গল্প-সল্প

নেহালকে লেখা চিঠি…

মুক্তিযোদ্ধা নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রিয় নেহাল,
আমি যে চিঠি লিখছি জানি তা তুই পাবিনে। তবু লিখছি। না তোর এই চিঠি অন্য কেউ পড়বেনা, তাদের এত সময় নেই এই সব আজাইরা প্যাচাল পড়ার।

কতো কথা মনে পড়ছে। কোথা থেকে শুরু করি ভাবছি তাই। ১৪ই ডিসেম্বর এসে গেলো তার আগেই তোকে লিখছি। কারণ ওই দিনটা তোর জন্যে বিশেষ দিন। কতো বছর পর লিখছি তোকে। আচ্ছা এখন তোর বয়েস কত হল বলতো? আটষট্টি বছরে পড়লো তাই না? এর মধ্যে তুই মামা হয়েছিস দাদু হয়েছিস, কম না! ইদানীং মাঝে মাঝে অনেকে বলে, “আপনি সেই সব দিনের কথা লেখেন না কেনো?” কি লাভ বল। কি হবে লিখে? কেন লিখি না তা বলি।

তোর মনে আছে জহিরের (নামটা বিশেষ কারনে বদলিয়ে দেয়া হয়েছে) কথা? ওই যে মুক্তিযোদ্ধা জহির ১৯৭১ এর আগস্টের মাঝামাঝি বুড়িগঙ্গা নদীতে পাক আর্মীর নৌকায় গ্রেনেড চার্জ করেছিলো। সেই জহিরের ডান পায়ে গ্রেনেডের স্প্লিনটার লেগে পরে পচন ধরেছিল যে কারনে তার ডান পা কাটতে হয়েছিল। পরে তার বাঁ পাটাও ক্রমে অবশ হয়ে যায়। এ কারণে তাকে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হত। ১৯৭৬-এর জানুয়ারি মাসের একদিন তাকে দেখি হুইলচেয়ারে করে গুলিস্তানের জিপিও’র সামনে বসে আছে। হুইলচেয়ারের পিছনে লেখা “পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা”। আমি তাকে দেখে বললাম, “কিরে জহির, এখানে কি”? জহির আমাকে দেখে কেমন যেন বিব্রত হয়ে গেলো। শুধু বললো, “এই এমনি”। আমি আর কিছু না বলে জিপিওতে ঢুকে গেলাম। কাজ সেরে বাইরে এসে দূর থেকে দেখি জহির হাত পেতে হুইলচেয়ারে বসে আছে। দু এক জন মানুষ টাকা পয়সা দিচ্ছে তার হাতে। দৃশ্যটা আমার কাছে খুব কষ্টের ছিলো,তাই চোরের মত ওর পিছন দিয়ে সরে আসলাম। দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা জহির দেশের জন্যে যুদ্ধ করে আজ ভিখিরি। তুই বল এর পর আর কিছু লিখতে ইচ্ছে হয়?

