ফ্লাডলাইট

খেলাটাই যখন রাজনীতি এবং আমাদের পাকিস্তানী ফ্যানদের গল্প

খেলাটাই যখন রাজনীতি এবং আমাদের পাকিস্তানী ফ্যানদের গল্প

২০১৮ সাল ফুটবল বিশ্বকাপের আগে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ না করা দেশগুলোতে জরিপ করা হয় কে কোন দেশকে সাপোর্ট করবে। ওমান, লেবাননের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশের নাগরিকদের কথা ছিল, তারা সৌদি আরব এবং মিসরকে সাপোর্ট করবে না। কারণ সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে আরেক মুসলিম দেশ ইয়েমেন ধ্বংস করে দিচ্ছে আর মিসরে এখনও একনায়কতন্ত্র বিদ্যমান। পোল্যান্ডের নাগরিকদের মতে, তারা সবচেয়ে বেশি অখুশি হবে যদি জার্মানরা বিশ্বকাপ জিতে কারণ এখনও তারা জার্মানদের ঘৃণা করে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাৎসি বাহিনীর পোলিশদের উপরে চালানো নির্মম অত্যাচার এখনও ভুলতে পারেনি তাঁরা। একই কাহিনী এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান ইত্যাদি দেশেও। তাঁদের মতে, তাঁদের দেশ যদি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেত, সানন্দে এই বিশ্বকাপ বয়কট করতো তাঁরা। কারণ তাঁরা চায় না রাশিয়ার বিশ্বকাপটা সফল হোক। কারণটাও একই, তাঁরাও ভুলতে পারেনি রুশ শাসকদের অত্যাচার।

এতো পিছনের কথা টানা বাদ দেই, যা সামনে দেখেছি সে গল্পেই আসি। সুইজারল্যান্ড বনাম সার্বিয়ার গ্রুপ পর্বের খেলাটার কথা নিশ্চয়ই মনে আসে আমাদের। সে খেলায় মাঠে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ছিলেন গ্রানিত জাকা, জের্দান শাকিরির মতো খেলোয়াড়েরা। আগুনের উত্তাপ ফুটে উঠছিল তাঁদের শারীরিক ভাষায়, চোখে-মুখে, এমনকি গোল উৎযাপনেও। আগুনের উত্তাপ তাঁরা ছড়িয়ে দেন পুরো কালানিনগ্রাদ স্টেডিয়ামে। কিই বা ছিল এই উত্তাপের কারণ? তা বুঝতে হলে জানতে হবে একটু পিছনের কাহিনীও।

১৯৯০ সালে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে জন্ম নেয় ১১টি নতুন রাষ্ট্র। তাদেরই একটি হলো সার্বিয়া। সার্বিয়া থেকে আবার ২০০৮ সালে জন্ম নেয় নতুন আরেক রাষ্ট্র কসোভো। কসোভোকে অবশ্য এখনো স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকার করে না সার্বিয়া। কিছু দিন আগ পর্যন্তও চলেছে কসোভোর স্বাধীনতা রুখে দেয়ার প্রক্রিয়া। হিটলার পরবর্তী সময়ে ইউরোপে সবচেয়ে বড় গণহত্যা চালায় সার্ব সেনাবাহিনী। কসোভো যুদ্ধে প্রায় ১৫,০০০ এর মতো আলবেনিয়ান মুসলিমকে হত্যা করা হয়।

কসোভো স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত ফিফা কিংবা উয়েফার কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার অনুমতি ছিল না কসোভোর। যে কারণে দেশটির অধিকাংশ ফুটবল খেলোয়াড় সুইজারল্যান্ডের ফুটবলে নাম লেখান। তাদেরই প্রতিনিধি বিশ্বকাপের সুইস দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যেমন- গ্রানিত জাকা, ভালোন বেহরামি এবং জের্দান শাকিরি।

রাজনৈতিক কারণে কসোভোয় জন্ম নেয়া জাকা’র বাবা সাড়ে তিন বছর সার্বিয়ার কারাগারে কাটান। জাকার জন্ম কসোভোয়। শাকিরির জন্মস্থানও কসোভো। দু’জনের শরীরেই বইছে মুসলিম অধ্যুষিত আলবেনিয়ান রক্ত। দুজনই বাল্যকালে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। গোল করার পর তাই এদিন তাদের উদযাপনে ছিল সার্বিয়ার বিপক্ষে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

শাকিরির মনে কসোভোর উপর চালানো নির্যাতন কিংবা পরাধীনতা কিভাবে দাগ কেটেছে তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় সেদিন তার শারীরিক ভাষাতেই। এদিন তার ডান পায়ের বুটে ছিল সুইজারল্যান্ডের পতাকা ও বাম বুটে সেলাই করা ছিল কসোভোর পতাকা। সার্বিয়ার দর্শকরাও ব্যাপারটা জানতেন। যে কারণে কিক-অফের আগে শাকিরির নাম ঘোষণার সময় তাকে দুয়ো দিতে থাকেন সার্বিয়ার দর্শকরা। গোল করে ও দলকে জিতিয়ে এর জবাব দেন শাকিরি।

