বিশেষ

বন্ধুত্ব দেখাতে যেয়ে বিপদ ডেকে আনছেন না তো?

ইয়ারফোন নিয়ন আলোয়  neonaloy

সত্যি করে একটা কথা বলেন তো, আপনার খুব কাছের কোনো বন্ধু যদি তার আন্ডারওয়্যার খুব ভালোভাবে ধুয়ে আপনাকে পরতে দেয়, তবে আপনি কি সেটা স্বাচ্ছন্দ্যে পরবেন?

অথবা আপনার কোনো বন্ধুর নতুন কেনা ব্রাশ যেটা সে একবার ব্যাবহার করে অনেক ভালোভাবে ধুয়ে রেখেছে। যে টুথপেস্ট দাঁতের ৯৯.৯৯% জীবাণু নির্মমভাবে হত্যা করে, সেই টুথপেস্ট টুথব্রাশের জীবাণুকে ছাড় দিবে ভেবেছেন? আইন যেমন অন্ধ তেমনি টুথপেস্টও অন্ধ, তার কাজই হচ্ছে নির্দয়ের মত জীবাণুর বংশ নির্বংশ করা৷ এটা জানার পরেও আপনি আপনার বন্ধুর টুথব্রাশ কি কোনো ধরনের সংশয় ছাড়া স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাবহার করবেন?

লেখার শুরুতে “জাইঙ্গা”র উপস্থিতি দেখে যদি নাক চেপে পাশ কেটে চলে যান তবে ক্ষতি আপনারই, অথবা আপনার অজান্তে আপনি অন্য কারো ক্ষতির কারণ হতে পারেন৷

অধিকাংশ মানুষই এই দুই প্রশ্ন শুনেই হা-রে-রে-রে করে আমার দিকে তেড়ে আসতে পারেন, “কী আউলফাউল প্রশ্ন করিস ব্যাটা?”

ইয়ারফোন আন্ডারওয়্যার নিয়ন আলোয় neonaloy

বন্ধুর সাথে অন্তর্বাস শেয়ার করাটা অনেক এরকম একটা বিষয়!

আপনি আরেকজনের ব্যাক্তিগত জিনিস যেমন আন্ডারওয়্যার, টুথব্রাশ পরিষ্কার থাকার পরেও ব্যাবহার করতে আপত্তি জানান কিন্তু আরেকজনের অপরিষ্কার ইন-ইয়ার ইয়ারফোন (যেটা কানের ভেতরে রেখে ব্যাবহার করা হয়) ঠিকই স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাবহার করছেন। অথবা আরেকজনকে আপনার কানের ইয়ারফোনই সাধছেন, “আরে নে নে গানটা শোন, অস্থির হয়েছে গানটা, উস্তাদ মাহফুজ খাঁ তো একদম ফাটিয়ে দিয়েছে”।

আমাদের কানের ভেতর সবসময়ই একধরনের ওয়াক্স উৎপন্ন হয়, যেখানে প্রতিনিয়ত ব্যাকটেরিয়া উৎপন্ন হচ্ছে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো আপনার কানের জন্য ভালো, আপনাকে বিভিন্ন ধরণের ইনফেকশনের হাত থেকে বাঁচায়৷ এই যে কানের ভেতরে ওয়াক্স বা মোম উৎপন্ন হয় এটা কিন্তু আমাদের কানের ভেতরের অংশে ময়লা প্রবেশে বাধা দেয়। অনেকের মতে এই ওয়াক্সের গন্ধ পোকামাকড় দূরে রাখে৷

মূল কথায় ফিরে আসি, এই যে আপনি ইয়ারফোনটা কানের ভেতরে দিচ্ছেন আপনার কানের ওয়াক্স কি ইয়ারবাডে লাগছে না? সেটা আরেকজন যদি তার কানে দেয়, তার কানে আপনার ইয়ার ওয়াক্স যাবে না লিখে দিতে পারবেন? আবার তার ইয়ার ওয়াক্সও আপনারটার সাথে বিনিময় হবে না- সে গ্যারান্টি কে দিবে?

ইয়ারফোন নিয়ন আলোয়  neonaloy

ইয়ার ওয়াক্সের বাসা-বাড়ি!

