ফ্লাডলাইট

দলে ফিরতে যা যা করতে হবে আশরাফুলকে…

আশরাফুলের ফেরা নিয়ন আলোয় neonaloy

আমার মা ক্রিকেট তেমন একটা বুঝেন না। তবে এই ছেলেটা যখন ব্যাটিং-এ নামত, তখন নানা ব্যাস্ততার মাঝেও টিভি স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন। যতক্ষণ ছেলেটা ক্রিজে থাকত ততক্ষণ সৃষ্টিকর্তার নাম জপতেন। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বাড়ীর গৃহিণী, সবারই একটাই প্রশ্ন ছিল- “আজকে আশরাফুল কত করেছে?” এভাবেই নানা স্তরের মানুষদের বাংলাদেশের খেলা দেখতে একপ্রকার বাধ্যই করেছিল ছেলেটা।

আমরা যখন প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম যে জিম্বাবুয়ে আর কেনিয়া ছাড়া আর কোন টিমকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের নেই, ঠিক তখনই এই ছেলেটার আবির্ভাব হয়। বড় বড় জায়ান্টদের আমরা হারানো শুরু করি এই ছেলেটার হাত ধরেই। যেদিন ছেলেটার ব্যাট হেসেছে সেদিন বাংলাদেশের মানুষ হেসেছে। ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন ম্যাচ উইনার হাতে গোনা কয়েকজনই আছে যারা একা হাতে ম্যাচ জিতিয়েছে।

এমন কোন শট ছিল না, যেটা এই ছেলেটার হাতে ছিল না। তখনকার দিনে আনঅর্থোডক্স শট খেলা হত না বললেই চলে। শচিন, লারা, পন্টিং সবাই ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ মেনেই শট খেলতেন। সেই সময় এই ছেলেটা এমন কিছু শট খেলেছে যেগুলো ২০১৮-তে এসেও অনেকে খেলতে হিমশিম খায়। আধুনিক ক্রিকেটে রিভার্স সুইপ আর স্কুপ খুবই ইফেক্টিভ দুটি শট। এই শটগুলো সাবলীল ভাবে তাকেই প্রথম খেলতে দেখি। হ্যাঁ, ট্যালেন্টের কোন অভাব ছিল না ছেলেটার। শুধু একটা অভাবই ছিল ছেলেটার। ধারাবাহিকতার অভাব। এবং পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই এই অভাবটা তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বাংলাদেশের এই ব্যাটিং বিস্ময়কে।

পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে এতো অধারাবাহিক থাকা সত্ত্বেও ছেলেটার একটা বড় ফ্যানবেজ এখনো আছে। পাঁচ বছর ন্যাশনাল টিমের বাইরে থাকায় সবারই ছেলেটাকে ভুলে যাবার কথা থাকলেও এখনো যেকোনো ক্রিকেট রিলেটেড টক শো তে “আশরাফুল” একটি হট টপিক।

আরো পড়ুনঃ মোহাম্মদ আশরাফুল- বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় রহস্যের নাম

আগামীকাল আশরাফুলের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। বাংলাদেশের একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ আশরাফুলকে আবার লাল-সবুজ জার্সিতে দেখার জন্য পাঁচ বছর ধরে আশায় বুক বেঁধে আছেন। তবে আশরাফুলের জন্য ন্যাশনাল টিমে ঢুকার রাস্তাটা প্রায় পুলসিরাতের মতই কঠিন বলা যায়।

আশরাফুলকে টিমে ঢুকতে হলে মূলত তিনটি চ্যালেঞ্জ পার করতে হবে-
(১) আশরাফুলের ব্যাটকে আবার আগের মত ধারালো করতে হবে
(২) নামের সাথে “অধারাবাহিক” ট্যাগ মুছে ধারাবাহিক হতে হবে
(৩) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- ফিটনেস

১ এবং ৩ নম্বর চ্যালেঞ্জ দুটি তিনি ভাল ভাবেই উৎরাচ্ছেন এটা ধরেই নেয়া যায়। গত প্রিমিয়ার লীগের রেকর্ড ৫ সেঞ্চুরি এবং লাস্ট ২ মাসে ৭-৮ কেজি ওজন কমানো অন্তত তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এই তিনটি চ্যালেঞ্জ পার করার পরেও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। সেটা হচ্ছে আশরাফুল যেই পজিশনে খেলেন, ন্যাশনাল টিমের সেই পজিশনটা খালি আছে কিনা।

টেস্টে আমাদের ২ আর ৭ নাম্বার পজিশন ছাড়া সবগুলো পজিশনই ফিক্সড। যদি এক্সট্রা একটা কিপার নেই তাহলে ৭ নাম্বার পজিশনটাও বুকড, এজন্য মোসাদ্দেকের মত প্লেয়ারকেও মাঝে মধ্যে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে আমাদের। বাকি থাকল তামিমের সাথে ওপেনিং-এ ২ নাম্বার পজিশন। আমি আমার জীবদ্দশায় আশরাফুলকে টেস্ট ম্যাচে কখনও ওপেনিং করতে দেখিনি, আর ওপেনিং করার মত ব্যাটসম্যানও সে না। তাহলে বুঝতেই পারছি আমাদের সিনিয়র চার প্লেয়ারের কেউ একজন রিটায়ার্ড না করা পর্যন্ত কিংবা অতিরিক্ত বাজে না খেলা পর্যন্ত আশরাফুলের টিমে ঢুকা প্রায় অসম্ভব।

