লাইফস্টাইল

টিউশনি- সে যেন এক বিভীষিকার নাম!

গৃহশিক্ষকের দায়

টানা ক’দিন বৃষ্টি বর্ষেছে আকাশ থেকে, আজ ঘামের বর্ষণ শরীর থেকে। ছুটির দিনটাতেও নিজ দায়বদ্ধতা থেকে পড়াতে গেলাম ছাত্রকে। কিঞ্চিত আর্থিক ব্যাপারও আছে। দু’মাসের বেতন বকেয়া জমেছে। আশ্বাস পাচ্ছিলাম শুধু দিনের পর দিন।

গৃহশিক্ষকের মতন বিড়ম্বনার কাজ বোধহয় আর নেই। হাইড্রোলিক পিস্টন কিংবা বিক্রম বেতালের ভূতটার মতন চেপে রাখতে হয় পড়াশোনায়। তার পরেও নানান আবদার থেকেই থাকে। আরেকটু বেশি সময় দেয়া যায় কিনা, সুযোগ পেলে বড়টার পাশাপাশি ছোট টাকেও বসিয়ে দেন অভিভাবকেরা পড়াবার আবদারে। অনুরোধের ঢেঁকি গিলে আমাকে এঁকে দিতে হয় হাতি, শসা, বালতি। যেখানে পুরো জীবনে আঁকাআঁকিতে আমার সর্বোচ্চ অর্জন পেন্সিল স্কেচে কুঁড়েঘর, গ্রামের দৃশ্য আর গোটা কয়েক কার্টুন ক্যারেক্টার। গৃহশিক্ষকদের হতে হয় অল ইন ওয়ান। ছাত্রের পরীক্ষার সময়ও বেচারার নিস্তার নেই। অভিভাবকের নির্দেশে ইন্টারোগেটরের মতন সমস্ত সাবজেক্টের পড়া নিংড়ে বের করে নিতে হয় মগজ থেকে বাংলা থেকে আইসিটি পর্যন্ত।

গৃহশিক্ষকের ধৈর্য হতে হয় হিমালয়সম। বেতনের জন্যে এমন অপেক্ষা কোন প্রেমিকাও প্রেমিকের জন্যে করে কিনা সন্দেহ। আর সহ্যক্ষমতা? পর্বতসম ব্যাম্বু মারা খেয়েও হাসার ক্ষমতা থাকতে হয়, প্রবল অসুস্থতা নিয়ে পড়ানোর পরেও অদ্ভুত অজুহাতে কম বেতন দিলে সেটা হাসিমুখে নিতে হয়।

নাস্তা, সে তো এক ডুমুরের ফুল, অমাবশ্যার চাঁদ। কখনো কখনো পাওয়া গেলেও তাতে থাকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। মানে বেতন দেরি হবে। তখন সেই নাস্তা ফাইমক্সিলের মতন তেতো মনে হয়।

অনেক অন্যায় আবদার আসে গৃহ শিক্ষকদের কাছে। পিএসসি পরীক্ষার্থী যখন প্রশ্ন এনে দেয়ার আবদার জানায় তখন এই ঘুণে খাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রবল আক্রোশ কাজ করে। এত ফ্রাস্ট্রেশনের মধ্যে সাইক্লিং করে আসছিলাম রাতের আঁধার চিরে।বাতাসের স্রোতে গা ভাসিয়ে ভোলার চেষ্টা করছিলাম হতাশাটাটুকু বের করে দেয়ার। চেইন পড়ে গেল। একবার , দুইবার। অভাগা যেদিকে চায়, ব্ল্যাকহোল হয়ে যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেঁটে যেতে হবে আলোর সন্ধানে।

শালার মাথা নষ্ট হয়ে যায় মান্নার মতন, বেচারা ছাত্রকে দেখি রাতের বেলায় ব্যাগটা কাঁধে কোচিং থেকে ক্লান্ত অবসন্ন বুড়ো মানুষের মতন হয়ে হেঁটে ফিরতে দেখে। এইটুকুন বয়সে দুনিয়ার সমস্ত ভার যেন তার কাঁধে। ফিরতে না ফিরতেই তাকে পড়তে বসিয়ে দেয়া হয় আমার সামনে। বেচারা পড়বার শেষ দিকে ঢুলতে থাকে ঘুমে। নিজেকে তখন অত্যাচারী মনে হয়। নাইট্রো রেসিঙের এই যুগে এরা নিজেদের জন্যে সময় পায় কই? ক্লাস- কোচিং- হোম টিউটর, এইটুকু গন্ডির মধ্যেই তাদের জীবন।ভালো রেজাল্ট পেলে হাতে একটা হাই এন্ড স্মার্টফোন ধরিয়ে দিয়েই অভিভাবক নিশ্চিন্ত। কোরবানির গরুর মতনই তারা ইনভেস্ট করেন। ছেলেমেয়েকে বানিয়ে ফেলেন ব্যবসার মূলধন, তবে মুদ্রার ওই পিঠও দেখা আছে। ফাঁকিবাজ ছাত্রী বিন্দাস আয়েশ করে ঘুরে ফিরে বান্ধবীদের সাথে আড্ডা মেরে মজাসে আছে। তার পরীক্ষার খাতায় গোল্লা বসাতে বসাতে আমি খালি হাতে বৃত্ত অঙ্কনে সিদ্ধহস্ত হয়ে গেছি। এভাবেই চলছে, চলতে থাকবে –

“মেধা বেচে আয়,
গৃহশিক্ষকের দায়”

Most Popular

To Top