নাগরিক কথা

হোলি আর্টিজানঃ দায়সারা শোক প্রকাশই কি সবকিছুর সমাধান?

হোলি আর্টিজান নিয়ন আলোয় neon aloy

২০১৬ সালের জুলাই মাসের কথা, শুক্রবার বাইরে থেকে রুমে এসে সবেমাত্র মোবাইলের ইন্টারনেট কানেকশনটা অন করেছি। ফেসবুক স্ক্রল করতেই সবখানে শুধু হোলি আর্টিজান আর জঙ্গী হামলার সংবাদ দেখতে পেলাম।

আমি থাকি ঢাকা থেকে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দূরত্বে, তারপরেও মায়ের মন বলে কথা, আমাকে ফোন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার নির্দেশ দেন বারবার, পরদিন সকালেও কোথাও না যেতে বলেন।

আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কি হচ্ছে আমার এই বাংলাদেশে?

রমজান মাস, তার উপর ছিল শুক্রবার। তাই হলের অনেক ছাত্রীই বাসায় চলে গিয়েছিল। আমরা যারা কয়েকজন ছিলাম তারা হলের টিভি সেটের সামনে বসে ছিলাম অনেকরাত পর্যন্ত, দেখে যাচ্ছিলাম লাইভ সম্প্রচার আর আনুষাঙ্গিক সবকিছুই। আমার এখনো মনে পড়ে যে আমরা সেদিন চাপা স্বরে কথা বলছিলাম সবাই, যেন উচ্চস্বরে কথা বললেই আমাদের বিপদ ঘটে যাবে। নিস্তব্ধতার মাঝেও যে কি বেদনা লুকিয়ে থাকে এর প্রমাণ পেয়েছিলাম সেদিন।

দেশের সব মানুষ সেদিন হয়তোবা সেহরি খেতে গিয়েও ভাবছিল হোলি আর্টিজানে বন্দীদের কথা, তাদের সেসময়কার অবস্থার কথা, ফজরের নামাজে বসে দোয়াও করেছিল হয়তোবা তাদের সুস্থভাবে মুক্তির জন্য।

আমার মত আবেগপ্রবণ অনেকেই নিশ্চয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোর পত্রিকাজোড়া সাফল্য দেখে ভাবেন যে, আহা! আমার বাংলাদেশটাকে নিয়েও যদি সবাই এমন মাতামাতি করত!

আমাদের সেই আশা পূরণ হয়েছে,বাংলাদেশকে নিয়ে সবাই মাতামাতি করেছে, এর বেশি আর কি চাই?

প্রায় বারো ঘন্টা আমার প্রিয় মাতৃভূমি ছিল সারাবিশ্বের প্রায় সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে। অনেক আনন্দের খবর আমাদের জন্য, তাই না?

তালি হবে ফ্রান্স! তালি হবে!

হোলি আর্টিজান নিয়ন আলোয় neon aloy

কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমার দেশ সারাবিশ্বের নজর কেড়েছে এমন এক ঘটনা দিয়ে যার লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসবে যেকোনো সুস্থ বাংলাদেশীর।

সেই বারো ঘন্টা ভিতরে আটক প্রত্যেকটা বিদেশী নাগরিকের স্বজনরা নিশ্চয় মাথা নিচু করে প্রার্থনা করেছে আর মনে মনে আফসোস করেছে কেন আমার প্রিয় মানুষটা বাংলাদেশে গেল, আমার পাশে থাকলে হয়তোবা এখনো বেঁচে থাকত। সেই ভয়ানক রাতের প্রতিটা মুহুর্ত অভিশাপ দিয়েছে বাংলাদেশকে, হয়তো এখনো দিচ্ছে!

আর বাংলাদেশী যারা জিম্মি হয়ে ছিলেন সেই রেস্তোরাঁয়, তাদের আত্মীয় স্বজনদের মনের মধ্যে কি চলছিল সেটা আমি কল্পনাও করতে পারিনা।একই দেশের একই আলো-হাওয়াতে বড় হওয়া মানুষ যে কিভাবে একজন আরেকজনের জীবন নিয়ে নিতে পারে তা সত্যিই আমার বোধগম্য হয়না।

হোলি আর্টিজান নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে এই মানুষগুলো সারারাত দাঁড়িয়ে ছিলেন হোলি আর্টিজানের সামনে, স্বজনদের সন্ধানে…

হোলি আর্টিজান নিয়ন আলোয় neon aloy

আর তার ক’দিন পরই অশ্রুসজল চোখে স্বজনের লাশ কাঁধে তুলতে হয়েছে এই মানুষগুলোকেই। নিজেকে এদের জায়গায় কল্পনা করুন তো একবার!

