নাগরিক কথা

বর্তমান ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে একজন বঙ্গবন্ধু-ভক্তের যত অভিযোগ…

ছাত্রলীগ নিয়ন আলোয় neonaloy

মাঝেমাঝে দুই একজন জিজ্ঞেস করেন, আমি কেন রাজনৈতিক লেখা লিখি? আসলেই তো, আমি কেন রাজনৈতিক লেখা লেখি? রাজনৈতিক লেখালেখির জন্য যেই পরিমাণ একাগ্রতা, নিষ্ঠা, আর জ্ঞানের দরকার হয়, স্বীকার করছি এর কোনটাই আমার নেই। তবে, এই যে নিজের সীমাবদ্ধতা জানি, তারপরও কেন লিখি? আসলে ঘটনা তা নয়। আমি আসলে যা লেখি একটু খেয়াল করলে দেখবেন, সেসব লেখা আসলে যতটা না রাজনৈতিক, তারচেয়ে বেশী মানবিক। এই সময়ে আমাদের সকল সমস্যার সাথেই রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়ানো বলেই লেখাতে রাজনীতি মিশে যায় এমনভাবে।

আমি যেমন চাই যে মানুষ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শিক্ষিত হোক, তেমনি চাই মানুষ একে অন্যের প্রতি আরো মানবিক হোক। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি একমাত্র মানবিক বোধই এখন পারে আমাদের রক্ষা করতে।

যখনই কোন রাজনীতি ঘেঁষা লেখা লিখি, স্বাভাবিকভাবেই এর বড় একটা অংশ যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের সমালোচনায়। সাথে সাথেই বন্ধু তালিকায় থাকা অনেকেরই অনলাইন ও অফলাইনে কুঁচকানো ভ্রু দেখতে পাই। এরা অনেকেই সমালোচনা আর বিরোধিতার পার্থক্যটা বোঝেন বলে মনে হয় না। আবার অনেকেই কথাগুলো সত্য জেনেও শুধুমাত্র দলান্ধতার কারণে বিরুপ হন।

অনেকেই বিএনপি-জামাত আমলের একই ধরনের ঘটনার সময়কার তুলনা দেন অথবা জিজ্ঞেস করেন তখন কিছু লিখিনি কেন?

তবে শুনুন, আমি পারিবারিক ভাবেই আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক, বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম সমর্থক। তাই প্রিয় দলের খারাপ-ভুল দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করাটাই স্বাভাবিক এবং আমার দায়িত্ব বলে মনে করি। দলের ভুল ত্রুটি নিয়ে কথা বললেই “বিরোধিতা” হয়ে যায় বলেই, আজ ছাত্রলীগকে সবাই হাতুড়ি লীগ বলে ডাকে এবং হালে সেটা হেলমেট লীগে গিয়ে ঠেকেছে। এই মহান অবদান আপনার, আপনাদের, যারা দলান্ধ- তাদের!!

আমি ২০১৩ এর শিবির-হেফাজত আর ২০১৮ এর ছাত্রলীগের মাঝে অপকর্মের ভিত্তিতে কোন ফারাক দেখিনা। এই ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ না! সেই ছাত্রলীগ হলে, নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে বিএনপি-জামাত আমলের সাথে নিজেদের তুলনা করতেন না! প্রয়োজন ছিল এই বিএনপি-জামাত-ছাত্রদল-শিবিরের কর্মকাণ্ডের বিপরীত কিছু করে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা জিতে নেয়া, জানি আমাদের মতো বহুমতের দেশে সেটা কষ্টসাধ্য বিষয় কিন্তু ইচ্ছা থাকলে সেটা করা যেতো।

নিজেদের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ছাত্রলীগ কাদের হাতে জন্ম নেয়া দল, তার নেতৃত্ব কারা দিয়েছিল এক সময় আর শিবির-ছাত্রদল কাদের হাতে জন্ম নেয়া দল! আর ছাত্রদল তো তাদের মুল দলের মতোই- ক্ষমতা না থাকলে মেরুদণ্ডহীন। তাদের অপকর্মের খেসারত স্বরুপ তাদের এখন স্থান হয়েছে এখন প্রায় জাদুঘরে। অথচ সেই ছাত্রলীগের নেতারা মুখ খুললেই মানুষ হাসে! সেই ছাত্রলীগকেই আপনারা আজকে হাতুড়ি লীগে নামিয়ে ছেড়েছেন। কিছু বললেই বানী শোনান ৪ দশক আগের; আপনাদের অবগতির জন্য বলি ৪ দশকে কথা ছিল এগিয়ে যাওয়ার; ছাত্র থেকে পিছিয়ে কাঠমিস্ত্রী হওয়ার নয়!

অনেকে বলেন, অল্প কিছু নেতাকর্মী এরজন্য দায়ী, তো মূল দল থেকে কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা একটু বলবেন কি দয়া করে?

অথচ উল্টো নেতাদের নীতির প্রশ্নে ছাড় না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করায় কিছু কর্মীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে রাখা হয়েছিল, এটা মাত্রই গত বছরের কথা!

