বিশেষ

আশির দশকের কিছু রকস্টার এবং তাদের ব্যান্ড রকস্ট্রাটার গল্প

আশির দশকের কিছু রকস্টার এবং তাদের ব্যান্ড রকস্ট্রাটার গল্প

১৯৮০ সালের দিকে বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে জন্য ছেলেদের লম্বা চুল রাখার মতোন ব্যাপারটা যেমন কষ্টসাধ্য ছিলো, তেমন সেই সময় সেই দেশে তৎকালীন তরুণদের জন্য হেভী মেটাল গান করার চিন্তা করাটা অনেকটা অসম্ভব ব্যাপারই ছিলো। কিন্তু, তখনই কয়েকজন যুবকের হাত ধরে জন্ম নেয় বাংলাদেশে হেভী মেটালের অন্যতম পাইওনিয়ার ব্যান্ড “রকস্ট্রাটা”, যারা বাংলাদেশের মিউজিকে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটা বিপ্লব ঘটিয়েছিলো।

১৯৮৫ সালে যাত্রা শুরু হয় রকস্ট্রাটা’র। ইনফ্লুয়েন্স ছিলো তাদের লেড জ্যাপলিন, আয়রন মেইডেন, ব্ল্যাক স্যাবাথ আর পিংক ফ্লয়েডের মতোন ব্যান্ডগুলো। ব্লাড পাম্পিং ড্রামিং, স্মুথ এবং ডিপ বেজ, গিটারের অসাধারণ ইন্ট্রো, পরাক্রমশালী সলো ছাড়াও আরো কাজ জটিল সব কাজ এবং হাই পিচের ভোকালের কাজ দেখা যায় তাদের এলবামগুলোতে।

এই রকস্ট্রাটা’র পথচলা শুরু হয় স্কুলপড়ুয়া দুই কিশোরের হাত ধরে। ঢাকার সেন্ট যোসেফে স্কুলে পড়ুয়া দুই বন্ধু ছিলেন মইনুল ইসলাম আর ইমরান হোসেন, যারা একসাথে অবসরে গান-বাজনা করতেন তাদের হাই স্কুল দিনগুলোতে। ১৯৮৪ সালের শেষদিকে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন একসাথে স্কুলের র‍্যাগ ডেতে পারফর্ম করবেন কিছু বাড়তি সদস্যদের নিয়ে যার প্রায় সব তাদেরই বন্ধুবান্ধব ছিলো। এর মধ্যে ইমরান বেজে আর মইনুল গিটারে ছিলেন, এবং সাথে ভোকালে রাখলেন আসিফ আলম (বীরু), ড্রামসে আসিফ ইকবাল এবং কীবোর্ডে শাফকাত জান চৌধুরীকে। 

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সময়ের অপর্যাপ্ততার কারণে তারা আর পারফর্ম করতে পারেননি সেদিন, কিন্তু এ থেকে একটি সম্ভাবনার দিকে নিয়তি মোড় নিলো। সেই অস্থায়ী মিউজিক গ্রুপ একটি ব্যান্ডে রূপ নিলো আর সেই থেকে এই ব্যান্ডের শুরু হলো নিয়মিত জ্যাম করা১৯৮৫ সালের শুরুর দিকের থেকে আসিফ ইকবাল ড্রামস থেকে বিদায় নেন পারিবারিক কারণে কিন্তু তার বদলী হিসেবে ব্যান্ডের বর্তমান ড্রামার মাহবুবুর রশীদকে অন্তর্ভুক্ত করেন এই ব্যান্ডে। তার উপর যতো দিনে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন তারা “হেভী মেটাল” প্লে করবেন, ততোদিনে তাদের কীবোর্ডের পাঠ চুকানো শেষ হয়ে গিয়েছিলো। এ সময় ব্যান্ডের লাইন-আপ দাঁড়ায়- মইনুল ইসলাম গিটারে, ইমরান হোসেইন বেজে, আসিফ আলম ভোকালে এবং মাহবুবুর রশীদ ড্রামসে।  

ব্যান্ডের নামকরণটা আসে মাহবুবুর রশীদের মাথা থেকে। মাহবুবুর রশিদ তার এসএসসি পরীক্ষার আগে ভূগোল বই পড়ার সময় “রক-স্ট্রাটা” একটা টার্মের সাথে পরিচিত হন। এই টার্মটা তার মাথায় রয়ে গিয়েছিলো এবং ব্যান্ডের নামকরণের সময় তিনি এটা বললে সবার পছন্দ হয়ে যায় নামটা এবং সেটাই ব্যান্ডের নাম হিসেবে রাখা হয় এবং শুরু হয় “রকস্ট্রাটা” ব্যান্ডের যাত্রা।  

রকস্ট্রাটার প্রথম লোগো ডিজাইন করেন ইমরান হোসেনের কাজিন শাহরিয়ার হোসেইন। লোগোটা প্রথমে ইমরানের গিটারের কেসে আঁকা হয়েছিল।

“রকস্ট্রাটা” ব্যান্ডের লোগো।

১৯৮৫ সালে তারা জ্যাম করতেন। কিন্তু নিয়মিত করতে পারতেন না যেহেতু সবাই তখন কলেজে পড়তেন। ব্যান্ড সদস্যরা সব ঢাকার নটরডেম কলেজের ছাত্র ছিলেন। কলেজ পড়াকালীন সময়েই একদিন মইনুল-ইমরানরা সবাই কলেজের ক্যান্টিনে এক টেবিলে বসে চা খাচ্ছিলেন আর তাদের নতুন ব্যান্ড নিয়ে কথার ফাঁকেই মইনুল বলেছিলেন যে, “ব্ল্যাক স্যাবাথের মতো ব্যান্ড করতে পারলে আমি আছি।”

যেটা সেখানেই উপস্থিত আরেকজন মানুষ “আরশাদ আমীন” এর কানে যায়। তখন যেহেতু খুব বেশী একটা মানুষ ব্ল্যাক স্যাবাথ নিয়ে কথা বলতো না সেটা আরশাদের মনোযোগ আকর্ষণ করলো। তিনি মইনুলের কাছে ব্যাপারটা নিয়ে আরো জানতে চান এবং সেখান থেকেই তাদের মধ্যে একটা সম্পর্কের সৃষ্টি হলো। তারপর আরশাদকে মইনুল ইমরান, মাহবুব আর আসিফের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর তারা আরো পিংক ফ্লয়েড, লেড জ্যাপলিন নিয়ে কথা বলা, আড্ডা দেয়া শুরু করলেন।

তখন সেই সময়টাতে “আয়রন মেইডেন” খুব রাজত্ব করছিলো ইন্টারন্যাশনাল ব্যান্ড মিউজিক সীনে এবং সেই যুবক রকস্ট্রাটা ব্যান্ডের সবাইও খুব “আয়রন মেইডেন” শুনছিলেন আর তারা তাদের ব্যান্ডকেও অমনভাবে গড়ে তুলতে চাইলেন যেখানে একটি নয়, দুটো গিটার নিয়ে দুইজন গিটারিস্ট থাকবে। যেই ভাবা সেই কাজ, ইমরান বেজ থেকে গিটারে চলে গেলেন এবং আরশাদ রকস্ট্রাটায় বেজিস্ট হিসেবে যোগ দিলেন। তিনি খুব সুন্দর করে ব্যান্ডে নিজের জায়গা করে নিলেন যেহেতু তিনি পিংক ফ্লয়েড আর রজার ওয়াটারসের অনেক বড় ভক্ত ছিলেন। আরশাদ বেজে আসার পর এবার ব্যান্ডের এই লাইন-আপ কিছুটা স্থায়িত্ব লাভ করে।

নতুন লাইন আপ হয়ঃ

ভোকালঃ আসিফ আলম (বীরু)
গিটারঃ ইমরান হোসেন
গিটারঃ মইনুল ইসলাম
বেজঃ আরশাদ আমীন
ড্রামসঃ মাহবুবুর রশীদ

সেসময় তারা কেউই কিছু বাজাতে পারতেন না কিন্তু তারপরও তারা শুরু করলেন তাদের ব্যান্ডের যাত্রা। আরশাদের ভাষ্যমতে,

“Okay, let’s do it! শখ আছে করবো।”