যাক এবার একটু তোর কথা বলি। তুই ছিলি মুজিব বাহিনীর সদস্য। ট্রেনিং নিয়েছিলি ভারতের দেরাদুন থেকে। মাখন, লাকী, রতন, শাহার ওরা ট্রেনিং নিয়েছিল আগরতলা মেলাঘর থেকে। তবু তোদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিলো না, কারণ তোরা একপাড়ায় থেকে বড় হয়েছিলি। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল বেশ কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা দলের মধ্যে সমন্বয় করা। একবার নির্দেশ এলো এক জায়গা থেকে অস্ত্র আনতে হবে। সেটা ছিলো ১৯৭১ এর আগস্ট মাস। রমজান মাস। একদিন খুব সকালে তুই এলি আমার বাসায়। বেরিয়ে আসতেই ঘরে গিয়ে একটা কোট পরে আসতে বললি, তুই নিজেও ওই গরমের মধ্যে একটা কোট পরেছিলি। আমি কিছুই না বুঝে একটা কোট পরে নিলাম। তার পর বাসে করে তারাবো ঘাটে পৌছলাম। ঘাটে অনেকগুলো নৌকা লাগানো ছিল। তুই কোনোটাতেই উঠলি না। অপেক্ষা করতে থাকলি। আমি খেয়াল করলাম বেশ খানিকটা দূরে মাঝ নদীতে একটা নৌকা ছিল সেটার দিকে হাত নাড়াচ্ছিস তুই। নৌকাটা আমাদের দেখে ঘাটে ভিড়লো। তুই দুর্বোধ্য ভাষায় কি একটা বলতে নৌকার মাঝি আমাদের নৌকায় উঠতে বললো। নৌকায় উঠে মাঝির দিকে তাকিয়ে মনে হলো না সে নৌকার মাঝি। বছর বাইশের সুঠাম দেহের জিন্স এর প্যান্ট, শার্ট পরা যুবক, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, হাতে বৈঠা। আমরা কেউ কোন কথা বলছিলাম না।

প্রায় ৪৫ মিনিট বৈঠা বাওয়ার পর একটা ঘাটে নৌকা ভিড়লো। আমরা নেমে পড়লাম। এর পর হাঁটা শুরু হল আমাদের। কখনও কোন গেরস্থ বাড়ির মধ্যে দিয়ে আবার কখনও কোন স্কুল বাড়ির পাশ দিয়ে বা পুকুর পাড় ধরে। গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা হাঁটার পর একটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে আমরা ঢুকতে যাবো, এমন সময় আমাদের পিছনে একটা বট গাছের ওপর থেকে ঝুপ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হোল। ফিরে তাকিয়ে দেখি একটা ছেলে বছর উনিশ কুড়ি হবে, এক হাতে স্টেনগান অন্য হাতে ওয়াকি টকি। আমাদের প্রশ্ন করলো কোথায় যাবো। তুই কিছু একটা সাংকেতিক শব্দ বলার সাথে সাথে সে ওয়াকি টকিতে কারোর সাথে কিছু কথা বললো। এই সময় জঙ্গলের ভেতর থেকে আর একটা ছেলে প্রায় একই বয়েসি হবে বেরিয়ে এলো। তার কাঁধেও একই রকম অস্ত্র। আমাদের ইশারা করলো তাকে অনুসরন করতে। এখানেও প্রায় আধ ঘন্টা চলার পর একটা খোলা জায়গায় এসে পড়লাম। দেখি বিশ পঁচিশ জন মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। আমাদের দেখে বছর পঁচিশের এক যুবক এগিয়ে এলেন। পরনে জিন্স এর প্যান্ট। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, মুখে ঘন দাড়ি। হাত বাড়িয়ে দিলেন। আলাপ করলাম। নাম বললেন খসরু ওরফে পারভেজ। স্বাধীনতার পরে তিনি “ওরা এগারো জন” নামে একটি সিনেমা প্রযোজনা ও অভিনয় করেছিলেন। তিনি ওই মুক্তিযোদ্ধা দলটির দলনেতা।

কিছুক্ষণ আলাপের পর আমাদের বললেন, অনেক দূর যেতে হবে আগে খেয়ে নিন তার পর বাকি আলাপ করা যাবে। এ কথা বলার সাথে সাথে দুজন মানুষ কোথা থেকে একটা নড়বড়ে টেবিল নিয়ে আসলেন। একজন একটা বড় হাঁড়ি ভর্তি ভাত নিয়ে সেই টেবিলে রাখলেন। আর এক জন একটা হাঁড়িতে চুনো মাছ, অন্য একটা হাঁড়িতে ডাল আনলেন। ওরা ডাল আর চুনো মাছ ঢেলে দিল ভাতের হাঁড়ির মধ্যে। আর একজন ওই হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে সব এক সঙ্গে মিশিয়ে ফেললেন। এর পর খসরুভাই বললেন আসেন খেতে। আমরা সবাই হাত ধুয়ে সেই হাঁড়ির ভেতর হাত ঢুকিয়ে খাবার তুলে খেতে শুরু করলাম। সে খাওয়ার স্বাদই আলাদা। তবে অসম্ভব ঝাল। সবাই খুব মজা করে খেলাম।

