ফ্লাডলাইট

এলান স্ট্যানফোর্ডঃ প্রতারক, নাকি নায়ক?

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যারিবিয়ান সফর মাঠে গড়াচ্ছে আজ প্রস্তুতি ম্যাচ দিয়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট একাদশের বিপক্ষে আজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে কুলিজ ক্রিকেট গ্রাউন্ড, এন্টিগায়।

এই কুলিজ ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সাথেই জড়িত একটি নাম এলান স্ট্যানফোর্ড। টাকা থাকলে যে একটি জাতীয় দলকেও ব্যক্তিগত টুর্নামেন্ট খেলানো যায় সেটিই করে দেখিয়েছিলেন এই এলান স্ট্যানফোর্ড।

কে এই এলান স্ট্যানফোর্ড?

এলান স্ট্যানফোর্ড একজন ধনকুবের, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী। মাল্টি-বিলিয়নেয়ার। স্ট্যানফোর্ড ফিনান্সিয়াল গ্রুপের মালিক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে জন্ম নেয়া এই কোটিপতি ব্যবসায়ী থাকতেন United States Virgin Islands নামক ক্যারিবিয়ান একটি দ্বীপে। আর অবকাশ যাপন করতেন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের আরেক দেশ এন্টিগা এবং বারবুডার এন্টিগা অংশে। এন্টিগাতে স্ট্যানফোর্ড ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। বলা যায়, এন্টিগার সরকার গঠন বা পতনে তার প্রভাব ছিলো “ওপেন সিক্রেট”, এন্টিগায় অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। সেখানকার সরকার এবং রাজনীতিবিদরা স্ট্যানফোর্ডের হাতের মুঠোয় ছিলো যার কারণে অতি দ্রুত তিনি এন্টিগার নাগরিকত্ব লাভ করেন।

এলান স্ট্যানফোর্ডের আরেকটা পরিচয় আছে, তিনি ভয়াবহরকম ক্রিকেট পাগল। ক্রিকেট অনুরাগী বলাই ভালো। ২০০৩ সালের দিকে তার মনে হলো ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ক্রিকেট দিন দিন অজনপ্রিয় হয়ে পড়ছে, ক্যারিবিয়ান স্বর্ণযুগ হারিয়ে গেলেও ক্রিকেট যাতে মারা না যায় ক্যারিবিয়ানের ছোট ছোট দ্বীপে, সেজন্য তিনি কিছু একটা করতে চাইলেন।

কাউন্টি ক্রিকেটে তখন পরীক্ষামূলক টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়। ইংল্যান্ড ঘুরতে গিয়ে এই ফরম্যাট দারুণ মনে ধরেছিলো স্ট্যানফোর্ডের। জাত ব্যবসায়ী এলানের বুঝতে বিন্দুমাত্র দেরী হয়নি যে এই ফরম্যাটই হতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। আমোদপ্রিয় ক্যারিবিয়ানদের ক্রিকেটে ফেরাতে পারে এই “পিকনিক ক্রিকেট” সেটা এলান বুঝেছিলেন ২০০৩ সালেই!

এন্টিগায় ফিরে তিনি প্রথমেই একটি ক্রিকেট গ্রাউন্ড কেনার কথা চিন্তা করলেন। এয়ারপোর্টের পাশের প্রাচীন ক্রিকেট মাঠটা কিনেও ফেললেন। ২০০৪ সালে সব ধরনের আধুনিক সুবিধা এবং ফ্লাডলাইট বসিয়ে পাল্টে দিলেন সেই গ্রাউন্ডের চেহারা। নতুন নাম দিলেন “স্ট্যানফোর্ড ক্রিকেট গ্রাউন্ড”। পাঁচ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়ামে রূপান্তরিত করলেন নিজের ক্রিকেট গ্রাউন্ডকে।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

অতীতের কুলীজ ক্রিকেট গ্রাউন্ড

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড থেকে অনুমোদন নিয়ে চালু করলেন Stanford 20/20 টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্টের প্রথম আসর বসেছিলো জুলাই-আগস্ট ২০০৬ সালে। সব কয়টি ম্যাচ হয়েছিলো স্ট্যানফোর্ডের নিজের স্টেডিয়ামে।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

