নাগরিক কথা

আপনারা এই আন্দোলনে নেমে খিচুড়ি পাকাবেন না, প্লিজ!

হয়ত বিচার হবেনা প্রতিবারের মতই। হয়ত বিচার হলেও ৩মাস বা ২০,০০০ টাকার মত দম ফাটানো হাসির নাটক এর ওপর দিয়েই যাবে। হয়ত এই আন্দোলনটাও স্যাবোটাজ হবে। হয়ত এমন কিছু হবে, যাতে এই আন্দোলনটাকেও ‘সরকার বিরোধী’ বলে প্রমাণ করে দেবে দলকানার দল। হয়ত বা আশা দেখিয়েও আশাহত করে যাবে সাম্প্রতিক অন্য সব আন্দোলনের মতই।

তবে একটা ব্যাপার এই আন্দোলন একটা বিপ্লব ইতিমধ্যে করে ফেলেছে। সেটা হল এই নতুন প্রজন্মের প্রতি আমাদের যে ধারণাটা ছিল, সেই “প্রজন্ম” যে কেবল আসল প্রজন্মের একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, সেটা দেখিয়ে দিয়েছে। “প্রজন্ম, তুমি কি জানো?” বলে টিটকারি দেবার আগে এই সময়টা, এই কয়েকটা দিনের কথা ধুম করে চোখের সামনে চলে আসবে। আমরা যে কাজগুলো করতে পারিনি, যে কাজগুলো করার চিন্তাও করিনি, ওরা সেগুলো করেছে। সড়ক দুর্ঘটনা নামের মৃত্যুর মিছিল এদেশে নতুন কিছু না। ঐ লাশের মিছিলে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নাম যোগ হবার ঘটনাও নতুন না। আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়েছি, আমাদের সময়েও সুযোগ ছিল এসব করার, আমরা করি নি। করি নি কারণ, সোজা বাংলায়, আমাদের বুকের পাঁটা ছিল না। থাকলেও ছিল ভেঙে যায়-যায় অবস্থায়। এই প্রজন্মের বুকের পাঁটা আছে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে আছে এবং সেটা অনেক বড় ও চওড়া। এত বড় যে আসল কলিজার সাথে সেটাকেও কলিজা বলে ভ্রম হয়।

প্রতিটা আন্দোলন সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা মিডিয়ার বাইরে এক ঝাঁক উজবুক পয়দা করে। এই আন্দোলনও করেছে। পয়লা জাতের উজবুক হল তারা, যারা সব আন্দোলনেই পয়দা হয়। এই জাতের উজবুকরা ফেসবুকে বসে, বা রাস্তায় গিয়ে বুদ্ধিজীবী বা ফেসবুক সেলেব্রিটি খুঁজে। কেন ভাই, এ রকম আন্দোলনে তো এপ্রিশিয়েট করেই সময় পাওয়ার কথা না, এপ্রিশিয়েশন বা মুগ্ধতার বাইরে কিছু আসারই কথা না। আপনারা ঐসব হনু নামক অ-হনুদের টেনে মজাটা কি পান? কেউ আয়মান সাদিকরে খুঁজবে, কেউ সুখনকে খুঁজবে, কেউ অমুক কেউ তমুক। কেন ভাই? এরা কে? যারা আওয়াজ ওঠানোর, তারা এমনিতেই ওঠাবে। সাপোর্ট যারা দেয়ার, তারা এমনিতেই দেবে। আন্দোলন একটা স্বতঃস্ফূর্ত বিষয়। কেউ যদি মন থেকে সাপোর্ট দেয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দেবে, কেউ যদি ফেম সিকের জন্য সাপোর্ট দেয়, তাও স্বতঃস্ফুর্তভাবেই দেবে। এই আপনাদের জন্যই আজ সুখনদের মত মানুষগুলো গিয়ে ‘আমি সেলেব্রিটি, আমারে যাইতে দাও’ মার্কা লেইমগিরি করে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের বিরক্ত করে।

