বিশেষ

একজন সঙ্গীত জাদুকর লাকী আখান্দ

লাকী আখান্দ নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলাদেশে সঙ্গীত জগতে কয়েকজন চতুর্মুখী সঙ্গীত ব্যাক্তিত্বের নাম বলতে গেলে সবার প্রথমেই যার নাম না বললেই নয়, তিনি হলেন লাকী আখান্দ। তাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের একজন জাদুকরও বলা চলে। লাকি আখান্দ ছিলেন একাধারে একজন সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার এবং তিনি নিজে গানও গেয়েছেন অনেক। বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের অনেক দিকেই তাঁর বিচরণ ছিল সগৌরবে। অসম্ভব সুন্দর পরিচালনা, গানের কথার গভীরতা, সুরের ছন্দে কেড়েছিলেন কোটি ভক্তের মন। জীবনের শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত, হাসপতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করার সময়ও সঙ্গীত থেকে দুরে সরেননি সুরের এই জাদুকর।

লাকী আখান্দ নিয়ন আলোয় neon aloy

লাকী আখান্দ

১৯৫৬ সালের জুন মাসের ৭ তারিখে পুরান ঢাকায় জন্মেছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই কিংবদন্তী। জীবনের মানে কি বুঝে উঠার আগেই মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বাবার কাছ থেকে সংগীতের হাতেখড়ি নেন লাকী আখান্দ। মাত্র ৭ বছর বয়সেই ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টেলিভিশন এবং রেডিওতে শিশুশিল্পী হিসেবে বিভিন্ন সংগীত বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি। তারচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো মাত্র ১৪ বছর বয়সেই এইচএমভি পাকিস্তানের সুরকার এবং ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ভারতের সংগীত পরিচালক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন মহান এই গায়ক। ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত রাখতেন বুলেটিন আর দেশের সব গান দিয়ে।

বাংলাদেশে ৮০-র দশক থেকেই সবার প্রিয় শিল্পীর তালিকায় ছিলেন লাকী আখান্দ। সংগীত পরিচালক, সুরকার, গীতিকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর অনুজ আরেক কিংবদন্তী হ্যাপি আখন্দ। লাকী আখন্দ এবং হ্যাপি আখন্দ দুই ভাই মিলে আখন্দ ব্রাদার্স নামে বেশ সুনাম কুড়ায়। ১৯৭৫ সালে ছোট ভাই হ্যাপি আখন্দের সাথে একটি এলবাম এর সংগীত আয়োজন করেন। এলবামটিতে “আবার এলো যে সন্ধ্যা” ও “কে বাঁশি বাজায় রে” গানে কন্ঠ দেন হ্যাপী আখান্দ। “স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে” ও “পাহাড়ী ঝর্ণা” গানে কন্ঠ দেন হ্যাপী ও লাকি দুই ভাই একসাথে, নিজে কন্ঠ দেন দুইটি গানে, “নীল নীল শাড়ী পরে” এবং “হঠাৎ বাংলাদেশ”। স্বাধীনতার পরে আখন্দ ব্রাদার্স উৎসাহী যেকোন শিল্পীর সাথে কাজ করার জন্য আগ্রহ দেখায়। নিজেদের অগ্রগতির কথা বাদ দিয়ে তারা অন্য শিল্পীর সাহায্য এগিয়ে যেতেন। ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন।  তাঁর পরিচালনায় গান গেয়েছেন দেশের অনেক প্রখ্যাত গায়ক। লাকি আখন্দের পরিচালনায় ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রের অনেক জনপ্রিয় একটি গান ‘সখী চলনা, সখী চলনা জলসা ঘরে এবার যাই’, এতে কন্ঠ দিয়েছিলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। একই চলচ্চিত্রে হ্যাপি আখান্দের পূর্বের এলবামের একটি গান “আবার এলো যে সন্ধ্যা” ব্যবহার করা হয় এবং গানটি অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এছাড়াও লাকী আখান্দ অনেক জনপ্রিয় সিনেমার সংগীত পরিচালনা, গীতিকার, সুরকার হিসেবেও কাজ করেছেন সফল এবং একনিষ্ঠভাবে।

