ক্ষমতা

বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যৎ একনায়ক?

শি জিন পিং নিয়ন আলোয় neonaloy

রাজনীতি- এই একটা শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে অনেক কিছু, প্রতি মুহূর্তে উত্থান-পতনের হিসাব আর কূটকৌশলের জোরে টিকে থাকতে হয় রাজনীতিতে।

অনেক বছর ধরেই বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে ছড়ি ঘুরিয়ে এসেছে সবার মাথার উপর দিয়ে, তার সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য রাশিয়া আর চীন থাকলেও দাদাগিরির আসনটা বরাবরই ছিল আমেরিকার।

কিন্তু এখন রাজনীতির ময়দানে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে আমেরিকার আসন। ট্রাম্পের বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্ত, কয়েকটি নিষ্ফল যুদ্ধের ভার সামলানোসহ নানাবিধ কারণে আমেরিকা এখন অনেকটাই ম্রিয়মাণ।

যেকোনো শূণ্যস্থানই যেমন কাউকে না কাউকে দিয়ে পূরণ হয়ে যায়, তেমনি আমেরিকার শুণ্যস্থান পূরণ করতে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের নেতৃত্বে এখন চলে এসেছে চীন।

প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর দূরদর্শী নীতির কারণে চীন যেমন ধীরে ধীরে বিশ্ব মোড়লের অবস্থান লাভ করছে তেমনি একনায়ক হিসেবে শি জিন পিংও আস্তে আস্তে তৈরি করে নিচ্ছেন নিজের অবস্থান। এক দশক আগেও আর দশজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের মতই অবস্থান ছিল শি জিন পিং-এর, কিন্তু নিজের বুদ্ধি আর দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক কলাকৌশল দিয়ে তিনি উঠে এসেছেন চীনের প্রধান নেতার আসনে।

মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনে নবজাগরণের সময় শি জিন এর বাবা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মাও সেতুং কর্তৃক পিপলস রিপাবলিক অফ চীন প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরেই জন্ম হয় শি জিন পিং এর, তথাকথিত “প্রিন্সলিং” বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সন্তানদের মধ্যে প্রথম সারিতেই ছিলেন শি জিন পিং। তবে চীনের সাংস্কৃতিক জাগরণের সময় শি জিন এর বাবা মাও সেতুং এর নেতিবাচক দৃষ্টিতে পরে যান আর শাস্তিস্বরূপ শি জিন এর বাবা সমস্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

শি জিন পিং নিয়ন আলোয় neonaloy

বাবা শি জংঝুনের সাথে শি জিন পিং

শি জিন কে অন্যান্য যুবকদের সাথে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লিয়াংঝিজাই নামক গ্রামে এবং এই গ্রামে কৃষক হিসেবে গ্রামবাসীদের সাথে শি জিন বেশ কয়েকবছর কাটান। লিয়াংঝিজাই গ্রামে কাটানো কয়েকটা বছর যে শি জিন এর জীবনে বেশ বড় দাগ কেটেছিল সেটা তিনি বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্ত করেছিলেন।

মাও সেতুং-এর মৃত্যুর পরে শি জিন এর বাবা তার পুরনো অবস্থান ফিরে পান এবং ১৯৭৪ সালে শি জিন সর্বপ্রথম চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে শি জিন পিং-এর প্রথম দায়িত্ব ছিল তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গেং বিয়াও’র ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করা, এবং সেখানে শি জিন পিং যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেন। এরপরে শি জিন পিং এর দ্রুত উত্থান হয় সরকারী পদে। বিভিন্ন প্রদেশে দায়িত্ব পালন করার পরে ২০০২ সালে তাকে ঝেজিয়াং প্রদেশে দলীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ঝেজিয়াং প্রদেশ, ক্ষমতার ভিত্তিমূলঃ

বড় পরিসরে এককভাবে দায়িত্ব পাওয়া শি জিন পিং তার ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগান। একদিকে তিনি যেমন স্থানীয় জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো নেওয়া আরম্ভ করেন তেমনি অপরদিকে তার পছন্দমত লোকদের দিয়ে সাজানো শুরু করেন ঝেজিয়াং প্রদেশের প্রশাসন।

আর এই ঝেজিয়াং প্রদেশের প্রশাসনিক ব্যক্তিদের নিয়েই তিনি দলীয় এবং প্রশাসনিক সব ক্ষেত্রেই একটা শক্ত “ব্যাকআপ” তৈরি করে নেন যা তাকে ক্ষমতার আরো উচ্চস্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। চীনে এখন আপনি যেদিকেই তাকান, দেখতে পাবেন সেখানে কোথাও না কোথাও এই ঝেজিয়াং প্রদেশে শি জিন পিঙের অনুগত ব্যক্তিদের কেউ না কেউ দায়িত্বে রয়েছেন এবং অনেকের ধারণা শি জিন পিং আর ঝেজিয়াং প্রদেশের কর্মকর্তাদের এই ক্ষমতাবলয় বর্তমানে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির চেয়েও বেশি।

শি জিন পিং নিয়ন আলোয় neonaloy

পূর্বসুরী হউ জিনতাও এর সাথে শি জিন পিং

বিভিন্ন প্রদেশগুলোতে কাজ করার সময় শি জিন পিং নিজের একটা গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি তৈরি করেন জনগণের সামনে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের পরিচয় দেন। দুর্নীতিগ্রস্ত চীনের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শি জিন পিং এর এই দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি দলীয় “ইমেজ” ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ভালো প্রভাব ফেলে এবং ফলে তিনি নেকনজরে পড়ে যান চীন কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চস্তরের নেতাদের। ২০০৭ সালে শি জিন পিং রাষ্ট্রীয় পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হন এবং অক্টোবরে কেন্দ্রীয় সচিবরূপে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে হু জিন্তাও প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তার ডান হাত নামে পরিচিত শি জিন পিংকে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ দেওয়া হয় এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালনকালে শি জিন পিং সর্বক্ষেত্রে নিজের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতাকে প্রমাণ করেন।

