বিশেষ

জীবনটা শুধু ভেবেই নষ্ট করে ফেলছেন না তো?

শুরুতেই পাঠককে একটা অনুরোধ করি। স্থির হয়ে বসে একটু আপনার দিনটা সম্পর্কে ভাবুন তো। একটু নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, দিনের কতটা সময় আপনি শুধু নিজের মাথার মধ্যেই, অর্থাৎ ভেবেই কাটিয়েছেন? বেশিরভাগের-ই সদুত্তর হবে, অনেক!

হ্যাঁ, আপনি ভাবেন, আপনি দুশ্চিন্তা করেন, নিজেকেই নিজে অশান্তিতে রাখেন। সবচেয়ে বেশি কিন্তু এ কাজটাই করেন আপনি। যখন যে-ই কাজই করেন, মাথার মধ্যে সেই চিন্তাগুলো চলতেই থাকে। এমন না যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করে থাকেন। একই জিনিস নিয়ে বারবার করেন আপনি দুশ্চিন্তা। হয়তো এ লেখাটা পড়তে পড়তেও সে কাজটাই করছেন।

আমেরিকার ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের একটা স্টাডি অনুযায়ী, আমাদের চিন্তার ৯৫ ভাগই শুধু আগের চিন্তার পুনরাবৃত্তি, আর তার মধ্যে ৮০ ভাগই আবার নেতিবাচক। আর সত্য কথা বলতে গেলে, তার মধ্যে ৯৯ ভাগেরই আসলে কোনো কার্যকারিতা নেই। সেগুলো শুধু আমাদের মাথায় বসে আমাদের পীড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে।

তাহলে এর তো একটা প্রতিকার দরকার। সেটা খুঁজতে খুঁজতেই আমরা গিয়ে থামি ১৯ শতকের আমেরিকান দার্শনিক এবং মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস এবং তার দর্শন “প্রাগমাটিজম” বা প্রয়োগবাদে।

উইলিয়াম জেমস (১৮৪২-১৯১০)

তবে দর্শনের কথা আনছি দেখে ভয় পেয়ে যাবেন না, নানান ভারী ভারী শব্দের মারপ্যাঁচে ফেলে আপনাকে একঘেঁয়েমিতে ফেলার অভিসন্ধি আমার একদমই নেই। একদম যতটুকু আপনার জন্য কার্যকর, ততটুকুই ছেঁকে এনে আপনাদের সামনে তুলে ধরাটাই আমার লক্ষ্য থাকবে এখানে।

প্রাগমাটিজম হলো কার্যকারিতার দর্শন, উপযোগিতার দর্শন। আরো বড় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা আসলে একটা বাস্তবতার দর্শন। এই দর্শনের মতে কোনো প্রস্তাব বা ধারণার তখনই প্রহণযোগ্যতা আছে যখন এর সন্তোষজনক বাস্তব কার্যকারিতা আছে, অপ্রায়োগিক সবকিছুই এই দর্শনমতে প্রত্যাখ্যানযোগ্য। সহজ ভাষায় বললে, যে জিনিসটা তোমার কোনো কাজে আসছে না, নির্দ্বিধায় ফেলে দাও কিংবা উপেক্ষা করো সেই জিনিসটা- এটাই প্রাগমাটিজম। উইলিয়াম জেমসের ভাষায়,

“যে জানে কি কি জিনিস উপেক্ষা করতে হবে, সে-ই সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী।”

প্রাগমাটিজম বলে, আমাদের মন শুধুমাত্র নিজেকে পরিচালনা করার নিতান্তই একটা যন্ত্র। এর কাজ করার কথা আমাদের পক্ষে, বিরুদ্ধে নয়। এই মনকেও তাই আমাদের শিখাতে হবে অকার্যকর চিন্তাগুলোকে উপেক্ষা করতে। অহেতুক দুশ্চিন্তাগুলোকে উপেক্ষা করতে। এখানেই আমাদের বেশিরভাগ অশান্তির প্রতিকার নিহিত।

কিন্তু জানি, বেশিরভাগেরাই বলবেন, “আমি তো ইচ্ছা করে দুশ্চিন্তা করি না, দুশ্চিন্তাটা অনিচ্ছাকৃতভাবেই শুরু হয়ে যায়। একে ইচ্ছা করলেই উপেক্ষা করতে পারবো?” হ্যাঁ, পারবেন। অনুশীলন করলেই পারবেন। উপেক্ষা করাটা একটা দক্ষতা, যা অর্জন করে নিতে হয়। সত্যিই কি তাই? আসুন আমরা এই দর্শনের প্রবক্তা উইলিয়াম জেমসের জীবন থেকে ঘুরে আসি।

