষেত্রে করতে পারার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যপুস্তক সংস্কার করে এই বিষয় গুলোকে আরো উত্তজেনাপূর্ণ ও আকর্ষনীয় ভাবে উপস্থাপন করা দরকার।

এরকম আকর্ষনীয় একটা ইতিহাসের বই গোলাম মুরশিদের ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’। আবার দর্শনকে অনেকে বাতিল বিষয় বলে গণ্য করে। কিন্তু দর্শন আমাদের বিভিন্ন ভাবে একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে শেখায়, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে কোন কিছুকে দেখতে শেখায় যা কিনা বিজ্ঞানের পূর্বশর্ত। আনন্দ সহকারে দর্শন পড়ার জন্য কাজী মাহবুব হাসানের ‘দর্শনের সহজ পাঠ’ পড়া যেতে পারে। সত্যি বলতে, যে দর্শন পাঠ করে নি তার শিক্ষা জীবন এখনো সমাপ্তই হয় নি। অর্থনীতির বেসিক ধারণার জন্য আনু মুহম্মদের ‘অর্থশাস্ত্র’ একটি ভালো বই। এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ের অসংখ্য সুপাঠ্য বই আছে, চাইলে নিজেরাই সেগুলো থেকে জেনে নেয়া যায় অনেক কিছু।

তৃতীয়ত, যারা স্কুল-কলেজে মানবিকে পড়াশুনা করছ তাদের নিজেদের ছোট ভাবার কোন কারণ নেই। বরঞ্চ তোমরাই এমন কিছু বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করছে যা দিয়ে দেশ এবং সমাজের জন্য অনেক কিছু করা সম্ভব। এমন কিছু করা সম্ভব যা এই মুহুর্তে আমাদের সব থেকে বেশি দরকার। কাজেই এই বিষয় গুলো খুব ভালো মত অধ্যয়ন করতে হবে। পাঠ্যবই বিরক্তিকর লাগলে বাইরের বইপত্র পড়তে হবে। বিষয় গুলো আসলে বোরিং না, যথেষ্ট মজার। সেই মজাটা খুঁজে বের করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

আমাদের নিজেদের সামাজিক সমস্যা গুলো সমাধান করতে হবে সবার আগে। নিজেদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। পলিসি তৈরি করতে হবে দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করে। নিজদের চিন্তার জগতকে উন্নত করতে হবে নতুন নতুন দর্শনের সাহায্যে। নতুন উপায়ে চিন্তা করতে জানতে হবে। নিজেদের মনকে সাহিত্যের মাধ্যমে সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। নিজেদের সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলে বাকি উন্নতি, অগ্রগতি, বিজ্ঞানে সাফল্য লাভ করা- এগুলো এমনিতেই চলে আসবে কনসিকোয়েন্স হিসেবে। কাজেই এই মুহুর্তে বোরিং সামাজিক বিজ্ঞানকে মজাদার করে, আগ্রহ নিয়ে চর্চা করার এবং করানোর চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষকরা এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে সব থেকে বেশি। সত্যিকার অর্থে দেশে একটি সচেতন নাগরিক সমাজ চাইলে বা স্থায়ী উন্নতি চাইলে আমাদের অ-মানবিক থেকে মানবিক হওয়ার কোন বিকল্প নেই!

Most Popular

To Top