শিল্প ও সংস্কৃতি

কে-পপ: ভালোবাসব না ঘৃণা করব?

কেপপ: ভালোবাসব না ঘৃণা করব?

ইন্টারনেটের যুগে বর্তমানে সবাই কম বেশি কে-পপের কথা জানি। আর না জানলেও ট্রল পেজগুলোর বদৌলতে জানা আছে। বাংলাদেশের ট্রল পেজগুলোতে নিয়মিতই কে-পপ আর্টিস্টদের নিয়ে ট্রল করা হয়। একটা ট্রল খুব বেশিই জনপ্রিয় আর তা হচ্ছে ছেলে কে-পপ আর্টিস্টদেরকে তাদের ভিন্ন ধরনের ফ্যাশন ও স্টাইলের জন্য হিজড়াদের সাথে তুলনা করা। সেই সাথে কে-পপ গানের শ্রোতাদেরকে নানা ভাবেই হেয় করে দেখা হয়।

যেই কে-পপ নিয়ে এত ট্রল কিংবা পচানো, সেই কে-পপ কি? যার জন্য এত কিছু!

কে-পপ বা কোরিয়ান পপ হল দক্ষিণ কোরিয়াতে জন্ম নেওয়া একটি সংগীতের একটি ধারা। কোরিয়ান গান বলতে আমরা বুঝি কোরিয়ান ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরে বড় বড় ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গাওয়া। কে-পপ হচ্ছে কোরিয়ান সঙ্গীতের আধুনিক ধারা। কে-পপ গান গুলোতে এখন ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের বদলে নানা ধরণের Western pop music, Rock, Experimental, Jazz, Gospel, Latin, Hip-Hop, R&B, Reggae, Electronic Dance, Folk, Country and Classical প্রভৃতি মিউজিকের সমন্বয় ঘটানো হয়। কোরিয়ার শিল্প ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কে-পপ এর অবদান। যেখানে গানের সাথে এক যোগে তাল মিলিয়ে থাকবে নিখুঁতভাবে নাচ আর থাকবে Rap এর জটিল সমন্বয়।

শুরুর দিকের কে-পপের ইতিহাস সম্পূর্ণই ভিন্ন। কে-পপ সঙ্গীত তার নিজস্বতার পাশাপাশি রয়েছে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রভাব। এই প্রভাব প্রথম শুরু হয় ১৮৮৫ সালের দিকে। তখন কোরিয়ার স্কুলগুলোতে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিখ্যাত বিখ্যাত গানগুলোকে কোরিয়ান ভাষায় রূপান্তর করে শেখানো হত। পরবর্তীতে কোরিয়ায় জাপানিজ শাসনের সময়কালে জাপানের বিখ্যাত গানগুলোকে কোরিয়ান ভাষায় রূপান্তরিত করে প্রথম পপ গানের এলবাম বের করা হয়। ১৯৪৫ সালে জাপানিজ শাসনের পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া আলাদা হয়ে যাওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় বেশ কিছু পাশ্চাত্য ধারার ক্লাব ও বার খোলা হয়।

এছাড়াও যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে মেরিলিন মনরো ও লুইস আর্মস্ট্রংয়ের মত বিখ্যাত ব্যক্তিরা কোরিয়া ভ্রমণ করেছেন। পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে কোরিয়া নেটওয়ার্ক রেডিও সম্প্রচার শুরু করে ও এতে পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রচার হত বেশি। আস্তে আস্তে কোরিয়ান সঙ্গীত জগতে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রভাব বাড়তে থাকে। এর সাথে সাথে ব্যবসা বাণিজ্য ও নানা দিক থেকে পাশ্চাত্য সংস্কৃত ব্যাপক প্রভাব থাকায় কোরিয়ায়ও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা যায়। পুরো সময়টাতে সঙ্গীতের প্রচলন থাকলেও খুব কমই তার ব্যপ্তি ছিল।