স্ট্যানফোর্ডের মালিকানায় বদলে যাওয়া ক্রিকেট স্টেডিয়াম

২০০৬ সালের প্রথম আসরে নক-আউট ফরম্যাটে আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ১৯ দল অংশ নেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট খেলুড়ে দ্বীপ-দেশগুলার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেম্যান আইল্যান্ড ইত্যাদি ছোট ছোট দেশ অংশ নিয়েছিলো।

প্রথম আসরের ফাইনালে ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোকে (১৭৫/৬) হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় গায়ানা (১৭৬/৫)।

প্রথম আসরেই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে যায় এই টুর্নামেন্ট। ২০০৭ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে এই টুর্নামেন্ট যেন ওয়েস্ট ইন্ডিজে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলো।

স্ট্যানফোর্ডের প্রাইভেট এই লীগ এতোটাই সাড়া ফেলেছিলো যে ২০০৮ সালে দ্বিতীয় আসরকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড তাদের ডোমেস্টিক ক্যালেন্ডারে আলাদা জায়গা দিয়েছিলো। কোন ব্যক্তিগত লীগের সেই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের ক্যালেন্ডারে জায়গা পাওয়ার বিরলতম উদাহরণ হয়ে আছে এই ঘটনা।

এলান স্ট্যানফোর্ড, এইবার আরো বড় কিছুর পরিকল্পনা করেছিলেন।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

দ্বিতীয় আসরে অংশ নেয় শুরুতে ২১ দল, যার ভেতর অন্যতম কিউবা। কিন্তু কিউবার সাথে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র না, আমেরিকা অঞ্চলের অনেক দেশের রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে, যার কারণে শেষ মুহুর্তে কিউবার অংশগ্রহণ বাতিল করা হয়। অংশ নেয় ২০ দল, আগের আসরের ১৯ দলের সাথে যোগ হয় সেন্ট মার্টিন নামক দ্বীপ-দেশ।

পুরা টুর্নামেন্ট ভালো খেলেও ফাইনালে ক্রিস গেইলের জ্যামাইকা অল-আউট হয়ে যায় মাত্র ৯৩ রানে! জবাবে ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো ৯ উইকেট হাতে রেখে জয় তুলে নেয়।

এই আসরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সব তারকা ক্রিকেটার নিজ নিজ দ্বীপ-দেশের হয়ে অংশ নেয়।

২০০৬ সালের আসরের পরই স্ট্যানফোর্ডের মাথায় এক অদ্ভুত চিন্তা আসে। Stanford 20/20 টুর্নামেন্ট থেকে তিনি নিজে সেরা প্লেয়ারদের বাছাই করে একটি দল গঠন করবেন আর সেই দল খেলবে র‍্যাংকিং-এর প্রথম সারির কোন জাতীয় দলের সাথে।

প্রথম আসরের পর স্ট্যানফোর্ড আলোচনা শুরু করেন সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডের সাথে। স্ট্যানফোর্ডের দল সাউথ আফ্রিকার সাথে খেলবে এবং প্রাইজমানি হবে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! কিন্তু এই ম্যাচ আলোর মুখ দেখেনি নানান কারণে।

২০০৮ সালে স্ট্যানফোর্ড ভারত, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া এবং সাউথ আফ্রিকাকে আমন্ত্রণ জানান এন্টিগায় একটি নক-আউট চারজাতি টুর্নামেন্টে অংশ নিতে। টুর্নামেন্টের জয়ী দল মুখোমুখি হবে স্ট্যানফোর্ডের নিজের দলের বিপক্ষে। কিন্ত আইসিসি এবং টুর্নামেন্টের ব্রডকাস্টিং পার্টনার ESPN-Star এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের শিডিউলিং সমস্যার কারণে এই আয়োজন বাস্তবায়ন হয়নি।