তোকে দেখে বুঝলাম তুই এখানে প্রায়ই আসিস। খাওয়া শেষ হলে খসরুভাই আমাদের বেশিক্ষন দাঁড়াতে দিলেন না। একটা কালো রঙের ব্রিফকেস আর একটা ছোট ব্যাগ এনে মাটিতে বসে খুলে ধরলেন। ব্যাগে একটা পিস্তল, দুটো ম্যাগাজিন আর একটা বেয়োনেট ছিলো। ব্রিফকেসে ছিল একটা স্টেন গান, চারটা গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন আর তিনটে হ্যান্ড গ্রেনেড। ব্রিফকেসটা আমার হাতে দিয়ে তুই বেয়োনেট আর পিস্তলটা তোর কোটের ভেতর নিয়ে নিলি। এর পর খসরু ভাইয়ের আর অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে পথে এসে ছিলাম সে পথে ফিরলাম। তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে দিল নদীর ঘাট পর্যন্ত। আমরা কেউ কোন কথা বলছিলাম না। ঘাটে নৌকা নিয়ে সেই ছেলেটা অপেক্ষা করেছিল। সে আমাদের তারাবো ঘাটে নামিয়ে দিল। ওখান থেকে আমরা বাসে উঠলাম।

কিছু দূর যাওয়ার পর বাস সহসা থেমে গেল। এক ছোকরা পাক আর্মী হাতে রাইফেল নিয়ে বাসে উঠল। বাস ড্রাইভার আগেই আমাদের বলে দিয়েছিল আমরা যেন কোন কথা না বলি। প্রত্যেকে হাতে পাঁচ টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ওই আর্মীটা কাছে আসলে যেন টাকাটা দিয়ে দেই। আমাদের বাস থেকে নামানো হল। আমি ব্রিফকেসটা পা দিয়ে একটা সিটের তলায় সরিয়ে দিয়ে বাস থেকে নামলাম। সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড় করান হল। এইবার সবাই যার যার পকেট থেকে পাঁচ টাকা করে বার করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। একজন আর্মী উর্দু ভাষায় আমাদের ভালো হওয়ার নসিহত দিতে দিতে সবার হাত থেকে টাকাগুলো নিতে থাকল। টাকা নেয়া শেষ হলে আমাদের গাড়িতে উঠতে বলে গাড়ি ছেড়ে দিতে বলল। তোর আর আমার তখন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার অবস্থা।

ওখান থেকে গুলিস্থানে বাস বদল করে ফার্মগেটে নেমে বাসায় এলাম। তুই আমার কাছে ব্রিফকেসটা রাখতে বলে চলে গেলি। তখন রমজান মাস। সবে মাগরেবের আজান পড়েছে। আমি চোরের মত চুপি চুপি বাসার পিছন দিক দিয়ে গ্রেনেড আর গুলি ভর্তি স্টেন গান নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। কেউ টের পায় নি। দু দিন পর তুই এসে ব্রিফ কেস নিয়ে গেলি। তার তিন দিন পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যার বুলেটিনে খবর হোল গতকাল সন্ধ্যায় শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর পাক আর্মির নৌকায় গ্রেনেড হামলায় দুই পাক সেনা খতম পাঁচ জন নিখোঁজ।

