নাগরিক কথা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, এবং একজন অভিভাবকের অভিজ্ঞতা…

দুদিন আগে ফেসবুক ইভেন্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- যাবো। কারা ইভেন্ট কল করেছে জানিনা। ধারণা ছিলো মানব বন্ধন টাইপের কিছু হবে। স্কুল কলেজের কিছু ছেলে মেয়ে থাকবে আর আমরা যারা এই শহরের নানা ইস্যুতে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াই তাদের কেউ কেউ থাকবেন, মুলতঃ ঢাকার আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানো।

কাল রাতে মৃন্ময় যখন জিজ্ঞেস করলো- ‘বাবা আমি কি কাল শহীদ মিনারে যেতে পারি?’ একটু অবাক হলেও না করিনি। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে- ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স নিয়ে সারাদিনের আগ্রহ, এই ইস্যু সে ফলো করছে বুঝিনি। দুপুরে গোসল করে যখন স্কুল ড্রেস পড়ছে তখন জিজ্ঞেস করেছি ‘স্কুল ড্রেস কেনো? ‘ বললো- সবাই স্কুল ড্রেসে আসবে।
আমি মানা করেছি প্রথমে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, যদি অন্যভাবে রিয়েক্ট করে! তবু সে স্কুল ড্রেস পড়েছে।

তিনটার একটু আগে যখন বললাম ‘চল যাই’ তখন তার অবাক হবার পালা ‘তুমি কেনো যাবে? এটা ছাত্রদের প্রোগ্রাম’। বললাম – ‘অসুবিধা নাই, তোদের প্রোগ্রামই দেখতে যাবো’। সে বিরক্ত হয়ে বললো – ‘তুমি যখন মিছিলে যেতে, দাদা কি তোমার সাথে যেতো?’ সে কোন ভাবেই আমার সাথে যাবেনা, তার ধারণা আমি পাহারা দিতে যাচ্ছি।
শেষ পর্যন্ত আমরা আলাদা আলাদা গেলাম।

যাওয়ার পর আমার ধারণা বদলে গেলো। এটা টিপিক্যাল মানব বন্ধন নয়। শত শত ছাত্র ছাত্রী স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে এসেছে। সিংহভাগ স্কুল আর কলেজের, কিছু হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর ভেতর আমি মৃন্ময়কে খুঁজে বের করে তাকে চোখে চোখে রাখা শুরু করলাম তার অজান্তে, তার স্কুলের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে এসেছে।

দেখে মনে হলো এই বিশাল সংখ্যক ছাত্র ছাত্রীর কোন নেতৃত্ব নেই, কর্মসূচী নিয়ে তাদের কোন ধারণা নেই। সবাই মিলে পুরো শহরে একটা চক্কর দিয়ে এক সাথে শ্লোগান দিলে- শহর কেঁপে উঠবে এই অভিজ্ঞতা এদের নেই। ছোট ছোট আলাদা আলাদা গ্রুপ হয়ে তারা শ্লোগান দিচ্ছে। নানা রকম শ্লোগান। সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত হচ্ছে ‘We want Justice’ মৃন্ময় আর তার বন্ধুরা এই শ্লোগানে তাল মেলাচ্ছে।

এক পাশে প্রচুর পরিমানে ছেলে মেয়ে গোল হয়ে শ্লোগান দিচ্ছে ‘আমার ভাইয়ের রক্ত লাল, পুলিশ কোন চ্যাটের বাল?’ আমি স্বৈরাচার বিরোধী, ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের প্রজন্ম। ‘এরশাদের চামড়া তুলে নেবো আমরা’, ‘শিবিরের যতো চ্যালা গোলাম আজমের ঝাউড়া পোলা’- এর বেশী ঝাঁঝালো শ্লোগান আমরা দেইনি। আমার কানে এই শ্লোগান অশ্লীল, অস্বস্তিকর লাগে। কিন্তু ছেলে এবং মেয়েরাও সাবলীল ভাবে শ্লোগান দিচ্ছে তাদের সব শক্তি দিয়ে। হয়তো সময় এই ভাষা তৈরী করে দিয়েছে, আমি কে বিচার করার। আমার সময়ের শ্লোগান হয়তো আমার বাবার কানে অস্বস্তিকর লাগতো।

এই বিপুল জমায়েতে কিছু মুখ দেখেছি যারা এইসব শ্লোগানের চেয়ে অস্বস্তিকর। শিবিরের কিছু নেতৃস্থানীয় ছেলে ছিলো, হিজবুত তাহরীর ছিলো। এরকম একটা বিস্ফোরনে এরা আসবেই নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে। কিন্তু ৯০% ছেলে মেয়ে এসেছে মৃন্ময়ের মতো তীব্র আবেগ নিয়ে। তারা হাতে লিখে পোষ্টার করেছে, পোষ্টারের ভাষা বড় আবেদন জাগানো। ‘কি হবে আকাশ জয়ে সমুদ্র জয়ে, যদি দেশের মাটিই নিরাপদ না হয়?’

এই বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ দেশ দেয়ার দায়িত্ব ছিলো আমাদের। আমরা পারিনি, ওরা নিজেদের মতো তাই দাবী জানাতে রাস্তায় নেমেছে। কাউকে ক্ষমতা থেকে নামাতে, কাউকে ক্ষমতায় বসাতে নয়।
আর কিছু না পারি, বাচ্চাগুলোর নামে বদনাম করি না যেনো! আমাদের অক্ষমতা ছাপিয়ে ওরা সফল হোক।

লেখকঃ
হাসান মোরশেদ
প্রতিষ্ঠাতা, 1971Archive

Most Popular

To Top