ক্ষমতা

সৌদি যুবরাজের গ্রেফতারের তালিকায় এবার মসজিদুল হারামের ইমাম?

মসজিদুল হারামের ইমাম গ্রেফতার!

গত ২০ আগস্ট সোমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে খবর পাওয়া যায় সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অবস্থিত মসজিদুল হারামের ইমাম এবং ধর্মপ্রচারক শেখ সালেহ আলতালিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইমাম শেখ সালেহ আলতালিবের গ্রেফতারের ব্যাপারে টুইটারে টুইট করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘প্রিজনার্স অব কনসায়েন্স’র একাউন্ট থেকে। সেখানে আরো বলা হয়, অপশক্তির বিরুদ্ধে ইসলামের করণীয় সম্পর্কিত বক্তব্যের কারণেই শেখ সালেহকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশের পরপরই শেখ সালেহ আলতালিবের আরবি এবং ইংলিশ দুইটি টুইটার একাউন্টই বন্ধ পাওয়া যায়।

যদিও তার বক্তব্যে রাজপরিবারের কোন উল্লেখ নেই, কিন্তু সৌদি রাজপরিবার সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক উৎসব ও অনুষ্ঠানে নারীর উপস্থিতির অনুমতি দেওয়ায় শেখ সালেহ আলতালিবের বক্তব্যে আঙ্গুল মূলত তাদের দিকেই তোলা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এখনও সামাজিক অনুষ্ঠানে নারীর উপস্থিতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

অ্যাক্টিভিস্টদের মতে, শরীয়তবিরোধী কর্মকান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ বক্তব্যের জন্যই আলতালিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদিও সৌদি রাজপরিবার কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে শেখ সালেহ আলতালিবের গ্রেফতারের ব্যাপারে কোন বিবৃতি দেওয়া হয়নি, সে কারণে এখন পর্যন্ত এই গ্রেফতারের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

সৌদি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ মানবাধিকার কর্মী ইয়াহিয়া আসিরি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“প্রতিবাদী এবং জনগণের মনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন সকলকেই নজরদারিতে রাখছে সৌদি সরকার। এমনকি, যারা সরকারের কর্মকাণ্ডে সমর্থন দিচ্ছে, অথবা চুপ থাকছে তারাও নিরাপদ নয়।”

গেল বছরের জুনে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান (যিনি এমবিএস নামেও পরিচিত), ক্ষমতায় বসার পরই অনেক মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আধুনিক মানসিকতাসম্পন্ন ইসলামিক চিন্তাবিদ, এবং রাজপরিবারের প্রভাবশালী সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৮ সালের মে মাস হতে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন নারী অধিকার কর্মীকেও গ্রেফতার করেছে সৌদি সরকার। বেশিরভাগ কর্মীই নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতির পক্ষে এবং পুরুষ অভিভাবকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রচারণায় যুক্ত ছিল। গ্রেফতারকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানবাধিকারকর্মী এমান আল-নাফজান, লুজাইন আল-হাতলুল, আজিজা আল-ইউসেফ, আয়শা আল-মানিয়ে, ইব্রাহিম মোদেইমাহ, মোহাম্মাদ আল-রাবেয়া প্রমুখ। সরকারী বিবৃতিতে বলা হয়, বিদেশী শক্তির সাথে হাত মেলানো এবং শত্রুদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সন্দেহে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে আরো অনেকেই গ্রেফতার হতে পারেন।

শুধু তা-ই নয়, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের ক্কাতিফ শহরে শান্তিপুর্ণভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করার সময় গ্রেফতার হওয়া শিয়া গোত্রভুক্ত নারী ইসরা আল গমঘামের মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আবেদন গৃহীত হলে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে এ রায়, যা কিনা অহিংস আন্দোলনের অভিযোগে অভিযুক্ত কোন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম নিদর্শন হবে সৌদি ইতিহাসে।

শেখ সালেহ আলতালিবের গ্রেফতারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু জানা না গেলেও গ্রেফতারের খবরটি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে সম্প্রতি সৌদি সরকারের হাতে গ্রেফতার হওয়া আলেম ও ইসলামবিদদের তালিকায় চোখ বুলিয়ে। রাজপরিবারের বিরোধিতা এবং অন্যান্য অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরও আছেন প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারক সালমান আল-আওদাহ, আওয়াদ আল-কারনি, ফারহান আল- মাল্কি, মোস্তফা হাসান এবং শাফার আল-হাওয়ালি। গত সপ্তাহে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন প্রখ্যাত ইসলামী বিশেষজ্ঞ শেখ সুলেইমান দয়েশ। ২০১৬ সালে যুবরাজের সমালোচনা করায় তাকে গ্রেফতার করা হয়।

আল-আওদাহ এবং আওয়াদ আল-কারনি, যাদের সামাজিক মিডিয়াতে অনুসারীর সংখা প্রায় দশ লাখের মতো, তাদের গত সেপ্টেম্বর মাসে গ্রেফতার করা হয় নিষিদ্ধ সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে গোপন আঁতাতের অভিযোগে। ইসরাইলের সাথে রাজপরিবারের সমাঝোতার জন্য বিন সালমানের সমালোচনা করে আল-হাওয়ালি একটি বই লেখার পর গ্রেফতার হন। উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুতেই মার্কিন ‘অ্যাটলান্টিক’ ম্যাগাজিনে বিন সালমান বলেন,

“ইসরাইলিদের অধিকার আছে নিজেদের ভূমিতে বসবাস করার।”

তিনি আরও বলেন,

“ইসরাইলিদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করতে আগ্রহী আমরা।”

২০১৮ সালের মার্চ মাসেই ভারতীয় জাতীয় বিমান সংস্থাকে রিয়াদের আকাশসীমা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় নয়া দিল্লি থেকে সরাসরি তেল আবিবের ফ্লাইটের জন্য।

মূলত, স্বেচ্ছাচারিতা এবং বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণেই প্রথম মুসলিম বিশ্বের রোষানলে পড়েন যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান। প্রতিবাদের ঝড় উঠতে থাকে সর্বস্তর থেকেই। প্রতিবাদ থামাতেই নির্বিচারে গ্রেফতার ও ধরপাকড় শুরু হয়। সেই সাথে আছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হওয়া রাজপরিবারের প্রভাবশালী সদস্য, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজপরিবার বিরোধী শিয়া সংখ্যালঘুদের লম্বা তালিকা। আপাতদৃষ্টিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান এখন নিজ দেশের ভিতরে সব পক্ষেরই চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়াচ্ছেন এবং ন্যূনতম বিরোধিতার আঁচ পাওয়ামাত্র যাকে-তাকে গ্রেফতার করতে কসুর করছে না সৌদি প্রশাসন, যা কিনা প্রতিদিনই চক্রবৃদ্ধি হারে নতুন নতুন শত্রুর জন্ম দিচ্ছে রাজতন্ত্রের বিপক্ষে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্বের চোখে “অন্যান্য সৌদি বাদশাহদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী” এবং যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান কি এভাবেই দমন-পীড়ন চালিয়ে জোরপূর্বক নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে পারবেন, নাকি সৌদি আরবের ভিতরেই দিনকে দিন ফুঁসে উঠতে থাকা কোন একটি পক্ষ তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিবে?

তথ্যসূত্রঃ
আল জাজিরা
নিউ ইয়র্ক টাইমস

Most Popular

To Top