ব্যান্ডের এক বছর যেতেই ১৯৮৬ সালের দিকে জ্যামিং সেশনগুলো আস্তে আস্তে আরো ভালো ভালো হতে থাকে, কেমিস্ট্রি আরো জমে উঠে। তারা তখন ব্ল্যাক স্যাবাথের প্যারানয়েড, এনআইবি এবং আয়রন ম্যান জ্যাম করার চেষ্টা করতেন। তারপর ইমরান হোসেন সাজেস্ট করেন “আয়রন মেইডেন” এর “২২ অ্যাকাসিয়া এভিনিউ” কভার করার। এটা কভার করার সময় থেকেই ব্যান্ডের সকল সদস্যরা অনেক কঠিন পরিশ্রম করা শুরু করে প্রকৃত “হেভী-মেটাল” মিউজিসিয়ান হতে। যখন গানটা সবাই মিলে তুলেন তখন তদের নিজেদের মধ্য আত্মবিশ্বাস জন্মাতে শুরু করলো এবং ফ্লাইট অফ ইকারাস, রানিং ফ্রি, এইসেস হাই এর মত অন্যান্য আয়রন মেইডেন গান কভার করার সাহস পান।

এ পর্যায়ে ব্যান্ড মেম্বাররা আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাসী হচ্ছিলেন লাইভ শো করার ব্যাপারে। ১৯৮৬ সালের জুনে নটরডেম কলেজের ডিবেটিং ক্লাবের ফাংশনের পরে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিলো এবং তারা সেখানে একটি শো করার সুযোগ পেলেন। সেখানকার আয়োজক যারা ছিলেন তাদের বললেন যে তাদের একটা ব্যান্ড আছে এবং শো করার অনুমতি পেলেন। অনুমতি পেয়েই তারা স্টেজে উঠে গেলেন। কিন্তু যখনই তারা স্টেজে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাদের গান শুরু করবার, তখনই তাদের কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল জোসেফ এস পিশোতো স্টেজের দিকে দৌড়ে এসে তাদের শো থামিয়ে দিলেন। তখনই তারা এবং তাদের বন্ধুবান্ধবরা সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের নিজেদের টাকায় একটা শো করার। আর যেহেতু শো করবেনই, সেটা বড়-সড় করেই করা উচিৎ

তারপর ভেন্যু খোঁজার মিশনে নামলেন রকস্ট্রাটা ব্যান্ডের সদস্যরা এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষমেষ ঢাকার “ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট” এর অডিটোরিয়াম ঠিক করলেন তারা। তখনকার দিনে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের অডিটোরিয়াম ছিলো বাংলাদেশের “ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন”। ঠিক করলেন যাই থাকুক কপালে, ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের অডিটোরিয়ামেই শো করবেন তারা। কিন্তু ভেন্যু বুক করতে প্রয়োজন বিশ হাজার টাকা। যেহেতু মইনুলের বাবা একজন আর্কিটেক্ট হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সদস্য ছিলেন, সেই সুবাদে তারা অর্ধেক ডিস্কাউন্ট পেয়ে গিয়েছিলেন। এবার বিল দশ হাজার টাকায় নেমে আসলো যা তখনকার সময়ে অনেক বড় একটা অ্যামাউন্ট। আরশাদের বাবার এক বন্ধুর থেকে তিনি পাঁচ হাজার টাকা ম্যানেজ করেছিলেন এবং বাকী টাকাও তাদের সবার পকেট মানি এবং তাদের পরিবার থেকে আসলো।

রকস্ট্রাটার মাহবুবের একটা ড্রামস ছিলো কোনরকম। পরে যদিও কুল একটা ড্রামসেট কিনেন কিন্তু এর আগে মাহবুবের সেই ড্রামসেটের স্নেয়ার কিছুক্ষন পর পর ডিসটিউন হয়ে গেলে সেটা রোদে শুকাতে ছাদে নিয়ে যেতে হতো প্র্যাকটিসের ফাঁকে ফাঁকে ব্রেকে।

মাহবুব এবং তার প্রথম ড্রামকিট

০মাহবুব এবং তার প্রথম ড্রামকিটভেন্যু তো বুক করা হলো কিন্তু তারা একা তো শুধু পারফর্ম করতে পারবেন না তাই তারা ওয়ারফেইজের কয়েকজনকে বললেন। ওয়ারফেইজের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহীম আহমেদ কমল বললেন তিনি বাজাতে পারবেন, কিন্তু তার ব্যান্ড নেই। তখন কমলের সেই শো-এর জন্য একটা ব্যান্ড অনেকটা হুটহাট করেই বানানো হলো। সেখানে বেজে ছিলেন কমল, ভোকালে “পেন্টাগন” ব্যান্ডের মোহাম্মদ আলী সুমন এবং “উইনিং” ব্যান্ডের জামান আলী চন্দন, ড্রামসে ছিলেন ওয়ারফেইজের বর্তমান ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু, কিবোর্ডে “ফিডব্যাক” এর ফুয়াদ নাসের বাবুএই নিয়ে একটা ক্ষণস্থায়ী ব্যান্ড তৈরী হলো “ফ্রেন্ডস”। সেই শো এর নাম ছিলো “রকস্ট্রাটা এন্ড ফ্রেন্ডস”। এই শো-টি হয়েছিলো ১৯৮৬ সালে।

তারা শুরু করে দিলেন টিকেট ছাপানোর কাজ, ব্যানার বানানো এবং পুরো শহরজুড়ে পোস্টারিং তারা দুই ব্যান্ডের সবাই মিলে। তারা যেই সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করেছিলেন সেটা ছিলো ৫০ ওয়াট আউটপুট পাওয়ারের। এটাই ছিলো রকস্ট্রাটার প্রথম স্টেজ পারফর্মেন্সএভাবেই একদিন একদিন করে শো এর দিন ঘনিয়ে আসলো, সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেলো। তারা শো করতে গিয়ে দেখেন পুরো ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের অডিটরিয়াম মানুষে ভর্তি হয়ে গিয়েছিলো। তারা খুশি হয়েই স্টেজের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং স্টেজে উঠার সময় বিরু ক্রাউডের উদ্দেশ্য স্টেজে উঠতে উঠতে বলেছিলেন,  “স্ক্রিম ফর মি ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউশন”

শো শুরু হলো, শুরু হলো তাদের নজরকাড়া পারফর্মেন্স, ছড়িয়ে পড়লো তদের ভাইরাস আর তখনই বোঝা গেলো যে বাংলাদেশেও আছে কিছু মেটালহেড। রকস্ট্রাটা নিজেদের দাবী ধরে রাখতে পারলো বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে।

তারা তাদের ব্যান্ড নিয়ে যেখানে সুবিধা পেতেন, সেখানেই প্র্যাকটিস করতেন। যা বেশিরভাগ সময়েই হতো কারো না কারো খালি বাসা। তারা কেউ এক জায়গায় একাধারে প্র্যাকটিস করতে পারতেন না মানুষের অভিযোগের কারণে, তাই এক একদিন এক এক জায়গায় করতেন প্র্যাকটিস।

সেই শো-এর পর এক বছর তারা বিরতি নিলেন, সেই এক বছর তারা না খেয়ে-দেয়ে হলেও টানা প্র্যাকটিস করেছেন সবাই মিলে।তারপর ১৯৮৭ সালে আবার ফেরত আসলেন তারা। কিন্তু, ১৯৮৭ সালের থেকে কিছু ঝামেলা দেখা দিতে শুরু করে, বীরুকে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্য আমেরিকা যেতে হলো এবং ব্যান্ড ভোকাল শূন্য হয়ে পড়লো। তখনই তারা বিভিন্ন মানুষকে ভোকালিস্ট হিসেবে ট্রায়াল দিতে থাকেন এবং তখন একবার “মুশফিকুর রহমান” এসেছিলেন, কিন্তু ব্যান্ডের গানের ধাঁচের সাথে তার চিন্তাভাবনা না মিলার কারণে তাকে বাদ দিতে হয় সেইবারের মতোন। তখনই ব্যান্ডে ভোকাল হিসেবে আসেন “শোয়েব রহমান” শোয়েব এবং আরশাদ একসাথে “ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল” এ পড়েছেন এবং স্কুল ফ্রেন্ড ছিলেন। বীরু চলে যাবার পর একদিন হঠাৎ করেই আরশাদের সাথে শোয়েবের দেখা হয় এবং কথা বলতে বলতে একসময় শোয়েব জানতে পারেন আরশাদ একটা ব্যান্ডের সাথে সংযুক্ত আছে এবুং তাদের ভোকাল দরকার। শোয়েবও তখন “আয়রন মেইডেন” এর অনেক বড় ভক্ত ছিলেন এবং তিনি যেহেতু গাইতেন সে সব গান, আরশাদ তাকে নিয়ে আসলেন অডিশনের জন্য একদিন ব্যান্ডের প্র্যাকটিসে। পুরো ব্যান্ড তখন বনানীর কাছে পুরানো “ডি.ও.এইচ.এস কমিউনিটি সেন্টার” এ প্র্যাকটিস করতো। অডিশনের পর সবার শোয়েবকে সবার পছন্দ হয়ে গেলো এবং সেই থেকে শোয়েব ব্যান্ডে যোগদান করেন নতুন ভোকাল হিসেবে।