আজকের এই লেখার মূল কারণ আমাদের বন্ধুত্ব এবং বেহুদা আবেগ৷

আপনার বন্ধু আপনার কাছে ইয়ারফোন চাইলো, আপনি হুট করে দিয়ে দিলেন। কিন্তু তার কানে শুধু তার তৈরী ব্যাকটেরিয়াই যে আছে তাই না, শুধু পাউরুটি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে যে ঈস্ট বা ফাঙ্গাস, তা-ও থাকতে পারে একজনের কানের ভেতর কোনো ইনফেকশনের দরুণ৷

যেহেতু বঙ্গদেশ মূর্খের দেশ এবং যেহেতু আমাদের আচার-আচরণ অনেকাংশেই সেফাতউল্লাহ’র বকাবকিকে জাস্টিফাই করে, তাই এ ধরনের রিয়েকশনও আসতে পারে “ওই মিয়া এত কথা বলেন কেন? আমরাও জানি কানের ব্যাকটেরিয়া খুব একটা ক্ষতি করে না, শুনছি আরেকজনের কাছে।”

আপনি কি শুনেছেন আমি জানি না তবে এতটুকু বলছি ঈস্ট আপনার কানের কী কী করতে পারে গুগল ঘেঁটে জেনে নিন৷ দুইটা মেজর সমস্যা যা কিনা ঈস্টের কারণে ঘটতে পারে- এক নাম্বারেই আসবে আপনার শ্রবণশক্তি বিনাশ, দুই নাম্বারে আসতে পারে আপনার শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া৷

যারা জানেন না তাদের বলছি, আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষাতে কানের ভূমিকা প্রচুর। কানসা বরাবর কেউ মারলে টের পাওয়া যায় ভারসাম্য ধরে রাখা কত কষ্ট। ছোটবেলায় আব্বা-আম্মার হাতে খেয়েছেন কিনা মনে করে দেখুন৷

এখন আপনি আমাকে বলবেন “ওই মিয়া, ফাউ কথা বলেন কেন? আপনি কিভাবে শিউর হলেন যে আমার জানে জিগার, পেয়ারে পগার দোস্তের কানের ভেতর ঈস্ট আছে?” অথবা যেসব কাপল এক ইয়ারফোনে গান শুনে দুই হিয়া শান্ত করেন, তারা অশান্ত হয়ে আমাকে বলে বসবেন “কত ছোট মনের মানুষ, নিজে সিঙ্গেল তাই আমার মিঙ্গেলের নামে যা তা বলছে৷  বুঝি বুঝি, সবই বুঝি৷ আমাদেরকে দেখে ওর হিংসা হয়, আমাদের মত হতে চায় কিন্তু শালা গরীব তাই পারে না৷ ইয়ারফোন নিয়ন আলোয়  neonaloy

দেখুন, শুরুতে বড় রোগগুলো ধরা যায় না বলে একটা প্রস্টিটিউট/তার খদ্দের, অথবা পাশের বাসার বড় মনের ভাবি/তার মোটা মনের দেবরের ভেতরে যদি এইচআইভি’র জীবাণু বাসা বেঁধে থাকে, তবে তারা টের পাবার আগেই তাদের ভেতরে সেটাও বাসা বাঁধবে৷

কিন্তু আপনারা তো এগুলো শুনবেন না, সময় কই? লেখার প্রথম লাইন পড়েই তো অনেকে এড়িয়ে গেছেন!

সমস্যাটার শুরু এখানেই। আপনার বন্ধু আপনার কাছে ইয়ারফোন চাইলো, সে রাগ করবে ভেবে আপনি মানা করলেন না। আবার পাশের বাসার দেবরকে ভাবী মানা করলে দেবরও রাগ করতে পারে৷

ক্ষতি কিন্তু হবেই, আপনি মানেন আর না মানেন। শুধু যে আইন আর টুথপেস্টই অন্ধ তাই না, জীবাণুরাও অন্ধ৷ কার মন কত বড় দেখার মত চোখ নাই তার৷

মানলাম অন্তরে পাথরচাপা দিয়ে আপনি তারে বললেন যে, “দোস্ত আমি আমার ইয়ারফোন আরেকজনের সাথে শেয়ার করি না” সে মনে মনে বলবে “শালা ছোটোলোকের বাচ্চা, একটা ইয়ারফোন নিয়াও কাইশটামি করে”।

এখানে বিষয়টা ছোটলোকী হলে সে নিজে কত বিরাট বড়লোক যে ইয়ারফোন কিনতে না পেরে আরেকজনকে ছোটলোক বলে গালি দিচ্ছে, আর ইয়ারফোন কিনলেও আপনার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আপনি আনেন নাই। ছোটলোক কে?