এবার আসি ওয়ানডেতে। ওয়ানডে’র অবস্থা তো আরও খারাপ। যেখানে মমিনুল, শান্ত আর মোসাদ্দেকদের মত তরুণ তুর্কিরা ঘরোয়া লীগে শতকের পর শতক করেও ন্যাশনাল টিমে জায়গা পাচ্ছে না, সেখানে আশরাফুলের মত বুড়ো ঘোড়াকে ওয়ানডে টিমে আশা করাটা বিলাসীতাই বটে।

আর টি-২০? এখানে মাশরাফির মত পারফর্মারকে অবসর নিতে হয়।নিদাহাস ট্রফিতে পারফর্ম না করলে হয়তো মুশি আর তামিমের বিদায়ঘণ্টাও বাজতে পারতো। সেখানে অ্যাশকে টিমে চিন্তা করাও এখন পাপ মনে হবে টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে।

তবে হ্যাঁ। আশরাফুল একজন চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ার। তার মত প্লেয়ার ব্যাটিং অর্ডারে থাকা মানে প্রতিপক্ষের জন্য এক্সট্রা একটা চাপ। আমরা কিন্তু একটু টেকনিক্যালি চিন্তা করলে “আশরাফুল” নামক অচল পয়সাটাকেও স্বর্ণমুদ্রায় পরিণত করতে পারি।

পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায় আমরা ইনিংসের প্রথম ৪০ ওভার পর্যন্ত টপেই থাকি, খেই হারিয়ে ফেলি শেষের ১০ ওভারে। যেখানে অন্যান্য টিম শেষ ১০ ওভারে ১০০+ রান তুলে, আমরা সেখানে বড়জোর ৬০-৭০ রান তুলি। এই ৩০-৪০ রান কম করার জন্যই অনেক ম্যাচ আমাদের হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। আমাদের ওয়ানডেতে ডেথ ওভারগুলোতে দ্রুত রান তোলার মত ব্যাটসম্যান সাব্বির রুম্মন ছাড়া আর কেউ নেই বললেই চলে। আরিফুলকে আমরা ডেথ ওভারের জন্য কেবল তৈরি করা শুরু করেছি। আবার গোঁদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে সাব্বিরের অফফর্ম। সাব্বিরের বর্তমান ফর্ম বিবেচনা করলে ৩০ সদস্যের দলেও তার এখন জায়গা পাবার কথা না। তথাপি বলা যায় আমাদের এখন হার্ড হিটার নেই বললেই চলে।

এই হার্ড হিটারের অভাবে আমরা হেরে যাচ্ছি অনেক টি-২০ ম্যাচও।

আশরাফুলকে কিন্তু আমরা ডেথ ওভারে ট্রাই করতে পারি। ডেথ ওভারে মূলত সেই টাইপ প্লেয়ার প্রয়োজন হয় যারা ক্রিজে নেমেই হাত খুলতে পারে এবং অ্যাশ ঠিক এমনই একজন প্লেয়ার। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তার প্রতি অভিযোগ ছিল তিনি এসেই শট খেলতে চান, অতিরিক্ত শট খেলেন। এজন্য ওনার স্ট্রাইক রেট চমৎকার থাকলেও রানটা ২০-৩০ রানের মধ্যেই আটকে যেত। এই ২০-৩০ রানটাই যদি তিনি এখন ডেথ ওভারে করে দিতে পারেন তাহলে আমাদের ম্যাচ জেতার গ্রাফটা যে হু-হু করে উপরের দিকে উঠবে সেটা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়। তাছাড়া ডেথ ওভারে আনঅর্থোডক্স শট খুবই ইফেক্টিভ এবং আশরাফুল যে এইসব শটের মাস্টার সেটা আমরা আরও ১০-১২ বছর আগেই দেখেছি। তাই আমার কাছে মনে হয় আশরাফুলের এখন টপ অর্ডারে জন্য রেডি না হয়ে ডেথ ওভারের জন্য রেডি হওয়া উচিত।

এতো সবকিছু তখনই হবে যখন আশরাফুল ওই তিনটি চ্যালেঞ্জ উৎরাতে পারবেন। আমরা আশা করতেই পারি। কেননা আশরাফুলের মত চ্যাম্পিয়নদের জন্মই হয় চ্যালেঞ্জ উৎরানোর জন্য। হয়তোবা ঈশ্বর আশরাফুলকে আরেকটি সুযোগ দিতেই পারেন। ক্যারিয়ারের সোনালী যুগে আশরাফুল যেই অমার্জনীয় অপরাধ করেছিলেন সেটার মাশুল দেবার জন্য হলেও ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির কৃষ্ণকায় ছেলেটাকে ২২ গজে আবার সিজদাহ রত অবস্থায় দেখতে চাই।

[আশরাফুল ম্যাচ ফিক্সিং এর দায়ে নিষিদ্ধ হলেন। কিন্তু তাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে অন্য কেউ কি গা বাঁচায়নি? বিস্তারিত পড়ুনঃ আশরাফুলের ম্যাচ ফিক্সিং, এবং ভুলে যাওয়া কিছু পুরনো প্রশ্ন!]

Most Popular

To Top