স্ট্যানফোর্ড তো হার মানার মানুষ না! এবার তিনি অন্য উপায় খুঁজতে লাগলেন, ২০০৮ সালের Stanford 20/20 টুর্নামেন্ট শেষ হলে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটারদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন অল-স্টার টিম আর ২০০৭ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দল ভারতকে আমন্ত্রণ জানালেন তার অল-স্টার দলের সাথে একটি ম্যাচ খেলার জন্য। ম্যাচের প্রাইজমানি এবার রাখলেন ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কোন কারণে ভারত রাজি না হলে ব্যাক-আপ হিসেবে রাখলেন অস্ট্রেলিয়াকে পরিকল্পনায়। কিন্তু ভারত তখন নিজেদের টুর্নামেন্ট আইপিএল-এর প্রথম আসর আয়োজন করায় ব্যস্ত, পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন কোন ম্যাচ খেলতে তারা আগ্রহী না বলেও জানিয়ে দেয় স্ট্যানফোর্ডকে। রাজি হয়নি অস্ট্রেলিয়াও।

এদিকে স্ট্যানফোর্ডের জন্য ততদিনে বিষয়টা ইমেজের প্রশ্ন হয়ে গিয়েছে। টাকার তার অভাব নাই, অথচ একটা জাতীয় দল ম্যানেজ হচ্ছে না!

চোখ কপালে তোলার মতো প্রাইজমানি ঘোষণা করলেন এই দফায়। “উইনার টেকস অল”, ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এক ম্যাচের জন্য।

পাঁচ বছরের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট, প্রতি বছর একটা ম্যাচ হবে তার “অল স্টার টিম”-এর বিপক্ষে, প্রতিপক্ষ হবে একটি জাতীয় দল, একমাত্র ম্যাচে যারা জিতবে তারা পাবে ২০ মিলিয়ন ডলার, পরাজিত দল অবশ্য কিছু পাবেনা। তবে দুই দলের ক্রিকেটাররা পাবে মোটা অংকের ম্যাচ ফি।

এইবার কাজ হলো! অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড দুই দলকেই অফার দেয়া হয়েছিলো, অফার গ্রহণ করলো ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ECB)।

পাঁচ বছর পর্যন্ত ইংল্যান্ড স্ট্যানফোর্ডের অল-স্টার টিমের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে এন্টিগায় তার নিজস্ব স্ট্যানফোর্ড ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। ইংল্যান্ডের এন্টিগায় যাওয়া-আসা, থাকা ইত্যাদি সব খরচ স্ট্যানফোর্ড বহন করবেন।

২০ মিলিয়ন ডলারের পুরাটাই পাবে জয়ী দল। জয়ী দলের একাদশে খেলা ১১ জন ক্রিকেটার সবাই পাবে ১ মিলিয়ন ডলার করে, ১ মিলিয়ন ডলার ভাগ করে দেয়া হবে একাদশে না থাকা, কিন্তু স্কোয়াডে থাকে ক্রিকেটারদের ভেতর, ১ মিলিয়ন ডলার ভাগ করে দেয়া হবে জয়ী দলের কোচিং স্টাফদের ভেতর আর বাকি ৭ মিলিয়ন ডলারের ভেতর ৩.৫ মিলিয়ন ডলার পাবে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড এবং ৩.৫ মিলিয়ন ডলার পাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড।

এই সিরিজের নাম দেয়া হয় “স্ট্যানফোর্ড সুপার সিরিজ”।

এই সুপার সিরিজে মূলত দুটি ম্যাচ করে হবার কথা ছিলো পরবর্তী পাঁচ বছর। একটি ম্যাচ হবে Stanford 20/20 লীগের জয়ী দলের সাথে কাউন্টি ক্রিকেটের টি-টুয়েন্টি শিরোপা জয়ী দলের একটি ম্যাচ এবং স্ট্যানফোর্ডের অল-স্টার টিমের সাথে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের একটি ম্যাচ।

প্রথম ম্যাচের নাম ছিলো “Trans-Atlantic Twenty20 Champions Cup”।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

টস করছেন কেভিন পিটারসেন ও ক্রিস গেইল।

২০০৮ সালে স্ট্যানফোর্ড ২০/২০ চ্যাম্পিয়ন দল ত্রিনিদাদ এবং টোবাগো মুখোমুখি হয়েছিলো কাউন্টির টি-টুয়েন্টি চ্যাম্পিয়ন মিডলসেক্সের বিপক্ষে।

