বিশেষ

একটা পরীক্ষা আর কিছু মার্কস কি জীবনের চেয়েও বড়?

আত্মহত্যা নিয়ন আলোয় neonaloy

সম্প্রতি রাজউকের সুইসাইড অ্যাটেম্পট করা মেয়েটার ঘটনা পড়ে নিজের লাইফের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল আমার।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। খুব সম্ভবত দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলে। রুটিনে পরপর তিনদিনে তিনটা পরীক্ষা ছিল- বাংলা, ইংলিশ, সমাজ। ঠিক কি কারণে মনে নেই, আমি ডায়েরীতে এই রুটিনটা লেখার সময় একটু ভুল করে ফেলেছিলাম। বাংলার পরের ইংলিশটা আর লিখি নাই, লিখেছিলাম সরাসরি সমাজ। তো সে রুটিনই ফলো করছিলাম, মাথায় গাঁথা ছিল- বাংলা পরীক্ষা, এরপর একদিন গ্যাপ, এরপর সমাজ। ইংলিশ পরীক্ষা যে আছে তা জানার আমার কোনো উপায় নাই। আর আমি আবার সমাজে দুর্বল। গ্যাপ পেয়ে খুশিও হয়ে গেলাম।

বাংলা পরীক্ষা দিয়েই রাতের মাঝে সমাজের পড়া গুছিয়ে ফেললাম। কালকের গ্যাপে পড়ে, পরশুদিন ভালো একটা পরীক্ষা দেয়া যাবে। পরদিন সকালে আরামসে সমাজ বই সামনে নিয়ে কার্টুন দেখছি, এসময় আম্মুর কাছে এক আন্টির ফোন, “আপনার ছেলের ইংলিশ কেমন হইছে?” আম্মুর তো মাথায় হাত! ইংলিশ, কই রুটিনে তো নাই। আমার ভয়ংকর ভুলটা বুঝতে আম্মুর সময় লাগল কিছুক্ষণ। ওইপাশ থেকে আন্টি বললেন, “ফাইনাল পরীক্ষায় অ্যাবসেন্ট থাকলে তো ফেল দিয়ে দেয়!” আম্মু বাকরুদ্ধ হয়ে গেল, সেই বাকরুদ্ধ চেহারা দেখে আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল বুকের উপর ইয়া বড় এক পাথর চেপে বসেছে।

দৌড়ে স্কুলে গেলাম, পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি ইনভিজিলেটর ম্যাডাম খাতা গুছাচ্ছে, হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম, রিকোয়েস্ট করলাম, “ম্যাডাম, ভুল হয়ে গেছে ম্যাডাম, প্লিজ ম্যাডাম পরীক্ষাটা দিতে দেন।” আমি একাই কিন্তু এই জিনিস ফেস করতেছি। প্যারেন্টসদের ঢুকতে দিত না আমাদের স্কুলের ভিতরে। ম্যাডাম নিয়ে গেলেন ভিপি স্যারের কাছে, ভিপি স্যার বললেন না, হবে না। যে পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, সেই একই প্রশ্নে একই ক্লাসের কারো পরীক্ষা পরে নেয়া হবে না। আমার ততক্ষণে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছে টাইপ অবস্থা। ফেল দেওয়া হবে নাকি সে ব্যাপারে কিছু বললো না, তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম এবার ফেল করতে যাচ্ছি। আবার বোধহয় ফাইভে পড়া লাগবে। আমার বন্ধুরা সব বৃত্তি নিয়ে সিক্সে উঠে যাবে। আমি আবার ফাইভে পড়ব।

পরাজিত মুখে স্কুলের গেট দিয়ে বের হয়ে গেলাম। আম্মু কোনো কথা বললো না। সেই সারাদিনই আম্মু কিছুই বললো না। কি বলবে, আম্মুর বলারও কিছু নাই। আমার নিজেকে খুবই অথর্ব মনে হলো। রুটিন লিখতে ভুল করে, এ কেমন স্টুপিড। আয়হায়, ফেল করলে কীভাবে মুখ দেখাব! আব্বু আম্মু কীভাবে মুখ দেখাবে! এসবের মাঝে কালকে আবার সমাজ পরীক্ষা দিতে যেতে হবে, সবাই জিজ্ঞেস করবে কালকে কোথায় ছিলাম। সব স্যার ম্যাডামরা জানবে আমি পরীক্ষা দিতে আসি নাই রুটিন ভুল লিখছি তাই। সব আংকেল আন্টিরা মনে হয় আমার প্যারেন্টসকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। এই ঘটনার পর এই স্কুলে বছরের পর বছর আমি কীভাবে পড়ব!