পরদিন তোদের তেজকুনিপাড়ার গোপন আড্ডায় যখন গেলাম তখন তোদের ফিস্ট চলছে। তুই, লাকী আর সাহার ছিলি ওই অপারেশনটাতে। আমার যে খুশি লেগেছিল তা বলে বোঝাতে পারবনা। এর কয়েক দিন পর বাটা কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিঃ উডারল্যান্ড আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তোকে নিয়ে আমেরিকান ক্লাবে উডারল্যান্ড সাহেবের সাথে দেখা করলাম। তিনি আমাদের নিয়ে একটা ছোট্ট ঘরে বসালেন। একটু পর সেখানে হাজির হলেন অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের একজন জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা, নাম বললেন মিঃ এলেন। তিনি আমাদের কাজের খুব প্রশংসা করলেন। তারপর একটা খামে দশ হাজার টাকা দিলেন। আর তোকে বিশেষ ভাবে অভিনন্দন জানিয়ে একটা ছোট্ট পিস্তল আর ৫০ টা গুলি দিলেন। পিস্তলটা এত ছোট যে হাতের মুঠোর মধ্যে রাখলে কেউ টেরই পাবে না। মিঃ উডারল্যান্ড একটা মাঝারি সাইজের কালো রঙের বয়োম দিলেন। বললেন ওতে পটাসিয়াম সায়ানাইড আছে। হালকা ছাই রঙের নুনের দলার মত। আর দিলেন একশটা পাঁচ সিসি ইনজেকশন সিরিঞ্জ। টাকা আর সিরিঞ্জসহ পটাসিয়াম সায়ানাইড দু তিনটে দলে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। সে গুলো পরে খুব কাজে লেগেছিল।

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তোরা দুটো অপারেশন করেছিলি মনে আছে। একটা আদমজী জুট মিলের গেটের কাছে। এতে দু জন রাজাকার খতম হয়েছিল আর তিন জন রাজাকার আহত হয়েছিল। আর একটাতে যেটা হয়েছিল টঙ্গী রেলস্টেশনের কাছে, সেখানে তোরা এক জন পাক আর্মীকে খতম করেছিলি আর দুজন রাজাকারকে ধরে নিয়ে এক গোপন ডেরায় নিয়ে বেদম মার দিয়েছিলি। পরে ওরা তোদের হয়ে কাজ করেছিল। ক্রমশঃ আমরা স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তোদের অপারেশন একটু কমে এসেছিল। কারন চারদিক থেকে অন্য মুক্তিযোদ্ধা দল আর ভারতীয় সেনারা ঘিরে ফেলেছিল ঢাকা।

১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল সাতটার দিকে মিঃ উডারল্যান্ড ফোন করে জানালেন আমি যেন তাড়াতাড়ি তোকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে চলে আসি খুব জরুরী। একটু পরেই গাড়ি আসবে আমাকে নিতে। আমার মনে আছে আগের দিন অর্থাৎ ১৩ তারিখ রাতে তুমুল আড্ডা দিয়েছি তোদের ঘরে বসে। তোরা আমাকে বাড়ি ফিরতে মানা করছিলি। আমি শুনিনি। বললাম বাড়ীতে মা চিন্তা করবেন। চলে এসেছিলাম বাড়ীতে। তুই দুস্টুমী করে বলেছিলি নতুন বৌ ছাড়বেনা তাই যাচ্ছি!

ভোর সাড়ে আটটার দিকে রেডক্রসের গাড়ি এলো। তেজতুরীবাজারে তোদের বাড়ির গলির মুখে গাড়ি রেখে হেঁটে তোদের বাড়ীতে ঢুকলাম। ঘরের দরজা হাঁ করে খোলা। সচরাচর এমন খোলা থাকে না। আমি ঢুকে যে ঘরে রতন আর শাহার শোয় সেদিকে তাকিয়ে দেখি মশারী ওঠানো। কেউ নেই। ডান দিকের ঘর যেটাতে তুই, মাখন আর লাকী ঘুমাস সেটারও মশারী ওঠানো। আমি তোদের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ভেতরের দিকের উঠনটার দিকে গেলাম যেখানে উঠন পেরিয়ে রান্নাঘর। ভাবলাম তোরা হয়তো রান্নাঘরে ব্যস্ত। উঠনে পা দিতেই চোখ পড়লো ডান দিকে। সেখানে তিন জন শোয়া। চোখ বাঁধা। নিথর দেহ। আমি ভয়ে ভয়ে সেদিকে গেলাম। ধীরে ধীরে চোখের বাঁধন খুললাম। বাঁ দিকে শোয়া রতন তারই পরনের জামা দিয়ে চোখ বাঁধা ছিল। মাঝে তুই, তোর খদ্দরের জামা দিয়ে চোখ বাঁধা ছিল। ডান দিকে শাহারের দেহ তারও চোখ বাঁধা ছিল। সবার বুকে গুলির চিহ্ন, তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তোদের শরীর থেকে। তোদের গা তখনও গরম।

