শিল্প ও সংস্কৃতি

যে গানটি বদলে দিল অনেক কিছু

ডেসপাসিতো (ধীরে)
কুয়িরো রেসপিরার তু ছুলে ডেসপাসিতো (আমি তোমার কণ্ঠ অনুভব করতে চাই)
ডেযা কুই তে ডিগা কোসাস আল ওইদো (কানে কানে কথা বলতে দাও)
পারা কুই তে একুয়ারদেস সি নো এসতাস কনমিগো (যখন থাকবো না আমি, তখন আমাকে মনে করার জন্য)
ডেসপাসিতো (ধীরে…)

হ্যাঁ, বলছিলাম লুইস ফন্সি এবং র‍্যাপার ড্যাডি ইয়ানকির বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো দ্বৈত সঙ্গীত ‘ডেসপাসিতো’র কথা। ইউনিভার্সাল মিউজিক ল্যাটিন ২০১৭ সালের ১২ই জানুয়ারি ‘ডেসপাসিতো’ গানের ভিডিওটি রিলিজ করে। পরবর্তীতে ১৭ই এপ্রিল, এ সময়ের আরেক বিখ্যাত কানাডিয়ান গায়ক জাস্টিন বিবারের সাথে একটি রিমিক্স রিলিজ করা হয়। এই রিমিক্সই মুলত ‘ডেসপাসিতো’র সাফল্যের সোপান তৈরি করে দেয়, ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলোতে ডেসপাসিতো পৌঁছে যায় এই রিমিক্সের মাধ্যমেই।

ডেসপাসিতো’র সাফল্য কি কি?

ডেসপাসিতো’র সাফল্য বলে কি শেষ করা যাবে? খুব বেশি দিন আগের কথা না, গানটি বের হবার মাত্র দুই মাস আগে পুয়ের্তো রিকোকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয় সে দেশের সরকার। গভর্নর রিকোর্দো রোসেলো ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জাতীয় ঋণ শোধ করতে এ ঘোষণা দেন। ‘ডেসপাসিতো’ রিলিজ হবার পরই হঠাৎ করে ঘুরতে শুরু করলো পুয়ের্তো রিকোর অর্থনীতির চাকা। আগের চেয়ে গড়ে ৪৫ জন অধিক পর্যটক ছুটতে শুরু করেন পুয়ের্তো রিকোর সৌন্দর্য দেখার জন্য!

কিভাবে সম্ভব হল এটা? মূলত লুইস ফন্সি, র‍্যাপার ইয়ানকি এবং অভিনেত্রী জুলেইকা রিভেরাকে নিয়ে তৈরি মিউজিক ভিডিও দেখেই পর্যটকরা অধিক আগ্রহী হন পুয়ের্তো রিকো ভ্রমণে। বিশেষ করে ভিডিও শুটিঙের স্থানগুলো যেমন ওল্ড সান জুয়ানে অবস্থিত ক্লাব লা ফ্যাক্টোরিয়া এবং লা পেরলা সেক্টরের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। উপরন্তু, গানের লিরিকে র‍্যাপার ড্যাডি ইয়ানকির ‘দিস ইজ হাউ উই ডু ইট ডাউন ইন পুয়ের্তো রিকো’ উক্তিও সবার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। আর সাথে তো ল্যাটিন সৌন্দর্য জুলেইকা রিভেরা ছিলেনই।

কে এই জুলেইকা রিভেরা?

পুরো নাম জুলেইকা জেরিস রিভেরা মেনদোজা, জন্ম ১৯৮৭ সালের ৩ই অক্টোবর। একই সাথে মডেল, অভিনেত্রী, উপস্থাপিকা, নৃত্যশিল্পী এবং বিউটি কুইন। ঝুলিতে আছে ‘মিস পুয়ের্তো রিকো ইউনিভার্স ২০০৬’ এবং ‘মিস ইউনিভার্স ২০০৬’ এর খেতাব। ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার এই ল্যাটিন বিউটি কুইনের অভিষেক হয় মেক্সিকান ‘দামে চকলেট’ নামক সোপ অপেরার মাধ্যমে। ‘ডেসপাসিতো’র বিশ্বব্যাপী ৫ বিলিয়নের বেশি ভিউ পাওয়ার পিছনে তার অবদানও নেহাত কম নয়।