সুপার সিরিজের চারদল (ইংল্যান্ড, মিডলসেক্স, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, স্ট্যানফোর্ড সুপারস্টার্স) নিজেদের ভেতর প্রথমে চারটি প্রস্তুতি ম্যাচে অংশ নেয়।

এরপর প্রথম ম্যাচে ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগোর মুখোমুখি হয় মিডলসেক্স।

রবি রামপালের বোলিং তোপের মুখে (২৫/৪) মিডলসেক্স ২০ ওভারে মাত্র ১১৭/৮ রান তুলেছিলো, জবাবে ত্রিনিদাদ দীনেশ রামদিনের ৪১ রানের উপর ভর করে ১৯.২ ওভারে জয় তুলে নেয় (১২২/৫)। ডেভিড মালান এবং টিম মুরতাঘ ২ উইকেট করে নিয়েছিলেন।

এরপর সিরিজের দ্বিতীয় এবং ফাইনাল ম্যাচ ছিলো ২০ মিলিয়ন ডলারের ইংল্যান্ড বনাম স্ট্যানফোর্ড সুপারস্টার্সের ম্যাচ।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

ম্যাচের আগে স্ট্যানফোর্ডের সাথে এক ফ্রেমে ইংল্যান্ড খেলোয়াড় ও অফিসিয়ালরা।

জিতলেই ১ মিলিয়ন করে ডলার পাবে, এইরকম এক সমীকরনের সামনে দাড়িয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ড!

সলেমান বেনের স্পিন জাদুতে (১৬/৩) পূর্ণশক্তির ইংল্যান্ড মাত্র ৯৯ রানে অল আউট হয়ে যায়। ড্যারেন স্যামী, কাইরন পোলার্ড, জেরম টেইলর প্রত্যেকে ২ উইকেট করে পান।

ইয়ান বেল, কেভিন পিটারসেন, ম্যাট প্রায়র, এন্ড্রু ফ্লিনটফ, কলিংউড, লুক রাইট কেউই দাঁড়াতে পারেনি সেদিন। সর্বোচ্চ রান করেন সামিত প্যাটেল (২২)।

জবাবে ১২.৪ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে জিতে যায় স্ট্যানফোর্ড সুপারস্টার্স, অধিনায়ক ক্রিস গেইল ৬৫* (৪৫) এবং আন্দ্রে ফ্লেচার ৩২* (৩১) রান করেন।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক ক্রিস গেইলের হাতে ২০ মিলিয়ন ডলার প্রাইজমানি’র স্মারক তুলে দিচ্ছেন এলান স্ট্যানফোর্ড

এই সিরিজে অংশ নিয়ে প্রচন্ড সমালোচনার মুখে পড়ে ইংল্যান্ড। টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট লীগে কোন জাতীয় দল অংশ নিলে সমালোচনা হবেই। বলা হয়েছিলো স্ট্যানফোর্ডের ব্যক্তিগত মনোরঞ্জন করেছিলো ইংল্যান্ড এবং ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা।

বিবিসি লিখেছে-

“এটা না কোন দেশের বিপক্ষে দেশ, না কোন ক্লাবের বিপক্ষে ক্লাব আর নাই বা কোন চ্যারিটি ম্যাচ, এমনকি নেই আইসিসি’র অনুমোদন, এটা কেবলই একটা প্রাইভেট লীগ, ব্যক্তিগত স্বার্থে আয়োজন করা”

তবে এই সিরিজ আয়োজন করেই ফেঁসে যান এলান স্ট্যানফোর্ড। এতো এতো টাকা ব্যয় করে তিনি অবশ্য প্রচুর লাভ করেছিলেন, স্কাই স্পোর্টস ছিলো ব্রডকাস্টিং পার্টনার, ছিলো কোটি কোটি টাকার স্পন্সরশীপ।

তবে এসব করতে গিয়েই স্ট্যানফোর্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ এবং এক্সচেঞ্জ কমিশনের (SEC) নজরে আসেন। শুরু হয় তার বিপক্ষে তদন্ত। ৮ মিলিয়ন ডলার অর্থ জালিয়াতির অভিযোগে তার অফিসে তল্লাশি চালায় এফবিআই (FBI), এই ৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছিলো স্ট্যানফোর্ড সুপার সিরিজের ম্যাচে। অধিকতর তদন্তে মানি লন্ডারিং, ব্যাংক জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, এন্টিগার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নামে-বেনামে অর্থ রাখা ইত্যাদি চার্জ গঠন করা হয়।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

