বিশেষ

শিক্ষা কি শুধু বইপত্রে হয়? নাটক-সিনেমা দেখে কিছুই কি শিখা যায় না??

বিশ্বজোড়া পাঠশালা.........

আজ থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর আগের কথা। উত্তরবঙ্গের কোন এক উপজেলা শহরের সরকারী কর্মকর্তাদের ছোট্ট তিন কামরার কোয়ার্টার। সেই কোয়ার্টারের ছোট্ট ছিমছাম ড্রয়িং রুমে ২০ ইঞ্চি সাদাকালো ন্যাশনাল টিভি চলছে। ডিশ এ্যান্টেনার যুগ তখনও শুরু হয়নি তাই লোহার রড বের হয়ে থাকা সাধারন এ্যান্টেনার বিশেষ একমুখী দিক নির্দেশনার কল্যাণে ভারতের ন্যাশনাল চ্যানেলগুলো দেখা যায়। শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশি মুভি আর শনি, রবি এই দুইদিন হিন্দি আর কলকাতার বাংলা মুভি দেখায় তখন। আর তাই সপ্তাহের এই দুই দিন সন্ধ্যা হলেই এই বাড়ির ছোট মেয়েটার মন উশখুশ। পড়ায় মন বসে না আর। কান পাতা ড্রয়িং রুমে।

এমন সময় সেই কাঙ্খিত ডাক “মমিইইই, আজ খুব ভাল মুভি দেখাচ্ছে, অনেক পুরনো, চলে আস মা।” আর কি, এক দৌড়ে আমি ড্রয়িং রুমে। এদিকে আমার মায়ের মুখ ভার, রাগে গজ গজ করছে, “জীবনে এমন বাপ দেখিনি, পড়া বাদ দিয়ে সিনেমা দেখতে ডাকে। বস্তাপচা সিনেমা সব, চৌদ্দ বার একই সিনেমা দেখায়।” এদিকে আমার বাবার প্রচ্ছন্ন সায়, “আরে একটা ভাল সিনেমা থেকেও জীবনে শেখার আছে অনেক কিছু। খালি বই পড়ে সব কিছু হয়না। সিনেমা দেখে পরে পড়বে। তুমি দেখ মা, খুব ভাল সিনেমা, আমি এটা আগে দেখছিলাম একবার ভার্সিটিতে পড়তে, বন্ধুদের সাথে হলে গিয়ে।”

আমি নির্বিকার, অত কিছু শোনার সময় আছে নাকি? মন ঢেলে দিয়েছি উত্তম-সুচিত্রায়। সেই থেকে সাদা কালোর এই জগৎটাকে এক অন্যরকম ভালবেসে ফেলেছি আমি। সময় যত গিয়েছে, রাজ্জাক-কবরী, উত্তম-সুচিত্রা, সুপ্রিয়া-সৌমিত্র, সাবিত্রী, রাজকাপুর, নার্গিস, মধুবালা সেই সাদাকালো বাক্সবন্দী মানুষেরা কিভাবে যেন আমার ছোট বেলার রঙিন স্মৃতিতে পরিণত হয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি। এখনো তাই চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে পুরনো কোন মুভির গান দেখি, অটোমেটিকভাবেই রিমোটে হাত স্থির হয়ে যায়, পাল্টাতে পারি না সহজে।

এই যে আমাদের ছোটবেলায় ড্রয়িং রুমে সবাই একসাথে বসে মুভি দেখা এই ব্যাপারগুলি কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এক সাথে বসে সাপ্তাহিক নাটক, ধারাবাহিক নাটক, মনের মুকুরে, ম্যাকগাইভার, ডার্ক জাস্টিস, সিন্দবাদ- উফফ কি আনন্দেরই না ছিল সেসব দিন! মনে পরে, হুমায়ুন আহমেদ এর একটা নাটক দেখিয়েছিল একবার, নাম “খাদক।” গ্রামের একজন ভোজন রসিক ব্যাক্তিকে একটা পুরো গরু খেতে বলা হয়। বিনিময়ে পুরস্কার হিসেবে তাকে টাকা দেয়া হবে। হত দরিদ্র এই লোকটির টাকা পাওয়ার আশায় চরম কস্ট সহ্য করে দুই চোখ দিয়ে অনবরত পানি ফেলতে ফেলতে জোর করে মাংস খাওয়া আর সেই সাথে তার ছোট ছোট দুই মেয়ের কান্না, “বাবা তোমার খেতে হবেনা, আমাদের টাকা লাগবে না” এই দৃশ্য দেখে আমি কাঁদতে কাঁদতে এত অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম যে বাসার সবাই মিলে নাটক দেখা বাদ দিয়ে আমাকে বোঝাতে লাগল যে এটা নিছক অভিনয়, লোকটা সত্যি জোর করে খাচ্ছে না। এভাবেই একজন ছোট্ট মেয়ের কোমল মনে একজন নাট্যকার তার যাদুকরী প্রভাব বিস্তার করেন। সেই সাথে সে সমব্যাথীও হতে শেখে।

