বিশেষ

ভাইব, এবং আমাদের নস্টালজিয়া!

ভাইব নিয়ন আলোয় neonaloy

“ভাইব” নামটা শুনলেই বাংলাদেশের ব্যান্ডসঙ্গীত ভক্তদের মাথায় কিছু গানের লাইন ঘুরতে বাধ্য- “ছুটতে ছুটতে বহুদূরে চলে গেছি আমি”, বা “আমি বিধাতারই রঙে আঁকা এক অস্পষ্ট ছবি”, অথবা “আমার চেতনার যত উদ্ধৃতি চেনা স্বত্বার কত আকৃতি” কিংবা “আমি সর্বস্বান্ত বড় ক্লান্ত আমার পথের তবুও নেই কোন শেষ”। আর তারপরেই মনটা খারাপ হয়ে যায় এই কারণে যে হয়তো এমন সব গান তারা ভবিষ্যতে আর নাও পেতে পারেন!

পথচলা শুরুর পর থেকে তুলনামূলকভাবে খুবই কম সময়ের মধ্যেই সমসাময়িক আর আট-দশটি ব্যান্ডের চেয়ে ভক্ত-হৃদয়ে বেশী জায়গা করে নিয়েছিলো ভাইব ব্যান্ডটি।

ভাইব ব্যান্ডটির বিরতিতে যাওয়া বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, বিশেষত ব্যান্ড মিউজিক সিনের ইতিহাসে অন্যতম একটি ট্র্যাজেডি। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক সিনারিও’র অন্যতম সেরা প্রতিভাবান ব্যান্ড হওয়ার পরেও ব্যান্ডটির বিরতিতে যাওয়া এবং সময়ের স্রোতে ভাইবের থেমে যাওয়া এই দেশের ব্যান্ডসঙ্গীত ভক্তদের আজও দীর্ঘশ্বাসের কারণ।

ব্যান্ডটির পথচলা শুরু হয় ২০০১ সালে। প্রাথমিক লাইন-আপ এ ছিলেন শুদ্ধ ফুয়াদ সাদী (ভোকাল এবং গিটার), সাব্বির হোসেন তূর্য (ড্রামস), মাহজুজ জসীম সৌরভ (গিটার), সাবের আহমেদ খান(বেজ) এবং ওয়ালী মোহাম্মদ আকবর (কিবোর্ড)।

ব্যান্ডের “ভাইব” নামটি শুদ্ধ আর তূর্যের মাথা থেকে আসে এই ভেবে যে এই নামটা তাদের কাজের সবচেয়ে ভালো ধারণা দিবে ব্যান্ড গঠনের পিছনে। “ভাইব” ইংলিশ শব্দটার বাংলা মানেই হলো একটি সত্ত্বার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যা অন্যরা সহজেই অনুভব করতে পারবে। ব্যান্ডের লক্ষ্যই ছিলো শ্রোতাদের মাঝে নিজেদের অস্তিত্বটা ছড়িয়ে দেওয়া তাদের কাজের মাধ্যমে।

“ভাইব” এর লোগো

ব্যান্ড গঠনের পর থেকে ব্যান্ডের প্রাথমিক লাইন-আপ থেকে শেষ লাইন-আপ পযন্ত অনেকবার গিটারিস্ট পরিবর্তন হয় ব্যান্ডের। ২০০২ সালে গিটারে সৌরভ বিদায় নিলে তার জায়গায় তানভীর যোগ দেন ২০০৩ সালে, কিন্তু তানভীর ব্যান্ড ছেড়ে দেন ২০০৪ সালে। তখন তানভীরের পর মুশফিক ব্যান্ডে তানভীরের জায়গা নেন। ২০০৫-এর জুলাইয়ে শেষ এবং ফাইনাল লাইনআপটা দাঁড়ায় যখন তৎকালীন মেটালমেইজের গিটারিস্ট সালেহ হাসান অনি ভাইব ব্যান্ডে যোগ দেন।

সেকালের ভাইব (একদম বাঁদিক থেকে অনি, সাবের, ফুয়াদ, তূর্য এবং ওয়ালী)