জালিয়াতি’র অভিযোগে গ্রেফতার এলান স্ট্যানফোর্ড

২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয় এবং ২০১২ সালের ৬ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত ১১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। স্ট্যানফোর্ড তার বিরুদ্ধে আনিত একটি বাদে সব অভিযোগ স্বীকার করে নেন। বর্তমানে স্ট্যানফোর্ড কারাগারে আছেন।

জালিয়াতির তদন্ত শুরুর সাথে সাথেই ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড স্ট্যানফোর্ডের সাথে চুক্তি বাতিল করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড বাতিল করে Stanford 20/20 লীগ এবং স্ট্যানফোর্ড সুপার সিরিজ।

স্ট্যানফোর্ড মালিকানা হারিয়েছেন তার বানানো “স্ট্যানফোর্ড ক্রিকেট গ্রাউন্ড”-এর। প্রায় দশ বছর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট বন্ধ ছিলো এই স্টেডিয়ামে, সম্প্রতি “কুলিজ ক্রিকেট গ্রাউন্ড” নামে পুনরায় চালু হয়েছে। আর এখানেই ২৮ জুন প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ।

আইনের চোখে স্ট্যানফোর্ড একজন প্রতারক (ফ্রড), জালিয়াতি করে এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামী। কিন্তু ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে জিজ্ঞেস করেন, বিশেষ করে এন্টিগায়, স্ট্যানফোর্ড সেখানে দেবতার সমান।

স্ট্যানফোর্ড নিয়ন আলোয় neon aloy

আইনের চোখে অপরাধী হলেও সাধারণ ক্যারিবিয়ানদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয় এলান স্ট্যানফোর্ড

আর মৃতপ্রায় ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে নতুন করে প্রাণ দিয়ে তিনি একজন নায়ক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ইতিহাসে।

ক্যারিবিয়ান প্লেয়াররা টি-টুয়েন্টির মাস্টার, এটাই তাদের ন্যাচারাল গেম, তারা সারা বিশ্বে টি-টুয়েন্টি’র ফেরিওয়ালা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই বারের ওয়ার্ল্ড টি-টুয়েন্টি চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু স্ট্যানফোর্ড ২০/২০ সিরিজের আগে ক্যারিবিয়ানরা নিজেরাও তাদের এই সামর্থ্য সম্পর্কে সম্ভবত জানতো না।

স্ট্যানফোর্ড যদি কাউন্টি ক্রিকেটের মতো টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট ক্যারিবিয়ান দ্বীপ-দেশগুলাতে ছড়িয়ে না দিতেন তাহলে ওয়ানডে বা টেস্টের মতো টি-টুয়েন্টিতেও পিছিয়েই

যেত ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

বিশ্বাস হয়না? কয়েকজন ক্যারিবিয়ান টি-টুয়েন্টি স্টারের নাম কল্পনা করুন সিনিয়র পর্যায়ের। তারপর মিলিয়ে দেখুন তাদের উত্থানের সাথে ২০০৬ অথবা ২০০৮ সালের স্ট্যানফোর্ড ২০/২০ ঠিকই জড়িত পাবেন।

তবে সবাই কিন্তু স্ট্যানফোর্ডকে প্রশংসা করেন সেটা না! একাধিক ক্যারিবিয়ান লিজেন্ড কিন্তু সরাসরি বলেন –

“ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ক্রিকেট ধ্বংসের জন্য স্ট্যানফোর্ড দায়ী।”

আচ্ছা স্ট্যানফোর্ড তাহলে কি? প্রতারক? নাকি নায়ক? আপনার কি মনে হয়?

সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পড়া ক্রিকেট জালিয়াতির কথা জানা আছে তো?
পড়ুনঃ বড় ধরণের ঝড় উঠতে যাচ্ছে ক্রিকেটবিশ্বে!

Most Popular

To Top