লাকী আখান্দ নিয়ন আলোয় neon aloy

“ঘুড্ডি” এর পোষ্টার

১৯৮৪ সালে তিনি তাঁর প্রথম এলবাম লাকী আখান্দ প্রকাশ করেন। তার প্রথম এলবামটি অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পায় তখন। এই এলবামের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান হলো “আগে যদি জানতাম”, “আমায় ডেকো না”, “মামুনিয়া”, “এই নীল মনিহার”, “হৃদয় আমার”।

১৯৮৭ সালে মাত্র ২৭বছর বয়সে ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দের হঠাৎ মৃত্যুর পরে লাকি আখান্দের সংগীত চর্চা কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। মাঝখানে প্রায় এক যুগ নীরব থেকে লাখো ভক্তের টানে, প্রাণের টানে আবারো ফিরে আসেন সঙ্গীত জগতে। সঙ্গীত ভক্ত শ্রোতাদের সৃষ্টির বেদনায় ভাসাতে আবারো দুটি হাত দিয়ে ধরে নেন পুরোনো সেই কীবোর্ডস, কথার ভাঁজে, সুরের মোহনায় আবারো সাজিয়ে তুলেন সঙ্গীতের অপার্থিব স্বরলিপি। সেই সাথে ভক্তদের জন্য নিয়ে আসেন দুটি এলবাম ‘পরিচয় কবে হবে’ ও ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’। এলবাম দুটি প্রকাশিত হয় এক যুগ পরে ১৯৯৮ সালে।

গীতিকার ‘গোলাম মোর্শেদ’ এর কথামালায় এক দশক পরে ছয়জন উজ্জ্বল তারকা শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ ও সামিনা চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশ করেন ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ এলবামটি। এটিই ছিল লাকি আখান্দের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মিশ্র এলবাম এবং প্রথমটিতেই তিনি বাজিমাত করেছিলেন। সুপারহিট হয়েছিল এই এলবামটি। সেই সময়কার কিছু জনপ্রিয় শিল্পীর জনপ্রিয় কিছু গান তার পরিচালনা করা ছিলো। জেমসের গান ‘লিখতে পারিনা’ ও ‘ভালোবাসা চলে যেওনা’, আইয়ুব বাচ্চুর “কি করে বললে তুমি, তোমাকে হঠাৎ ভুলে যেতে” এছাড়াও তপন চৌধুরী, সামিনা চৌধুরীর কিছু গান, এই সবগুলো জনপ্রিয় গানেরই পরিচালক ছিলেন কিংবদন্তী লাকী আখান্দ। যত্ন সহকারে যদি কোনো শ্রোতা এই গানগুলি শোনেন তাহলেই বুঝতে পারবেন গানগুলোর গভীরত্ব এবং কতটা যত্নের সাথে পরিচালনা করা হয়েছিল প্রতিটি এলবামের প্রতিটি গান।

একই বছর তিনি সামিনা চৌধুরীকে নিয়ে আনন্দ চোখ নামে একটি দ্বৈত এলবাম প্রকাশ করেন। গোলাম মোর্শেদের কথা আর লাকি আখান্দের কম্পোজিশনে এলবামটি প্রকাশ করে সাউন্ডটেক। এতে ১২ টি গান ছিল, যার মধ্যে “কাল কি যে দিন ছিল”, “বলো কে পারে”, ও “এই বর্ষা রাতে” গানগুলো ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৯৯ সালে আর্কের জনপ্রিয় শিল্পী হাসানের জন্য ‘দেখা হবে বন্ধু’ এলবামে সুর করেন লাকি আখান্দ। হাসানের গাওয়া সেই গানটি হলো ‘হায়রে দুর্দিন যাচ্ছে খরা কিছু ভালোবাসা দাও’।

লাকি আখান্দের ক্লাসিক হিট ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। শ্রোতাদের ভালোবাসাই ছিল তার বহিঃপ্রকাশ। ২০০০ সালের পর বের করেন আরেকটি মিশ্র এলবাম ‘তোমার অরণ্যের সুর’। এতে লাকি আখান্দের গাওয়া ৩টি গানসহ সাথে ছিল বাপ্পা মজুমদার, ফাহমিদা নবী এবং নিপুর কন্ঠের ১০ টি গান। তিনি এই এলবামে সমকালীন তাল, লোকগানের তাল ও তার প্রিয় স্পেনীয় গানের তাল ব্যবহার করেন।