অনেক কষ্টের আর অপেক্ষার প্রহর গুণে অবশেষে সমাপ্ত হল জিম্মিদের উদ্ধার করার অভিযান। কিন্তু লাশ হয়ে ফেরত এলেন সতেরজন মানুষ, সাথে তাদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া দুজন পুলিশ।

এরপরে আমরা পুরো জাতি কোথায় হাতে হাত মিলিয়ে এই জঙ্গীবাদ কিংবা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব তা না, আমরা নানা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে গেলাম আর বিভিন্নভাবে একে অন্যের প্রতি কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করতে লাগলাম!

আবার তালি হবে ফ্রান্স!

রেস্তোরাঁয় খেতে আসা নিহত বিদেশীদের পোশাক-আশাকের চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধার করলাম, ফারাজ জংগী নাকি জংগী না সেটা নিয়েও যুদ্ধ করলাম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি নিয়েও মাথা ঘামালাম কিছুক্ষণ।

এরপরে?

এরপরে আমরা সবাই ডুবে গেলাম আমাদের নিজস্ব বলয়ে। নিত্যদিনের যানজট, ফেসবুক, ভাইরাল ভিডিও, প্রেম-ঝগড়া আর পরশ্রীকাতরতার বেড়াজালে।

হোলি আর্টিজান নিয়ন আলোয় neon aloy

নরক থেকে নেমে আসা কিছু কীট

এতবড় একটা হামলার তদন্ত কি ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, কিংবা এমন ঘটনা ভবিষ্যতে কিভাবে এড়ানো যায় এসব নিয়ে আমাদের কিছুতেই কিছু যায় আসেনা!

নব্বইয়ের শেষভাগে উদিচী-তে বোমা হামলা থেকে জঙ্গীবাদের যে নতুন ধারা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে, তার শেষ কোথায় আমি জানিনা। এর মাঝখানে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সফরে সিলেটে হামলার ঘটনা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে হামলা, আর ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা দিয়ে শুরু করে দেশব্যাপী আরো বেশ কয়েকটি বোমা হামলা- কত কিছুই না হয়ে গেলো।

কিন্তু এর কোনো স্থায়ী প্রতিকার কি পেলাম আমরা?

হাতে গোণা কয়েকজন “জঙ্গী” ধরা পড়ে আর তারা কয়েকদিন পরেই কিভাবে কিভাবে যেন জামিন পেয়ে যায়।

আজকের বাংলাদেশী পত্রিকার (এই লেখাটি বেশ কয়েকদিন আগে লেখা) অনেক অনলাইন সংস্করণেও আমি দেখেছি যে আমাদের প্রাক্তন একজন প্রধানমন্ত্রী তার জামিন হতে এত কেন দেরি হচ্ছে সেটা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

যেখানে উনার মত এত ক্ষমতাধর ব্যক্তির জামিন হতে এত দেরি হয়, সেখানে এই “জঙ্গী”রা কিভাবে এত সহজে ছাড়া পেয়ে যায় আমি বুঝিনা।

শুধু কয়েকজন “বাংলা ভাই” কিংবা “মুফতি হান্নান”কে ফাঁসি দিলেই কি সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়?

আমার জানামতে “বাংলা ভাই” উচ্চশিক্ষিত লোক ছিলেন। এমন লোককে কিভাবে ব্রেনওয়াশ করা হল কিংবা কারা ব্রেনওয়াশ করল- এসব তথ্য উদঘাটন না করেই রিমান্ডে নেওয়া হয় আসামীদের আর সে রিমান্ডে তথ্য উদঘাটনের আগেই হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে তারা মারা যায় কিংবা “ক্রসফায়ার” তাদের কারো কারো মৃত্যুর খবর পেয়ে যাই আমরা।

কি আজব ঘটনা!!

হোলি আর্টিজান নিয়ন আলোয় neon aloy

উদ্ধার অভিযান শেষে লন্ডভন্ড হোলি আর্টিজান

আর এদিকে আরেকদল আছেন, যাদের একমাত্র বক্তব্য হচ্ছে এসব সবকিছুই পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র,পশ্চিমারা এদেশ দখল করে নেওয়ার জন্যই এমন কার্যকলাপ চালাচ্ছেন।

আপনার যদি এমন মনে হয় তাহলে আমার কোনো সমস্যা নেই, কারণ আপনার মতের সাথে আমার মত মিলল না বলে আমি আপনাকে কোপ মারতে যাব- এতটা অসহনশীল আমি নই।

আমার কথা হচ্ছে, আপনি যেহেতু জানেনই এসব পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র- তাহলে আপনি কেন এতে যুক্ত হচ্ছেন? কোনো সাদা চামড়ার বিদেশী এসে তো এসব কান্ড করে যাচ্ছেনা, যারা এসব কান্ড করছে তাদের প্রত্যেকেই তো বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বহন করছে। শুধু যে কাগজে-কলমে নাগরিকত্ব, তা না; একেবারে ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছে এই দেশে, তাই না?