উইলিয়াম জেমস ছোটবেলা থেকেই শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল ছিলেন। ছোটবেলা থেকে যখন তিনি যৌবনে পদার্পণ করলেন, অর্থাৎ বিশোর্ধ্ব যখন তার বয়স, তখনো তিনি অনেকগুলো ব্যাধিতে ভুগছেন। তাঁর এমিউসিয়া নামের এক বিশেষ ধরণের বধিরতাও ছিল। শুধু শারিরীক না, নিউরাস্থেমিয়া নামের একটি মানসিক ব্যাধিতেও ভুগতেন তিনি, যার কারণে ডিপ্রেশনে পড়তেন বারবার। আত্মহত্যার চিন্তা আসতো প্রায়ই।

ঠিক এই মানুষটাই পরবর্তীতে আমেরিকার মনোবিজ্ঞানের জনক হিসেবে আখ্যাত হয়েছেন, এবং একই সাথে গণ্য হয়েছেন তাঁর সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক হিসেবে। অবাক করার মতো না বিষয়টা? এটা শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছিল তিনি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিলেন বলেই।

তিনি বলতেন, “উদ্বেগ উৎকণ্ঠার বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে তার একটি চিন্তাকে উপেক্ষা করে আরেকটি চিন্তা করবার ক্ষমতা।”

তাঁর মতে আমাদের চিন্তাভাবনার বেশিরভাগই হচ্ছে আমাদের পূর্বধারণাগুলো পুনর্বিন্যাস। একই ভয় আমাদের বারবার তাড়া করে বেড়ায়, নিরর্থকভাবে। এবং এর পরিবর্তন সম্ভব শুধুমাত্র আমাদের মনোভাবকে পরিবর্তন করবার মাধ্যমে।

তো চলুন আমরা নিজেদের জীবনকে তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করি। আমি জানি দিনের অধিকাংশ সময়েই বেশিরভাগ পাঠকই ভাবনাতেই কাটান। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার ভাবনাগুলো আপনার জন্য কি করে? আমার ক্ষেত্রে, তারা সবসময় নিয়ে আসে হতাশা, বিরক্তি, অনুতাপ।

আসুন আমরা যে প্রশ্নটা উইলিয়াম জেমস বারবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করতেন সে প্রশ্নটাই নিজেদের জিজ্ঞাসা করি।

“আমাদের এই চিন্তাগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগটা কোথায়?”

দেখুন, আসলেই কি আছে তেমন কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ? “আমি এইটা কেন করলাম, এটা কিভাবে করব, এমন কেন হয় আমার সাথে, অনেকেই অনেক কিছু করছে, আমি কী করছি”- এসব চিন্তা কি আদৌ কোনো কাজে আসে?

হাতেগোনা কিছু চিন্তা হয়তো আসে, বেশিরভাগই তেমন কোনো কাজে আসে না। জেমসের মতে, এই হাতেগোনা চিন্তাগুলো ব্যতীত বাকি সব চিন্তাই উপেক্ষা করতে হবে আমাদের। যদি মনে হয়, না, আপনি তা পারবেন না, এর কারণ আপনি এখনো আপনার মনকে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। পারবেন, শুধু দরকার চেষ্টার। উইলিয়াম জেমস তো তাই-ই বলতেন। তিনি বলতেন, “তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হচ্ছে এটা বুঝতে পারা যে একজন মানুষ তার জীবনকে বদলে দিতে পারে শুধু মনোভাবকে বদলে দেবার মাধ্যমেই।” তাঁর প্রজন্ম থেকে কত এগিয়ে গেছি আমরা এখন, এতটুকু তো পারবোই!

কিন্তু কীভাবে, তাই না? উত্তর একটাই। সজাগ থাকা।

আপনার নিজের অকার্যকর চিন্তা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। যখনই টের পাবেন যে যেই চিন্তাটা করছেন সেটা আসলে নিস্ফল বেকার একটা চিন্তা, সাথে সাথেই বন্ধ করে দিবেন।

বন্ধ করে কি করবেন? যখন যেটা করবেন সেখানেই নিজের সম্পূর্ণটা নিযুক্ত করবেন। যেমন এখন এই লেখাটি পড়ছেন। আপনার চোখ অক্ষরগুলোকে দেখছে, শব্দ তৈরি হয়ে যাচ্ছে আপনার মাথায়, তথ্য হিসেবে জমা হচ্ছে আপনার স্মৃতিতে। অনুভব করুন তো এই প্রত্যেকটি ব্যাপারকে!

অনুভব করুন সবকিছু!অনুভব করুন সবকিছু। সকালে উঠার পর শরীরে যে রোদটা ছুঁয়ে গেল আপনার, কিংবা নাস্তার যে স্বাদটা লাগল আপনার জিহবায়, সকালের চায়ের যে গন্ধ, নিজের মাঝে গ্রহণ করুন সবকিছু। মানুষের হাসির শব্দকে, তাদের মাঝে লুকানো গল্পকে শুনুন।

ভাবনা বন্ধ করে অনুভব করুন। নিজের মাথা থেকে বের হয়ে ডুবে যান নিজের প্রতিটি কাজে। তখন আপনিও হয়ে উঠবেন একজন প্রাগমাটিস্ট, যে জীবন নিয়ে শুধু ভাবে না, তাকে যাপন করে।

Most Popular

To Top