ফ্লাডলাইট

আজই হবে সিরিজ জয়?

ক্রিকেট খুব অদ্ভুত খেলা, একটা জয়ই এখানে খেলাটার সাথে জড়িত সকলের চিন্তাভাবনা পাল্টে দিতে পারে। টেস্ট সিরিজ শেষে যেখানে সবাই হতাশায় নিমজ্জিত ছিলো সেখানে এখন বিদেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের প্রত্যাশা সবার।

কাজটা এখন কঠিন মনে হচ্ছে না, অসম্ভব না তবে সহজ বললেও ভুল হবে। তবে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচ যারা জিতে যায় এগিয়ে থাকে তারাই। আজ তাই বাংলাদেশই এগিয়ে থাকবে।

৪৮ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করলেও কিছু কিছু জায়গায় আরো উন্নতি করতে হবে টাইগারদের। উইন্ডিজ প্রথম ম্যাচে বেশ কিছু ভুল করেছে, দ্বিতীয় ম্যাচে তারা সেই সব ভুল শুধরে কঠিনভাবে ফিরতে চাইবে। বিশেষকরে তাদের ফিল্ডিং বিভাগ, কমপক্ষে পাঁচটি ক্যাচ ফেলেছিলো তারা, মিস করেছিলো রান আউটের সুযোগ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম ওপেনিং জুটি। নির্দিষ্টভাবে এনামুল হক বিজয়। অধিনায়কের বিস্তার আস্থা তার উপর কিন্তু বিজয় যেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাথে তাল মেলাতেই পারছেন না। আজ দ্বিতীয় ম্যাচেও একাদশে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। যার মানে আজকেও লিটন দাসের সুযোগ হবেনা সেটা প্রায় নিশ্চিত।

অবাক লাগছে লিটন সেখানে এক মাসের মতো আছেন, অনুশীলন ম্যাচে রান পেয়েছেন তবুও রিজার্ভ বেঞ্চে সময় কাটাচ্ছেন। যেহেতু একই স্টেডিয়ামে খেলা সুতরাং উইকেট একই রকম হবার সম্ভাবনা বেশি। এমনিতে গায়ানার উইকেট অনেকটা আমাদের দেশের মতোই।

প্রথম ম্যাচে বিজয়ের বিদায়ের পর তামিম-সাকিবের ২০৭ রানের জুটি ম্যাচে জয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলো। বিজয় আউট হবার পর ৩৩.৩ ওভারে এই জুটি রান তুলেছে ওভার প্রতি ৪.৭ করে। উইকেট বিবেচনায় দারুণ দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন দুইজনই।

তবে ৩৫ ওভারের পর আরেকটু দ্রুত রান তোলা যেত। ৯ উইকেট হাতে রেখেও ৩৫-৪৬ ওভার পর্যন্ত কোন বাউন্ডারি আসে নি। হুম অনেকে বলেছে, উইকেট ভালো ছিলো না, এটা ভুল, তামিম বলেছেন ২৫ ওভারের পর উইকেট ভালো ছিলো, আর খেয়াল করলে দেখবেন ওই সময় কোন মিস টাইমিং হয় নি, বল ব্যাটের মাঝেই লেগেছে। ৪০-৪৫ ওভার পর্যন্ত দুইজনই একাধিক সিঙ্গেলস-ডাবলস নেন নি। এই জায়গায় আরো সচেতন হতে হবে আবারো যদি একই অবস্থা আসে। সাকিব বলেছেন, সে আর তামিম যেভাবে খেলছিলেন তাতে ২৪০-২৫০ রান হতে পারতো। আর ২৫০ তাড়া করলে উইন্ডিজের গেমপ্ল্যান হয়তো ভিন্ন হতো। এই উইকেটে মুশফিকের ওই ৩০ রানই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে দুই দলের ভেতর। কিন্তু মুশফিক ওই ইনিংস না খেললে ম্যাচ কঠিন হয়ে যেতো।

এটা কোন সমালোচনা না, কারন তামিম-সাকিব প্রতিদিন এভাবে স্লো ব্যাট করবেন না। তবে উন্নতির জায়গা অবশ্যই থাকে। একটা জিনিস চেয়েছিলাম যেকোন একজন যেন শেষ পর্যন্ত থাকে, সেটা হয়েছে।

উইকেট যেমনই হোক নতুন বলের মুভমেন্ট ভোগাবে। ক্যাচ ফেলা, লাইফ পাওয়া খেলার অংশ অবশ্যই, কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে তামিম-সাকিব দুইজনই শুরুতে লাইফ না পেলে ওই ২০৭ রানের জুটি হয়না। তারা “চান্সলেস” ক্রিকেট খেলেনি। এতো সুযোগ দেয়া যাবেনা।

বিজয় তো আগেই বলেছিলাম স্লিপে আউট হতে পারে ফুটওয়ার্ক না থাকায় সেটাই হয়েছিলো, আর তামিম কিছু শট দ্রুত খেলেছেন, টাইমিং হয়নি, সেটা উইকেটের জন্য অবশ্য।

আবার সাকিবের সমস্যার কারন জেসন হোল্ডার, হোল্ডারের উচ্চতা আর এঙ্গেল সাকিবের ডিফেন্স ভেদ করে ফেলছে একাধিকাবার। অন্তত তিনবার ইনসাইড এজ হয়েছে প্রথম ম্যাচে। ভাগ্য ভালো যে উইকেটে যায়নি বল। এটার কারন সাকিবের পয়েন্টেড ডিফেন্স। সাকিবের ফেভারিট অঞ্চল গালি আর পয়েন্টের গ্যাপ, তার ডিফেন্স সেই অনুযায়ী, সে ডিফেন্স করলে বল গালিতে বা পয়েন্টে যায়। কিন্তু হোল্ডারের এঙ্গেল ব্যাট প্যাডের ফাঁক গলে বল ঢুকিয়ে দেয়।