শোয়েব রহমান

আরেকটা সমস্যা যার সম্মুখীন তারা হয়েছিলেন তা হচ্ছে তাদের ইন্সট্রুমেন্ট, ইকুইপমেন্টের অভাব ছিলো বেশ। ততোদিনে ওয়ারফেইজও প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে রুকস্ট্রাটা এবং ওয়ারফেইজ, দুই ব্যান্ড মিলে নিজেদের মধ্য সব ইকুইপমেন্ট শেয়ার করতো। তাদের গিটারের স্বল্পতা ছিলো। তাদের দুই ব্যান্ডের মিলে দুইটা গিটার ছিলো তখন। যখন ওয়ারফেইজ প্র্যাকটিস করতো, তখন রকস্ট্রাটা তাদের গিটার দিয়ে দিতো আর যখন রকস্ট্রাটা প্র্যাকটিস করতো, তখন ওয়ারফেইজ তাদের গিটার দিয়ে দিতো। রকস্ট্রাটার মাহবুবের একটা ড্রামস ছিলো কোনরকম। পরে যদিও কুল একটা ড্রামসেট কিনেন কিন্তু এর আগে মাহবুবের সেই ড্রামসেটের স্নেয়ার কিছুক্ষন পর পর ডিসটিউন হয়ে গেলে সেটা রোদে শুকাতে ছাদে নিয়ে যেতে হতো প্র্যাকটিসের ফাঁকে ফাঁকে ব্রেকে। রোদে কিছুক্ষন শুকালে সেটা আবার শক্ত হয়ে আগের “টান টান” শব্দটা পাওয়া যেতো সেটা থেকে। এমন আরো অনেক কিছুরই অভাব ছিলো তখন তাদের তাও তারা কোনভাবে ম্যানেজ করে নিজেদের কাজ চালিয়ে নিয়েছেন, এতোটা ডেডিকেশন বা ঝোঁক ছিলো তাদের এই ব্যান্ডের প্রতি। এভাবেই তারা কষ্ট করে হলেও ইকুইপমেন্ট সব শেয়ার করে দুই ব্যান্ড প্র্যাকটিস করতো।

রকস্ট্রাটা তখন “ব্ল্যাক স্যাবাথ”, “আয়রন মেইডেন”, “মেটালিকা” এবং “স্করপিয়ন” এর বিভিন্ন গান কভার করতো তাদের প্র্যাকটিসে। যেহেতু ব্যান্ড বেশিরভাগ সময়েই হেভী মেটাল গান প্র্যাকটিস করতো, অনেক শব্দ সৃষ্টি হতো এবং তখনো বাংলাদেশে হেভী মেটাল মিউজিক ততোটা পরিচিতি লাভ পায়নি, ব্যান্ডকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে একটা নিয়মিত প্র্যাকটিসের জায়গা খুজতে যেহেতু তখনো বাংলাদেশে “প্র্যাকটিস প্যাড” ছিলো না কোন।

তারা তাদের ব্যান্ড নিয়ে যেখানে সুবিধা পেতেন, সেখানেই প্র্যাকটিস করতেন। যা বেশিরভাগ সময়েই হতো কারো না কারো খালি বাসা। তারা কেউ এক জায়গায় একাধারে প্র্যাকটিস করতে পারতেন না মানুষের অভিযোগের কারণে, তাই এক একদিন এক এক জায়গায় করতেন প্র্যাকটিস।

কিন্তু শোয়েব ব্যান্ডে আসার পর শোয়েব তার বাসায় একটা রুমকে পুরো সাউন্ডপ্রুফ করে সেটাকে তাদের প্র্যাকটিস প্যাড বানান এবং অবশেষে রকস্ট্রাটা তাদের নির্দিষ্ট একটা প্র্যাকটিস প্যাড পায় প্র্যাকটিসের জন্য। একটা নির্দিষ্ট প্র্যাকটিস প্যাড পাবার পর থেকে পুরো ব্যান্ড একেবারে উঠে পড়ে নিয়মিত প্র্যাকটিস করা শুরু করে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত পারফর্ম করে এবং এভাবেই একটা আন্ডারগ্রাউন্ড হেভী মেটাল সিন গড়ে উঠে বাংলাদেশে।

শোয়েবকে নিয়ে রকস্ট্রাটা

রকস্ট্রাটার সাথে সাথে আরো কিছু ব্যান্ড পারফর্ম করা শুরু করে যেমন ইন ঢাকা, এইসেস এবং ওয়ারফেইজএসব শো এর কারণে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে “মেটাল-হেড”রা তাদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের ব্যান্ড গড়ে তোলে এবং বাংলাদেশে এভাবেই মেটাল মিউজিক প্রসার লাভ করা শুরু করে।

এভাবেই রকস্ট্রাটা এবং তাদের সাথের অন্যান্য মেটাল ব্যান্ডগুলো তাদের প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছিলো।

সেই আশির দশকে যেহেতু হেভী মেটাল খুব বেশী একটা পরিচিত ছিলো না সাধারণ মানুষজনের কাছে, সেই সময়ের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতশিল্পী এবং ব্যান্ড সদস্যরা এই রকস্ট্রাটা ব্যান্ড সদস্যদের মিউজিসিয়ান হিসেবে মেনে নিতে একটু দোটানাতে ভুগছিল।

মেটাল মিউজিক নিয়ে ঠাট্টা তামাশাও করতো অনেকে যে মেটাল মিউজিক শুধু অর্থহীন চিল্লাচিল্লি আর শব্দদূষণ ছাড়া আর কিছু না- এসব বলে। কিন্তু যখন থেকে মেটাল মিউজিক প্রসার লাভ করা শুরু করে, রকস্ট্রাটা খুব নাম কামাতে শুরু করে এবং নিয়মিত শো করে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যান্ড সিনারিওতে সবার চোখে পড়াতে শুরু করে, তখনই বাম্বা (বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস এ্যাসোসিয়েশন) এর প্রতিষ্ঠাতা ধীরে ধীরে এই রকস্ট্রাটা এবং অন্যন্য মেটাল ব্যান্ড ওয়ারফেইজ, এইসেস, ইন ঢাকার প্রতি আগ্রহ হয়ে উঠেন। ততদিনে রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেইজ, এইসেস এবং ইন ঢাকাই ছিলো কেবলমাত্র পরিচিত কিছু হেভী মেটাল ব্যান্ড এবং একটা রীতিমত তাড়াহুড়া শুরু হলো তাদের এই এ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

তৎকালীন সময়ে স্টেজ কাপাচ্ছে রকস্ট্রাটা

তখনকার বাম্বার প্রেসিডেন্ট মাকসুদুল হক যিনি কিনা বাংলাদেশের ইতিহাসের বিখ্যাত দুটি ব্যান্ড “ফিডব্যাক” এবং “মাকসুদ ও ঢাকা” এর সাথেও জড়িত ছিলেন, জলদি রকস্ট্রাটা’র সাথে যোগাযোগ করলেন। অনেক ঝুট-ঝামেলার মধ্য দিয়ে তিনি তাদের সেই এসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত করলেন। ঝুট-ঝামেলা বলতে এসোসিয়েশনের অনেকেই রকস্ট্রাটার সদস্যদের নিতে চাচ্ছিলো না এই ভেবে যে তারা কিছু উৎশৃংখল যুবক ছাড়া আর কিছু নয় যেহেতু তাদের কারো কারো লম্বা চুল ছিলো এবং তারা সবাই তখনো বিদেশী মিউজিক করতো এবং যে ধরনের মিউজিক করতো সেটা অপসংস্কৃতি হিসেবে ধরা হতো তখন। কিন্ত মাকসুদুল হক এতো কিছুর পরেও হাল না ছেড়ে দিয়ে সবার সাথে তর্ক-বিতর্ক করে তাদের সেই এসোসিয়েশনে ঢুকাতে সক্ষম হন।

এরপর থেকেই বাম্বার বিভিন্ন শোতে রকস্ট্রাটা নিয়মিত পারফর্ম করা শুরু করে দেয়। বাম্বার সদস্যপদ প্রাপ্তির পর একদম প্রথমদিকে তৎকালীন বাম্বার অন্তর্ভুক্ত অনেক ব্যান্ড এবং মিউজিসিয়ানই রকস্ট্রাটার মিউজিকের প্রতি বিরক্তিভাব প্রকাশ করলেও তারা বাম্বার শো গুলো করে যাচ্ছিলো।