যদি এমন হতো যে হলিউড-বলিউডের মুভি’র মত সুদূর আমেরিকা থেকে কোনো স্পাই এসে এসব “জঙ্গী” কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে তাহলে নাহয় কথা ছিলো।

আপনি যেহেতু জানেনই যে এগুলো সব ষড়যন্ত্র, তাহলে নিজেকে দূর করে রাখুন এসব থেকে, সরিয়ে আনুন ব্রেনওয়াশের ভুল রাস্তা থেকে! তা না করে আপনি ইনিয়ে-বিনিয়ে আপনারা সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন জঙ্গীদের, ডিফেন্ড করছেন তাদের কার্যকলাপ। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে সব পশ্চিমা ষড়যন্ত্র, তাহলেও কি আপনাদের এই ডিফেন্স মেকানিজম আখেরে সেই ষড়যন্ত্রের পালেই আরো হাওয়া দিচ্ছে না?

মুসলিম দেশ পৃথিবীতে আরো অনেক আছে, এবং এরা প্রায় সবাই বাংলাদেশ থেকে অনেক উন্নত। সেসব দেশে বিভিন্ন প্রয়োজনে অনেক ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বসবাস করেন। অনেক সময় টার্গেটেড হামলা সেসব দেশেও হয়। কিন্তু যেটা কখনো হয় না সেটা হলো একটি হামলার পর হামলাকারীদের সাফাই গেয়ে সেসব দেশের বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী সন্ত্রাসবাদের পাশে দাঁড়ায় না। তারা অন্তত এটুকু বুঝে যে আজকে যে হামলা অন্যের উপর হয়েছে, আগামীকাল সেটা আমার উপরও হতে পারে! তাই এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে সবাই মিলে। রাজনীতিবিদরা যে একেকটা ঘটনাকে ইস্যু করে কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি করেন না, তা না। কিন্তু একটি দেশের সাধারণ মানুষদেরই দায়িত্ব দল-মত-ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে এই জঙ্গীবাদ সমস্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, রাজনীতিবিদদের বাধ্য করা সঠিক পদক্ষেপ নিতে। মুসলমান মানেই জঙ্গী নয়, কিন্তু আমাদের নীরবতা কিংবা পরোক্ষ সমর্থনই আমাদের গায়ে জঙ্গী’র লেবেল লাগিয়ে যায়।

হোলি আর্টিজান হামলা কিংবা অন্যান্য বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে পৃথিবীর বুকে কতটুকু “উজ্জ্বল” (!) হয়েছে সেটা আর নতুন করে বললাম না, মাথায় সামান্যতম ঘিলু থাকলেই সেটা আন্দাজ করা যায়।

যখন কোনো উন্নত দেশে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশী কেউ দূতাবাসে ভিসার আবেদন করতে যায়, তখনই বোঝা যায় যে মনের মধ্যে উৎকণ্ঠা কতটুকু হয়।

একে তো আমরা বিদেশী অনুদান নির্ভর জাতি, এর উপরে আবার আমাদের বেশিরভাগ আয় আসে রপ্তানির মাধ্যমে। এমন হামলা হলে এ সবকিছু বন্ধ হতে আর বেশিদিন বাকি নেই।

আমার নিজের এলাকায় জাইকা’র অর্থায়নে যে বিভিন্ন প্রকল্প চলছিল, সেখানে কাজ করা বাংলাদেশী অনেকের কাছেই আমি শুনেছি যে হোলি আর্টিজান হামলায় সাত জাপানি নাগরিকের মৃত্যুতে নিরাপত্তাজনিত কারণে যদি এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায় তবে সেসব প্রকল্পে কাজ করা বাংলাদেশীদের হাঁড়ির হাল কি হবে।

যখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেয়, কিংবা ভারতের কোনো এলাকায় সাম্প্রদায়িক কোন ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশের সব হিন্দুদের ভারতে পাঠিয়ে দিবে বলে হুমকি দেয় তখন আমার সত্যি সত্যিই চিন্তা হয়।

চিন্তা হয় এ কারণে যে, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে যেসব দেশের নাগরিকরা বিভিন্ন জঙ্গী হামলায় মারা গিয়েছে তারা যদি বাংলাদেশীদের এই তাড়িয়ে দাও নীতি অনুসরণ করে তাদের দেশ থেকে সব বাংলাদেশীদের তাড়িয়ে দেয়, তাহলে কি হবে?

