নাগরিক কথা

বিশ্বকাপ ফুটবল, আর বাংলাদেশ

বিশ্বকাপ ফুটবল আর বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এক অদ্ভুত দেশ। অদ্ভুত বলতে যেনতেন অদ্ভুত না; র‍্যাংকিং-এ একদম প্রথম কাতারে থাকার মতো অদ্ভুত দেশ। আর এই দেশের লোকজন ও ততোধিক অদ্ভুত! ২০ কোটির বেশী জনগণ নিয়ে বিশ্বের খেলাধুলার দরবারে শুধুমাত্র ক্রিকেট ছাড়া, আর কোন খেলাধুলাতে আমরা আজ আর কোথাও নেই, কিছুতেই নেই।

অথচ এই শতাব্দীর গোড়ার দিকেও আমরা সারা বিশ্বের দরবারে না হলেও অন্তত সাফ, সার্ক আর এশিয়ান গেমস গুলোতে- এথলেটিক্স, শুটিং, কাবাডি আর ফুটবলে প্রতিপক্ষের সাথে ভালো প্রতিযোগিতা করার অবস্থানে ছিলাম। তারও আগে কমনওয়েলথ গেমস থেকে পদক নিয়ে ফেরার রেকর্ডও আমাদের আছে। একসময় আমাদের মুঠোয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানব-মানবীর খেতাব। আতিক, সাত্তার, নিনি, শাহানা, আসিফদের মতো শুট্যারদের এক সময় আমরা পেয়েছিলাম। জোবেদা লিনু, রাণী হামিদ, নিয়াজ মোর্শেদদের মতো দক্ষিণ এশিয় সেরা ক্রীড়াবিদেরা এক সময় প্রতিনিয়তই আমাদের আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতা করার পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা করেছেন।

একসময় আবাহনী-মোহামেডান খেলা আমাদেরকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলার চেয়েও বেশী উত্তপ্ত করে রাখতো। মুন্না, সাব্বির, আসলাম, কায়সার হামিদ, আলফাজ, রুপু, সালাহউদ্দিন, আরমানদের মতো ফুটবলাররা আমাদের অন্তত দক্ষিণ এশিয়া সেরাদের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন এক সময়।

এগুলো খুব বেশী দিন আগের কথা নয়, উপরে যাদের নাম বললাম একমাত্র মুন্না ছাড়া এদের সকলেই এখনো বেশ সুস্থ-সবল ভাবে বেঁচে আছেন। কিন্তু মরে গেছে আমাদের ক্রীড়াঙ্গন।

এত সুন্দর আর উপযুক্ত ভিত্তি পেয়ে যেখানে আমাদের সাফল্যের রেখা হওয়ার কথা ছিল উর্ধমুখী, সেখানে অদ্ভুতভাবে মাত্র কয়েক বছরেই কেবল মাত্র ক্রিকেট ছাড়া বাকী সব খেলাধুলাই আমাদের জাতীয় জীবন থেকে একদম প্রায় হারিয়ে গিয়েছে কিন্তু এ নিয়ে আমাদের যেন কারো মাথাব্যথাই নেই। কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না?

আমরাই ট্র‍্যাক এন্ড ফিল্ড থেকে সরিয়ে দিয়েছি আমাদের সেরা খেলোয়াড়দের, কাউকে পুলিশ দিয়ে মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছি, অথবা রাজনৈতিক প্রভাবে দেশের ক্রীড়াবিদদের চেয়ে আমরা সুযোগ করে দিয়েছি ” অর্থনীতিবিদ”দের। আর না হলে সর্বশেষ হাতিয়ার হিসাবে নিজ হস্তে রচিত ধর্মের ফতোয়া তো আছেই।

বিগত দুই দশকে আমাদের ক্রীড়াবিদ বানানোর কারখানাগুলো খেলোয়াড়ের চেয়ে চোর উৎপাদন করেছে বেশী। সর্বোচ্চ পদ থেকে শুরু সর্ব নিম্নস্তর পর্যন্ত আমরা শুধু চোরই উৎপাদন করে এসেছি ভুড়ি ভুড়ি।

যখনই কোন খেলা নিয়ে বিশ্বজোড়া মানুষের মিলনমেলা হয়, আমরা ২০ কোটি মানুষ অতি উৎসাহে, আমাদের আবেগের বাটি উজাড় করে আমরা মিশে যাই তার সাথে; তবে সেই মিশে যাওয়া কেবলই দর্শক আর সমর্থক হিসাবে। সেটা কমনওয়েলথ গেমসই হোক অথবা অলিম্পিক গেমসই হোক অথবা ফুটবল বিশ্বকাপই হোক। এই নিয়ে, আমরা ২০ কোটি মানুষের প্রত্যেকেই খুব নিঃশব্দে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলি, সেই দীর্ঘশ্বাস এতটাই নিঃশব্দে ফেলি যাতে নিজেরাই তার শব্দ শুনতে না পাই। যেহেতু ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে, তাই ফুটবলের কথাই বলি।