তখনকার সময়ে রকস্ট্রাটার কিছু ঝামেলার সম্মুখীন হতে হতো বিভিন্ন শোতে। একটা ছিলো স্টেজে ডাবল বেজ ড্রামকিট ম্যানেজ করা। তখনকার সময়ে শুধুমাত্র রকস্ট্রাটাই ডাবল বেজ ড্রামকিট ব্যবহার করতো তাদের বিভিন্ন গানে এবং তাদের বিভিন্ন কনসার্টে। কিন্তু এটাই একটা বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যেহেতু অন্য কোন ব্যান্ড ডাবল বেজ ড্রামকিট ব্যবহার করতো না। একাধিক ব্যান্ডসহ কনসার্টগুলোতে তাদের অন্য ব্যান্ডের থেকে আলাদা ড্রামকিট এর পার্ট ধার করে নিয়ে এসে একটা ডাবল বেজ ড্রামকিট বানাতে হতো এবং শো শেষে আবার তাদের সেটা যাদের থেকে ধার করেছিলো তাদের ফেরত দেয়া লাগতো।

প্রায় সময়ই সাউন্ড-সিস্টেম কোম্পানিগুলো ঝামেলা করতো। যেহেতু কোম্পানিগুলোর শুধুমাত্র একটা বেজ ড্রাম মাইক্রোফোন “অ্যান্ড” বা “অর’ ইকুইলাইজার ছিলো, ডাবল বেস ড্রামসের সাউন্ড পুরোপুরি অন্যরকম বানিয়ে দিতো সেখানে ড্রামস প্লাগ-ইন করলে।

আরেকটা যেই ঝামেলা যেটা দেখা দিতো তা হচ্ছে দুটো গিটারিস্ট থাকার পরেও কোন কিবোর্ডিস্ট না থাকার কারণে বিভিন্ন মাল্টি ব্যান্ড শো গুলোতে রকস্ট্রাটার দুটো গিটার এম্পলিফায়ার স্টেজের মধ্য যোগাড় করা খুবই ঝামেলার হতো এবং স্টেজে দুটো এম্পলিফায়ারের অবস্থান শনাক্ত করাটাও একটা ঝামেলার কাজ ছিলো। সবমিলিয়ে পরিশেষে এটা বলা যায় যে, রকস্ট্রাটার বাম্বার সাথে যাত্রা সহজ না হলেও অনেক সাফল্যময় একটা যাত্রা ছিলো।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে পুরো বাংলাদেশ যখন একনায়কতন্ত্র এরশাদের পতন উদযাপন করছিলো, বাম্বা সিদ্ধান্ত নেয় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে একটা সারাদিন ব্যাপী কনসার্ট আয়োজন করবে। বাম্বার প্রেসিডেন্ট মাকসুদুল হক বাম্বার সব ব্যান্ড এবং সদস্যদের ডেকে এক করলেন এবং সবাইকে একটা শো এর জন্য প্রস্তুত হতে বললেন কিন্তু একটাই পূর্বশর্ত যেটা তখনকার সময়ের ওয়ারফেইজ, এইসেস, ইন ঢাকা এবং রকস্ট্রাটার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো তা হলো সেই শো-তে সব বাংলা গান করতে হবে বলে দেয়া হয়েছে যেখানে এই চারটি ব্যান্ডই বিদেশী অন্যান্য সব ব্যান্ডের গান কভার করতো এবং তাদের নিজস্ব কিছুই ছিলোনা তখনো।

কিন্তু এই সমস্যা বা ঝামেলাটা তাদের কাছে  আসলো আশীর্বাদ আকারে। কারণ এবার তারা নিজেদের নিজস্ব গান করার কথা ভাবলেন। যেহেতু রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেইজ, এইসেস এবং ইন ঢাকা তখন বিদেশী সব হেভী মেটাল ব্যান্ডের গান কভার করতো, তাই তারা বাংলাতেও হেভী মেটাল গান করবে বলে ঠিক করলেন এবং সেই অনুসারেই গান লেখা শুরু করলেন যে প্রচেষ্টায় তারা এর আগে কখনো সফল হন নি।

সেই উদ্যোগের পর থেকেই সেই কনসার্টের জন্য রকস্ট্রাটার দুটি গান “শেষ রাত্রি” এবং “সামান্য দুঃস্বপ্ন” লেখা এবং সুর করা। সেই গান দুইটির মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো বাংলা হেভী মেটাল দুটি গানের জন্ম দিলো রকস্ট্রাটা। এর মধ্য এখানে এই “সামান্য দুঃস্বপ্ন” গানটি মইনুলের লেখা এবং আরশাদ এবং ইমরান মিলে লিখেছিলেন “শেষ রাত্রি”।

“কম দর্শক. ধরো, হয়তোবা ষাট-সত্তর বা একশোজন খুব বেশী হলে। মাত্র একশোজন, কিন্তু সেই একশোজন ছিলো একদম খাটিএকদম কঠিন ভক্ত … … একশোজনই একহাজার-দুইহাজারের সমান।”

১৯৯১ সালে ইমরান এবং মইনুল উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখনই আরশাদ তাদের কিছু গান রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নেন যেন ব্যান্ডের কিছু স্মৃতি এবং ব্যান্ডের অস্তিত্ব এর একটা সাক্ষী উভয়ই থাকে এবং যাতে করে ইমরান আর মইনুল ভবিষ্যৎকালে কখনো ফেরত এসে আবার ব্যান্ড করার অনুপ্রেরণা পায়। তখন সেই আলোচনা চলাকালীন সময়েই রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেইজ, ইন ঢাকা এবং এইসেসের সবার চারটি করে গান নিয়ে একটি মিক্সড এলবাম করার আইডিয়া তাদের মাথায় আসে।

এটা তাদের কাছে একটা ভালো উদ্যোগ মনে হলো যেহেতু তখনকার সময়ে মেটাল মিউজিক অতোটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। তাদের এই প্রস্তাব তারা বাকি তিন ব্যান্ডকে জানানোর সাথে সাথে বাকী তিন ব্যান্ড এতে রাজী হয়ে গেলো।

প্রচুর উদ্যমশীলতার মধ্য দিয়ে এই চারটি ব্যান্ড বা “BIG-4” সারগাম প্রোডাকশন কোম্পানির শরণাপন্ন হলো তাদের এই এলবাম রেকর্ড এবং রিলিজের আইডিয়া নিয়ে।

সারগাম তাদের এলবাম করতে রাজী হলো কিন্তু পাল্টা শর্ত দিলো যে এই চার ব্যান্ডের প্রতোক ব্যান্ডের পুরো একটা করে এলবাম বানানোর মতো পরিমাণের গান নিয়ে আসতে হবে। তাহলে সারগাম তাদের এলবাম বানিয়ে দিবে। সারগাম স্টুডিও রকস্ট্রাটার পুরো এলবাম ত্রিশ হাজার টাকার বিনিময়ে করে দিবে বলে দিলো।

এবার রকস্ট্রাটা আরো নতুন কিছু গান লিখে সুর করে বানানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগে গেলো। যেহেতু আগেই “শেষ রাত্রি”, “সামান্য দুঃস্বপ্ন” দুটি গান লেখা এবং সুর করা ছিলো তাদের, তারা এদিক থেকে একটু প্রশান্তি পেয়েছিলেন কিন্ত যেহেতু মইনুল আর ইমরানের দেশ ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছিলো, তাই তারা একটু তাড়াহুড়ায় পড়ে গেলেন। ব্যান্ডের সবাই অনেকটা না খেয়ে, না ঘুমিয়ে অবস্থার মধ্য দিয়েছি নতুন গান তৈরী করতে লাগলেন রেকর্ডিং-এর জন্য। তখনই তারা ভোকাল হিসেবে আবারও “মুশফিক আহমেদ” কে নিলেনএলবাম রেকর্ডের জন্য শোয়েবের বদলে মুশফিককে নেয়ার পিছনে দুটো কারণ ছিলো। একটা ছিলো বাংলা গান রেকর্ডের জন্য। শোয়েবের কথায় কিছুটা বাংলা-ইংরেজি মিলানো টান ছিলো এবং ব্যান্ডের বেজিস্টের সেখানে তীব্র আপত্তি ছিলো কারণ তিনি শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের প্রতি অনেক বেশী জোর দিতেন। সেদিক থেকে আবার মুশফিকের বাংলা উচ্চারণ এবং বাংলা বলার ধরণ অনেকটাই স্বাভাবিক ছিলো। যেহেতু বাংলা গানের জন্য শোয়েবের চেয়ে মুশফিকের গলা বেশী উপযুক্ত ছিলো, তাই শোয়েবের বদলে মুশফিককে নেয়া হয় এলবাম রেকর্ডের সময়।