একনায়ক হওয়ার পথে বিরোধীদের দমন

২০১৫ সালে প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় শি জিন পিং এর সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। “আমি বিশ্বাস করি যে এই অভিযান চীনের কমিউনিস্ট পার্টির উপরে আবার মানুষের আস্থাকে ফিরিয়ে এনেছে, নাহলে চীন অনেক সমস্যায় পড়ে যেত। সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পর চীনের কমিউনিস্ট সমাজব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ছিল দুর্নীতি”, এভাবেই চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন শি জিন পিং। এই অভিযানে প্রায় তিনলক্ষ কর্মকর্তাকে দুর্নীতির দায়ে আটক করা হয় এবং তাদেরকে জেল-জরিমানা সহ বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়।

তবে চারিদিকে জোর গুঞ্জন উঠে যে এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শি জিন পিং এর বিরোধীদের দমন করার অভিযান এবং তার “সুপ্রীম” ক্ষমতালাভের পথ সুগম করাই এই প্রশ্নবিদ্ধ অভিযানের মূল লক্ষ্য।

ইন্টারনেট এবং সংবাদমাধ্যমের উপর কড়া নজরদারি

যদিও চীনের সরকারি খবরের কাগজ কিংবা টিভি চ্যানেল প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে যে শি জিন পিং-এর নেতৃত্বে চীন বর্তমানে অনেকদূর এগিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরের নাগরিকেরা এতে খুবই খুশি, তারপরেও অনেক সময় এসব প্রোপাগান্ডাকে ছাড়িয়ে আলোচনায় চলে আসে বিরোধিতাকারীদের নাম।

তাই এসব বিরোধিতাকারীদের দমনের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এবং এর ফলে চীনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, খবরের কাগজ এবং বিভিন্ন চ্যানেলের উপর নজরদারির কারণে শি জিন পিং-এর কমিউনিস্ট সরকার সমালোচিত হচ্ছে।

অনেক মানবাধিকার কর্মী শি জিন পিং কিংবা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে বন্দী হয়ে আছেন দীর্ঘকাল ধরে, কাউকে আবার ত্যাগ করতে হয়েছে নিজদেশ।

রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলা

পিপলস রিপাবলিক অফ চীন এর সর্বময় রাজনৈতিক দল হচ্ছে চীন কমিউনিস্ট পার্টি,এই পার্টির নিয়মানুসারে কোনো প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট দুইবারের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। এই নিয়ম মাও সেতুং এর “সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ” এর মত আবার কোনো একনায়কতান্ত্রিক কালো যুগ সৃষ্টি না হওয়ার জন্যই করা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হয়ে যাওয়া কমিউনিস্ট পার্টির মহা সম্মেলনে এই নিয়ম তুলে ফেলা হয়েছে এবং শি জিন পিং-এর একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভের অন্যই যে এমনটা করা হয়েছে সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কোনো সন্দেহ নেই।

“চাইনিজ ড্রিম” কিংবা “চাইনিজ থট” নামে চীনে নতুন ধ্যান-ধারণার প্রবর্তন হয়েছে যা স্কুলগুলোতে পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পাঠ করা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। যদিও একে “চাইনিজ ড্রিম” বা “চাইনিজ থট” বলে অভিহিত করা হয়েছে কিন্তু সকলেরই কম-বেশি জানা আছে যে এটা মূলত প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এরই রাজনৈতিক মতাদর্শ।

শি জিন পিং একদিকে যেমন শক্ত হাতে নিজের রাজনৈতিক দলের ভেতরে নিজের অবস্থানকে পোক্ত করে নিচ্ছেন তেমনি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেকে করে তুলেছেন অপরিহার্য। আমেরিকার সাথে নরম-গরম সম্পর্ক কিংবা ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থেকে শুরু করে উত্তর কোরিয়া কিংবা ইরানের সাথেও চীনের দহরম-মহরম সম্পর্ক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সামরিক এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে এমন গরিব দেশগুলোতে বিশাল অংকের ঋণ দিয়ে একদিকে যেমন সেসব দেশের বিভিন্নক্ষেত্রে নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, তেমনি এমন চেকবুক নীতির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকেও নিজের নজরদারির সামনে রাখতে পারছে চীন।

শি জিন পিং-এর বয়স বর্তমানে ৬৪ বছর চলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে তিনি আরো প্রায় ১৬ বছরের মত বাঁচবেন এবং ততদিন পর্যন্ত আজীবন প্রেসিডেন্ট থেকে শক্ত হাতে চীনকে শাসন করবেন।

এদিকে মাও সেতুং-এর স্বৈরশাসনের আমলে চীনের ভয়াবহ অবস্থার কথা চিন্তা করে খোদ শি জিন পিং-এর দলে এবং চীনের মধ্যে দানা পাকিয়ে উঠছে কিছু বিক্ষোভ এবং অসন্তোষ। আর বিশ্ব রাজনীতির খেলোয়াড়েরাও হয়তো নিজেদের স্বার্থে আঘাত আসলে ছেড়ে কথা বলবেননা শি জিন পিংকে।

তাই দেখা যাক আগামী দিনগুলোতে কেমন যায় শি জিন পিং এবং সামগ্রিকভাবে চীনের ভবিষ্যত।

Most Popular

To Top