সেই নিজে না শোনা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মেলানোর আগেই আমরা সমগ্র সত্ত্বা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি, কোন না কোন দেশকে-দলকে সাপোর্ট করতে। মায়ের চেয়ে আমরা মাসীরা দরদের সাপোর্টের মহাসাগর নিয়ে হাজির হই। অন্য দেশকে সমর্থন জানানোতে কোন সমস্যা নেই কিন্তু আমরা যেমনতর করে সমর্থন করি, সমস্যা সেখানে।

আমরা আসলে নিজের দলের সাপোর্টের চেয়ে উত্তাল হই বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়-সাপোর্টারসদের বিরোধীতা করতে, ট্রল করার নাম করে অদ্ভুত সব নোংরামি করাতে। ছাত্র-শিক্ষক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সুশীল-কুশীল সবাই ঘৃণার একই পাত্র থেকে নিজেকে বড় প্রকাশ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি।

অদ্ভুত এক জনগোষ্ঠী আমরা!

নিজেদের দল নিয়ে, নিজেদের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে সর্বোপরি নিজেদের দেশ নিয়ে আমাদের গোছানো কোন ভবিষ্যৎ ইচ্ছা নেই, পরিকল্পনা নেই, এগিয়ে যাওয়ার কোন ছাপ নেই কিন্তু আমরা অতি ব্যস্ত বিশ্বের কোন দল কতবার সাফল্যের শিখরে উঠলো, কোন দল কতবার ব্যর্থ হলো কাদের পরিকল্পনা ভালো- কাদের খারাপ সেই অযাচিত তর্কে।

একসময় এশিয়া ইউরোপের ক্লাব গুলো আসতো আমাদের ঘরের মাটিতে খেলতে আর আমরা এখন নিজেরাও নিজেদের মাটিতে খেলি না! জানা মতে বাংলাদেশ ফুটবল দল ৩ বছরের নিষেধাজ্ঞার কবলে আছে এখন। অথচ বাড়ীর কাছের জাপান মাত্র কয়েক বছরের পরিকল্পনায় এখন শুধু নিয়মিত বিশ্বকাপই খেলছ না, ইউরোপ-দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর সাথে সমানে টক্কর দিচ্ছে।

অনেকেই আমাদের শারীরিক গঠন, দম এগুলোর কথা বলেন, যে আমরা ইউরোপিয়ান- আফ্রিকান আর দক্ষিণ আমেরিকানদের তুলনায় পিছিয়ে আছি। সেটা হতে পারে একটা কারণ কিন্তু আমি নিশ্চিত দীর্ঘমেয়াদী কিছু ট্রেনিং-এ সেটা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। এমন তর আরো অনেক কারণ নিশ্চই আছে, কিন্তু সত্যিকারের ইচ্ছে থাকলে, সেগুলোর সমাধান সম্ভব। সমস্যা হচ্ছে আমাদের সত্যিকার ইচ্ছেটাই নেই।

আমরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইটালির পতাকা উড়িয়ে, ঝগড়া করে আর মাঝে মাঝে বিশ্বকাপে অন্য দলের জার্সি সেলাই করেই খুশী, বিশাল বিশাল তৃপ্তির ঢেকুর তুলি এদের কেউ কোন খেলায় জয়ী হলে। নিজেদের তাদের কাতারে দেখার মতো মানসিকতাই আমাদের কখনো ছিল না আর এখনো তৈরী হয়নি।

অবশ্য এই মানসিকতা তৈরী হতেও সময় লাগে, তবে তার জন্য প্রয়োজন সরকার বাহাদুরের প্রকৃত নির্লোভ সদিচ্ছার। একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সেই সময়কে অনেকগুলো টাইমফ্রেমে ভাগ করা যেতে পারে, সে অনুযায়ী টার্গেট ঠিক করে একদম রুট লেভেল থেকে খেলোয়াড় নিয়ে ট্রেনিং শুরু করা যেতে পারে দেশী-বিদেশী কোচ-ফিজিওদের মাধ্যমে। তার জন্য অন্তত বিভাগীয় শহরগুলোতে ট্রেনিং একাডেমী শুরু করা যেতে পারে, বাফুফের সরাসরি তত্বাবধানে, তবে এই ট্রেনিং একাডেমীগুলো “ঝিকরগাছা ফুটবল একাডেমী” মানের হলে চলবে না, এগুলো হতে হবে একদম আন্তর্জাতিক মানের- এক্ষেত্রে কোন আপোষ চলবে না।