আরেকটা যেই কারণ ছিলো মুশফিককে নেয়ার জন্য এলবাম রেকর্ডের সময় তা হলো মুশফিক সে অনেক সুন্দর বাংলা গান লিখতেন এবং তার কিছু অসাধারণ বাংলা গান লেখা ছিলো। হেভী মেটাল ও রক সংস্কৃতির একটা নিয়ম আছে যে সবসময় নিজেদের গান নিজেদের লিখতে হয়। অন্য কেউ তাদের জন্য গান লেখা যাবে না। এবং যেহেতু রকস্ট্রাটা একটা হেভী মেটাল ব্যান্ড ছিলো তাই তারা মুশফিককে এলবাম রেকর্ডের সময় নিয়েছিলেন।

যথাযথভাবে গান লেখা শুরু হয়ে গেলো। মইনুল, আরশাদ, ইমরান সহ সবাই মিলে গান লেখা শুরু করলেন এবং মুশফিক রেকর্ডিং এর জন্য নিজের লেখা এবং সুর করা কিছু গান আনলেন। সেই এলবামের সবচেয়ে বেশী গাওয়া গান মুশফিকেরই ছিলো, মুশফিক একাই সাতটি গান গেয়েছিলো সেই এলবামের।

যেহেতু তখনকার সময়ে শুধুমাত্র রকস্ট্রাটাই ডাবল বেজ ড্রামকিট ব্যবহার করতো তাদের বিভিন্ন গানে, গানের রেকর্ডিং এর সময় সেটা একটা বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তাই তারা অন্য ব্যান্ডের থেকে আলাদা ড্রামকিট এর পার্ট ধার করে নিয়ে এসে একটা ডাবল বেজ ড্রামকিট বানিয়ে গানগুলো রেকর্ড করতে লাগলো।

নয়টি গানের রেকর্ডের পর ইমরানের যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেতে হলো। তাই মইনুলকে একাই দুই গিটারের সব কাজ করতে হয়েছিলো তাদের এলবামের দশম গানটি শেষ করার জন্য। ইমরান চলে যাবার পর “রক্তে ভেজা মাটি” গানটি করা হয়।

ইমরানের শেষদিন সারগামে।

তখন যেহেতু ডিস্ক বা সিডি ছিলো না, তাই তখন ক্যাসেটে এলবাম রেকর্ড করতে হতো। ষাট মিনিট একদিকে, বাকি ষাট মিনিট উল্টো দিকে। দশটা গান রেকর্ডের পর ক্যাসেটে প্রায় নয় মিনিটের মতো খালি জায়গা ছিলো তাই তারা সেই এলবামের জন্য একটা নতুন গান লিখে সুর করে সেই এলবামের এগারো নাম্বার গানের জন্ম দিলেন। যেটা ছিলো সেই এলবামের “কালো রাত” গানটি।

গানটি ছিলো ১৯৯১ সালে যেই সাইক্লোনটি হানা দিয়েছিলো বাংলাদেশের সমুদ্র নিকটবর্তী এলাকাগুলোতে, সেই সাইক্লোনটিকে নিয়ে। রকস্ট্রাটা সবসময়ই তাদের সকল গান বিভিন্ন ঘটনার উপর ভিত্তি করে করেছে, কখনো কোন প্রেমের গান করেনি।

আরশাদ এবং মইনুল ব্যান্ডের ড্রামার মাহবুবুর রশীদ থেকে কিছু পরামর্শ নিয়ে গানটিকে আট মিনিটের একটু বেশি বানান। সেই গানটির গিটারের কাজ শেষ হবার সাথে সাথেই মইনুলও যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

সাতটি গান রেকর্ড করেই বিশেষ কারণে মুশফিককে বিদায় নিতে হলো। বাকি দুইটি গান “শান্তির স্বপ্ন” এবং “নির্বাসন” ব্যান্ডের বেজিস্ট আরশাদের গলায় তোলা হলো এবং আর বাকি দুইটি গান “মুক্তি দাও” এবং “কালো রাত” ওয়ারফেইজের তৎকালীন ভোকালিস্ট সঞ্জয়কে গেস্ট ভোকালিস্ট হিসেবে এনে রেকর্ড করা হয়।

রেকর্ডিং এর পর এলবাম মাস্টারিং করার সময় “কালো রাত” গানটির গিটারের রেকর্ড দুর্ঘটনাবশত ডিলিট হয়ে যায় এবং মইনুল ততোদিনে আমেরিকা চলে যাওয়ায় একটা ঝামেলা দেখা দেয়। সেই সময় ওয়ারফেইজ, ইন ঢাকা এবং এইসেসের গিটারিস্টদেরকেও কাওকে পাওয়া যাচ্ছিলো না অনিবার্য কারণবশত। আরশাদ পরে “মিনহাজ আহমেদ পিকলু” এর শরণাপন্ন হয়ে তাকে গেস্ট গিটারিস্ট হিসেবে গিটারের কাজটি তাকে দিয়ে আবার করিয়ে নেন। 

সেই সময় ইন ঢাকার “মাসুক রহমান” ঢাকায় ব্যক্তিগত সফরে আসলে আরশাদ তাকে “কালো রাত” গানটির (সম্ভবত শেষ অংশটুকু) লিড গিটারের কাজটি করার জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং মাসুক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেই লিড গিটারের শেষ কাজটুকু করে দেন। সেই অংশটুকু করতে কয়েক মিনিট লেগেছিলো।

এভাবেই একসময় সব গান রেকর্ড হয়ে গেলো এবং রকস্ট্রাটা’র একটা এলবাম তৈরীর কাজ শেষ হলো সারগাম রেকর্ডসের। এই এলবামে যেহেতু ডাবল বেজ ড্রামকিট ব্যবহার করা হয়েছে, তাই এই এলবামটি ছিলো বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসের ডাবল বেজ ড্রামকিট ব্যবহার প্রসার করার পাইওনিয়ার। ১৯৯২ সালেই তারা তাদের প্রথম সেল্ফ-টাইটেলড এলবাম “রকস্ট্রাটা” মুক্তি দিয়ে তৎকালীন বাংলাদেশের হেভীমেটাল সিনে একটা ইতিহাসের সূচনা করে।

তাদের প্রথম এলবাম কভারটির কনসেপ্ট এবং ডিজাইন ছিলো “আবদুল্লাহ আর হোসাইন” এর। সেটি ছিলো হাতে আঁকা পুরোটা যেখানে বর্তমান সব এলবামের ডিজাইন কম্পিউটারে করা হয়।

রকস্ট্রাটার আরেকটা বড় যেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো তা হলো যেহেতু তখন ক্যাসেট আকারে এলবাম বের হতো, সেই ক্যাসেটে কেউ একজন “রকস্ট্রাটা” বাংলা ফন্টে লিখতে গিয়ে “রকস্টারটা” লিখে ফেলে। এর কারণে অনেকেই ব্যান্ডের নাম সঠিকভাবে উচ্চারণ না করতে পেরে সেটা বিকৃত করে “রকস্ট্রাটা” এর বদলে “রকস্টারটা” ডাকতোএই বিকৃত নাম এলবামের কভারের উপর বাংলা ফন্টে দেখা যায় কিন্তু সঠিক বানানটা এলবামের কভারের সমাধিস্তম্ভের উপর দেখা যায়।

এলবামের ক্যাসেটে ব্যান্ডের নামের ভুল বানান “রকস্টারটা”

পরে যখন এলবাম সিডি আকারে বের হয়, তখন সেটা ঠিক করে দেয়া হয় এবং বাংলাতেও “রকস্ট্রাটা” বানান লিখে দেয়া হয়।

এলবাম রেকর্ড এবং রিলিজের পর ১৯৯৩ সালের থেকে মইনুল, আরশাদ, মুশফিক মিউজিক সিন থেকে পুরোপুরি যোগাযোগের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। যদিও ইমরান আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ব্যান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি তার ঢাকার পুরান হেভী মেটালের দিনগুলোর বন্ধু মাশুক এবং তুষার কে নিয়ে “এলিফ্যান্ট রোড” নামক একটা স্টুডিও এলবাম করেন যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন। তাদের সেই ব্যান্ডের নাম ছিলো “এলিফ্যান্ট রোড”।

ব্যান্ডের ড্রামার মাহবুবুর রশীদ ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পযন্ত মাইলসের সাথে বাজাতেন এবং ১৯৯৬ সালের আগস্টে তিনিও উচ্চ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্য আমেরিকায় পাড়ি জমান।

মুশফিক বাংলাদেশের আরেকটি পাইওনিয়ার ব্যান্ড “ওয়েভস” এর সাথে একটি এলবাম রেকর্ড করে। ওয়েভসের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন “ইফতেখার শিকদার”।

২০০৮ বা ২০০৯ এর দিকে বেজিস্ট আরশাদ আমীন “স্টোন ফ্রি” ব্যান্ডের সাথে সংযুক্ত হয়েছিলেন যারা “পিংক ফ্লয়েড” ট্রিবিউট ব্যান্ড ছিলো। তারা ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে অসাধারণ কিছু শো করেছিলেন। সেই শোগুলোতে লেজার সহ অন্যন্য দারুণ সব ইফেক্ট দেয়া হতো এবং অসাধারণ সাউন্ড সিস্টেমের কারণে ডেভিড গিলমোর এবং রজার ওয়াটারসের পিংক ফ্লয়েডের একটা আভাস দিতো।