এই সঙ্গীতজগতের মহান কিংবদন্তী, যিনি বাংলাদেশের সঙ্গীতকে করেছেন তাঁর কাছে ঋণী, পেয়েছেন অনেক সম্মাননা। ১৯৬৯ সালে লাকি আখান্দ পাকিস্তানি আর্ট কাউন্সিল হতে “বাংলা আধুনিক গান” বিভাগে পদক লাভ করেন।

তাঁর নিজের সুর করা গানের সংখ্যা তাঁর কথায় দেড় হাজারেরও বেশি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বেতার এর পরিচালক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন। তারচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।

তিনি সফট মেলোডি, মেলো-রক, হার্ড রক এবং আধুনিক অনেক গানের কম্পোজিশন সুর দিয়েছেন এবং নিজে গেয়েছেনও। বলতে গেলে বাংলার সঙ্গীতের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান সগৌরবে বিরাজমান। এছাড়াও তিনি “হ্যাপী টাচ” এর সহযোগী শিল্পী ছিলেন।

মহান এই কিংবদন্তীর সঙ্গীত জীবনের কিছু এলবাম এবং উল্লেখযোগ্য গানের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:

  • লাকী আখান্দ (১৯৮৪)
  • পরিচয় কবে হবে (১৯৯৮)
  • বিতৃষ্ণা জীবন আমার (১৯৯৮)
  • আনন্দ চোখ (১৯৯৯)
লাকী আখান্দ নিয়ন আলোয় neon aloy

লাকী আখান্দের কিছু এলবাম

  • আমায় ডেকোনা (১৯৯৯)
  • দেখা হবে বন্ধু(১৯৯৯)
  • তোমার অরণ্যে

“আমায় ডেকোনা, ফেরানো যাবেনা, ফেরারি পাখি কুলায় ফেরে না” – নিজের গানের সুর ধরেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রখ্যাত এই লাকী আখান্দ। তিনি তাঁর গানে বলেছিলেন, ‘বিবাগী এ মন নিয়ে জন্ম আমার, যায় না বাঁধা আমাকে কোনো কিছুর টানের মায়া’।  সত্যিই তাই হলো, কোনো কিছুর মায়াই তাঁকে রাখতে পারেনি এই পৃথিবীতে।

দীর্ঘদীন ধরে ফুসফুসে ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে কোটি ভক্তের টানের মায়ায় হেরে গেলেন এই কিংবদন্তী। ৬১ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছাড়লেন লাকী আখান্দ।

২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপতালে (মিটফোর্ড) শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন লাকী আখান্দ। আমরা হারিয়েছি অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন সঙ্গীতশিল্পীকে। মুক্তিযোদ্ধা এই শিল্পীর জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর তহবিল থেকে সহায়তা করেছিলেন। ব্যাংককে গিয়ে অস্ত্রোপচারও করিয়েছিলেন, কিন্তু জগতের কোনো মায়াই তাঁকে আর আটকে রাখতে পারলো না।

লাকী আখান্দ নিয়ন আলোয় neon aloy

গিটার হাতে হাসপাতালের বেডে লাকী আখান্দ

মারা যাবার আগেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে হাতে গিটার নিয়ে ‘যেখানে সীমান্ত আমার‘ গানটি গেয়েছিলেন। আর গাইবেনই তো, সঙ্গীতই মিশে ছিলো তার শিরা উপশিরায়।

লাকী আখান্দের সুর করা, তার লেখা, প্রতিটি গানই যেকোনো মানুষকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। তাঁর গানের কথার উপর সুরের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। লাকী আখান্দকে সুরের বরপুত্র আখ্যায়িত করলে ভুল হবে না। সঙ্গীতের যে কোনো জনরাতেই তিনি হাত দিয়েছেন সবগুলোই হয়ে উঠেছিল একেকটা মাস্টারপিস। বাদ্যসন্ত্র ছাড়াও মুক্তকন্ঠে তিনি গাইতে পারতেন অসম্ভব সুন্দর গান। বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে একজন লাকী আখান্দের অবদান আবিস্মরণীয়। লাকী আখান্দ ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন প্রতিটি শিল্পীর, প্রতিটি সাধারণ মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

তথ্যসূত্র:

১. Bangladesh legendary singer Lucky Akhand no more

২. Lucky Akhand on Gaanalap tonight

Most Popular

To Top