ফ্লাডলাইট

অজস্র লাশের স্তূপ চাপা দেওয়া আলো ঝলমলে “গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ”!

বিশ্বকাপ চাপা কান্না নিয়ন আলোয় neon aloy

ক’দিন আগেই শেষ হয়ে গেলো ফুটবলের সব চেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮। বিশ্বকাপ চলাকালীন পুরো সময়টা জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, বাহারী আলোকসজ্জা, রঙ­­বেরঙের আতশবাজি আর ফুটবলীয় সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। আর সেই সাথে ছিল একের পর এক ঘটন-অঘটনের ম্যাচে ডেভিডের গোলিয়াথ-বধের উত্তেজনা।

কিন্তু এই রকমারি স্টেডিয়াম কিংবা বাহারী আলো ঝলমলে উদযাপনের প্রস্তুতিতে প্রাণ হারিয়েছেন যে সব নাম না জানা শ্রমিক- তাঁদের খবর কি আমরা রাখি? বর্ণাঢ্য বিশ্বকাপের আলোকছটার ভিড়ে তাঁরা হারিয়ে যান সময়ের অতল গহ্বরে।

এ পর্যন্ত পাওয়া অফিসিয়াল ডাটা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে স্টেডিয়াম নির্মাণকাজে রাশিয়াতে ন্যূনতম সতেরো জন নির্মাণকর্মী মারা গিয়েছেন এবং অন্যান্য অসংখ্য শ্রমিকগণ শোষণ এবং নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। এই ১৭ শ্রমিক মৃত্যুর তালিকা করেছে ‘বিল্ডিং এন্ড উড ওয়ার্কস’ ইন্টারন্যাশনাল নামক একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা। এমন তথ্যই বের হয়ে এসেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নামক সংস্থার একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে।

বিশ্বকাপ চাপা কান্না নিয়ন আলোয় neon aloy

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে ফিফার দুর্নীতিগ্রস্ত কমিটিতে স্বচ্ছতার অভাবের কথা এবং এই অস্বচ্ছ কমিটি যে কার্যকারীভাবে শ্রমিকদের উপরে চলে আসা নিপীড়ন শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং সর্বোপরি উন্নত ব্যবস্থার জন্য পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সে কথাও বলা হয়েছে।

এবারই প্রথম নয়, ২০১৪ সালে রাশিয়ার সোচিতে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকের নির্মাণকাজেও ৭০ জনের অধিক নির্মাণকর্মী মারা যান। রিও ডি জেনিরোতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে মারা যান ১৩ জন কর্মী। আর বেইজিং অলিম্পিকে ২০০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন ৬ জন।

তবে আসন্ন কাতার বিশ্বকাপের নির্মাণকাজে মৃত শ্রমিকসংখ্যার কাছে বাকি সবই হয়তো খুচরো খবরের মতো। পিলে চমকে যেতে হবে মোট মৃতের সংখ্যা গুনলে। জানতে চান কাতার বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে কতো শ্রমিক নিহত হয়েছে? ধারণা করা হয়, ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজে ১২০০ শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন!

কতোটুকু সত্য এই ধারণা? যাচাই করতে মাঠে নেমেছিল বিবিসি প্রতিনিধিরা। কিছু দিন আগেই ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাতে প্রকাশিত হল ২০০৮ সাল অনুষ্ঠিত হওয়া বেইজিং অলিম্পিক থেকে শুরু করে ২০২২ কাতার ফুটবল বিশ্বকাপে মৃত্যুবরণ করা শ্রমিকের গ্রাফচার্ট। সেখানেও বলা হয়, ১২০০ শ্রমিকের মৃত্যুর কথা।

বিশ্বকাপ চাপা কান্না নিয়ন আলোয় neon aloy

কিন্তু কিভাবে এই ১২০০ শ্রমিকের মৃত্যু দাবী করা হয়?

