নাগরিক কথা

রোগীর নাম পিঁপড়া!

পিঁপড়া ডাক্তার নিয়ন আলোয় neonaloy

ছোটবেলার ঘটনা, ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ি, বয়স ১১-১২ এর বেশী না। বাসার সামনে মাঠ, বিকেলে স্থানীয় সমবয়সী ছেলেদের সাথে খেলার জন্য বাসা থেকে বের হই। অবশ্য খেলতে বের হই বলার থেকে সমবয়সীরা আমাকে নিয়ে খেলে বলা যায়। বিষয়টা ব্যাখ্যা করি।

নিজের ফুটবল দিয়ে পোলাপানরা খেলাধূলা করে, আমাকে গোলকীপার হিসেবে বসায় রাখা হয়, মাঠে বন্ধুরা খেলে আর আমি বেলা শেষে ফুটবল নিয়ে বাড়ি ফিরি। ক্রিকেট খেলার সময় কে কোন দলে যাবে সেটা ঠিক করার পর যে দলে শক্তি কম সে দলে আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়, ব্যাট-বল আমার হলেও আমি ছিলাম ‘দুধভাত’ টাইপের।

যাই হোক, একদিন ক্রিকেট খেলার সময় উইকেটের পেছনে উইকেটকীপার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছি। যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি সে জায়গাটায় যে পিঁপড়ার ঢিপি আছে তা আমার জানা ছিলো না। পিঁপড়ার কামড় শুরু হবার পর ‘উহ মাগো’ বলে লাফ দিয়ে সেখান থেকে সরে যাবার পর দেখি দু’পায়ে অনেকগুলো লালপিঁপড়া উঠে পড়েছে। আমার চিৎকার শুনে সমবয়সী বন্ধুরা এগিয়ে আসলো। এর মাঝে এক বন্ধুর সাথে কথোপকথন নিম্নরূপ (অনেক আগের ঘটনা, হুবহু মনে নেই, তবে কথাবার্তা অনেকটা এমনই ছিলো):

–কনক, তোরে যেগুলা কামড়াইছে ওগুলা তো দেখি লাল পিঁপড়া।
–পা চুলকাতে চুলকাতে সায় দিয়ে বললামঃ হুম।
–এগুলা তো হিন্দু পিঁপড়া।
–হিন্দু পিঁপড়া!
–আরে, লাল পিঁপড়া গুলা হিন্দু, আর কালো পিঁপড়া যেগুলা দেখোস, ঐগুলা মুসলমান। তোরে হিন্দুগুলান কামড়াইছে, এগুলারে মাইরা ফেল।

কথাগুলো বলেই আমার ঐ বন্ধু সহোৎসাহে লাল পিঁপড়া মারা শুরু করলো। আমি করুণ চোখে ঐ হিন্দু(!) লাল পিঁপড়াদের মৃত্যু দেখলাম।

আমার নিজের কনসেপ্ট বলি। আমার কাছে জীবন মানেই মূল্যবান, সেটা মানুষেরই হোক অথবা অন্য কোন জীবেরই হোক। হিন্দু-মুসলিম বা অন্য কোনরকম একটা ট্যাগ দিয়ে অপ্রয়োজনে কারো জীবন নষ্ট করাকে আমি কোনদিন সমর্থন করতে পারি নাই। যেই জীবন আমরা তৈরি করতে পারি না, সেটা নষ্ট করার অধিকারও আমাদের নাই।

সিরিয়াস কথা বাদ দেই। পিঁপড়া নিয়ে আলোচনা শুরুর কারণটা বলি। গত সোমবারের ঘটনা। হাসপাতালের ইমার্জেন্সী রুমে আনুমানিক ৩৫ বছরের এক মহিলা রোগীকে দেখা শেষ করে চিকিৎসাপত্র লেখার জন্য চেয়ারে বসলাম। আমার সামনে আধ-ময়লা শার্ট-লুঙ্গি পরা এক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। তার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

জিজ্ঞেস করলামঃ

–রোগীর নাম কি?
–পিঁপড়া।
–কি বললেন?
–পিপীলিকা স্যার।
–রোগীর নাম পিঁপড়া?
–জ্বে স্যার, ভালো নাম পিপীলিকা।

একটানা ২৬ ঘন্টা যান্ত্রিক ডিউটি চলার পর যদি শুনতে হয় যে রোগীর নাম পিঁপড়া, যার ভালো নাম পিপীলিকা, তবে একটু হলেও থামতে হয়। যান্ত্রিকতা ঝেড়ে মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করলামঃ

–পিঁপড়া আপার এত বমি হচ্ছে কেনো বলেন তো, কি খেয়েছে।
–স্যার, তেমন কিছুই তো খায় নাই, খালি ডাইল-ভাত খাইছে।
–বলেন কি! পিঁপড়া হইয়া দেখি মানুষের খাওয়া খাইছে! তাই একটু বদহজম হইছে আর কি।

আমার রসিকতায় লোকটি হেসে দিলেন।

–রোগী আপনার কি হয়?
–আমার পরিবার স্যার।

তাড়াহুড়ো ছিলো। Food poisoning সাসপেক্ট করে সে অনুযায়ী চিকিৎসাপত্র রেডী করলাম। রাউন্ড দিতে হবে। রুম থেকে বের হয়ে যাবো, এমন সময় কি মনে করে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলামঃ

–আপনার নাম কি?
–মাঁকড়া।
–বুঝলাম না, কি বললেন?
–মাঁকড়া স্যার, মাকড়সা।

পুনশ্চ
১. কোন মানুষের নাম পিঁপড়া/মাঁকড়া হতে পারে এটা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। আপনাদের কল্পনাতেও বোধ হয় নেই। পেশেন্ট এডমিট করার জন্য আমার সহকারী রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট তৈরি করলো, সেই রেজিস্ট্রেশন খাতার ডকুমেন্টাল প্রুফ দিয়ে দিলাম।

পিঁপড়া নিয়ন আলোয় neon aloy

২. রোগীর স্বামীর আসল নাম কিন্তু মাঁকড়া না। স্বাভাবিক একটা নাম। নিজের নাম পরিবর্তন করে মাঁকড়া কেন রাখলেন জিজ্ঞেস করাতে এক আশ্চর্য তথ্য জানলাম। তার স্ত্রীকে সবাই পিঁপড়া ডাকে, তার স্ত্রী তাতে অস্বস্তি বোধ করে। বাপ-মায়ের দেয়া নাম তো ফেলে দেয়া যায় না। স্বামী এক বুদ্ধি আঁটলেন, স্ত্রীকে এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে কেউ স্ত্রীর নাম জানতে চাইবার পর নিজের নাম জানতে চাইলে বলেন তার নাম-‘মাকড়া’।

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অনেক রকম ফ্যান্টাসী আমি দেখেছি। এক এক ক্লাসে এর মাত্রা একেকরকম। তবে অভিজাত ক্লাসের স্বামী-স্ত্রীর ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের মাঝে আপনারা যে শৈল্পিকতা খুঁজে পান, পিঁপড়া নামের স্ত্রী’র জন্য নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘মাঁকড়া’ নাম রাখার মাঝেও আমি একই নান্দনিকতাকে বিমূর্ত হতে দেখি।

Most Popular

To Top