তাই তাদের শো গুলো অনেক প্রশংসিত হতো। তাদের এই শোগুলো এতো ভালো এবং অসাধারণ হতো যে আরশাদ এবং এই স্টোন ফ্রি ব্যান্ড অনেক সাড়া ফেলে দিয়েছিলো ব্যান্ড মিউজিক সীনে তখন।

অনেকদিন ধরে রকস্ট্রাটার কোন খোঁজ ছিলো না কিন্তু ২০০৯ সালে যখন ওয়ারফেইজের ২৫ বছর পূর্তি রিইউনিয়ন কনসার্ট হলো, সেটার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তখন রকস্ট্রাটার সদস্যরাও তাদের রিইউনিউন শো করার কথা বলা শুরু করলেন। কিন্তু তারা একটা এলবামের উপর ভিত্তি করে রিইউনিয়ন শো করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তারা আয়রন মেইডেন বা ব্ল্যাক স্যাবাথ কভার করার কথা ভাবলেও সেটা খুব বেশী একটা ভালো হবে না মনে হওয়ায় তারা তাদের দ্বিতীয় এলবাম বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন যাতে তারা একটা আড়াই ঘন্টার রিইউনিয়ন শো করার মতোন উপাদান পান। যেহেতু ব্যান্ড সিনে ফেরত আসার কথা একবার ভাবা হয়ে গিয়েছে, এবার তারা সবাই সেটাকে বাস্তবরূপ দিতে উঠে পড়ে লেগে গেলেন।  

ব্যান্ড সদস্যরা সবাই যেটা ভাবা শুরু করলো এবার সেটা হচ্ছে কি টাইপের মিউজিক তারা তাদের এই এলবামে করবেন। একদম প্রথম থেকেই রকস্ট্রাটা মেইন্সট্রিম মিউজিক করার থেকে বিরত থেকে এসেছে। এটা তাদের প্রথম এলবাম থেকেই টের পাওয়া যায় যখন বাংলাদেশে মেটাল মিউজিক ততোটা বিস্তৃতি লাভ করেনি। রকস্ট্রাটার সদস্যরা প্রথম থেকেই তাদের নিজেদের মিউজিক্যাল ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে এসেছে, যেসব শ্রোতা পেয়েছে তাদের সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে সাফল্যের সাথে এবং কখনোই হতাশ হননি। একই জিনিস তাদের সবার মধ্য কাজ করেছে যখন নতুন এলবাম নিয়ে কাজ করা শুরু করলেন। তারা ঠিক করলেন ওল্ড স্কুল হেভী মেটাল জনরা নিয়ে কাজ করবেন।

তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো এমন কিছু গান রেকর্ড করা যেসব লাইভে বাজিয়ে তারা আনন্দ পাবেন এবং তাদের ভক্তরাও সেটা দীর্ঘদিন মনে রাখবে। তারা তাদের নতুন এলবামে তাদের হেভী মেটালের বৈশিষ্টগুলো এবং অসাধারণ মেলোডীগুলো তাদের কম্পোজিশনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। যেটা পরে তাদের দ্বিতীয় এলবাম “নতুন স্বাদের খোঁজে” তে টের পাওয়া গিয়েছে।

আরেকটা যেই সমস্যা তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিলো তা হচ্ছে বাস্তব পথের দূরত্ব। তারা সবাই ভৌগলিকভাবে দুটো আলাদা মহাদেশে অবস্থান করছিলেন। আরশাদ এবং মুশফিক ঢাকায় এবং বাকি তিনজন মইনুল, ইমরান আর মাহবুব আমেরিকায়। তাদের অবস্থানের দূরত্ব থাকার পরেও তারা স্কাইপ, ড্রপবক্স, গুগল প্লাস এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে লিরিক্স এবং সুর আদান-প্রদান করতেন একে অপরের সাথে। কয়েকমাসের পরিশ্রমের পর তারা একটা ডেমো ট্র্যাক বানালেন নিজেদের হোম স্টুডিও থেকেই। রেকর্ডিং এর জায়গা এবং তারিখ ঠিক হলো। রেকর্ডিং স্টুডিও হিসেব বেছে নেয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার মিনেপোলিসের “উইন্টারল্যান্ড স্টুডিওস” কে। আরশাদ সেখানের উদ্দেশ্য ঢাকার থেকে রওনা দিলেন। মাহবুব মিসিসিপির জ্যাকসন থেকে ফ্লাইট ধরে চলে আসলেন সেখানে এবং তাদের দ্বিতীয় এলবামের কাজ শুরু হলো।

দ্বিতীয় এলবামের এগারোটা গানের সবগুলোর ড্রামের কাজ দুইদিনে করা শেষ হয়ে গেলো প্রতিদিন ১২ ঘন্টার শিফট নিয়ে নিয়ে। গিটার এবং ড্রামসের কাজ যুক্তরাষ্ট্রে হলেও গিটার এবং ভোকালের কাজ বাংলাদেশে করা হয়েছিলো এবং সব গান রেকর্ডিংইয়ের পর সেটার মিক্সিং যুক্তরাষ্ট্রে করা হয়েছিলো। এলবাম প্রোডাকশন এবং পাবলিকেশন করা হয়েছিলো “জি-সিরিজ প্রোডাকশন কোম্পানি” থেকে। এবং অনেক প্রতীক্ষার পর অবশেষে ২০১৪ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারিতে তাদের সিডি লাঞ্চিং অনুষ্ঠান হয়ে তাদের দ্বিতীয় এলবাম “নতুন স্বাদের খোঁজে” মুক্তি পায়অনুষ্ঠানটি করা হয় সেই “ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে” যেখানে তিন দশক আগে তারা তাদের প্রথম শো করেছিলেন।

এই অনুষ্ঠানটি পুরোটির ডিজাইন, তত্ত্বাবধান এবং সম্পন্নের কাজ আরশাদ আমীন এবং “লাইভস্কোয়ার এন্টারটেইনমেন্ট” করছিলো। ইমরান, মাহবুব এবং মইনুল গুগল প্লাস ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানটিতে ওয়ারফেইজের ইব্রাহীম আহমেদ কমল, ফিডব্যাকের মাকসুদ, এলআরবির আইয়ুব বাচ্চু সহ প্রমুখ বিখ্যাত সব মিউজিসিয়ান উপস্থিত হয়েছিলো। সেই অনুষ্ঠানটিতে অন্যান্য অনেক ব্যান্ড রকস্ট্রাটার প্রথম এলবামের অনেক গান পারফর্ম করেছিলেন। রকস্ট্রাটার সঙ্গে গেস্ট আর্টিস্ট হিসেবে পারফর্ম করেন আর্টসেলের জর্জ লিংকন ডি কস্টা, আর্বোভাইরাস ব্যান্ডের সুফি, ক্রিপটিক ফেইট ব্যান্ডের শাকিব চৌধুরী, পাওয়ারসার্জ ব্যান্ডের জামশেদ চৌধুরী, রেডিওঅ্যাক্টিভ ব্যান্ডের পলাশ নূর এবং ওয়ারফেইজের গিটারিস্ট ইব্রাহীম আহমেদ কমল।

দ্বিতীয় এলবামটি ইলেক্ট্রনিক পারচেজ এবং আইটিউন্স এবং এমাজনে ডাউনলোডের জন্য এমপিথ্রি আকারে ছাড়া হয়েছিলো যাতে রকস্ট্রাটার ভক্তরা তাদের নতুন এলবামের গানগুলো বৈধ উপায়ে শুনতে পারে। সেই গানগুলো কেও বৈধ উপায়ে শুনতে চাইলে এখনো সেই লিংকগুলো তাদের ফেসবুক পেইজে Rockstrata Official এর এবাউটে দেয়া আছে।

ডিস্কোগ্রাফী:-

রকস্ট্রাটা এই পযন্ত দুইটি এলবাম বের করেছে। সেগুলো হলো,

  • রকস্ট্রাটা(১৯৯২)
  • নতুন স্বাদের খোঁজে(২০১৪)

রকস্ট্রাটার দুটি এলবামসমূহের প্রচ্ছদ।

ট্র্যাক লিস্টঃ-

রকস্ট্রাটা (১৯৯২)
১. রক্তে ভেজা মাটি
২. আর্তনাদ
৩. নির্বাসন
৪. নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা
৫. সামান্য দুঃস্বপ্ন
৬. মুক্তি দাও
৭. শেষ রাত্রি
৮. সত্য লোক
৯. পাগলটা
১০. শান্তির স্বপ্ন
১১. কালো রাত

