ফ্লাডলাইট

বিজয় কি পারবেন অধিনায়কের মান রাখতে?

নিয়ন আলোয়- যে কারনে সাউথ আফ্রিকা সফরে দলে ফিরলেন না এনামুল হক বিজয়- Neon Aloy

এনামুল হক বিজয়, আশা জাগিয়ে যার আগমন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কিন্তু হতাশ করেছেন বারবার।

২০১২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিলেন এনামুল হক বিজয়, টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান (৩৬৫) করেছিলেন বিজয়। ৬ ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি, একটি ফিফটিসহ ৬০.৮৩ গড়ে ওই রান করেন ৮৫.০৮ স্ট্রাইক-রেট নিয়ে।

বিশ্বকাপ শেষে অনেক প্রত্যাশা জাগিয়ে ওয়ানডে অভিষেক হয় বিজয়ের। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই খুলনায় উইন্ডিজের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেন বিজয়। ৩৪ ম্যাচে ৩ সেঞ্চুরি আর, ৩ ফিফটিসহ ১০০৫ রান করেন, গড় মাঝারি মানের (৩২.৪১) হলেও স্ট্রাইক-রেট মাত্র ৭০.৭২। মূলত দ্রুত রান তোলার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন তিনি, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিরিক্ত ডট বল দেয়ার প্রবণতা এবং স্ট্রাইক-রোটেট করার ব্যর্থতা বিজয়ের প্রধান দূর্বলতা হিসেবে আলোচিত হয়।

যুব বিশ্বকাপের ওই আসরে বিজয়ের ঠিক নীচের অবস্থানে ছিলেন পাকিস্তানের বাবর আজম। টুর্নামেন্টে বাবরের স্ট্রাইক-রেট ছিলো মাত্র ৬৫.৬২। কিন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বর্তমানে বাবর আজমের স্ট্রাইক-রেট ৮৫+, পাকিস্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বাবরকে।

বিজয়ের সাথে সেই বিশ্বকাপ খেলা কয়েকজন ক্রিকেটার হচ্ছেন- কুইন্টন ডি কক, ক্রেগ ব্রাথওয়েট, নাজিবুল্লাহ জাদরান, মোহাম্মদ নেওয়াজ, ক্যামেরুন ব্যানক্রফট, টিম হেড, নিরোশান দিকভেলা প্রমুখ । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যারা নিজেদের একটা অবস্থান করে নিয়েছেন।

বিজয়ের লম্বা ইনিংস খেলার যোগ্যতা রয়েছে, তবে সমালোচিত হয়েছেন লম্বা ইনিংস খেলার ধরনের জন্য। যার কারনে বিশ্বকাপের সময় পড়া ইনজুরি থেকে ফিরেও দলে জায়গা হারান সৌম্য সরকারের কাছে।

যদি খেয়াল করা হয়, ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ক্রিকেট খুব দ্রুত বদলে গিয়েছে। এই বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে ক্রিকেটে দলীয় ৩৫০ রানের ইনিংস বেড়ে গিয়েছে। ৪০০ রানের ইনিংসের সংখ্যা বেড়েছে দলগতভাবে। অর্থাৎ রান রেট বেড়েছে।

তামিম-সৌম্য জুটি গড়ে ১৭ ওভারে দলীয় ১০০ রান করেছে। ফলে শেষের দিকে ব্যাটসম্যানরা শ্লগ করার সুযোগ পেয়েছে। তামিমের উপর প্রেসার কমেছিলো ফলে তামিম লম্বা ইনিংস খেলার সুযোগ পেয়েছিলো।

যেকোন কারনে হোক নির্বাচকরা বিজয়ের লম্বা ইনিংস খেলার যোগ্যতাকেও “ওভারলুক” করেছেন, বিজয়কে বিকল্প ওপেনার হিসেবেও বিবেচনা করা হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয়না বিজয়ের অতিরিক্ত মন্থর গতির ব্যাটিং “অযোগ্য” বলে ধরা হয়েছে। যার কারনে সৌম্য ব্যর্থ হলে সুযোগ পেয়েছেন ইমরুল কায়েস।

সৌম্য সরকারের ব্যর্থতা আর ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দিয়ে আবার আলোচনায় আসেন বিজয়। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেতর পার্থক্য বিস্তর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য বিজয়কে প্রথমে সুযোগ দেয়া হয় আয়ারল্যান্ড “এ” দলের সাথে। আইরিশ বোলারদের বিপক্ষে বিজয় তিন ওয়ানডে খেলে রান করেন যথাক্রমেঃ ২০ (২৩), ৫ (৫) এবং ১৩ (১২)।

মাঝারি মানের বিপিএল শেষে সুযোগ পান জানুয়ারি মাসে ত্রি-দেশীয় সিরিজে। সিরিজের চার ম্যাচে বিজয়ের সংগ্রহঃ ১৯ (১৪), ৩৫ (৩৭), ১ (৭) এবং ০ (৬)।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাত ম্যাচে বিজয়ের রান মাত্র ৯৩, গড় ১৩.২৯। এর ভেতর ৩৫ রানের ইনিংসে রয়েছে একাধিক লাইফ পাবার ঘটনা।

তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিজয়ের টিকে থাকাটা কতটা কঠিন হচ্ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