তখন কেমন লাগবে বাংলাদেশীদের?

দুঃখের চেয়ে বরং লজ্জার বিষয় এই যে হোলি আর্টিজান হামলার প্রায় দুই বছর হতে চলল, কিন্তু এই হামলাসহ আরো অন্যান্য হামলার তদন্তের বিষয়ে কোন সন্তোষজনক অগ্রগতি চোখে পড়ল না। আর প্রহসনের মত হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে পনের হাজার ইউরো করে দেওয়া হচ্ছে।

মামলার সঠিক তদন্ত না হয়ে নিকটজনের মৃত্যুর বিনিময়ে এই পনের হাজার ইউরো যে কি পরিমাণ মূল্যহীন তা বোঝানোর জন্যই মনে হয় অধিকাংশ স্বজনই আসেননি এই রক্তের দাগ মাখা টাকাগুলো নিতে। লঞ্চডুবি’তে নিহতদের পরিবারকে দুইটি করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ধরিয়ে দেওয়ার যে সরকারী নীতি আমাদের ছিল (এখন আছে কিনা জানা নাই), সেই পলিসিতে হয়তো আমাদের দেশের সহজ-সরল গরীব মানুষগুলোর জীবন কিনে নেওয়া যায়, সরকারী অবহেলার অভিযোগ চাপা দেওয়া যায়। কিন্তু যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে এই টাকা কিংবা ছাগলের দামে কারো জীবনের দাম চুকানো যে খুব বাজে রকমের রসিকতা ছাড়া আর কিছু না- সেটা অন্তত ওই বিদেশী মানুষগুলোর পরিবার বুঝেছেন। জমা থাকুক এই টাকাগুলো এদেশের বিবেকহীনদের তহবিলে, আর ধূলিচাপা পড়ে যাক বাংলাদেশের মানসম্মান এই হামলাগুলোর ধুলোমলিন ফাইলের স্তুপে।

ইতালি, জাপান এসব দেশগুলো আমাদের দেশে অনুদান প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। অন্যদের কথা আমি জানিনা, আমার জাপানী সুপারভাইজার প্রতিবছর ওয়ার্ল্ড ভিশন আর ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুইলাখ টাকা অনুদান পাঠান যেন বাংলাদেশের গরিব শিশুরা পড়ালেখা করতে পারে।

সুপারভাইজারকে আমার নিজের বাড়ির ছবি, গ্রামের ছবি দেখিয়েছিলাম। উনি হেসে বলেছিলেন যে তোমার দেশে যাওয়ার জন্য আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছে, নিয়ে যাবে আমাকে? আমি যদিও মুখে বলি অবশ্যই নিয়ে যাব আপনাকে, কিন্তু মনে মনে বলি কখনোই আপনাকে নিয়ে যাব না।

আমার ভয় হয় জাপানী সুপারভাইজারকে আমার দেশে নিয়ে আসতে, কারণ উনার পাঠানো টাকায় পড়ালেখা করে যে শিশু বড় হবে, সে-ই হয়তোবা ধর্মান্ধতার ফাঁদে পড়ে বেহেশতের আশায় উনাকে কাফের হিসেবে মেরে ফেলতে দ্বিধাবোধ করবেনা এক মুহুর্তের জন্যেও!

আমি যে এই লেখা লিখছি সেই লেখাটাই হয়তোবা শেয়ার করা হবে এমন কোনো পেজে যেখানে আমাকেও কাফের এবং মুরতাদ ঘোষণা করা হবে, আর সেখানে সায় দেবে কয়েক হাজার কিংবা কয়েক লক্ষ বাংলাদেশী!

এই লেখাটি জাপানে বসে লিখছি। ভাগ্যিস আমি জুলাই মাসের এক তারিখ জাপানে থাকবনা, নাহয় সেদিন যখন হোলি আর্টিজানে নিহত সাতজন নিরপরাধ জাপানীর স্মরণে সবাই শোকপালন করবে সেদিন আমি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে মুখ লুকানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারতাম না।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদরা হয়তোবা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছেন এই ভেবে যে এজন্যই কি তাঁরা দেশ স্বাধীন করেছিলেন?

[নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত লেখক নিজের পরিচয় প্রকাশে অনীহা জানিয়েছেন]

Most Popular

To Top