ক্ষমতা

আমাদের দেশে এরকম কিছু হলে কি ঘটতো সেই রেস্টুরেন্ট মালিকের কপালে?

ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারির বিরুদ্ধে এক রেস্টুরেন্টের সাহসী প্রতিবাদ;

প্রথমেই বলি, হোয়াইট হাউজ প্রেস সেক্রেটারি সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্সকে আমি ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করি। প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে তার কাজ হলো প্রেস কনফারেন্সগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেয়া। তিনি ব্যাপারটি খুব নিষ্ঠার সাথে করে থাকেন। তবে সেই নিষ্ঠাটি জনগণের প্রতিও নয়, গণমাধ্যমের প্রতিও নয়- সেই নিষ্ঠাটি তার প্রশাসনের প্রতি। আরো যথাযথভাবে বলতে গেলে, নিষ্ঠাটি তার নিজের প্রতি। তিনি দিনের পর দিন ট্রাম্পের কাজকর্মের মিথ্যা ব্যাখ্যা দেন, প্রমাণিত কাজগুলোকে অস্বীকার করেন, অনৈতিক অনেক কিছুকে সমর্থন করেন। বলতে গেলে তার নিজস্ব কোনো নৈতিকতার ভিত্তি-ই নেই। তার প্রশাসন যা করে, তাই-ই তার কাছে নৈতিক। এ ধরণের একজন মিথ্যুক এবং নীতিহীন মহিলাকে একজন নিরপেক্ষ পরদেশী মানুষ হিসেবে আমার-ই পছন্দ করার কোনো কারণ নেই, আর আমেরিকার সিংহভাগ মানুষ যে করবে না, তা তো বলাই বাহুল্য।

সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স

এখন আসি আমাদের আলোচ্য ঘটনাটিতে। লেক্সিংটন ভার্জিনিয়ার রেস্টুরেন্ট রেড হেনে সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স খেতে গিয়েছিলেন। তাকে দেখামাত্র রেস্টুরেন্টের স্টাফরা চিনতে পারলেন কে খেতে এসেছে তাদের রেস্টুরেন্টে, স্বয়ং প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি! সাথে তার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধব ধরণের কিছু মানুষ। কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন ওয়েটার এবং শেফরা তাদের প্রচন্ড অপছন্দের মানুষটিকে সার্ভিস দেওয়া ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে। পনিরের অ্যাপেটাইজার সার্ভ করা হলো। এই ফাঁকে শেফ ফোন করলেন রেটুরেন্টের মালিকদের একজন স্টেফানি উইলকিনসনকে। তিনি তখন নিজের বাসায় ছিলেন। শেফের কল পাওয়ামাত্র এক দৌড়ে চলে এলেন রেস্টুরেন্টে।

স্টেফানি কি করলেন? স্বাভাবিকভাবেই সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্সকে অনেক বিশেষভাবে সার্ভিস দেবার ব্যবস্থা করলেন, একটি ভালো ইম্প্রেশন তৈরি করার চেষ্টা করলেন, তাই না? না, তিনি তার শেফ এবং ওয়েটারদের, অর্থাৎ রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের জিজ্ঞাসা করলেন, এই মানুষটিকে সার্ভ করতে তারা ইচ্ছুক কিনা। যে মানুষটি তাদের দেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি, যে মানুষটি একটি অনৈতিক প্রশাসনের জন্য কাজ করেন, তাকে কি তারা আপ্যায়ন করবেন কিনা। সিদ্ধান্ত হলো, না, তারা তা করবেন না। স্টেফানি উইলকিনসন ঘাবড়ে না গিয়ে সোজা হেঁটে গেলেন সারাহ’র টেবিলে, “একটু বাইরে আসুন প্লিজ, আপনার সাথে কথা আছে” বলে অন্যান্য অতিথিদের মাঝ থেকে আলাদা করে নিলেন প্রেস সেক্রেটারিকে। রেস্টুরেন্টের বাইরে এনে সারাহকে খুব বেশি কিছু বললেন না অবশ্য স্টেফানি; শুধু বললেন “আমার কর্মচারীরা আপনাকে সার্ভ করতে অস্বস্তি বোধ করছে, আমাদের রেস্টুরেন্ট থেকে আপনাকে সার্ভ করা সম্ভব হচ্ছে না”। স্যান্ডার্স নীরবেই শুনলেন, টেবিলে ফিরে গিয়ে নিজের পার্স এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়ে গেলেন। অ্যাপেটাইজারগুলোর দাম সারাহ দিতে চাইলেও সেগুলোর দাম রাখা হলো না তার কাছ থেকে।

সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স

অনেকেই বাহবা জানাচ্ছেন রেড হেন রেস্টুরেন্টের কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের।

ঘটনাটি যদি এখানেই শেষ হতো তবে ভালোই হতো। স্যান্ডার্স বুঝতেন সাধারণ মানুষের কাছে তার ভাবমূর্তি আসলে কেমন, পরবর্তীতে প্রেস কনফারেন্সগুলোতে একটু নৈতিক হবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দেখা গেল, ঘটনাটি আসলে মাত্র শুরু। স্যান্ডার্স এই নিরীহ রেস্টুরেন্টটাকে অ্যাটাক করে সেই রাতেই একটি টুইট করে বসলেন-