৯০-এর দশককেই Mordern K-pop এর সূচনা বলে ধরা হয়। যদিও কোরিয়ায় পাশ্চাত্য প্রভাব এবং সঙ্গীতে এর প্রভাব বাড়ছিল তবে ৯০-এর দশকে তা বিরাট আকার ধারণ করে। ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম কোরিয়ান পপ গ্রুপ হিসেবে  ‘Seo Taiji & Boys’ নামে তিনজনের একটি গ্রুপ আত্মপ্রকাশ করে। তুমুল জনপ্রিয়তা পায় গ্রুপটি। নতুন ধারার নানা গান উপহার দিতে থাকে। একই সাথে অন্যান্যদের জন্যও চলার পথটা সহজ করে দিয়ে যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে প্রথম আইডল বয়ব্যান্ড হিসেবে H.O.T এর আবির্ভাব ঘটে। শুধু তাই নয় ‘Seo Taiji & Boys’ এর মত এই ব্যান্ডটিও তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সর্বপ্রথম মেয়ে গ্রুপ হিসেবে কে-পপে S.E.S অভিষেক করে। এর পাশাপাশি বের হয় Fin.k.l, Shinhwa, Sechs Kiss, NRG, Baby V.O.X, DIVA, g.o.d । যথেষ্ট পপুলার থাকলেও পরবর্তীতে গ্রুপগুলো ভেঙে যায় নতুবা আস্তে আস্তে তাদের কার্যক্রম থেকে সরে আসে। এই গ্রুপ গুলো ভেঙে গেলেও এদের হাত ধরেই সূচনা হয় Boa, Rain, Psy, TVXQ, Super Junior, SS501, Bigbang, Girls’ Generation, Wonder Girls, Brown Eyed Girls, Kara, Shinee, Beast, CNBlue, FT Island, 2ne1, 4 minute, Sister, T-ara, F(x), Exo, Miss A সহ আরোও দারুণ সব কে-পপ গ্রুপের অভিষেক হয় এবং এত দারুণ সমস্ত গান করে যা কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, চীন তো বটেই Billboard এ পর্যন্ত শীর্ষস্থান লাভ করে।

কোরিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোতে দারুণভাবে জনপ্রিয় ছিল এসব গ্রুপ। এমনকি জাপানের মিউজিক চার্টে নাম ছিল কে-পপ গ্রুপের। ২০১৪ সালে psy এর gangnam style এর ফলে কে-পপ বর্হিবিশ্বের কাছে আরো বেশি প্রকাশ পায়। কোরিয়া ছাড়াও চীন ও জাপানে এ সকল ব্যান্ডের রয়েছে বিশাল ফ্যানবেস। এসকল খ্যাতির ফলে অনেক ছেলেমেয়েরাই কে-পপে তাদের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য এগিয়ে আসে। আরো নতুন নতুন গ্রুপ BTS (Bangtan Boys), Twice, Mamamoo, Red Velvet, Ikon, Winner, Girl’s Day, AOA, Got7, Seventeen, Teen Top, Gugudan, Sonamoo, Lovelyz, Momoland, Nine Muses, Stellar, Blackpink Gfriend, Apink সহ নানান নতুন গ্রুপের আগমন হয়। এর মধ্যে Bigbang & Girls’ Generation তাদের দারুণ ব্যতিক্রমধর্মী পারফরম্যান্সের জন্য সারাবিশ্বে খ্যাতি পায়।

কে-পপ মূলত তাদের গান ও নাচের জন্য বিখ্যাত। প্রতিটি গানের সাথে মনোমুগ্ধকর নাচ ও চোখ ধাঁধাঁনো ফ্যাশন। প্রত্যেকটি কে-পপ গানের থাকে কথার পেছনে থাকে অর্থ। গানগুলো বর্তমান প্রজন্মের উপযোগী ও চাহিদা অনুযায়ী তৈরি তাই খুব সহজেই তা জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এছাড়াও কে-পপের আর্টিস্টদের চোখ ধাঁধাঁনো ফ্যাশান ও তাদের জনপ্রিয় হওয়ার একটি কারণ। শুধু তাই নয় বরং আর্টিস্টদের কিছু নিজস্ব্তা আছে যার কারণে তাদের নিজেদের ফ্যানবেসও রয়েছে। ২০১৭ সালের প্রথম অর্ধবছরের হিসাব অনুযায়ী কে-পপের আয় হচ্ছে ৩২৬,০০০,০০০ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় ২৭,৫৮৪,১৮০,৩০০ টাকা। কে-পপে সব ধরনের গানই গাওয়া হয়। Western Hip Hop, Jazz, Blues, Latin, Salsa, Spanish, Japanese pop, Bubblegum pop genre, Electropop Genre, Dancepop Genre।

