টেক

মহাবিশ্বের সমাপ্তি ঘটবে কিভাবে? বিজ্ঞানীদের মতে সম্ভাব্য ৩টি দৃশ্যপট

মহাবিশ্ব সমাপ্তি নিয়ন আলোয় noen aloy

“মহাবিশ্বের শুরুটা কীভাবে হয়েছে, এর শেষই না কীভাবে”- এ নিয়ে মানুষের কৌতূহল অনেক পুরোনো। আমাদের এই বিশ্ব আজকে যেমনটা দেখছি, চিরকাল তেমন ছিল না, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। জন্মিলে মরিতে হবে- এই মহাবিশ্বও একদিন মিলিয়ে যাবে। সেটা যত সুদূর ভবিষ্যতেই হোক না কেন।

মহাবিশ্বের যে একসময় ধ্বংস হবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা একমত হলেও ঠিক কীভাবে ধ্বংস হবে তা নিয়ে নানা বৈজ্ঞানিক থিওরী আছে। মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের মাঝে তিনটি থিওরী যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য-

১. দি বিগ রিপ (The Big Rip)

২. দি বিগ ক্রাঞ্চ (The Big Crunch)

৩. দি বিগ ফ্রিজ (The Big Freeze)

থিওরীগুলোর বাস্তবিক ফলাফল খুব একটা সুখকর না হলেও থিওরীগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। আসুন, আমরা একটা একটা করে দেখে নেই থিওরীগুলো কী বলে।

মূল আলোচনা শুরুর আগে, আমাদের একটা ব্যাপারে একটু পরিষ্কার হয়ে নেয়া দরকার। বিষয়টার নাম “ডার্ক এনার্জি”। মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে জানতে হলে ডার্ক এনার্জির সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

বিগ ব্যাং এর পর টাইম-স্পেস প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, অর্থাৎ মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটতে শুরু করল। পরস্পরের মধ্যে মহাকর্ষ বলের কারণে একটা সময় পরে মহাজাগতিক বস্তুগুলোর গতি কমার কথা ছিল, কমতে কমতে একসময় সংকোচন শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, ছড়িয়ে পড়ার গতি কমার বদলে কোন এক রহস্যময় কারণে বেড়ে চলেছে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন- একটা বল শূন্যে ছুঁড়ে দেয়ার পর সেটা একসময় নিচে নেমে আসার বদলে আরও উপরে উঠে যাচ্ছে, তার উপর সময়ের সাথে গতিও যাচ্ছে বেড়ে!

মহাবিশ্বের সাথে অনেকটা এমনটাই হচ্ছে। লোকাল গ্রুপের বাইরে যে গ্যালাক্সী, ক্লাস্টার বা সুপারক্লাস্টার আছে, তারা লোকাল গ্রুপ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরে যাওয়ার গতিও সময়ের সাথে বাড়ছে। অর্থাৎ, মহাকর্ষ বলের বিপক্ষে কিছু একটা কাজ করছে। সেই “কিছু একটা” যে কী তা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করতে পারেননি। তবে একটা কাজ করেছেন, ব্যাপারটার একটা সুন্দর নাম দিয়ে রেখেছেন- ডার্ক এনার্জি। এই এনার্জি সম্পর্কে আমরা কিছু জানিনা বলেই এর নাম ডার্ক এনার্জি। ডার্ক এনার্জির বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অস্পষ্ট। ধারণা করা হয়, এটি শূন্যস্থানের একটি বৈশিষ্ট্য। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ যত বাড়ছে, তত বাড়ছে শূন্যস্থানের পরিমাণ, তত বাড়ছে ডার্ক এনার্জি। ফলে বাড়ছে সম্প্রসারণের গতি।

এ তো গেল ডার্ক এনার্জি’র সংক্ষিপ্ত ধারণা। এবার যাওয়া যাক মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে জনপ্রিয় থিওরিগুলোতে।