‘ডেসপাসিতো’ গানটি মূলত রেগিটন (ল্যাটিন গানের একটি নিজস্ব ধারা) এবং ল্যাটিন পপ সঙ্গীতের মিশ্রণ, যেখানে আবেদনময়ী লিরিক গাওয়া হয়েছে মসৃণ এবং রোম্যান্টিক স্কেলে। দু’বছর নতুন কোন সিঙ্গেল বের না করা লুইস ফন্সি চাচ্ছিলেন ল্যাটিন ধারার এমন কিছু একটা শ্রোতাদের উপহার দিতে যা শুনতে শুনতে নাচের তাল উঠে। ল্যাটিন গ্রামি পুরস্কারপ্রাপ্ত পানামানিয়ান শিল্পী এরিকো এন্ডারের সাথে মিয়ামিতে নিজের প্রথম ‘ডেসপাসিতো’র সুর তোলেন লুইস ফন্সি। ফন্সির ডেমোতে মুগ্ধ হয়েই র‍্যাপার ড্যাডি ইয়ানকি একসাথে কাজ করতে রাজি হন। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে,‘ডেসপাসিতো’ নিয়ে লুইস ফন্সি কিংবা ড্যাডি ইয়ানকি তেমন আগ্রহী ছিলেন না শুরুতে। তাঁরা এ্যালবামের বাকি গানগুলো নিয়ে বেশি উৎসাহী ছিল। প্রযোজক মাউরিকো রেনজিফো এবং আন্দ্রে টরেসের কথামতো ডেসপাসিতো’তেই নজর দেন তারা। এবং উভয়েই স্বীকার করেছেন ডেসপাসিতো’র ফাইনাল ভার্সন শোনার পর নিজেরাই মুগ্ধ হয়ে যান তারা এবং ফন্সি বুঝতে পারেন, যা চাচ্ছিলেন ঠিক সে রকম গানই তৈরি করতে পেরেছেন।

গানের অর্জন সম্পর্কে জানতে চান? ‘ডেসপাসিতো’র অফিসিয়াল ইউটিউব ভিডিওটি সর্বপ্রথম ভিডিও হিসেবে তিন বিলিয়ন ভিউ অর্জন করে। শুধু ৩ বিলিয়ন নয়, যথাক্রমে সর্বকালের দ্রুততম সময়ে চার, এবং পরবর্তীতে পাঁচ বিলিয়ন ভিউ অর্জন করে। ১৯৯৬ সালের পর ডেসপাসিতো প্রথম স্প্যানিশ অন্তর্গত কোন গান হিসেবে ‘বিলবোর্ড হট হান্ড্রেডে’র প্রথম স্থান অধিকার করে। ১৬ সপ্তাহ ধরে হট হান্ড্রেডে’র প্রথম স্থান ধরে রেখেও গড়লো আরেক রেকর্ড। এখানেই শেষ নয়, ল্যাটিন জনরার প্রথম স্থান ধরে রেখেছিল পুরো ৫২ সপ্তাহ, অর্থাৎ গোটা একটা বছর।

শুধু ভিউ কিংবা প্লেলিস্ট অনুসারে নয়; সমালোচক, বিশিষ্টজনদের কাছে থেকেও অসংখ্য প্রশংসা, বাহবা কুড়িয়েছে ডেসপাসিতো।

নেশা ধরানো ল্যাটিন ছন্দ, সহজ ভাষার জন্য ভূষিতও হয়েছে বিভিন্ন সম্মাননায়। ১৮তম ল্যাটিন গ্রামি এ্যাওয়ার্ডে গ্রামি ছিনিয়ে নিয়েছে রেকর্ড অব দা ইয়ার, মিউজিক অব দা ইয়ার, বেস্ট আরবান পারফরম্যান্স, বেস্ট মিউজিক ভিডিও প্রমুখ শাখায়। কোন গ্রামি অর্জন না করতে পারলেও ৬০তম গ্রামিতে মনোনয়ন পায় রেকর্ড অব দা ইয়ার, মিউজিক অব দা ইয়ার এবং বেস্ট পপ ডুয়েল পারফরম্যান্স শাখায়। টাইম, রোলিং স্টোন (মিউজিক ম্যাগাজিন) সাময়িকীর তৈরি বছরের সেরা ১০ গানে স্থান করে নেয় লুইস ফন্সি এবং ড্যাডি ইয়ানকির এই দ্বৈতটি। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালে বিলবোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত তালিকায় সর্বকালের সেরা পাঁচ ল্যাটিন গানের ভিতর স্থান করে নেয় ‘ডেসপাসিতো’। মজার ব্যাপার হচ্ছে, গ্রামি অ্যাওয়ার্ড অর্জনেও রেকর্ড করেছে লুইস ফন্সির ‘ডেসপাসিতো’, এর আগে কোন ল্যাটিন গানের ভাগ্যে এতো সম্মাননা, অ্যাওয়ার্ড জোটেনি।

মোটের উপর, ‘ডেসপাসিতো’ আবির্ভাব ছিল পুয়ের্তো রিকোর জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ, ল্যাটিন সঙ্গীতের নতুন স্বর্ণ শাখার সোপান আর গোটা বিশ্বের সঙ্গীতনুরাগীদের জন্য ছিল উপহার।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? আরও একটা ‘ডেসপাসিতো’ দর্শকরা উপহার হিসেবে পাবেন কি? এ প্রশ্নের জবাবে লুইস ফন্সি বলেছেন,

“যে রকম ভালবাসা পেয়েছি ভক্তদের কাছ থেকে, ডেসপাসিতোর পরে তো আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিশ্রম করে যাচ্ছি আমরা, হয় তো এর থেকেও ভাল কিছু নিয়ে হাজির হবো একসময়”।

সে ভাল কিছু দেখার অপেক্ষায় মূলধারার সঙ্গীতপ্রেমীরা।

 

Most Popular

To Top