ইতিহাস

সোভিয়েত ইউনিয়নকে যেবার ঘোল খাইয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র!

প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান নিয়ন আলোয় neonaloy

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বি-মেরুকরণ শুরু হলে, তার ফলশ্রুতিতে আদর্শগত সংঘাতের সূত্রপাত হয়। দুটি পরস্পর বিরোধী মতবাদ ও জীবনাদর্শ একে অপরের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়, যার অনিবার্য পরিণাম হল এক ধরনের অস্ত্রবিহীন মানসিক তথা স্নায়ুর লড়াই, পারস্পরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল।

আমরা  জানি এই স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়টাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইউএসএ একে অপরকে আক্রমণ না করলেও পুরো সময়টা জুড়ে তারা একটা আক্রমণাত্মক আবহ ধরে রেখেছিল। দুটোই ছিল নিউক্লিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্র এবং এক্ষেত্রে একে অপরকে আক্রমণ খুব একটা ভাল ফলাফল বয়ে আনত না বিশ্ববাসীর জন্য।

শুরু থেকেই ইউএসএ বিভিন্ন ভাবে সোভিয়েতের কর্মপদ্ধতি বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এর মাঝে একটি ছিল ডুবে যাওয়া বিভিন্ন জাহাজের খোঁজ করা, যাতে কোন ডকুমেন্ট উদ্ধার করা যায়। প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান ছিল এমনই একটি অতীব গোপনীয় প্রোজেক্ট। এর মাধ্যমে ইউএসএ সোভিয়েতের মিসাইল টেকনোলজী বুঝতে চেয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধার অভিযানে নেমেছিল। প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান সফল হয়েছিল কিনা সেটা শেষে বলা যাবে, প্রথমে বলি এর ইতিহাস এবং কার্যপদ্ধতি।

প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান নিয়ন আলোয় neonaloy

প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান প্রেসের কাছে জেনিফার নামে বহুল পরিচিত একটি প্রজেক্ট। সুন্দর এই নামের আড়ালে এই প্রোজেক্ট ছিল সিআইএ ( সেন্ট্রাল ইন্টালিজেন্স এজেন্সী) দ্বারা পরিচালিত একটি অত্যন্ত গোপনীয় মিশন।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রাশিয়ার তলদেশ থেকে ডুবন্ত সাবমেরিন কে-১২৯ কে উদ্ধার করার জন্য একটি নতুন জাহাজ বানায় যুক্তরাষ্ট্র যার নাম “Hughes Glomar Explorer” জাহাজটির ডুবে যাবার খবর নিশ্চিত করে অফিস অফ ইন্টালিজেন্স, ইউএসএ ভিত্তিক সংস্থা।  সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন ডকুমেন্ট উদ্ধার করার জন্য এই জাহাজ তৈরী করা হয়েছিল। এছাড়াও বলা হয়ে থাকে তিনটি মিসাইল নিয়ে এই জাহাজটি ইউএসএ’র পশ্চিম উপকূলের দিকে যাচ্ছিল।

ধারণা করা হয় ১৯৬৮ সালে কে-১২৯  নামক সোভিয়েত একটি ডুবোজাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ১,৫৬০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিম ডুবে গিয়েছিল। এবং জাহাজটিতে বেশ কয়েকটি নিউক্লিয়ার শক্তিধর মিসাইল ছিল। ইউএসএ এই জাহাজটি পেতে চাইছিল এই কারণে যে এর মাধ্যমে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের নিউক্লিয়ার কৌশল বুঝতে পারবে।

প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার বেশ ব্যয়বহুল, জটিল এবং গোপনীয় একটি প্রজেক্ট ছিল। দূরদর্শী ইউএসএ তাদের চিন্তাভাবনা থেকেই এ ধরণের জাহাজ নির্মাণে আগ্রহী হয়েছিল।  অংকের হিসেবে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল এখানে।

এই প্রজেক্টটিতে কাজ করার সময়ে আমেরিকা বিভিন্ন বিজ্ঞানী এবং মেরিন ডিপার্টমেন্টের সাহায্য নেয়। সমুদ্র তলদেশে থেকে অত্যন্ত গভীরের জাহাজের উদ্ধারকাজ চালানো খুব একটা সাধারণ বিষয় নয়। আমেরিকার গ্লোবাল মেশিন জাহাজকে লক্ষ্যবস্তুর উপর স্থির রাখার জন্য এমন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করে যা অনুযায়ী কাগজকে পানির তলদেশে সংরক্ষণ করে রাখা যায় বেশ কয়েক বছর ধরে। এগুলো সাবমেরিনগুলোর কোডবুক পড়তে পারে। যাতে করে তার ভিতরে থাকা কোন ডকুমেন্ট অক্ষত থাকলে তা পাওয়া যায়।