১. দি বিগ রিপ  (The Big Rip)

ডার্ক এনার্জির প্রভাবে গ্যালাক্সীগুলো ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকলেও, গ্যালাক্সীর ভেতরের গ্রহ-নক্ষত্রগুলো মহাকর্ষ বলের প্রভাবে আবদ্ধ রয়েছে। তবে ডার্ক এনার্জির প্রভাব বাড়তে বাড়তে এমন একটা সময় আসবে, যখন তা গ্যালাক্সীর ভেতরকার মহাকর্ষ বলের প্রভাবকে অতিক্রম করে যাবে। তখন থেকে একটা ভয়াবহ ব্যাপারের শুরু হবে।

মহাবিশ্ব সমাপ্তি নিয়ন আলোয় noen aloy

গ্যালাক্সীর মধ্যকার গ্রহ নক্ষত্রগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকবে। একসময় একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, তাদের মধ্যে কোন মহাকর্ষ শক্তিই কাজ করবে না। এর ফলে, ডার্ক এনার্জির প্রভাব আরও বেড়ে যাবে। তখন গ্রহ-নক্ষত্রগুলো “ছিঁড়ে যাওয়া” শুরু করবে। আক্ষরিক অর্থেই।

ডার্ক এনার্জির প্রবল বিকর্ষণ বলের প্রভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের নিজেদের মধ্যকার আণবিক বন্ধন প্রথমে ভাঙতে শুরু করবে। ধীরে ধীরে তারা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করবে। মহাবিশ্বে কোন একক গ্রহ, নক্ষত্রের অস্তিত্ব থাকবে না, গ্রহাণু-উপগ্রহ বা উল্কাপিণ্ডের কথা তো বাদই দিলাম।

ডার্ক এনার্জির পাগলা ঘোড়া কিন্তু থেমে নেই। তার শক্তি দিনকে দিন আরও বাড়ছে। একসময় অবস্থা এমন গিয়ে দাঁড়াবে, অণুগুলোও আর অটুট থাকতে পারবে না, ভেঙ্গে পড়বে পরমাণুতে। মহাবিশ্বে হবে পরমাণুময়।

কল্পনা করতে কি খারাপ লাগছে একটু?

২. দি বিগ ফ্রিজ  ((The Big Freeze)

এই থিওরী আরেকটু কম নাটকীয়, তবে কম সম্ভাবনাময় নয়!

মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণের সাথে সাথে থার্মোডায়নামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী বাড়তে থাকবে এনট্রপি। একটা সময় এনট্রপি যখন সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে যাবে, তখন মহাবিশ্বের সকল তাপ সবদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এর ফলে নিঃশেষ যাবে মহাবিশ্বের সকল জ্বালানী। নতুন করে আর কোন তাপ উৎপন্ন হবে না। একসময় সম্পূর্ণ শীতল হয়ে পড়বে মহাবিশ্ব, এখানে আর কোন মেকানিকাল কাজ সংগঠন সম্ভব হবে না।

মহাবিশ্ব এভাবেই “শীতল মৃত্যু”র পরিণতি ধারণ করবে।

একটি থিওরী বলে যে, এই বিগ ফ্রিজ থেকে নতুন একটি বিগ ব্যাং এর উপযোগী অবস্থা তৈরীর সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে, আমরা নতুন করে বিগ ব্যাং এর আশা করতেই পারি, যার মাধ্যমে তৈরী হবে নতুন একটি মহাবিশ্ব!