ভাবলাম, আমার তো কোনো পাপ হয় না, নাবালক তো আমি। আত্মহত্যা করে ফেললে সরাসরি জান্নাত। এই দুর্বিষহ জীবনের থেকে আমার সেটা অনেক অনেক বেটার মনে হলো। ভাবতে শুরু করলাম আত্মহত্যা কীভাবে করা যায়। তারপর… তারপর কি হলো সেটা আর না বলি। এরপর একসময় ক্যাডেট কলেজে পড়েছি। এখন বুয়েটে পড়ছি। তাই গল্পের মোটামুটি হ্যাপি এন্ডিং। এতকিছু জেনে আর কি করবেন।

তবে হ্যাঁ, বললাম হ্যাপি এন্ডিং, কিন্তু আসলেই কি হ্যাপি এন্ডিং? জানি না। এখন একটু বেশি করে বুঝতে শিখেছি, জানতে শিখেছি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর সত্যিকারের রূপটা কিছুটা ধরতে পারি; আবার দৃষ্টিভঙ্গি বড় হয়েছে, জীবনে আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে নতুন আঙ্গিকে দেখতে পারি। সবকিছু মিলিয়ে ভাবলে, এই স্কুলগুলোকে আমার শিক্ষার জায়গা বলে মোটেও মনে হয় না, মনে হয় একটা কন্ডিশনিং-এর জায়গা। খুলে বলি।

মানুষ কিন্তু গৃহপালিত পশুদের মত না, মানুষ বন্য পশুদের মত। একসাথে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু অন্যের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তারা নারাজ। অথচ সমাজ যেই সিস্টেমে চলে, সেখানে আনুগত্য একটা বড়সড় ফ্যাক্টর। সমাজের আইডিয়াল মেম্বারদের বৈশিষ্ট্য হবে গৃহপালিত পশুদের মত। যে কাজ করতে বলা হবে সে কাজ করবে, একটু কিছু পেয়েই আহ্লাদে গদগদ থাকবে, কখনো কোনোকিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। বাচ্চাকাল থেকে স্কুলে আমাদেরকে এই প্যাটার্নে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘন্টার পর ঘন্টা একই জায়গায় বসে থাকো, এমনকি দিনের পর দিন বসো সেই একই জায়গাতেই (অনেক স্কুলে আবার সিট ফিক্সড থাকে)। সবধরণের তাড়না প্ররোচনা আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখো, কথা বলা যাবে না, তাকানো যাবে না কোনোদিকে। ঘণ্টার শব্দ শুনে বুঝতে হবে ছুটি, বা নতুন ক্লাস। ঘণ্টার শব্দ! যে শব্দে ইশারা পায় বিড়াল কুকুররা। বাথরুমে যাওয়ার আগে অনুমতি নিতে হবে। বাধ্যতার জন্য, আনুগত্যের জন্য তোমাকে পুরষ্কৃত করা হবে, বাহবা দেয়া হবে; নতুনত্বের জন্য, নিয়ম ভাঙার জন্য নয়। ছোটবেলার থেকেই তুমি ফার্স্ট তুমি সেকেন্ড এভাবে সবার একটা ভ্যালু সেট করে দেওয়া হবে। রেজাল্ট অনুযায়ী রোল বসিয়ে সবকিছুকে র‍্যাংকিং দিয়ে ভাবতে শেখানো হবে, শেখানো হবে প্রতিযোগিতা। পুরাই একটি কোম্পানির কার্যকর শ্রমিক হিসেবে তৈরি করার স্পষ্ট ফর্মুলা।