২০০৩ সালে মিক্সড অ্যালবাম “আগন্তুক ১” রিলিজ হয়। যেখানে আর্টসেল, ক্রিপটিক ফেইট, ব্ল্যাক এবং অর্থহীনের মতো নামীদামী সব ব্যান্ডের গানের সাথে ভাইবের প্রথম সিঙ্গেল “দূরে দূরে” ট্র্যাকটি রিলিজ পায়। আর এই এক এ্যালবামের এক গান দিয়েই শ্রোতাদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলো ভাইব।

কিন্তু তারপর হারিয়ে গেলো অনেকদিনের জন্য। বেশ খানিকটা সময় কোন খোঁজ নেই। তারপর আবার প্রায় ৪ বছর পর ২০০৭ সালের ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে হঠাৎ একদিন বেশ একটা আলোড়ন তুলেই “জি-সিরিজ” থেকে তারা তাদের প্রথম এবং একমাত্র অ্যালবাম “চেনা জগৎ” রিলিজ করলো।

“চেনা জগৎ” অ্যালবামটিকে সফল অ্যালবাম না বলার কোনই সুযোগ নেই। সবাই ব্যান্ডটাকে রক বলেছিল, কিন্তু পুরো অ্যালবামে থ্র্যাশ, সফট এবং মেলোডী সহ নানা জনরার একটা মিশ্রণ ছিল। যদিও তাদের প্রথম সিঙ্গেল “ছুটতে ছুটতে” গানটাতে বেশ মেলোডিয়াস একটা ভাব ছিল যা “অধরা” এবং “বিধাতার রঙে আকা” গান দুটোর ধাঁচে পড়ে। কিন্তু, অ্যালবামের দুটো গান ছাড়াও “আমার সংবিধান“, “চেনা জগৎ”, “স্বপ্নদেব” এবং “অবাক সব স্বপ্ন” গান গুলো শুনলেই বোঝা যায় ভাইব এর মিউজিকের ধাঁচ। থ্র্যাশ, সফট, মেলোডি সবই পাওয়া যায় তাদের কাজে। তাই ভক্তরা ভাইবকে অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ড জনরার ব্যান্ড বলতেই বেশী সাচ্ছন্দবোধ করে।

তাদের অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাক “চেনা জগৎ” ট্র্যাকটার গিটার সলোটা আজ পর্যন্ত দেশের তুলনাহীন পরাক্রমশালী গিটার সলো গুলোর মধ্য অন্যতম। শুধু কম্পোজিশনই নয়, লিরিক্সের দিক থেকেও এই অ্যালবামটির কোন তুলনা হয় না। যেমন এই অ্যালবামের সর্বশেষ ট্র্যাক “Nostalgia” গানটি শুনলে বোঝা যাবে এখানে এই গানটিতে একজন প্রবাসীর তার স্বদেশ এই বাংলাদেশের প্রতি আকুতি বোঝা যাচ্ছে। ঢাকায় বড় হওয়ার সময় তার এবং তার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে দেশে কাটানো সময়ের কথা মনে করে বলা কিছু কথা। কি কি করেছে যুবক বয়সে, কিভাবে কোথায় আড্ডা দিয়ে বেড়িয়েছে, এই দেশের মানুষ এবং দেশটি তাদের কাছে কতোটা মানে সৃষ্টি করে এসব নিয়েই এই গানটি পুরোটা। গানটায় নস্টালজিয়ার অনুভূতি এতটাই তীব্র যে দেশের বাইরে না থাকলেও নস্টালজিয়া এসে পড়ে একদম একজন স্বদেশে বসবাসকারী মানুষেরও।