নিরপেক্ষ চোখে বিগত বছরগুলোর হিসাব করে দেখুন। কতগুলো ভালো কারণে, আর কতগুলো খারাপ কারণে ছাত্রলীগ সংবাদের শিরোনাম হয়েছে, তখন নিজেই উত্তর পেয়ে যাবেন।

আসিফ নজরুলের মতো লোক যখন টকশো’তে বড় বড় লেকচার দেয়, সেটার প্রতিবাদও আপনারা করেন না; কিন্তু কোটা আন্দোলনে অংশ নেয়া মার খাওয়া ছাত্রদের পক্ষ নেয়া শিক্ষকদের মার দেয়ার জন্য প্রবল আন্দোলনের ডাক দেন, নিরাপদ সড়ক চাওয়া ছাত্রদের উপর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েন- এই হচ্ছে ছাত্রলীগ!

অন্যসব জিনিস বাদ, আমাদের ইতিহাস নিয়ে কয়জন ছাত্রলীগ সদস্য সমৃদ্ধভাবে জানেন? বুঝতে পারা তো অনেক দুরের কথা, কয়জন পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো? একজন ছাত্রনেতার বাৎসরিক উপার্জন কত, এর উৎস কি – কেউ বলতে পারবেন, কেউ পারবেন এসবের উত্তর দিতে? বঙ্গবন্ধুকে আর মুক্তিযুদ্ধকে তো অনেক বিক্রি করেছেন, আর কত? এবার ক্ষ্যান্ত দেন! নিজেদের গুনগান নিজেদেরই গেয়ে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হচ্ছে, সেটা যে ছাত্রলীগের মতো সংগঠনের জন্য অপমানজনক সেটা তো বোঝেন নাকি??

আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সমালোচনা করে কিছু লিখলে, একদল মানুষ এসে সেখানে লাইক দেয়, লাভ ইমো দেয়, ফ্রেন্ড রিকূ পাঠায়। এরা চুপিচুপি ঘাপটি মেরে থাকে আপনার-আমার ফেসবুকে বন্ধু তালিকায়। সারা বছর আপনি এদের কোন কার্যক্রম দেখতে পাবেন না, শুধুমাত্র আওয়ামী বা ছাত্রলীগ বিরোধী কোন স্ট্যাটাস দিলেই এরা সেই স্ট্যাটাসের গা বেয়ে কুৎসিত মাকড়সার মতো জড়িয়ে ধরবে লাইক লাভ ইমো দিয়ে! এরা ভয়ংকর, এদের থেকে সাবধান থাকুন। এরা সেই সকল দলের সমর্থক যাদের নাড়ী পাকিস্তানে পোঁতা!

মোটামুটি এর জন্যও দায়ী বর্তমান আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ! নিজেরা বিক্রি হয়ে এই মাকড়সাগুলো দলে জায়গা দিয়েছে। এখন তারাই এদের অশিক্ষা, নির্বুদ্ধিতা আর লোভের সুযোগ নিয়ে তাদের ব্যবহার করেই তাদের নিজস্ব “আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ” কে নামিয়ে এনেছে “হাতুড়ি লীগ” আর “কুত্তা লীগ” পরিচয়ে। কিন্তু হাতুড়ি লীগের গুনধর রত্নরা এই ব্যাপারটি বুঝেও না বোঝার ভান করে আছেন!

এখন হাতে ক্ষমতা আছে, সময় আপনাদের হাতে- যারা সত্যি বঙ্গবন্ধুকে আদর্শ মানেন, দেশকে ভালোবাসেন – দুধের মাছি না হয়ে ভুল গুলো শোধরানোর চেষ্টা করুন, গায়ের জোর আর ক্ষমতার জোর না খাটিয়ে নিজেদের মানবিক বোধ আর ভালোবাসার ক্ষমতাটা কাজে লাগান, কারণ শুধু এই ক্ষমতা দুটোই চিরস্থায়ী। আর এর অন্যথা হলে, একসময় নিজেরাই ডুবে যাবেন নিজেদের বানানো চোরাবালির অতলান্তে।

পরিশেষে বলি, রাজনীতি-রাজনৈতিক লেখা কোনটাই আমার কাছে আনন্দের বিষয় নয়, তবে পড়ি শুধু ইতিহাস জানার আগ্রহে। সে ছোট্ট জানার গন্ডি ধরেই ইচ্ছে করে, দেশের রুপরেখা বদলে ফেলার মতো একটি রাজনৈতিক দল ও তার ছাত্র সংগঠন দেখতে; এমন জনবিরোধী, বাকরোধ করা, নিরাপরাধ ছাত্র বা বিরোধী দল পেটানো দল বা সংগঠন নয়।

শুনেছি ছাত্রলীগের নতুন শীর্ষ নেতাদের একজন খুব ভালো কবিতা লিখেন, আশা করবো তার ভিতরের মনুষ্যত্ব এখনো মরে যায় নি, তার হাত ধরেই না হয় ফিরে আসুক সোনালী দিন।

পারবেন সেটা ফিরিয়ে আনতে?

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top