এই পদ্ধতির কোথাও কি কোনো মমতা আছে, সহানুভূতি আছে? কোনো জীবনবোধ, ব্যক্তিত্ববোধ? আমি যখন ১০ মিনিট স্কুল গ্লোবালের ইন্টার্নশিপটার জন্য এপ্লাই করলাম, সেখানে একটা প্রশ্ন ছিল, ঠিক মনে নেই, “তোমাকে এই মুহূর্তে একটি এডুকেশনাল আর্টিকেল লিখতে বললে তুমি কী নিয়ে লিখবে?”, এরকম কিছু একটা। আমি বেশ কিছুক্ষণ ভেবেছিলাম ব্যাপারটা নিয়ে। লিখেছিলাম, আমি একদম প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা পদ্ধতিতে একটা পরিবর্তন নিয়ে লেখব। অংক ইংরেজি বাংলার সাথে বাচ্চাদের একটা নতুন সাবজেক্ট চালু করা হবে। উত্তরটা তো দিচ্ছিলাম ইংরেজিতে, সাবজেক্টটার নাম দিয়েছিলাম, “কাইন্ডনেস।” সেই সাবজেক্টের ক্লাসগুলোতে সবাই গোল হয়ে বসে প্রত্যেকে প্রত্যেকের গুণের প্রশংসা করবে, কেউ কারো উপরে রেগে থাকলে ক্ষমা করার প্র্যাকটিস হবে এই ক্লাসে। সবাই সবার জন্য গিফট নিয়ে আসবে সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিনে। হোমওয়ার্ক থাকবে “যেকোনো একটি ভালো কাজ”, কারো উপকার। আমার মনে হয়েছিল এরকম কিছু থাকলে বাচ্চাগুলো একটি উদার মানসিকতা নিয়ে বড় হতে পারবে, থাকবে মানসিক প্রশান্তিতে।

অথচ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা বাচ্চাকাল থেকেই প্যারানয়ায় ভুগতে থাকি। সবাইকে প্রতিযোগী ভাবি, কে কখন কি ভাবছে তা নিয়ে ভয়ে তটস্থ থাকি সবসময়। আমাদেরকে কখনো মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতেই শেখানো হয় না; সবাই তোমার শত্রু, তোমার ফার্স্ট প্লেস নেবার ধান্ধায় আছে সবাই- এটাই আমাদের মানসিকতা। আমরা তাই সবসময় থাকি অদ্ভুত রকমের অসুখী। সুখের স্বরূপ কখনো কোনো স্কুল আমাদের বোঝায় না। হার্ভার্ডের সবচেয়ে লঙ্গেস্ট স্টাডিগুলোর একটা করা হয়েছিল হ্যাপিনেসের উপরে। বোধহয় সত্তর বা পচাত্তর বছর ধরে বেশকিছু নির্দিষ্ট মানুষকে বিভিন্ন বয়সে অবজার্ভ করা হয়েছিল, হরমোনাল রিডিং নেয়া হয়েছিল- আমার ডিটেইলস মনে নেই। গবেষকরা সেখানে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, মানুষের হ্যাপিনেস নির্ভর করে তার সম্পর্কগুলোর উপর, বিভিন্ন মানুষের সাথে তার সম্পর্ক যতটা সুন্দর ঘনিষ্ট নির্ঝঞ্ঝাট, সে ততটা সুখী। আর আমাদের জীবনে আমাদের ভাই বোনরাও আমাদের প্রতিযোগী, এমনকি বাবা মা-ও তাদের থেকে বড় কিছু হতে হবে এ ধারণা সন্তানদের মনে ঢুকিয়ে সন্তানদের প্রতিযোগী বনে যান। কী অদ্ভুত সিস্টেম!

আমাদের সময়টা মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে উৎকর্ষের সময়। এতটা জ্ঞান এতটা বোধশক্তি মানুষ কখনো পায়নি। অথচ এখনকার স্কুলপড়ুয়ারা সব সময়ের থেকে সবচেয়ে বেশি অসুখী। আমাদের দেশেরই তো কত সুন্দর সময় যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এবছরের মত সাফল্য তো আর কখনো আসেনি। কিন্তু অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, প্রতিটি মেডেলের বিপরীতে শেয়ার হচ্ছে হাজার হাজার ডিপ্রেসড স্কুলপড়ুয়ার সুইসাইডাল মিম। অন্যদের প্রত্যেকটা গোল্ড মেডেল কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাদেরকে, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তাদের ব্যর্থতা। এই সুইসাইডের গল্প তাই ভবিষ্যতে কখনো কমবে না, শুধুই বাড়বে। আর আমাদের শুধু তাকিয়ে তাকিয়েই সেগুলো দেখতে হবে যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটাকে, সিস্টেমটাকে আমরা রিথিংক না করি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top