টুইটটি দেখতে নিরীহ হলেও আমাদের এখানে বুঝতে হবে, স্যান্ডার্স প্রশাসনের মুখপাত্র, টুইটারে তার লাখ লাখ ফলোয়ার এবং এই টুইটটিই রেড হেন রেস্টুরেন্টের ব্যবসা সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিতে পারে। সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স সরকার ও প্রশাসনের হয়ে কাজ করেন, তার জনগণের ভালোর জন্য কাজ করবার কথা, ব্যবসা ধসিয়ে দেবার জন্য নয়। একটি ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবেও ব্যাপারটাকে রাখতে পারতেন তিনি, তা না করে নিজের ইগোকে তুষ্ট করার জন্য যা করলেন তার ফলাফল কি হলো? পরদিন ট্রাম্পের টুইট-


এখন সেই রেস্টুরেন্টকে ট্রাম্প সমর্থকরা রীতিমত বয়কট করে ফেলেছেন। দিনরাত বিক্ষোভ চলছে তার সামনে। সারা আমেরিকায় রেড হেন নামে আরো যত রেস্টুরেন্ট আছে, সবগুলোরই ব্যবসা বন্ধ হবার জোগাড়, যদিও কোনোটিই এই ঘটনার সাথে জড়িত নয়। তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যাচ্ছে ঘৃণাপূর্ণ কমেন্টে। মূল রেড হেনের মালিক স্টেফানি উইলকিনসন ভার্জিনিয়ার ব্যবসায়ী সমিতি থেকেও পদত্যাগ করেছেন। আমেরিকার সব ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোই ভয় পেয়ে গেছে ট্রাম্পের এই টুইট দেখে, ট্রাম্পের এই টুইট কিন্তু যতটা না তার প্রেস সেক্রেটারিকে সমর্থন করে, তার থেকে বেশি রেস্টুরেন্টটার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে; এবং সেই ঘৃণাটি শুধু রেড হেনের প্রতি বলেও মনে হয় না, মনে হয় ছোট রেস্টুরেন্টগুলোকে সাধারণভাবেই ঘৃণা করেন ট্রাম্প। দেশের প্রেসিডেন্টের যদি স্বাধীন ব্যবসাগুলোর প্রতি এমন মনোভাব পোষণ করেন, মানুষ আর নির্ভয়ে ব্যবসা করবে কীভাবে!

স্টেফানিকে যখন ওয়াশিংটন পোস্ট জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপারটি সম্পর্কে, তিনি বলেন যে তার রেস্টুরেন্টের নিজস্ব কিছু মানদণ্ড আছে যেগুলো তিনি তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ন বলে মনে করেন। সততা, সহযোগিতা, সহানুভূতি। ট্রাম্প প্রশাসন এগুলোর বিপরীতে বলেই এ ধরণের একটি সিদ্ধান্ত তিনি নেন। তিনি মনে করেন দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য তার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।

তবে এ ঘটনাটি ঘটার পর শুধু যে নেতিবাচক ফলাফলই আসছে একের পর এক তা কিন্তু নয়। স্টেফানির পক্ষেও জেগে উঠছে অনেকে, সংবাদ মাধ্যম বাহবা দিচ্ছেন তাকে। ট্রাম্প অফিশিয়ালদের এভাবে পাব্লিক শেমিং করাটা ট্রাম্পের অনৈতিক ঘৃণাপূর্ণ প্রশাসনকে জবাব দেওয়ার খুবই ভালো একটি উপায় তাদের মতে। ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টের মালিক হয়েও স্টেফানি আমেরিকার একটি অংশের মধ্যে রীতিমত একটি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। এরপর প্রশাসনের মানুষগুলো যতই মিথ্যা বলবেন, ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার কেড়ে নেবেন, বর্ণবাদী মন্তব্য করবেন, সংখ্যালঘুদের অগ্রাহ্য করবেন- ততই স্টেফানির মত মানুষ বাড়বে। বিভিন্ন জায়গায় জনগণের সেবা পেতে গিয়ে এভাবে লজ্জিত হবেন ট্রাম্প অফিশিয়ালরা। কতই আর টুইট করবেন? কত মানুষকেই আর দমিয়ে রাখবেন? এভাবে ছোট ছোট প্রতিবাদ জন্ম দিবে বড়সড় এক বিপ্লবের- এই হয়তো আমেরিকার স্বাধীনচেতা মানুষদের স্বপ্ন।

আমরাও কিন্তু অনেক অনৈতিকতা দেখি চোখের সামনে, দেখি অনেক অবিচার। উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা তো দুরের কথা, এলাকার চ্যাংড়া ছেলেপুলেরা ঘুরে বাইকে ক্ষমতাসীন দলের স্টিকার লাগিয়ে, পুলিশ ধরলে তাদের হম্বিতম্বি – “আপনি চিনেন আমি কে? অমুক মন্ত্রীর পিএসের চাচাতো ভাইয়ের গাড়ির ড্রাইভারের তালতো ভাইয়ের শালা লাগি আমি”। কম বয়সী ছেলেপুলের কথা বাদ দিলাম, বুঝদার বয়সের মানুষরাও অহরহ আইনকে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেড়ান বাইক-গাড়িতে সাংবাদিক, আইনজীবী ইত্যাদি স্টিকার লাগিয়ে; যদিও এরকম করাটা আইনবিরোধী! অথচ আমাদের দেশে স্টেফানির মত খুব ছোট একটা প্রতিবাদ করাটাও মনে হয় স্বপ্নের মত। স্টেফানির মত প্রতিবাদ এদেশের কেউ করতে গেলে হয়তো টুইটের মাধ্যমে না, আহত হতে হবে শারীরিকভাবেই। তবুও কাগজে-কলমে আমেরিকাও গণতন্ত্র, আমরাও গণতন্ত্র। অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের এভাবে সোচ্চার হওয়ার এই দৃষ্টান্ত থেকে আমরা কিছু শিক্ষা নিতেই পারি!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top