কে-পপ বর্তমানে খুবই বড় একটি ইন্ডাষ্ট্রি। কোরিয়ায় বেশ কিছু এজেন্সি রয়েছে যারা কে-পপ আর্টিস্টদের ট্রেনিং এর মাধ্যমে গড়ে তোলে এবং তাদের একজন সফল আর্টিস্ট হয়ে উঠতে সাহায্য করে। তবে উল্লেখযোগ্য ভাবে তিনটি এজেন্সি রয়েছে। এত সকল এজেন্সীগুলোর মধ্যে S.M. Entertainment, YG Entertainment and JYP Entertainment হচ্ছে উল্লেখযোগ্য।

এজেন্সীগুলো অনেকের মধ্য থেকে আর্টিস্ট বাছাই করে, তাদের ট্রেনিং দেয়। ট্রেনিং শেষে কে-পপের জগতে তাদের অভিষেক ঘটে। ট্রেনিং এর জন্য আর্টিস্টদের খুব কম বয়সেই সিলেক্ট করে নেওয়া হয়। দেখতে সুন্দর হওয়া, নাচে-গানে পারদর্শী হওয়া, একের অধিক ভাষায় কথা বলতে পারা- এগুলো খুবী জরুরী ট্রেনিং এ সিলেক্ট হওয়ার জন্য। আর্টিস্টদের জন্য এজেন্সিগুলো বিভিন্ন অডিশনের ব্যবস্থা করে এবং অডিশনে নির্বাচিত হওয়ার পর এজেন্সি থেকেই তাদের জন্য ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হয়। ট্রেনিং এর মধ্যে নাচ, গান, র‍্যাপ সহ নানা ধরনের ভাষা শেখাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

একজন আর্টিস্টের ট্রেনিং এর নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। অনেক আর্টিস্টদের ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে প্লাস্টিক সার্জারিও করতে হয়। সুন্দর দেহের জন্য আর্টিস্টদের কঠিন ডায়েটের মধ্যে থাকতে হয়। একেক আইডলের ট্রেনিং এর সর্বনিম্ন ৩ মিলিয়নের বেশি টাকা খরচ হয়। প্রতিদিন ১২-১৪ ঘন্টা তাদেরকে ট্রেনিং করতে হয়। সর্বনিম্ন ৪-৫ বছর ট্রেনিং এ থাকতে হয়। অনেকের এর চেয়ে বেশি সময়ও লাগে। এত কষ্টের কারণে অনেকেই মাঝ পথে ট্রেনিং ছেড়ে চলে আসে। এর পাশাপাশি তাদের পড়ালেখাও চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়।

ভিন্ন ধারার গান ও মনোমুগ্ধকর গান ও নাচের জন্য বিখ্যাত বেশ কিছু গান হল- Super junior এর ‘Sorry Sorry’, Exo’র ‘Mama’, BTS এর ‘Blood Sweet & Tears’, SNSD’র ‘Into The New world’, ‘I Got A Boy’, ‘The Boys’, ‘Genie’, F(x) এর ‘Nu Abo’, Blackpink এর ‘Boombayah’, Shinee’র ‘Ring Ding Dong’, Kara’র ‘Mama Mia’, Girls’ Generation এর ‘Gee’, ‘The Boys’, ‘I Got a boy’ ; Bigbang এর ‘Loser’, ‘Fantastic Baby’ ‘Bang Bang Bang’, 2ne1 এর ‘I’m the Best’, ‘Comeback Home’, Super Junior এর ‘Sorry Sorry’, ‘Mr. Simple’, Shinee’র ‘Ring Ding Dong’ Brown Eyed Girls এর ‘Abracadabra’, Wonder Girls এর ‘Tell Me’, ‘Nobody’, Ss501 এর ‘Because I’m Stupid’ Exo’র ‘Mama’, ‘Monster’ ‘Kokobop’ Psy এর ‘Gangnam Style’, ‘Gentleman’ থেকে শুরু করে হালের BTS এর ‘Blood sweet & tears’, Blackpink এর ‘Boombayah’, Mamamoo’র ‘Decalcomanie’।