মূলত এই প্রোজেক্ট এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অক্ষত নিউক্লিয়ার মিসাইলগুলো উদ্ধার করা। এটা ধারণা করা হয় এই প্রজেক্টের প্রধান কারণ হচ্ছে অক্ষত নিউক্লিয়ার মিসাইল আর-২১ (ন্যাটো – এসএস-এন-ফাইভ)  উদ্ধার করা এবং বাকি ডকুমেন্ট এবং যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা।

প্রজেক্ট অ্যাজোরিয়ান নিয়ন আলোয় neonaloy

যদিও কে-১২৯ উদ্ধার করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার চেষ্টা চালিয়েছে কিন্তু তারা এটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় নি। ১৯৬৮ এর এপ্রিলে ইউএসএ নেভাল ইন্টেলিজেন্স অফিস লক্ষ্য করে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রশান্ত মহাসাগরে কিছু অপ্রয়োজনীয় খোঁজ চালাচ্ছে, বিষয়টা ইউএসএ’কে ভাবিয়ে তোলে। অবশেষে প্রায় ছয় বছর পর ইউএসএ এই প্রোজেক্টের মাধ্যমে উদ্ধার কাজ চালায়। নেভাল ইন্টালিজেন্স তাদের বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে কে-১২৯ এর অবস্থান নিশ্চিত করে। এটি তখন ৪০.১ ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখা এবং ১৭৯.৯ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমারেখা বরাবর অবস্থান করছিল যা কিছুটা আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার নিকটবর্তী। এক্ষেত্রে তারা এ্যাকুয়েস্টিক ডাটা ব্যবহার করে জাহাজের অবস্থান নির্ণয় করে। এছাড়াও বিভিন্ন ক্যামেরা, স্ট্রোব লাইট, এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় সমুদ্রের গভীরতা বোঝার জন্য।

জুলাই, ১৯৬৮ সালে ইউএসএ “অপারেশন স্যান্ড ডলার” নামক একটি অপারেশন চালায় কে- ১২৯ ডুবোজাহাজটি উদ্ধার করতে। ইউএসএস হ্যালিবুট এবং পার্ল হারবার নামক দুইটি নিউক্লিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন এই অপারেশনে ব্যবহৃত হয়। হ্যালিবুট প্রায় ২০,০০০ ক্লোজ আপ ছবি তোলে কে-১২৯ এর যা পরবর্তীতে উদ্ধারকাজে বেশ সহায়তা করে। ১৯৭০ সালে এই ফটোগ্রাফের উপর ভিত্তি করে হেনরী কিসিঞ্জার এবং মেলভিন লাইয়ার্ড সোভিয়েত নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি বোঝার জন্য কে-১২৯ কে উদ্ধার করার প্রস্তাব দেন।  রিচার্ড নিক্সন এই প্রস্তাব গ্রহণ করলে জাহাজটি উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।

এরপরে অত্যন্ত গোপনে সমুদ্রে ম্যাঙ্গানিজ এর খনি আবিষ্কার কাজের আড়ালে তারা কে-১২৯ কে উদ্ধার করে। এক্ষেত্রে প্রখ্যাত উদ্ভাবক ও শিল্পপতি হাওয়ার্ড হিউজ এবং হিউজ গ্লোমার এক্সপ্লোরার নামক জাহাজটি বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। যদিও জাহাজটি উদ্ধারের সময়ে যান্ত্রিক কিছু ত্রুটির কারণে জাহাজের দুই-তৃতীয়াংশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তারপরেও বলা হয়ে থাকে এটি ছিল একটি সফল উদ্ধার অভিযান। যেখানে স্নায়ু যুদ্ধকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে কড়া গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখতো, এমনকি একাধিকবার একে অপরের বিপক্ষে নিউক্লিয়ার আক্রমণ চালানোর মত অবস্থায় চলে গিয়েছিল; সেরকম পরিস্থিতিতে শত্রুপক্ষের এত গোপনীয় প্রযুক্তি সফলভাবে উত্তাল সমুদ্রের তলদেশ থেকে তুলে নিয়ে আসার মত ঘটনাকে উল্লেখযোগ্য অর্জন বলা-ই যায়।

Most Popular

To Top