নাগরিক কথা

সব কথার শেষ কথা যখন যৌনতা!

এই যে ছবিটা দেখছেন? আপনার রিএকশন কী?এই ছবিটা দেখার পর দুইধরনের রিএকশন পাওয়া যাবে।

একঃ আহ কী প্রেমময় একটা ছবি।

দুইঃ এই যদি হয় ভালোবাসা প্রকাশের নমুনা তাইলে কুকুরই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রেমিক। এবং এই ছবিটার সাথে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে মলত্যাগ করার তুলনা করা হবে।

এবং দ্বিতীয় রিএকশনটাই সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাবে৷

আমাদের দেশে খুব অল্পকিছু মানুষ আছে যারা মা-বাবার ঝগড়া দেখেনি। অনেকে শারীরিক নির্যাতনের সাক্ষীও হয়েছে। কিন্তু মা-বাবার সুন্দর কোনো মুহুর্তের সাক্ষী হয়েছে- এমন মানুষ খুব অল্প আছে, খুবই অল্প।

এখন যাদের মাথায় মস্তিষ্কের বদলে অণ্ডকোষ আর যোনী আছে, তাদের কাছে উপরের প্যারাটার মানে দাঁড়াবে মা-বাবার মিলনের কথা বলা হয়েছে। অথচ সুন্দর মুহূর্ত মানে প্রেমময় মুহূর্ত, যেখানে যৌনতা ছাড়াও অন্য কিছু যে থাকতে পারে তা ওদের কারো মাথায় আসবে না। উদাহরণ দেই? কোনোদিন আপনার আব্বা-আম্মাকে একসাথে হাত ধরে হাঁটতে দেখেছেন? অথবা বাবাকে কখনো বলতে শুনেছেন, “এই তোমাকে আজকে অনেক সুন্দর লাগছে।”

এদেশে রাস্তায় ফেলে বউ পিটানোকে খুব পৌরুষের বিষয় বিবেচনা করা হয়, সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিনোদন নেয়৷ কিন্তু সেই একই পুরুষ যদি রাস্তায় তার স্ত্রী অথবা প্রেমিকার হাত ধরে হাঁটে, তবে কানাঘুষার শেষ নেই। মূর্খ মানুষজনই যে এমনটা করে তা কিন্তু না, শিক্ষিত মানুষজনও অনেক করে৷

মনে করেন একজন মানুষ প্রচন্ড সাহসের কাজ করলো, তখন আমরা বাহবা দিতে কী বলি?

এই ছেলেটার শরীর পুরোটাই কলিজা।

আর আমাদের দেশে পুরো শরীর কলিজাওয়ালা মানুষের চেয়ে পুরো শরীরই অণ্ডকোষ এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি৷

এরাই বাসে এদের সামনের সিটে কোনো দম্পতি বসলে একজন আরেকজনের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোলে দেঁতো হাসি দেয়, এরাই আবার রাস্তা দিয়ে বোরকা পরে হাঁটতে থাকা মেয়েকে দেখেও শীষ বাজায়, এরাই কিন্তু পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া জানার পরেও রোজার দিন মেয়েদেরকে জিজ্ঞাসা করে রোজা রেখেছে কিনা।

আমরা এমন এক দেশে বাস করি যেখানে প্রকাশ্যে দুনিয়ার সকল ক্রাইম করা ঠিক আছে, কিন্তু চুমু খাওয়া নট ওকে, নট ওকে৷ এরচেয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করাকে সমর্থন জানানোর মানুষের অভাব হবে না।

উন্নত দেশের মানুষগুলো প্রশ্রাব করে লুকিয়ে লুকিয়ে চুমু খায় প্রকাশ্যে৷ আর আমরা চুমু খাই লুকিয়ে লুকিয়ে, প্রশ্রাব করি প্রকাশ্যে। কারণ আমাদের ভেতর লজ্জাশরম অনেক বেশি।

অনেক কে দেখছি তারা চুমু খাওয়াকে সঙ্গমের সাথে তুলনা করছেন। ভাইয়েরা আমার আপনারা যে প্রিম্যাচিউর ইজাকুলেশনের সমস্যায় ভুগতেন এইটা জানতাম না, চুমুতেই যে ক্লাইম্যাক্স হয়ে যায় আপনাদের জানা ছিলো না৷ তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখান, নাইলে বউ থাকবে না!