আমি লাফ দিয়ে বাইরে আসতে চাইলাম। আসতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম পাশে রাখা একটা মটর সাইকেলের সাথে। পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুট। রাস্তার মোড়ের মুখের বাড়ীর থেকে একজন বলে উঠলো তাড়াতাড়ি পালান আপনাকে খুঁজছে। আমি গাড়ীতে উঠতেই গাড়ী ছেড়ে দিল। ইন্টারকন্টিনেন্টালে গিয়ে দেখি লাউঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিঃ উডারল্যান্ড ও রেডক্রসের চীফ মিঃ ল্যাম্পেল। আমাকে দেখে মিঃ উডারল্যান্ড বলে উঠলেন আর সব কোথায়? আমি চিৎকার দিয়ে কেঁদে ফেললাম। একটুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মিঃ উডারল্যান্ড সজোরে আমার গালে একেটা চড় বসিয়ে দিলেন। ইংরেজীতে বললেন এখন ইমোশনের সময় নয়। তুমি এসো আমার সাথে। এরই মধ্যে তাকিয়ে দেখি বিভিন্ন সরকারি দফতরের বড় বড় কর্মকর্তারা সারেন্ডার করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

মিঃ উডারল্যান্ড ওদের দিকে আঙ্গুল তুলে আমাকে বললেন বুঝতে পারছো পরিস্থিতি কি? আমার বুঝতে বাকি থাকল না। আমরা ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে ঢুকে ওয়্যারলেস রুমে গেলাম। মিঃ উডারল্যান্ড আমাকে বললেন তোমার যে কটা মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সাথে যোগাযোগ আছে তাদের সবাইকে বলো যেন অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে এখনই ঢাকার দিকে রওনা হয়। আমি যন্ত্রের মত তাই করলাম। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম। আমার ঘোর তখনও কাটেনি। সত্যিই কি তোরা নেই? আজও সে স্মৃতি ভুলতে পারিনারে।
তার পর আর কি। লাকী আর রতনের লাশ পরে অন্য যায়গায় পাওয়া গিয়েছিল। খুব ঘটা করে তোদের পাঁচজনের লাশ দাফন করা হল ওই বাড়ীর গেটের সামনে। ঘিরে দেয়া হল চার দিক। বছর কয়েক খুব ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হোল তদের। পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা জহির, যে পরে গুলিস্থানের মোড়ে ভিক্ষে করতো সে-ও আসতো।

কালের স্রোতে আস্তে আস্তে সেই উৎসাহেও ভাঁটা পড়তে লাগল। বছর দশেক পর সবার আসা বন্ধ হয়ে গেল। সবাই ভুলে যেতে লাগল তোদের। কবরগুলো ভেঙ্গে যেতে লাগলো। ময়লা আবর্জনায় ভরে গেল তোদের কবর। আর কদিন পর হয়তো তোদের লাশ আজিমপুর বা অন্য কোন কবরস্থানে সরিয়ে নেয়া হবে। সেটাই ভালো হবে, তবু তো কিছু মানুষের দোয়া, জিয়ারত পাবি তোরা।
সালাম জানাই তোদের, নিভৃত যোদ্ধাদের, you unsung heroes.

ইতি
বুড়ো।

লেখকঃ আশেকুর রহমান

Most Popular

To Top