প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া দলকে দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফিরিয়েছিলেন আরেক আলবেনিয়ান রক্ত বয়ে বেড়ানো জাকা। দুজনের গোল উৎযাপনের ভঙ্গি ছিল একই রকম- দুই হাত বিপরীতভাবে জোড়া লাগিয়ে দুই মাথাওয়ালা ঈগলের চিহ্ন প্রকাশ করছিলেন তারা। যা আলবেনিয়ান জাতীয় প্রতীক প্রকাশ করে। গুরুত্বহীন এ মাচে হলুদ কার্ডের দন্ড উপেক্ষা করে গায়ের জার্সি পর্যন্ত খুলে ফেলে দু’জন গোল উৎযাপনটা করেছেন সার্বিয়ান ভক্তদের গ্যালারির সামনে গিয়ে।

শুনুন, কোন বড় খেলা কিংবা বিশ্বকাপই এক বিপুল জনতাকে একসাথে পাওয়ার একটা বড় মাধ্যম। এমন সমাবেশকে এক সাথে পাওয়া রাজনীতির জন্য অনেক কিছু। যারা “খেলার সাথে রাজনীতি মিশবেন না” এমন অমর উক্তি দিয়ে থাকেন তাদেরকে বলি, ‘ভাই, খেলাটাই একটা রাজনীতি, রাজনৈতিক মতামত জানানোর জন্য খেলার চেয়ে বড় প্লাটফর্ম আর পাবেন না। শাকিরিকে দেখেন, জাকাকে দেখেন। মিসরের খেলোয়াড় মো সালাহকে সবাই কতটা পছন্দ করে তা হয়তো জানতে কারোই বাকি নেই। মো সালাহর এই জনপ্রিয়তাকে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট কিভাবে পলিটিক্সে কাজে লাগিয়েছে জানতে ‘চেচনিয়া কন্ট্রোভার্সি’ লিখে একবার গুগলে সার্চ দিন, নাহলে এই লেখাটা পড়ুন, তাহলেই বুঝবেন।

ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মইন আলিকে চিনেন? কয়েকদিন আগে ভারতের সাথে টেস্ট ম্যাচে আইসিসি’র সকল ড্রেস কোডকে পিছে ঠেলে ‘সেভ গাজা’, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লেখা আর্মব্যান্ড পরে নেমে যান মাঠে।

মানে কি এই কথাগুলো বলার?

বলার মানে হচ্ছে, অতীতকে ভুলে গিয়ে, পূর্বপুরুষদের ত্যাগতিতিক্ষা কিংবা নিজের রক্তাক্ত ইতিহাস পিছে ফেলে আসেনি পৃথিবীর কোন জাতিই। শুধু আমাদের মতো মেরুদণ্ডহীন জাতিই পারে তিরিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ বা দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত হারানোর বোবাকান্না কিংবা পঁচিশ বছরের নিপীড়নের কথা ভুলে আবার সেই শোষকদের কাছে টেনে নিতে।

বিলিভ মি, প্রায় ৮০ বছর পার হতে চলেছে জার্মানরা পোলিশদের উপর অনাচার চালিয়েছিল। সেই আগুন নেভেনি এখনও পোলিশদের মনে, এখনও তাঁরা জার্মানদের মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। তারা কি পারতো না আমাদের মত রাজনীতি ভুলে ফুটবলে শক্তিশালী দল জার্মানীর পতাকা গালে এঁকে নাচানাচি করতে? আর আমরা! মুক্তিযুদ্ধে ঘটে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারি নাই, এর মধ্যেই “আরে, পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের কি দোষ? ওরা তো আর যুদ্ধ করে নাই” কিংবা “আমার জানামতে এই টিমের কেউ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে ছিল না যুদ্ধের সময়” এই যুক্তি দিয়ে আপন করে নিচ্ছি পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের। গলা ফাটায় চিৎকার করছি তাঁদের জন্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের জয়ে গদগদ হয়ে ভূয়সী প্রশংসা করছি। মানুষ আমরা, নাকি মানুষের বেশে মেরুদণ্ডহীন সরীসৃপ!  

সময় হয়েছে এখন দেখে শেখার। আসুন শাকিরিকে দেখি, জাকাকে দেখি কিংবা মইন আলিকেই দেখি, দেখে শিখি কিছু। প্রতিবাদ করতে শিখি, নিজ নিজ স্থানে থেকে প্রতিবাদ করতে জানি। খেলাপ্রেমিক জাতি আমরা। আমরা জেগে উঠলে জেগে উঠবে পুরো জাতি, গোটা দেশ।

Most Popular

To Top