নাগরিক কথা

তাহলে আজকেই কি জীবনের শেষ দিন?

বাইক এক্সিডেন্ট নিয়ন আলোয় neon aloy

রাইসুল আবেদীন আনন্দঃ

শখের বাইকটা প্রতিমাসেই কোনো না কোনো মডিফিকেশন করাই। মাঝে মধ্যে হাতে টাকা না থাকলে এলাকার ক্লোজ ফ্রেন্ডরাই করে দেয়। কারণ ওরা জানে যেটা মাথায় এসেছে, সেটা না করতে পারলে রাতে আমার ঘুম হবে না।

একবার একজন কাছের মানুষকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। পথিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হওয়াতে রাস্তায় পার্ক করে এক ছাউনিতে দাঁড়ালাম। ৫ মিনিট পরে সে আমাকে বললো, “আপনি লাস্ট ৫ মিনিট ধরে বাইকটার দিকেই তাকিয়ে আছেন।”

আমি তাকে কিভাবে বুঝাই যে, একদিকে যেমন বাইকটা বৃষ্টিতে ভিজছে সেটাতে খারাপ লাগছে, আবার পানিতে বাইকটা ধুয়ে গিয়ে ব্ল্যাক কালারের উপর ফ্লুরোসেন্ট ইয়েলো কালারটা যেভাবে চকচক করছে, সেটা আমার কাছে কতটা চোখ ধাঁধাঁনো!

বাইকটা যে কি পরিমাণ ভালবাসি, সেটা টের পেয়েছিলাম ২য় এক্সিডেন্টের সময়। প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ডান পা থেতলে গেলো। রক্ত বের হচ্ছে, মাথা ঘুরাচ্ছে। কিন্তু আমি বাইকের গ্রিপ লুজ করিনি। বাম পা দিয়ে ঠুকরাতে ঠুকরাতে ঠিকই রাস্তার পাশে পার্ক করে মাটিতে বসে পড়েছি। সার্জেন্ট বললো পাশের ফার্মেসীতে গিয়ে ফার্স্ট এইড নিতে। কিন্তু, ঐখানে বাইক সেইফ না দেখে আমি ২ মিনিট রেস্ট নিয়ে ঐ অবস্থাতেই বাইক চালিয়ে এলাকায় এসে ব্যান্ডেজ করিয়েছি।

বয়হুড ফ্যাসিনেশন হয়তো এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি, এরজন্যই এই অবস্থা। অথবা, ছেলেদের কাছে বাইক ব্যাপারটাই হয়তো একটা ডিফারেন্ট লেভেল। ভুলও হতে পারি। তবে বেশিরভাগ ছেলেকেই আমি একটা ভালো বাইক দেখার পর “ওফফফফফ” বলতে দেখেছি।

যাই হোক, আজ আসলে বাইক নিয়ে না, বরং বাইক এক্সিডেন্ট নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।

হয়তো আগে কম খোঁজ পেতাম। কিন্তু ইদানিং ব্যাপারটা খুব চোখে লাগছে। এবার ঈদে তো রাস্তার মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল, জাস্ট টু চেক সেইফ ড্রাইভিং। এত অল্প সময়ে এত এক্সিডেন্ট!! সব দোষ বাইকারের??

আমার আগের ২ টা এক্সিডেন্টের পর একটা কনফিডেন্স এসেছিলো। ওকে, ইঞ্জুরড হবো, তবে মরবোনা ইনশা আল্লাহ্‌।

কিন্তু, কয়দিন আগে ফ্লাইওভারে যা হলো, এখন প্রতিদিন বের হবার সময় পুরাপুরি মাইন্ড সেট আপ থাকে, আজকেই হয়তো আমার লাস্ট দিন। আমার বাইকের সাথে আরেক বাইকের সংঘর্ষ!!

আমি আসলে এখনো জানিনা সেইদিন আমার বাইকটার হেডলাইট ভেঙ্গে ঝুলে যাবার পরেও আমি কেন বাইক থেকে পড়ি নাই?? বা কেন বাইকটা পড়ে নাই?? আর কেনই বা সেখানে ২/৩ টা বাস ৫ সেকেন্ড পরে ক্রস করে গেলো?? আর কেন বা কিভাবেই আমি বেঁচে গেলাম??