নতুন স্বাদের খোঁজে (২০১৪)
১. এই আমার জীবনধারা
২. গোপন কুঠুরি
৩. মরণ বৃষ্টি
৪. দুই
৫. এইটুকু আশা
৬. নতুন স্বাদের খোঁজে
৭. জোৎস্না রাঙা এই আকাশ
৮. অশান্তি
৯. চলো হারিয়ে যাই
১০. এই বসন্তে
১১. স্বচ্ছ মানুষ

লাইন-আপঃ

ব্যান্ডের জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে অনেকেই ব্যান্ডের সাথে কাজ করে গিয়েছে বা সংযুক্ত হয়েছিলো। তারা হলো,

বর্তমানঃ

  • আরশাদ আমীন ~ বেজ এবং ব্যান্ড লিডার (১৯৮৫-বর্তমান)
  • মইনুল ইসলাম ~ গিটার (১৯৮৫-বর্তমান)
  • ইমরান হোসেন ~ গিটার (১৯৮৫-বর্তমান)
  • মাহবুবুর রশীদ ~ ড্রামস (১৯৮৫-বর্তমান)
  • মুশফিক আহমেদ ~ ভোকাল (১৯৯১- বর্তমান)

রকস্ট্রাটার বর্তমান লাইন-আপ (বা থেকে মুশফিক-মইনুল-আরশাদ-ইমরান-মাহবুব)

অতীতঃ

  • আসিফ আলম (বীরু) ~ ভোকাল (১৯৮৫-১৯৮৭)
  • শোয়েব রহমান ~ ভোকাল (১৯৮৭-১৯৯১)
  • মিনহাজ আহমেদ পিকলু (১৯৯১-১৯৯১)

এছাড়াও ফেসবুকের বিভিন্ন মিউজিক গ্রুপে ফ্যানদের থেকে আমরা “নিয়ন আলোয়” অনেক প্রশ্ন যোগাড় করেছি, সেসব থেকে বাছাইকৃত কিছু প্রশ্ন আমরা ব্যান্ডের বেজিস্ট “আরশাদ আমীন”কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। নিচে সেগুলো দেয়া হলো।

আরশাদ আমীন

# এতো মিউজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট থাকতে বেজ গিটারই কেন? কখন থেকে বেজ বাজানোর ইচ্ছে হলো? বেজ কি নিজে শিখেছেন নাকি অন্য কারো থেকে শিখেছেন?

“না, আমাকে কেউ শেখায়নি। আমাদের কাউকেই কেউ শেখায়নি, আমরা সবাই নিজে শিখেছি। বেজ কেন করলাম? কারণ যেটা বললাম ঐ সময় বেজের বড় একটা গ্যাপ ছিলো রকস্ট্রাটায়। ইমরান গিটারে চলে গিয়েছিলো এবং তারা আমার চেয়ে ভালো গিটারিস্ট ছিলো তাই আমি চিন্তা করলাম বেজ নয় কেন? আমি কিন্তু বেজের বড় ভক্ত কারণ রজার ওয়াটারস এবং জিজার বাটলার এই দুইজনের খুব বড় ফ্যান ছিলাম।”  

# আপনার একবার পিংক ফ্লয়েডের রজার ওয়াটারস এর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো? তিনি আপনার প্রতি অনেক অনুরাগী হয়েছিলেন আপনি একটা বাংলাদেশের পতাকা মাথায় পড়ে থাকার জন্য? তিনি সম্ভবত আপনাকে তার ইমেইল এড্রেস দিয়েছিলেন অটোগ্রাফ দেয়ার সময়। সেই সাক্ষাৎ এর ডিটেইলস কি বলা যাবে? আপনার সেই রজার ওয়াটারসের সাথে দেখা হবার অভিজ্ঞতা এবং উনি কিভাবে আপনার মিউজিকে প্রভাব ফেলেছেন সেসব জানতে খুবই আগ্রহী কিছু ভক্ত। সেসব বলা যাবে কি?

“না, এরকম হয়নি। সেটা কথা বলেছে। শো-তে সে বলেছিলো যে, বোধহয় ইউটিউব বা ফেসবুকে আছে “There’s a guy down here he’s a twenty seven years fan from Bangladesh” ঐ যে কাগজ নিয়েছিলাম। তারপর আমার সাথে যখন স্টেজে আসলো সে সামনে একদম আমি  হাত বাড়িয়ে আমি রজার, রজার করলাম। সে বললো “Hey, I can’t reach you.” এটা আমার জন্য অনেক বড় একটা জিনিস ছিলো, সে আমার সাথে কথা বলা।  এমনকি যাকে ছোটবেলার থেকে দেখে আমি তার কথা বলতেই বড় ভক্ত ছিলাম এবং এখনো অনেক বড় ভক্ত আছি। মানে যখন সে ওয়ার্ল্ড ট্যুর এনাউন্স করলো ২০১০ এ, টরোন্টোর দিকে লঞ্চ করলো শো। আমি চলে গেলাম টরোন্টোতে শো দেখতে। ফার্স্ট শো দেখবো, টিকেট পাই নাই। সেকেন্ড শো দেখলাম।”

# রকস্ট্রাটা সেই ৮০ এর দশকে শো গুলোতে বিদেশি কোন কোন ব্যান্ডের গান কভার করতো? সেই শো গুলো কোন সব ভেন্যুতে হতো? দর্শক হতো কেমন? দর্শক কেমন রিয়েক্ট করতো?

“কম দর্শক. ধরো, হয়তোবা ষাট-সত্তর বা একশোজন খুব বেশী হলে। মাত্র একশোজন, কিন্তু সেই একশোজন ছিলো একদম খাটিএকদম কঠিন ভক্তওরা, মানে এমনও ছিলো, ওরা একটা দল ছিলো নারায়ণগঞ্জ থেকে বাস করে সবসময় আসতো। ওরা পোস্টার-টোস্টার, আমাদের ছবি-টবি তুলে, ঐ সময় ছবি-তবি তুলে পোস্টার-টোস্টার বানায়া রাখতো বাসায়। এবং তারা কঠিন ভক্ত ছিলো মানে, তারা অসাধারন ছিলো। মানে আমরা ঐ একশোজনের জন্যই বাজাতাম। আমাদের রকস্ট্রাটার খুবই ছোট ফ্যানবেজ ছিলো কিন্তু যা ছিলো, একদম খাঁটি। মানে, তারা একদম পাগলা ভক্ত ছিলোএকশোজনই একহাজার-দুইহাজারের সমান। এবং তোমার দরকারও নেই। আমার মনে হয় কি তোমার মিউজিকের যদি কিছু খাঁটি ভক্ত থাকে যারা তোমার কাজকে ভালোবাসে, সেটাই একটা অন্যরকম ভালো অনুভূতি।”

# রকস্ট্রাটা আবারও শুরু করার আগের সময়ে আপনি মিউজিকের সাথে কি জড়িত ছিলেন কোনভাবে?

“না, আমি একদম না। আমি এলবাম করার পর আমি যে মিউজিক ছাড়লাম তারপর ২০০১ এ একটা গিটার কিনলাম তারপর হয়তো গিটার বাজালাম। তো মাঝখানে প্রায় আট বছরের একটা গ্যাপ আছে।”

# দ্বিতীয় এলবামের নাম “নতুন স্বাদের খোঁজে” কেনো? নামকরণের পিছনে কাহিনীটা কি?

“নতুন স্বাদের খোঁজে” মইনুলের কাজ ছিলো কিন্তু আমি প্রস্তাব দিলাম এলবামের নামটা করা হোক। দুইটা নাম ছিলো মাথায়। একটা ছিলো “দুই” আরেকটা “নতুন স্বাদের খোঁজে”। লিরিক্সের দিক থেকে নতুন স্বাদের খোঁজের একটা সেই পুরানো রকস্ট্রাটা ভাব ছিলো। ঐটা, তারপর “স্বচ্ছ মানুষ”, এখানে একটা রকস্ট্রাটা ভাব আছে। আমি খুব ইন্সিস্ট করলাম এলবামের নাম “নতুন স্বাদের খোঁজে” দেয়ার। আরেকটা কারন ছিলো কি যে সাউন্ড একদম অন্যরকম ছিলো। এই এলবামের মিউজিকটা অন্য ধাঁচে করা। দুটো এলবামে গানের ধরণ একদম অন্যরকম। এটা ছিলো নতুন স্বাদের খোঁজে। ঐ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন স্বাদের খোঁজে। কিন্তু সেই গানটা কিন্তু এমন কোন মানে বহন করে না। সেই গানটির কিন্তু আলাদা অন্য একটা মানে আছে।”