শুধু এই ক্ষেত্রেই না, মান এর ক্ষেত্রে কোথাও আপোষ করা চলবে না, কারণ খেলোয়াড় থেকে দর্শক পর্যন্ত সবারই লক্ষ্য হতে হবে একটাই- যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে হবে।

জানি বলা যত সহজ করা তত টাই কঠিন। প্রথমেই আসবে টাকার ব্যাপার, তারপর দীর্ঘ দীর্ঘ সময় যাবে সব আনুষঙ্গিক সুবিধা তৈরী করতে, তারপর শুরু হবে প্রস্তুতি পর্ব। যদি এখনি শুরু করা হয় তবুও আমরা যারা এই লেখা পড়ছি তাদের অনেকেই, বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলা তো দুরের কথা, এসব প্রস্তুতির প্রায় কিছুই হয়তো দেখে যেতে পারবো না, তারপরও আমরা একটি কঠিন লক্ষ্যের পথে হাটতে শুরু করেছি সেটা তো জানতে পারবো। যাত্রা শুরুই করতে না পারলে তো লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রশ্নই উঠেনা।

সামনে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ছে, আর এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আমরা কেবল মাত্র অন্য দলগুলোর জার্সি সেলাই করে নয়, আমরা কি নিজ যোগ্যতায় আর ক্রীড়া নৈপুন্যে সত্যিই পারি না “দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ” এর অংশ হতে?

আসুক না একটা মেসি, নেইমার, মুলার, রোনালদো- আমাদের মধ্য থেকেই; জমি বিক্রি করে পতাকা বানিয়ে যদি নিঃস্ব হতেই হয়- তবে হোক না সেটা আমাদের নিজেদের পতাকা, কোন দলের বিজয়ে অথবা পরাজয়ে যদি কাঁদতেই হয়- হোক না সেটা আমাদের নিজেদের দল; কে ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ দল আর কে সবচেয়ে ভালো দল এই নিয়ে যদি নিজেদের মাঝেই তর্ক করতে হয়- তবে নিজেদের দল নিয়েই কেন নতুন করে ইতিহাস লেখা নয়? আর ইতিহাস গড়তে হলে- কাউকে না কাউকে তো একদিন শুরু করতেই হবে, তো সেই কাজ “শুভস্য শীঘ্রম”।

২০ কোটি মানুষের দেশ হয়ে আর কত যুগ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ইটালির সাপোর্টার হয়ে থাকবো? নেইমার, মেসি, রোনালদো, মুলারদের পেছনে গ্যালারীতে আর কতযুগ ছোট্ট এক টুকরো লাল সবুজের পতাকা খুঁজবো? আর কত যুগ Vai Brasil আর Vamos Argentina লিখে স্ট্যাটাস শেষ করবো? লজ্জা লাগে না কারো? আমার তো লাগে।

আমি চাই একদিন বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলুক, এই বিশাল জনগোষ্ঠী আমাদের সমস্যার পাহাড় না হয়ে আমাদের সম্পদ হয়ে উঠুক; আমি চাই সকল বাংলাদেশীরা এক সময় সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিকদের মতো বাংলাদেশীদের নাম লেখা জার্সি পড়ে ঘুরবে, আমি চাই গ্যালারীর পাশাপাশি বিশ্বকাপ মাঠে আমাদের লাল সবুজের বিশাল পতাকা উঠুক- জাতীয় সংগীত বাজবে আর দেশ বিদেশ থেকে টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে প্রতিটি বাংলাদেশী হাউমাউ করে কাঁদবে আর চিৎকার করে জাতীয় সংগীত গাইবে, আহা! আমি চাই একদিন প্রতিটি বাংলাদেশী বিশ্বকাপ নিয়ে কোন লেখা শেষ করলেই, তার শেষ বাক্য হবে “জয় বাংলা, ঠেলা সামলা”।

নিজের জীবদ্দশায় দেখতে পাবো বলে আশা করি নি, এমন কত কিছুই তো শুধু আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের সদিচ্ছার কারণে আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, আর বিশ্বের দরবারে নিজেদের তুলে ধরার এই ইচ্ছাটা কি খুব বেশী অযৌক্তিক?

কেউ কি আছেন আমাদের এই চাপা আর্তনাদ শোনার মতো, নাকি কোথাও কেউ নেই?

Most Popular

To Top