২০০৫ সালে “অল কমিউনিটি ক্লাব” এ পারফর্ম করাকালীন সময়ে ভাইব।

এমনই অসাধারণ সব লিরিক্স নিয়ে এই অ্যালবামের সবগুলো গান অসাধারণভাবে কম্পোজড হয়েছিলো। সব মিলিয়ে এই পুরো অ্যালবামটি হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক সিনের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এ্যালবামের মধ্যে অন্যতম একটি অ্যালবাম। তাদের এই অ্যালবাম “চেনা জগৎ” এর জন্যই ব্যান্ডটি বিরতিতে যাবার এতো বছর পরেও প্রাসঙ্গিক, ব্যান্ড হিসেবে আজও ভক্তদের হৃদয়ের একটা বড় জায়গা তারা দখল করে রেখেছে ভাইব।

২০০৭ সালে একমাত্র অ্যালবাম “চেনা জগৎ” রিলিজের পরের বছর ভাইবের দ্বিতীয় সিঙ্গেল “অতৃপ্ত প্রাণ” ২০০৮ সালে “আগন্তুক-২” মিক্সড অ্যালবামে রিলিজড হয়।

আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড হলেও তাদের কিছু বড় প্রাপ্তি ছিলো ২০০৮ সালের সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে ভাইবের বেস্ট ব্যান্ডের পুরষ্কার জেতা। ২০০৯ সালের ঘটনা, গিটারিস্ট ফেস্টে আন্ডারগ্রাউন্ডের নামিদামী গিটারিস্টদের ভীড়েও শুদ্ধ ফুয়াদ সাদী সবার নজর কেড়েছিলেন। সম্ভাবনার অনেক কথাই বলা হয়েছিলো সাদী এবং তার ব্যান্ড ভাইবকে নিয়ে “Rising Star”-এ।

অনি হাসান এবং সাব্বির হোসেন তূর্য

যদিও ভাইব নিজেদের আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো, তবু তাদের অ্যালবাম “চেনা জগৎ” কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড সিনারিও’র বাইরেও অনেকের মনে জায়গা করে নেয়। কিন্তু এরপরেও অনেকদিন আর ভাইব-এর কোন সিঙ্গেল গান বা অ্যালবাম এর দেখা মিলেনি। ২০০৮-এর সেই সময়টাতেও ভাইবকে লাইভ পারফর্মেও দর্শক মাতাতে দেখা যেত নিয়মিত। তারপর যেন সব কিছু হঠাৎ ঢাকা পড়ে গেলো, কোথাও আর ভাইবকে দেখা যায় না, নতুন কোন গানও রিলিজ হয় না। কিছুদিন পর বিভিন্ন জায়গার থেকে শোনা গেলো যে বেশিরভাগ ব্যান্ড মেম্বারদেরই নিজেদের উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে যেতে হয় এবং ব্যান্ডটিও তারপর থেকে থেমে যায় সেখানেই। এবং, তারপর আস্তে আস্তে দৃশ্যপট থেকেই হারিয়ে যায়। কিন্তু আফসোস, যেখানে প্রথম সারির ব্যান্ডে পরিণত হওয়ার কথা ছিল ভাইবের, সেখানে আজ অনেকেই তাদের “বিগত ব্যান্ড” হিসেবে চিনে। যদিও ব্যান্ডের গিটারিস্ট অনি তার ফেসবুক পেইজের থেকে একটি পোষ্টের মাধ্যমে বলেন তারা একটা বিরতিতে আছেন।

অনি হাসানের পেইজের পোষ্ট

লাইনআপঃ-

“ভাইব” ব্যান্ড সদস্যরা

ছবির একদম বাঁদিক থেকেঃ

সাব্বির হোসেন তূর্য (ড্রামস)
তূর্য ভাইব ছাড়াও ক্রিপটিক ফেইট, রিবর্ন, গ্রুভ ট্র্যাপ এর ড্রামার হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির একজন এলামনাই যিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে সিএসই নিয়ে পড়ালেখার পর গ্র্যাজুয়েশন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং বর্তমানে সেখানে অগমেডিক্সে হেড সফটওয়ার ডেভেলপার হিসেবে কর্মরত আছেন।

সালেহ হাসান অনি (গিটার)
২০০৭-এ ওয়ারফেজ ব্যান্ডে যোগ দেন এবং ২০১৪ পর্যন্ত ওয়ারফেজের গিটারিস্ট হিসেবে ছিলেন। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