কোরিয়া ও এর আশে পাশের দেশ গুলোতে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে কে-পপ গ্রুপ গুলোর রয়েছে বেশ বড় ফ্যানবেজ। পাশ্চাত্য দেশ গুলোর পাশাপাশি এশিয়ান দেশ গুলোতেও কে-পপ ব্যান্ডগুলো সমান জনপ্রিয়। গানের জগতে বিলবোর্ডের শীর্ষস্থান ও দখল করেছে কে-পপ ব্যান্ডগুলো। কে-পপের ব্যান্ড গানের পাশাপাশি আর্টিস্টরা বিভিন্ন ধরনের সিনেমা কিংবা ড্রামাতেও অভিনয় করছে। পছন্দের মেম্বার থাকার ফলে সে সকল ড্রামা সিনেমাগুলোও তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিভিন্ন কে-পপ ব্যান্ডের ফ্যানদের আলাদা আলাদা নামে ডাকা হয়। এমনকি তাদের একটি আলাদা চিহ্নও থাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করার জন্য। TVXQ এর ফ্যানবেসের নাম ‘Cassiopeia’ ও তাদের রঙ হল ‘pearl red’। Bigbang এর ফ্যানদেরকে বলা হয় VIP, Girls’ Generation এর ফ্যানদের বলা হয় ‘SONE’, 2NE1 এর ‘Black Jacks’, Exo এর ‘EXOL’, BTS এর ‘ARMY’ ও G-Dragon এর ‘Applars’, SS501 এর ‘Tripple S’ । নিজেদের আর্টিস্টদের সাপোর্ট দেওয়ার পাশাপাশি এরা আর্টিস্টদের সাহায্যে নানা ভাবে এগিয়ে আসে এমনকি অনেক সময় এরা নানা ধরনের সমাজকল্যাণ মূলক কাজও পরিচালনা করে।

কে-পপের জনপ্রিয়তার ফলে কোরিয়ার অর্থনীতিতেও বিশাল বিস্তার রয়েছে। প্রতিবছর কে-পপের নানা কনসার্টের জন্য অন্যান্য নানা দেশ থেকে প্রচুর ফ্যান আসে। ২০১২ সালে বারাক ওবামা কোরিয়া ভ্রমণকালে কে-পপের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন। এছাড়াও জাতিসংঘের সচিব বান কি মুন ও তার কোরিয়া ভ্রমণকালে তার বক্তব্যে কে-পপের কথা তুলে ধরেন। কে-পপের ফলে কোরিয়ার অর্থনীতিতে যে উন্নতি হয়েছে তার কথা উল্লেখ করেন। কে-পপের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার যে প্রভাব তৈরি হয়েছে তাও তুলে ধরেন।

সর্বজায়গায় সমাদৃত হলেও কে-পপকে নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। কে-পপে অন্যান্য সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে তাই অনেকেই এর বিপক্ষে ছিল। এছাড়াও অনেকের ধারনা কে-পপের গান ও লিরিকগুলো অন্যান্য নানা দেশের গান থেকে নকল করে বানানো। এমনকি এদের সুর গুলোও নকল করে বানানো বলে কথা উঠেছিল। কে-পপের ট্রেনিং নিয়েও নানা কথা উঠে সব সময়ই। আর্টিস্টদের নিয়ে অমানবিক ট্রেনিং করানো, ঠিক মত খাবার না দেওয়া, প্লাস্টিক সার্জারি করানো সহ আরো নানা কিছু। BBC-তে এই ট্রেনিংকে দাস চুক্তির সাথে তুলনা করেছে। অর্থহীন ও বিকৃত উচ্চারনের শব্দের কারণেও অনেকে কে-পপকে দায়ী করেছে।

প্রচন্ড রকমের অমানুষিক ট্রেনিং এর মধ্য দিয়ে যেতে কে-পপ আর্টিস্টদের। এছাড়াও পারিপার্শ্বিক নানা চাপ তো রয়েছেই। কিন্তু তাও স্টেজে হাসি মুখে ফ্যানদের জন্য আর্টিস্টরা পারফর্ম করে। তাই আমাদেরও উচিত তাদের সাপোর্ট দেওয়া। আর তাও যদি না করা সম্ভব হয় তবে অন্তত যেন আমরা ট্রল না করি।

Most Popular

To Top