কিছুদিন আগে ছোটবেলার এক স্কুল ফ্রেন্ডের সাথে দেখা। কিছুক্ষণ আলাপের পর সে যাবার আগে বললো “দোস্ত, তোরে একটা রিকোয়েস্ট করি, রাখতেই হবে। আমি শুনসি তুই রাফ চালাস। প্লিজ একটু আস্তে চালাইস। আর জোরে চালাইলে আমার অনুরোধটা একটু মনে রাখিস”

আসলে এগুলা আমাকে মানুষ বলতেই থাকে। ভুলে যাই। তবে ঐদিন রাস্তায় বের হবার পর ফ্লাইওভারে উঠার কয়েক সেকেন্ডের মাথায়ই প্রতিবারের মত ১০০+ করার পর পরই মাথায় বন্ধুর কথা ভাসছিলো। ভাবলাম, আজকে বললো বন্ধু। থাক, আজকে কথাটা শুনি। কমিয়ে ৬০ এ নিয়ে আসলাম।

একা থাকলে যেভাবে চালাই, বাসা থেকে বের হবার সময় যে আল্লাহ’র কাছে চাইবো, যে আল্লাহ্‌ বাচায়ে দিয়ো আজকে- সেটাতেও লজ্জা লাগে। আমি এখন বাইরে থাকা অবস্থায় আমার ফোন অফ থাকলে আব্বু ধরেই নেয়, আমার হায়াত শেষ!

কদিন আগে পাঠাও প্যাসেঞ্জারের দুর্ঘটনাটায় দেখলাম বাইক TVS-এর। আর সাধারণত যারা এসব বাইক চালায়, তারা খুব সেইফলি চালায়। কিন্তু এটা কি হলো?! এখানে দোষ কার? সব দোষ বাইকারের?? ভাইরে, বাস-প্রাইভেট কারগুলো যেভাবে প্রেসিং করে সেগুলা একটু খেয়াল করলেই বুঝা যায়।

লেখাগুলো কতটা লেইম লাগছে জানিনা। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে এত নিউজ পাচ্ছি। সেদিন একটা লাইভ ভিডিও দেখলাম। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে একটা বাইকারের লাশ সিএনজিতে উঠাচ্ছে।

পাঠাও প্যাসেঞ্জার লোকটার পরিচয় জেনে আরো খারাপ লাগলো। ৩২ বছর বয়স মাত্র। একজন সিনিয়র অফিসার। নিশ্চয়ই তার উপর অনেকে ডিপেন্ডেন্ট। দোষ তো তার, কিংবা বাইকারের কারোই ছিলো না।

এসব দেখলে বা শুনলে কোন বাইকারের মাথা ঠিক থাকে??

এর জন্য বাধ্য হয়ে লিখলাম। আর নিতে পারছিলাম না। কিছু হলেই, একটা কথা “প্লিজ সাবধানে চালাইস”। এখন পর্যন্ত ৩ টা এক্সিডেন্ট করেছি। ১ম বার রক্ত দিতে গিয়ে তাড়াহুড়ায় ছিলাম। কিন্তু, বাকি ২ বার আমার কোনো দোষই ছিলো না। তাহলে…??

এক মাসও হয়নি যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারে আরেকটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল। আমার স্কুলের ম্যামের হাসবেন্ড মারা গেলেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার, ২ দিন আগে তাদের একটা বেবি হয়। সেই নবজাতককে দেখতেই তিনি হাসপাতালে যাচ্ছিলেন।

এমন না যে, খুব সচেতন এক দেশপ্রেমিক হয়ে গেছি।
আবারো, এমনও না যে, নিজের কথাই ভাবছি শুধু।

কিন্তু, আমারও তো ভাই-বোন, বন্ধু আছে যাদের মধ্যে কেউ হয়তো নতুন চাকরি পেয়েছে অনেক চেষ্টার পর, কারো হয়তো নতুন বিয়ে হয়েছে, কারো হয়তো ঘরে একটা ফুটফুটে বেবি এসেছে। এই মানুষগুলো আমার জানামতে প্রায় প্রতিদিনই পাঠাও ইউজ করছে সময় বাঁচানোর জন্য।

আমিও কি সবার মতো ওদের বলবো, “সাবধানে থাকিস। হেলমেট পড়ে নিস।” কিন্তু বাসের চাকাটা যদি হেলমেটের উপর দিয়ে চলে যায়, তাহলে?? গত বছরের ইদেই এলাকার এক ছোট ভাই এক্সিডেন্ট করেছিলো মাওয়া রোডে। বাসের চাকার রিমের সাথে ধাক্কা খেয়ে হেলমেট ভেঙ্গে মাথার খুলির ভিতর ঢুকে গিয়েছিল!

তাহলে, কাকে বলবো?? আল্লাহ ছাড়া তো আর কাউকেই দেখি না।

এখন যখন বাইকটা মডিফাই করে বংশাল থেকে বের হই। মাথায় ঘুরতে থাকে, “এই শখের মডিফিকেশন তো একটা ভালোমতো ধাক্কা খেলেই শেষ। সাথে হয়তো আমিও।”

এখন রাস্তায় একা বের হলে, স্পিড তুলি ঠিকই। তবে সেটা রোড ফ্যান্টাসির জন্য না। বলা যায় অভ্যাস থেকেই। তবে যতই সেইফ, যতই রাফ চালাই, মাথায় ঠিকই ঘুরতে থাকে…

“This might be the last ride of my life…”

আল্লাহ সবাইকে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করুন…

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top