এই উজবুকদের একটা শাখা হচ্ছে ‘জাফর ইকবাল এই প্রশ্নের উত্তর দ্যান’ অথবা ‘জাফর ইকবাল আপনে কই’ ওরফে “জাইএপ্রউদ্যা” বা “জাইআক” শাখা। প্রতিটা ইস্যুতে জাফর ইকবাল স্যারকে না খুঁজলে এদের হয় না। কোটা ইস্যুতে খুব তো খুঁজছিলেন। পেয়েছেন ঘন্টা, স্যার দিয়েছিলেন গলায় আঙ্গুল দিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে। তাও শিক্ষা হয় না। এখনো খোঁজে। নূন্যতম একটু কমনসেন্স থাকলে এই উজবুককুলের জানার কথা যে স্যার ফেসবুকে আসেন না, ফ্যানমেইল পড়েন না, টিভিও নাকি দেখেন না। সমসাময়িক ইস্যুতে স্যারের জানার একমাত্র উপায় পত্রিকা। অকেশনালি একটা করে লেখা ছাড়েন, সেটা তার ছাত্ররা ফেসবুকে তার নামে করা ভ্যারিফায়েড পেজে ছাড়েন। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়াও আমার জানা মতে স্যার যখন থেকে লিখছেন তখন এই উজবুক কুলের অনেকের জন্ম হয় নাই বা তারা দুধের শিশু ছিল। তবে হ্যাঁ। তিনি সমালোচনার উর্ধ্বে নন। তিনি পঁচে যাওয়ারও উর্ধ্বে নন। কাদের সিদ্দিকি, কর্ণেল তাহের, চাষি নজরুল ইসলামরা পচতে পারলে জাফর ইকবাল স্যারও পচতে পারেন। কোটা আন্দোলনের পরে আমার ধারণা হয়েছে তিনি সেদিকে যাচ্ছেন এবং এইটা অস্বীকার করার উপায় নাই। তবে উনি আমাদের ভুলে গেলেও আমরা, অন্ততঃ আমি তাকে বা তার অবদান ভুলতে পারব না। পঁচন ধরলেও ‘জাফর ইকবাল ফিল্টার’ একটা শক্ত ফিল্টার। মানলে মানেন, না মানলে না মানেন। আপনার মর্জি। মনে মনে ভাবার ক্ষেত্রে আমরা এখনো স্বাধীন।

ও আচ্ছা, দুধের শিশু থেকে মনে পড়ল। আমি যখন দুধের শিশু ছিলাম তখন থেকে দেখতাম সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ক্যাম্পেইন। “নিরাপদ সড়ক চাই”। এক সময়ের ঢালিউড কাঁপানো নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন সাহেবের ক্যাম্পেইন। উনারও মুখ-চোয়াল বা জিহবার ঠিক-ঠিকানা নাই আজকাল, কিন্তু সড়ক দূর্ঘটনা বিষয়ে উনারে খুঁজতে যাওয়া উচিত না। এই ফিল্ডে উনারে নিয়া কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য উজবুক সমাজ তো দূরের কথা, সবাইকেই বেশ ক’বছর সাধনা করতে হবে।

চট্টলার একজন বেশ বড়সড় ছাত্রনেতা (ইয়ে, ওনার কিছু কাজকর্মের আমি নিজেও ভক্ত, যদিও ব্যক্তি হিসাবে বা মানুষ হিসাবে উনি একেবারেই অনুকরণীয় কেউ না), তিনিও আন্দোলনের সাথে আছেন। কিন্তু গত ৩১শে জুলাই আন্দোলনের একটা ছবিতে ইউনিফর্ম না থাকা এক ব্যক্তিকে মার্ক করে “জামাত-শিবিরের অনুপ্রবেশ” সাজায়ে জ্ঞানগর্ভ এক বয়ান প্রসব করেন।

তার জাজমেন্ট নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলছি না, বরং আমার আশংকা এমন জাজমেন্টাল ওনার মত অনেকেই হতে পারে। তাই অতি উৎসাহী হয়ে স্কুল-কলেজের ইউনিফর্মের বাইরে কেউ আন্দোলনের ফ্রন্টে যোগ দিয়েন না। সড়কে নিরাপত্তার অধিকার আমাদের সবার, মানছি, কিন্তু আমরা আমাদের সময় রাস্তায় নামি নাই। এই বাচ্চাগুলা নেমেছে, এরাই কাজ শুরু করেছে, এদেরই কাজটা শেষ করতে দেই। ‘তুমি পারবা না বাবু’ বলে নিজের হাতে এদের কাজ নেওয়ার দরকার নাই। দোহাই লাগে। পারলে ‘বাবু তোমাদের ভয় নাই, আমরা তোমাদের সাথে আছি’ বলে পিছনে থাকেন। পানি-টানি খাওয়ান। খাওয়া দাওয়া করান। এরা কোন মুখপাত্র ছাড়াই এতদূর আসছে, তাদের আসতে দেন। যে মুহুর্তে মুখপাত্র বা কমিটি-ফমিটি এইসব ঢুকাবেন, আন্দোলনটা ভন্ডুল হবে। এমনটা করবেন না।

বিঃদ্রঃ আমি খুব বড় কোন ফেসবুক সেলেব্রিটি হলে ‘তুই/তুমি/আপনি কি করছেন ফেসবুকে বড় বড় পোস্ট দেয়া ছাড়া’ টাইপের কমেন্ট আসত, এখন আসবে না জানি। যদি আসেও, উত্তর রেডি আছে। সেটা উপরে কিছুটা বলেছি, এখন আবার বলছি। আমার যখন সময় ছিল, তখন নামতে পারি নাই। এখন এই বাচ্চাগুলা নেমেছে। এখন ওদের সাথে নামলে ওদের লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে। তাই দূর থেকে এপ্রিশিয়েট করছি। আপনিও এপ্রিশিয়েট করেন। ছবিগুলা দেখেন। ভিডিওগুলা দেখেন। ওদের কথা শুনেন। শান্তি লাগবে। অনেক শান্তি।

Most Popular

To Top