এখানে স্টিভ রোডসের ভূমিকা রাখতে হবে। “ফুল ফেস” ব্যবহার করলে আর সমস্যা হবেনা। বছর দুয়েক আগে সাকিব আইপিএল থেকে দুই দিনের জন্য দেশে ফিরে কোচ সালাউদ্দিনের সাথে কাজ করেছিলেন। রান পাচ্ছিলেন না। সমস্যা ছিলো কাঁধ বেশি নীচু করে সামনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছিলেন, ফলে ব্যাট উঁচু করতে করতেই বল ব্যাট পার হয়ে যাচ্ছিলো। ব্যাক লিফটের সমস্যা। সৌরভ গাঙ্গুলী একবার এই সমস্যায় পড়েছিলেন ক্যারিয়ারের শেষ দিকে। বাঁহাতিদের প্রায়ই হয় এটা। তো সালাউদ্দিন সাকিবকে বলেছিলেন ব্যাট আগেই সামান্য উঁচু করে কোমর হালকা সোজা করে খেলতে। সাকিব কিন্তু ফিরেই ভারতে ফিরেই ফিফটি করেছিলেন।

এসব টেকনিক্যাল সমস্যা সমাধান করাই কোচের কাজ। সিরিজে আরো পাঁচটা ম্যাচ আছে। সাকিব চাইলেই সমাধান হয়ে যাবে।

তবে সবচেয়ে বেশি চিন্তা যাকে নিয়ে তিনি রুবেল হোসেন। অভিজ্ঞতা আর ডেথ ওভারের জন্য তিনি দলে সুযোগ পান। আগে জানতাম সেট ব্যাটসম্যান থাকলে রুবেল ডেথ ওভারেও বেড়ধক পিটুনি খান, আর টেল এন্ডারদের জন্য তিনি দুর্দান্ত সব ইয়র্কার দিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রথম ম্যাচে জোসেফ-বিশুর লাস্ট উইকেট জুটিও রুবেলকে সাবলীলভাবে চার মেরেছে। চিন্তা করেন, সেই সময় রাসেল-পাওয়েল-হোল্ডাররা থাকলে কি হতে পারতো?

রুবেলের জায়গায় রাহি খেললে কতটুকু ক্ষতির আশংকা থাকে?

এইসব বিষয় বাদ দিলে দল নিয়ে তেমন কোন চিন্তা নাই, বোলিং হয়েছে দারুন। অধিনায়ক মাশরাফি নিজে চমৎকার বোলিং করেছেন, বোলারদের ব্যবহার করেছেন অসামান্য বুদ্ধিমত্তার সাথে, উপস্থিত বুদ্ধি দেখিয়েছেন বোলার রোটেট করার ক্ষেত্রে। বোলিং চেঞ্জ করেছেন যখনই তখনই সফল হয়েছেন। শুরুতে মিরাজকে আনাটা প্রত্যাশিত ছিলো, এবং সেটা চাপ সৃষ্টি করেছে অনেক। মাশরাফির এইসব বিষয় কিছুটা জন্মগত লিডারশীপ আর বাকিটা অভিজ্ঞিতা। রুবেল হোসেন বাদে সবাই ভালো লাইনে বল করেছেন। সাকিব স্বাভাবিক ক্লান্ত ছিলো, লাইন এদিক সেদিক হওয়াটা তারই প্রভাব হতে পারে।

মাশরাফি ফিরলে দলের ভেতরের অস্থিরতা এমনিতেই দূর হয়ে যায়। সবাই আস্থা ফিরে পায় আর মাশরাফি সেরাটা বের করে আনতে জানেন একজন প্লেয়ারের। যার কারনেই দলের সবার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পর্যন্ত পাল্টে যায়। প্রথম ম্যাচেই এগুলার প্রমাণ দেখা গিয়েছে।

এই সিরিজ এখন বাংলাদেশেরই জেতা উচিৎ। ২০০৯ সালে অনভিজ্ঞ এবং ভঙ্গুর তৃতীয় সারির উইন্ডিজ দলকে তাদের মাটিতে হারানোর অভিজ্ঞতা আছে বাংলাদেশের, তবে সেটাতে পরিপূর্ণ তৃপ্তির সুযোগ ছিলোনা, সেটা এবার করে দেখানোর সুযোগ হাতের নাগালে।

সিরিজ জয়ের জন্য গায়ানার চেয়ে আদর্শ ভেন্যু আর কি হতে পারে? এখানেই ২০০৭ বিশ্বকাপের সুপার এইটে সাউথ আফ্রিকার সাথে জয় এসেছিলো আবার ২০১৩ সালে এখানেই টান টান উত্তজেনার সাত ম্যাচ সিরিজের শেষ ম্যাচ জিতে ৪-৩ ব্যাবধানে সিরিজ জিতে নিয়েছিলো বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সেই দলের অধিনায়ক মিরাজ, মোসাদ্দেক, শান্ত, রনি আজ জাতীয় দলের অংশ হয়ে আবার গায়ানায়।

মিরাজ চাইলে বড়দের সিরিজ জয়ের সেই গল্প শোনাতেই পারেন!!!

Most Popular

To Top