সম্প্রতি অনি হাসান কারভিন-কিসেল গিটারের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়েছেন। বাংলাদেশের কোন গিটারিস্টের এটাই প্রথমবারের মতো কারভিন-কিসেল গিটারেরর পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া। বিখ্যাত জো ওয়ালশ, জেসন বেকারদের কাতারে তিনিও নাম লেখিয়ে নেন বাংলাদেশের হয়ে। শুধুমাত্র তার জন্য কিসেল কোম্পানী একটি কাস্টম গিটার বানিয়ে তাকে দেয়।

অনি হাসান এবং তার নতুন কিসেল গিটার

এছাড়াও বিদেশে থাকাকালীন সময় বেশ কিছু ইন্সট্রুমেন্টাল কাজ করেছেন অনি। তাদের মধ্য উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে “The Himalayas is where my heart rests”। যা শ্রোতাসমাজে ভালো সাড়া ফেলে এবং অনেক গিটারিস্টই সেটার তাদের করা অনেক কভার ফেসবুক এবং ইউটিউবে আপলোড করে।

শুদ্ধ ফুয়াদ সাদী (গিটার, ভোকাল)
ভাইব এর সবচেয়ে পরিচিত নাম, সম্ভবত এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াতে অবস্থান করছেন সপরিবারে।

ওয়ালী মোহাম্মাদ আকবার (কিবোর্ডস)
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে এখন ঢাকাতেই আছেন নিজ পরিবার আর ক্যারিয়ার নিয়ে।

সাবের আহমেদ খান (বেজ)
এ্যানিমেশন এর ওপর পড়ালেখা শেষে এখন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। প্রসঙ্গত, তিনি এবং নেমেসিসের এক্স-গিটারিস্ট “মাহের খান” আপন ভাই সম্পর্কে।

 ডিস্কোগ্রাফীঃ-

তারা তাদের ব্যান্ডের জীবদ্দশায় একটিই অ্যালবাম বের করেছিলো “চেনা জগৎ” নামক।

  • চেনা জগৎ(২০০৭)

 

এই অ্যালবামে মোট এগারটি ট্র্যাক ছিল। সেগুলো হলো,

  • স্বপ্নদেব (৩.৩৭)
  • শেষের ওপাশে (৪.৩৯)
  • বিধাতার রঙে আকা (৫.৫৬)
  • চেনা জগৎ (৪.২৭)
  • অধরা (৪.৪৩)
  • মনে পড়ে (৪.১৯)
  • আশার প্রদীপ জ্বেলে (৫.১৪)
  • উড়ে চলে যায় (৪.২১)
  • আমার সংবিধান (৬.৫৭)
  • অবাক সব স্বপ্ন (৪.৪১)
  • Nostalgia (৫.১৪)

এছাড়াও ব্যান্ডের দুটি সিঙ্গেল বের হয়েছিলো-

  • দূরে দূরে(২০০৩)
  • অতৃপ্ত প্রাণ (২০০৮)

ভাইব এর ভেঙে যাওয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম একটি ট্রাজেডি। তবুও অনেকেই বলেছিলো যে আপাতত নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সবাই, অদূর ভবিষ্যতে আবার ভাইব ফিরে আসবে! এখনো সেই আশা নিয়েই ভক্তরা বসে আছে। সবচাইতে আফসোসের কথা যেটা, তা হলো- যে ব্যান্ডটিকে শ্রোতারা ভুলতে পারছেন না এতদিনেও, সেই ব্যান্ডটিকে ব্যান্ড-মেম্বাররা কিভাবে ভুলে আছেন এতগুলো বছর?!?

তথ্যসুত্রঃ

১। জো ওয়ালশ, জেসন বেকারদের সঙ্গে বাংলাদেশের অনির নাম

২। বিডি আন্ডারগ্রাউন্ডঃ ভাইব(VIBE)

৩। ভাইবঃ বাংলা রক মিউজিকের এক আফসোসের নাম।

৫। ভাইব কে মনে পড়ে?…হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া একটা অসাধারন ব্যান্ড।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top