এখানে আবার দুটো জিনিস আসবে সামনে
১) আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ,
২) ধর্মীয় আচার।

সামাজিক মূল্যবোধের কথা শুনলেই হাসি পায়, হো হো করে হাসতে মন চায়। আমাদের সমাজের মত বোগাস সামাজিক মূল্যবোধওয়ালা সমাজ এই পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কিনা জানা নাই। এরা নিজের সুবিধামত সবকিছু বলবে, করবে। নিজের যা পছন্দ তাকেই সামাজিক মূল্যবোধের স্টিকার লাগিয়ে দিবে৷ নিজে যা করতে পারে না, নিজের যা নেই আরেকজনের তা থাকলে ওইখানেও সামাজিক মূল্যবোধের ব্যারিয়ার দিয়ে দেয়।

যে সমাজে পাশের বাসার আন্টিদের কারণে বাচ্চাবাচ্চা পোলাপান আত্মাহুতির পথ বেছে নেয়, যে সমাজের পুরুষরা ধর্মকে নিজেদের পৌরুষত্ব ফলানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করে (অথচ আমাদের নবী(সাঃ) উনার স্ত্রীদের সাথে কেমন ব্যাবহার করতেন এরা জানেই না), যে সমাজে “নারী এবং ঢোল সবসময় মাইরের উপর রাখতে হয়” কথাবার্তা প্রচলিত- সে সমাজ আমি মানি না।

পঞ্চাশ বছর আগের সমাজ চিন্তা করেন তো। তখন কি একটা ছেলে একটা মেয়ের সাথে খোলামেলা ভাবে কথা বলতে পারতো? একটা মেয়ে কি তার বিয়েতে মত আছে কিনা জানাতে পারতো? স্বামী ভুল হলেও ওর কথাই শিরোধার্য মেনে নিতো না সবাই? জামাই বউকে মারলে লোকজন বলতো, “কান্দিস না মেয়ে, জামাইয়ের মাইর যেখানে যেখানে পড়বে সেখানটা বেহেশতে যাবে”।

এখনকার সমাজে কী হয়?

ছেলেমেয়েরা একসাথে চলতে পারে। বিয়েতে নিজেদের মতামত জানায়। স্বামী যা বলে তা সবসময় ঠিক না, এটা বউরা প্রতিবাদ করে৷ জামাই মারলে বেহেশতে যাওয়ার আগে জামাইকে জেলে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে না এখন?

সমাজ, সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিনিয়ত পাল্টায়। পাল্টায় না যেটা, সেটা হল ন্যায়-অন্যায় বোধ। খুন করা আগের সমাজেও অন্যায়, এখনকার সমাজেও অন্যায়। ঘুষ খাওয়া আগেও অন্যায় ছিলো, এখনো আছে। চুমু খাওয়া আগেও প্রেমের অংশ ছিলো এখনো আছে। আপনার চোখের আড়ালে খেলেও তা প্রেম, আপনার চোখের সামনে যদি সেটা পড়ে যায় তবুও প্রেমেরই প্রতীক থাকবে। অশ্লীলতার প্রতীক হবে তখনই যখন এটাকে মানসিক চাহিদা থেকে বাদ দিয়ে শুধুই শারীরিক চাহিদার প্রয়োজনে ব্যাবহার করা হবে।

ধর্মের কথায় আসি। এখানে দুইটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আমাদের ধর্মে প্রকাশ্যে স্বামী-স্ত্রী’র প্রেম (যৌন মিলনের দিকে ইঙ্গিত) নিষিদ্ধ, এবং নবী (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলে গিয়েছেন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। অথচ আমরা একজন আরেকজনের উপর ধর্ম চাপিয়ে দেই।

সাকিব আল হাসানের ফেসবুক পেইজ সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নামাজের সময় নামাজে না গিয়ে সাকিবের বউকে পর্দা না করার জন্য গালাগালি করার মানুষের অভাব নেই!

এতগুলো কথা লিখলাম কেউ হয়তো মনে মনে বলতে পারেন, “মিয়া তুমি তো ভালোই রঙে আছো, সুযোগ পাইলে তুমিও রাস্তায় এহেম এহেম।”

হ্যাঁ, কোনো সমস্যা? আমাকে আমার মত চলতে দিবেন না কেন? কোন ক্ষেতের মূলা আপনি?

এই যে এতগুলো কথা লিখলাম কেউ বুঝলো কিনা কে জানে? অবশ্য যে জাতি নোংরা যৌনাচার আর ভালোবাসার পার্থক্য জানে না এদের সাথে কথা বলে ফায়দা নেই খুব একটা৷

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top