এখানে আপনার বন্ধুটি বিষয়টার গুরুত্ব জানে না বলেই সে কিন্তু আপনার সাথে রাগ করেছে। এবং রাগের মুহূর্তে তাকে কিছু বলতেও পারবেন না, লাভ নেই। কারণ আমাদের প্রচ্চুর আবেগ৷ আমরা টিফিনের টাকা জমিয়ে আবেগ কেনা জাতি। আমাদের সবকিছুর অভাব থাকলেও আবেগের অভাব হয় না৷ টাকা জমিয়ে আবেগ কিনা বাদ দিয়ে আগে একটা ইয়ারফোন কিনেন, এখন ইয়ারফোন প্রতিনিয়ত ব্যবহার করতে হয়। জাইঙ্গা ছাড়া চলা গেলেও ইয়ারফোন ছাড়া চলা কষ্ট৷ গান শুনার সময় আরেকজনের সমস্যা করতে না চাইলে ইয়ারফোন লাগবেই, সভ্য যেকোনো মানুষের বিষয়টা বোঝার কথা৷

এখন বাজারে চার-পাঁচশো টাকায় মোটামুটি ভালো মানের ইয়ারফোন পাওয়া যায়, যেগুলোর সাথে এক্সট্রা ইয়ারবাড দেয়া থাকে৷ আপনি যেহেতু বড় মনের মানুষ, কেউ চাইলেও মানা করতে পারেন না সেহেতু নিজের সেফটির জন্য এক্সট্রা ইয়ারবাড সাথে রাখবেন যেনো কেউ চাইলে ইয়ারবাডটা অন্তত পাল্টে দিতে পারেন। কারণ, আমাদের মধ্যে খুব অল্প কিছু মানুষই আছেন যারা ইয়ারবাড রেগুলারলি পরিষ্কার করেন।

ইয়ারফোন নিয়ন আলোয় neonaloy

শাওমি, অ্যাওয়ি, রিম্যাক্স সহ বেশ কিছু ব্র্যান্ডের ভাল ইয়ারফোন পাওয়া যায় ৪০০-৫০০ টাকা দামের মধ্যেই

একটা কথা বলি, আমাদের শরীরের সবচাইতে সেন্সিটিভ অংশের ভেতরে কানের নাম উপরের দিকেই আসে৷ অনেক নাজুক গড়নের অধিকারী এই কান বাবুটা। তার যত্ন নেয়া আপনার দায়িত্ব, শুধু ইয়ারফোন শেয়ার না করলেই কানের কেয়ার নেয়া হয়ে যায় না।

এখন বসতে দিলে শুতে চাওয়া জাতি আমার লেখায় যদি কানের কিভাবে যত্ন নিতে হয় বিষয়ক বিস্তারিত লেখা আশা করে তবে তাদেরকে হতাশই হতে হবে৷ আমি অলস মানুষ এই লেখাটা ঠেকায় পরে লিখেছি, আর পারবো না। অনেকবার ইয়ারফোন শেয়ার করা নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, তাই এই লেখাটা লিখা৷

এই লেখা লিখতে গিয়ে একটা ভিডিও পেলাম “হোয়াই শেয়ারিং ইয়ারফোন ইজ সো রোমান্টিক”। নে ভাই রোমান্টিকতা করতে থাক৷ যখন কানসা বরাবর খাওয়ার আগেই মাথা ভনভন করে ঘুরবে তখন টের পাবি কত ধানে কত চাল, কত শেয়ারিং-এ কত রোমান্টিকতা৷

যাইহোক শেষ কথা এটাই প্রেম বা বন্ধুত্ব না ভাঙতে চাইলে লেখাটা শেয়ার করতে পারেন, শেয়ার করতে সমস্যা হলে আপনার প্রিয়জনকে লেখাটা পড়তে দিতে পারেন, তাও সমস্যা হলে লেখাটা কপি করে রেখে দেন। আমি কিছু মনে করবো না।

প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর। কিন্তু আমাদেরকে কে বোঝাবে? আমাদের যে অনেক আবেগ।

আরো পড়ুনঃ কেন আমরা ইচ্ছামত টাকা ছাপাই না?

Most Popular

To Top