হাতে যথেষ্ট ভালো বিকল্প নাই, সৌম্য রানে ফিরতে পারেনি, ইমরুল টাচে নাই, রিজার্ভ বেঞ্চেই সময় পার করছেন, আর লিটনকে সাউথ আফ্রিকায় খেলানো হলেও অদ্ভুত কোন কারনে ঘরের মাটিতে ত্রি-দেশীয় সিরিজে সুযোগ দেয়া হয়নি। ফলে বিজয় তখন একবার সুযোগ পান এবং অধিনায়ক মাশরাফির ইচ্ছায় আবারো উইন্ডিজ সফরের দলে সুযোগ পেয়েছেন।

বিশ্বকাপ সামনে রেখে দল গোছানোর দিকে মনযোগী হয়েছেন অধিনায়ক। সরাসরি বলেছেন তামিমের সাথে সঙ্গী হিসেবে তিনি বিজয়কে দেখতে চান।

বিজয়ের জন্য অনেক বড় পাওয়া এটা। সাথে ম্যাশ এটাও বলেছেন বিজয়কে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া হবে।

“কিছু সুনির্দিষ্ট কারনে বিজয় দলের বাইরে ছিলো”, ম্যাশের এই কথা থেকে আমরা কি ধরে নিবো বিজয় সেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠেছেন? যদি হয় তাহলে সেটা দলের জন্যই মঙ্গলজনক।

তবে বিজয়কে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। সন্তোষজনক স্ট্রাইক-রেট নিয়ে খেলতে হবে। স্ট্রাইক-রোটেট করতে হবে। তাকে মনে রাখতে হবে তামিম ইকবালের ভূমিকা দলের নির্দিষ্ট। তামিম লম্বা ইনিংস খেলবেন একপাশ ধরে রেখে। তাকে অন্তত ৩৫ ওভার পর্যন্ত উইকেটে থাকার পরিকল্পনা করতে হয় এখন। আর সেটা হলে ভালো স্কোর সম্ভব হয়। ফলে পাওয়ার প্লে এর ব্যবহার, দ্রুত রান তোলা, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার কাজটা বিজয়কে নিতে হবে। সাধারণত জুনিয়র পার্টনার যে থাকে কাজটা তাকেই করতে হয়।

অধিনায়ক যে আস্থা রেখেছে সেটার প্রতিদান বিজয়কে দিতে হবে। তবে অনুশীলন ম্যাচে শূন্য (০) রানে আউট হয়ে নিশ্চয় তিনি বুঝেছেন সিরিজটা সহজ হবেনা তার জন্য।

বিজয়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে তার দূর্বল ফুটওয়ার্ক। অনেক সময় তিনি যেন ক্রিজে আটকে যান ক্রিজ থেকে পা না তুলে নিজেই লেগ সাইডে ঘুরে যান, আবার কখনো কখনো জায়গায় দাঁড়িয়ে (stuck in the crease) ড্রাইভ করতে যেয়ে প্লেয়ড অন হয়ে যান।

বিজয়ের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে হোল্ডার, গ্যাব্রিয়েলদের এঙ্গেল ক্রিয়েট করা নতুন বলের মুভমেন্ট। সময়মত পা সামনে না নিলে স্লিপে ক্যাচ উঠে যেতে পারে।

বিজয় চাপমুক্ত হতে পারেন এটা ভেবে যে শুধু এই সিরিজ নয়, হয়তো এশিয়া কাপের দলেও তিনি সুযোগ পাবেন।

এক দিক থেকে অনেক বড় সুযোগ, আবার অন্য দিক থেকে এটাই হয়তো তার শেষ সুযোগ। স্কোয়াডে যেহেতু লিটন দাসকে রাখা হয়েছে সুতরাং বার্তাটা পরিষ্কার।

মাশরাফি বলেছেন বিজয়ের সুযোগটা দুহাত ভরে লুফে নেয়া উচিৎ। কারন এইবার না হলে আর কখনো না!

দেখার বিষয় বিজয় এই পরীক্ষায় পাশ করেন কিনা।

তামিমের একজন স্থায়ী পার্টনার বের করতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে টিমকে। এ যেন মিউজিকাল চেয়ার! আজ সৌম্য, কাল বিজয় তো পরশু ইমরুল বা লিটন।

বিজয়ের পাশাপাশি লিটনের দিকে নজর রাখা উচিৎ। এখন পর্যন্ত “এক্সপেরিমেন্ট” হচ্ছে তার পজিশন নিয়ে। আচ্ছা যে ছেলেটাকে সাউথ আফ্রিকায় খেলাবেন তাকে অন্তত দেশের মাটিতে আগে খেলানো উচিৎ ছিলো। ত্রি-দেশীয় সিরিজে বিজয়ের জায়গায় আমি লিটনকেই প্রত্যাশা করেছিলাম। তবু আশার কথা এইবার লিটনকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে। হতে পারে তিন নাম্বারে সুযোগ দেয়া হবে তাকে।

এমনিতে মাশরাফির উপর আমার প্রচণ্ড আস্থা আছে, মন বলে তিনি যা করেন বুঝে শুনেই করেন আর দেরি করে হলেও সেটায় ফল আসবে।

তবে, বিজয়ের বিষয়টা নিয়ে আশংকা হচ্ছে, মনে হচ্ছে বিষয়টা ফ্লপ করবে। বিজয় হয়তো সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেননা।
আমি ভুল প্রমাণিত হলেই দলের আর বিজয়ের জন্য মঙ্গল, আমিও খুশি হবো সে রান পেলে।

এখন সবকিছু বিজয়ের উপর, সে কি পারবে মাশরাফির মান রাখতে?

Most Popular

To Top