২০১৩ সালে সর্বপ্রথম যারা এ দাবী করেন তাঁরা হলেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডস ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি)। আইটিইউসি নেপাল এবং ভারতের দূতাবাসে যায় তাঁদের শ্রমিকদের খবর নিতে। উল্লেখ্য, কাতারে অবস্থিত মোট প্রবাসী শ্রমিকের ৬০% এর অধিক(প্রায় ১.৪ মিলিয়ন) শুধুমাত্র নেপাল এবং ভারত থেকেই এসেছে।

বিশ্বকাপ চাপা কান্না নিয়ন আলোয় neon aloy

দূতাবাসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী উভয় দেশ মিলিয়ে প্রতিবছরের ৪০০’র অধিক মৃত্যু ২০১৫ সালের মধ্যেই রিপোর্ট করা ১২০০ সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়।

২০১১ ২০১২ ২০১৩
ভারতীয় ২৩৯ ২৩৭ ২৪১
নেপালি ১৬২ ১৬৯ ১৯১
সর্বমোট ৪০১ ৪০৬ ৪৩২

সুত্রঃ আইটিইউসি

একই তথ্য দিয়েছে কাতারি সরকার থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ল’ ফার্ম ডিএলএ পাইপার। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আসা শ্রমিকসহ প্রতি বছর গড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬০০ জন অর্থাৎ এই তিন বছরে সর্বমোট ১৮০০।

প্রশ্ন হচ্ছে, জগৎ মাতানো এই আসরের জন্য, উন্মাদনা সৃষ্টি করতে কি এই অসংখ্য মৃত্যু প্রয়োজন? নাকি শুধুই অঝোরে প্রাণগুলো ঝরে যাচ্ছে? ভারতীয় দূতাবাসের দেয়া বিবৃতি অনুযায়ী, বড় কোন পদক্ষেপ গ্রহণে এমন প্রাণহানি ঘটতেই পারে। মৃতের সংখ্যা স্বাভাবিক!

সত্যিই কি তাই? সবসময়ই কি এমন প্রাণহানি স্বাভাবিক? যদি তাই হয়, তাহলে দুঃখের সাথে বলতে হয়, ১৯৯৬ এর বার্সেলোনা অলিম্পিক কিংবা ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিকে শ্রমিক মৃত্যুর হার ছিল ১ জন করে। খুব বেশি দূর যেতে হবে না, ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে শ্রমিক সংখ্যা ছিল সর্বমোট ৪৬,০০০। অবাক করার মতো বিষয় হল, নির্মাণকালে শ্রমিক মৃত্যুর হার ছিল শূন্য, অর্থাৎ কোন শ্রমিকই মারা যাননি।

সুতরাং, কোন রকম দুর্ঘটনা বাদেই নির্মাণকাজ চালানো সম্ভব। তবে কেন এই দুর্ঘটনা? কেন এই প্রাণনাশ? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেখক এবং রাশিয়ার উপরে গবেষণাকারী জেন বুকাননের লেখা রিপোর্টে সেসব তথ্যই উঠে এসেছে। শ্রমিকদের উপরে চলে আসা এ নির্যাতনের জন্য যে দায়িত্বে থাকা ফিফা কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন তিনি। প্রমাণ হিসাবে সামনে তুলে এনেছেন জালিয়াতি, কালোবাজারি এবং টাকা পাচারের অভিযোগে ২০১৫ সালে চাকরীচ্যুত হওয়া কর্মকর্তাদের নাম।

ফুটবল এ প্রজন্মের জনপ্রিয় খেলার একটি। ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই গোটা পৃথিবীর উন্মাদনা। যে উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে থাকে সকল জাতি। অথচ এই উন্মাদনা সৃষ্টির যে কারিগর, যাদের ছাড়া এ আসরগুলো কখনোই সফল হতো না- তাদের প্রতি এতো অবহেলা কেন? সৃষ্টির কারিগরকে তুচ্ছ করে সেরা সৃষ্টি কি পাওয়া সম্ভব? প্রতিকার কিন্তু আমাদের হাতে। আমরাই পারি এ সমস্যার সমাধান করতে। প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী, প্রতিটি জাতিই যদি জেগে উঠি এই অবহেলার বিরুদ্ধে, তবেই হবে এর প্রতিকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়ার জন্য ফুটবলই যথার্থ মাধ্যম। আর এখনই উপযুক্ত সময় এ শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। নিজেরাও মেতে উঠি ফুটবল উন্মাদনায়, অন্যকেও সুযোগ করে দিই।

Most Popular

To Top