# আর্তনাদ এবং নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা গান দুটির পিছনে বিশেষ কোন গল্প আছে কি?

আর্তনাদ আমি লিখেছিলাম এবং সুরও আমার। আমার আব্বা বকা দিয়েছিলো, বকার চোটে লিখে ফেলেছিলাম রুমে বসে বসে তারপর কিভাবে কিভাবে সুর হয়ে গেলো। খুবই সাদামাটা একটা গান, কর্ডস চলবে আর ব্ল্যাক স্যাবাথের মতো একটা বেজ চলবে আর ওর মধ্যই গান গাওয়া হবে। একদম সত্যি বলতে কি, আমরা ব্ল্যাক স্যাবাথ শুনে, মেইডেন শুনে, লেড জ্যাপ শুনে বড় হয়েছি তো এবং বাজাতামও যেহেতু তো প্রভাব তো আসেই। বেসের ব্ল্যাক স্যাবাথের হেভেন এন্ড হেল। এটাই বাস্তবতা। আমি সেই বেজ পার্টটা খুবই পছন্দ করতাম এবং মন কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম এবং আর্তনাদে যেই ড্রাম পার্টটা ছিলো সেটা হোয়াইট লায়নের একটা গান আছে স্ট্যান্ড আপ এন্ড ক্রাই ফর ফ্রিডম সেখানের থেকে নেয়া। ঐ টাইপেরই একটা গান করতে চেয়েছিলাম। গানটা যখন রেকর্ড করছিলাম সারগামে তখন দুলাল ভাই রেকর্ড করছিলেন। উনি এই গান শুনে খুব মজা পেয়েছিলেন। বলেছে এই গানটা কিন্তু হিট হবে। শেষে যখন “আমি তো তোমাদেরই একজন” কোরাসটা আসে তখন সেটা কিন্তু সঞ্জয় গাচ্ছিলো। এখানে কিন্তু ব্যাকিং ভোকাল সঞ্জয় আছে। ঘটনা হচ্ছে আমার যেই এক্সপেরিয়েন্সটা আর্তনাদ থেকে মানে যেই অনুভূতিটা আমি বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছি, আমার এই জীবন ভালো লাগেনা। আমি যদি নিজের জীবন নিজে যাপন করতে পারতাম। এই কনসেপ্ট থেকেই গানটা এসেছে। এখানে সঞ্জয় আর মুশফিকের স্কেল একই থাকলেও তাদের সুর একদমই আলাদা ছিলো, দুইজন দুটো আলাদা সুরে গাচ্ছিলো। এবং নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা একটা সুন্দর গান। ইমরান একটা সুন্দর রিফ নিয়ে এসেছিলো। নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা মানে আমরা উন্নতি করছি এবং আমরা এমন একটা সময়ে এসেছি যেখানে সবকিছু খুবই আগাম। কিন্তু এখনো কিন্তু আমরা মানসিক হিসাবে সেই লেভেলে যেতে পারিনি। এটাই আমাদের নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা, আমরা এতোকিছু অর্জন করেছি কিন্তু আমরা তো মানুষই হতে পারি নাই ঠিকমতো, সভ্য মানুষ আর কি।এটা একটা অসাধারণ লিরিক্স। তারপর “মুক্তি দাও” এর লিরিক্স, “মুক্তি দাও, স্বাধীনতা দাও”। কি সুন্দর লাইন, কয়জন বুঝে এটা? স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু আমরা কি আসলেও মুক্ত?”

# রকস্ট্রাটার ব্যাক করার প্ল্যান আছে কিনা আপনাদের?  ভাই কি স্টেজে আর কোনদিন বেজ বাজাবেন কিনা?

“স্টেজে পাইতেই পারো, বললাম না অনেক প্রেশার দিচ্ছে মানুষজন, হতেও পারে। অনেক প্রেশার। কিন্তু এলবাম করার আসলে ইচ্ছে নাই যদিও ইমরান অনেক প্রেশার দেয় যে চল পাঁচটা-ছয়টা গান করি। আমি মাঝখানে অবশ্য দুই-তিনটা কম্পোজও করেছিলাম।”

# ওয়ান লাস্ট লাইভ এর ডিভিডি আনুমানিক কবে বের হবে?

“সব হয়ে গেছে, ডিভিডি প্রিন্টও হয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রিন্ট করাতে পারলাম না, ইন্ডিয়া থেকে করিয়েছি। সনি ইন্ডিয়া প্রিন্ট করলো। ডিভিডিগুলো আমার কাছে না আসলেও আমার লোকের কাছে চলে এসেছে, সে আমাকে গতকাল ছবিও পাঠালো সবকিছুর। সবকিছু শেষ, কভার শেষ, স্লিভ শেষ, ডিস্ক করা শেষ, এখন শুধু ঢাকায় লঞ্চিং ডেট দেয়া বাকী। সম্ভবত ঈদের পরে করে ফেলবো। অনেক সময় লাগলো কারন আমি খুব ডিটেইলসে খেয়াল রাখি। বাংলাদেশে করতে হলে চার জিবির ব্লু ডিস্কে করতে হচ্ছিলো। কোয়ালিটি এতো খারাপ আসছিলো যে সাউন্ড ফেটে ফেটে যাচ্ছিলো সবকিছু। আমি বললাম যে করবো না। তারপর সনির সাথে যোগাযোগ করলাম , ডিভিডি নাইন ৮.৫ জিবি ডিস্ক। আগের চেয়ে বেটার কোয়ালিটি এটা অনেক। সেখানে ভিডিও এবং সাউন্ড কোয়ালিটি অনেক ভালো, আমাদের ব্যান্ডের সবাইকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টরী আছে। সেই ডিভিডির সব হয়ে গেছে, সবকিছু করা শেষ। এখন শুধু লঞ্চিং ডেট ঘোষণা করা বাকী।”

# এটার নাম “ওয়ান লাস্ট লাইভ” কেন?

“ওয়ান লাস্ট লাইভ কারন এটা ছিলো এবং এখনো আছে বলতে পারো যে শেষ লাইভ ভিডিও। কারন আমাদের জন্য ব্যান্ড করা এবং শো করা খুব কঠিন যেহেতু মইনুল থাকে ক্যালিফোর্নিয়া, ইমরান থাকে মিনেপোলিসে, মাহবুব থাকে মিসিসিপি, আমি থাকি ঢাকায়। তারপর একসাথে হওয়া, হয়ে একমাসে প্র্যাকটিস করা। আমরা যখন শেষবার প্র্যাকটিস করি, তখন আমি আমার এই বাসার নীচতলা ভাড়া নিয়েছিলাম। এই নীচতলায় পুরো ব্যান্ড ছিলো। এবং আমরা একসাথে থেকেছি একমাস। আর এখানে মিউজিক প্ল্যানেটে একমাস প্র্যাকটিস করেছি।”

# রকস্ট্রাটার কি আর কোন শো করার প্ল্যান আছে ঢাকার বাইরে কোথাও?

“না রকস্ট্রাটার আর আপাতত কোন প্ল্যান নেই শো করার যেহেতু আগে বললামই আমাদের জন্য শো করা খুবই কঠিন যেহেতু আমাদের এক একজন এক এক জায়গায় থাকি পৃথিবীর। কিন্তু, আমাদের চিটাগং এ একটা শো করার ইচ্ছে আছে কারন চিটাগং ক্রাউড ইজ এমেইজিং। চিটাগংয়ের ক্রাউডের তুলনায় ঢাকার ক্রাউডের কোন তুলনাই হয় না। চিটাগংয়ের ক্রাউড বেস্ট।” 

রকস্ট্রাটা যেভাবে পরবর্তীতে বাংলাদেশে বাংলা হেভী মেটালের আবির্ভাব ঘটিয়েছে, সেভাবেই তারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে অনেক ব্যান্ডের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাদের মিউজিক সবসময় অন্যরকম ছিলো, কখনোই গতানুগতিক ছিলো না। তাদের এলবাম দুটোতে সেটি টের পাওয়া যায়।তাদের কোনপ্রকার প্রেমের গান ছিলো না, সব গান ছিলো ঘটনার প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা। এবং এসব গানের জন্য এবং তাদের পথচলার গল্পগুলোই সামনে তরুণদের হৃদয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখবে সময়ের স্রোতে। যোগাবে তরুণদের মনে অনুপ্রেরণা, যোগাবে দুর্গম পথ পাড়ি দেবার সাহস এই করে রকস্ট্রাটার সদস্যরা কামনা।

তথ্যসুত্রঃ- https://en.wikipedia.org/wiki/Rockstrata

[এই ফিচারটির জন্য রাসেল চৌধুরী এবং উইকিপিডিয়া পেইজের লেখক মিঠু ফাহমী’র প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা।]

Most Popular

To Top