৩. দি বিগ ক্রাঞ্চ  (The Big Crunch)

এটা অনেকটা দি বিগ রিপ এর উল্টোটা। আগের দুইটি থিওরী যখন ডার্ক এনার্জির আধিপত্য এবং মহাবিশ্বের ক্রমসম্প্রসারণতার উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে, এই থিওরী গঠিত হয়েছে মহাকর্ষের বলের আধিপত্যের উপর ভিত্তি করে।

মহাবিশ্ব সমাপ্তি নিয়ন আলোয় noen aloy

সুদূর ভবিষ্যতের কোন এক সময়ে যদি ডার্ক এনার্জি স্তিমিত হয়ে পড়ে, অথবা বিজ্ঞানীরা যতটুকু ভাবছেন ডার্ক এনার্জির পরিমাণ যদি এর চাইতে কম হয়, তখন একসময় ডার্ক এনার্জির জায়গা নেবে মহাকর্ষ বল। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতি কমতে শুরু করবে, একসময় এসে থেমে যাবে। তারপর শুরু হবে উল্টোপথে যাত্রা। শুরু হবে মহাবিশ্বের সংকোচন।

গ্যালাক্সীগুলো মহাকর্ষ বলের প্রভাবে একে অপরের নিকটে আসা শুরু করবে। ছোট হতে শুরু করবে মহাবিশ্বের আয়তন, বাড়তে শুরু করবে এর ঘনত্ব।

এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। গ্যালাক্সীগুলো নিকটে আসতে আসতে একসময় একে অপরের সাথে মিশে যেতে শুরু করবে। যত কাছে আসবে, তাদের মধ্যে তত বাড়তে থাকবে মহাকর্ষ বল। এক পর্যায়ে অনেকগুলো গ্যালাক্সী মিলে তৈরী করবে একেকটি সুপার গ্যালাক্সী। সেই সুপার গ্যালাক্সীগুলো একসময় পরিণত হবে একেকটি ব্ল্যাকহোলে। এভাবে অনেকগুলো ব্ল্যাকহোল তৈরী হবে। এরপর সেই ব্ল্যাকহোলগুলো মিলে তৈরী হবে একটি “মেগা ব্ল্যাকহোল”। মহাবিশ্বের সকল ভর পুঞ্জিভূত থাকবে এতে।

চিন্তা করা যায়, মহাবিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল ভর মিলে মাত্র একটি ব্ল্যাকহোল!

ঘনত্ব অসম্ভব রকম বেড়ে যাওয়ায় এই মেগা ব্ল্যাকহোলটির ভেতরে তাপমাত্রা যাবে বেড়ে, প্রচন্ড তাপ নিয়ে এটার অন্তর্ভাগ জ্বলতে থাকবে। একসময় ছোট হতে হতে ব্ল্যাকহোলটি পরিণত হবে একটিমাত্র বিন্দুতে, ঠিক বিগ ব্যাং এর উলটো।

বিগ বাউন্স (The Big Bounce) নামে একটি থিওরী আছে, যা বলে মহাবিশ্ব এ পর্যন্ত অনেকবার এই সংকোচন-প্রসারণ চক্রের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। যতবার মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে অসীম ভরের একটি বিন্দুতে পরিণত হয়েছে, ততবারই জন্ম নিয়েছে নতুন বিগ ব্যাং।

যেহেতু এখন পর্যন্ত বা অদূর ভবিষ্যতে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের গতি কমে যাওয়ার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না, সে অনুযায়ী এই থিওরী অন্য দুটির চেয়ে কম সম্ভাবনাময়।

তিনটি থিওরীর মধ্যে কোনটি বেশি সম্ভাবনাময়, তা জানতে হলে বিজ্ঞানকে আরও অনেকদূর এগিয়ে যেতে হবে। জানতে হবে এই মহাবিশ্বের ঘনত্ব কত, প্রকৃত আয়তন কত, ডার্ক এনার্জির প্রকৃত রুপ কী। তবেই একটা আপাত-সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেতে পারে। আপাত-সিদ্ধান্ত বলছি এই কারণে, এই তিনটি থিওরীর কোনটিই কার্যকর না-ও হতে পারে। মহাবিশ্বের বয়েই গেছে মানুষের ভবিষ্যৎবাণী করা পরিণতি মেনে নিতে।

Most Popular

To Top