ঘুরে আসুন সেই ধূসর-রঙিন দিনগুলো থেকেঃ “নব্বইয়ে বিটিভি’র পর্দা কাঁপানো মানুষগুলো…”

আসলে আজ যে আমরা আগের মত সেই পরিবেশ পাচ্ছি না তার জন্য তো দায়ী আমরা নিজেরাই। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য আলাদা আলাদা ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকলে নাটক দেখার সময় কোথায়? আর ছোট বাচ্চাদের সামনে অন্তর্জালের অবাধ দুনিয়ার কথা তো আমি এর আগেও অসংখ্যবার বলেছি। এটা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তবে শুধু পারিবারিক বন্ধন কেন, সকল বন্ধনের ক্ষেত্রেই এটি একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। ইন্টারনেটে যে শেখার কিছু নেই আমি তা বলব না কিন্তু একটি শিশুও তো জানে না ওর এখন ঠিক কী শেখা উচিত, কী নয়। আপনি যতক্ষণ না তার নেট ব্রাউজিং কন্ট্রোল করছেন ততক্ষণ তো ওর সামনে যা পড়বে তাই ওর ক্ষুদ্র মস্তিস্কে প্রবেশ করতে থাকবে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েই যদি ধারণ ক্ষমতা পুর্ণ হয় প্রয়োজনীয়টা রাখবে কোথায়?

তাই আবার ফিরে যাই আমার বাবার কথায়। শুধু এ্যাকাডেমিক বই দিয়েই শিক্ষা হয় না। শিক্ষা একটি ভাল মুভি থেকেও হতে পারে। হতে পারে একটা ভাল বই থেকে, গান থেকে। হতে পারে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে পথ শিশুটিকে দেখিয়ে তার জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে তাকে অবহিত করে, বাসায় কাজ করা খেটে খাওয়া মানুষটির কাজের গুরুত্ব তাকে বুঝিয়ে। বাচ্চার সামনে সারাক্ষণ বাসার কাজের লোকটির দুর্নাম গাইবেন না। বরং ও যে পরিবারে কতবড় হেল্প করছে সেটা বুঝিয়ে দিন। আমার মনে আছে আমাদের বাসায় কাজ করা আমার বয়সী এক মেয়ের সাথে একবার আমি দুর্ব্যবহার করেছিলাম। আমার বাবা আমাকে কিছু না বলে আমাকে কাছে নিয়ে একটা গান গেয়ে (উনি অসাধারণ গান গাইতে পারতেন) শোনান। গানটা হল ”এতিমের প্রাণে জ্বালালে আগুন, নবীজীর প্রাণে জ্বলে শতগুণ।” তারপর সেই গানটার অর্থ ব্যাখা করেন আমার কাছে। এখনো কোন এতিম বাচ্চা দেখলে আমার কানে ঠিক এই গানটা বাজে।

শিক্ষা হতে পারে আত্মীয় স্বজনদের সম্মান করা শিখানোর মাঝে। গ্রামে অবস্থান করা নিম্নবিত্ত আত্মীয়-স্বজনকে দেখলে আপনার সন্তান যেন এলিয়েন মনে না করে দয়া করে সেদিকে খেয়াল রাখুন। সেইসাথে ওরাও গ্রামে গেলে যেন পরিচিত পরিবেশ না পেয়ে নাক সিটকে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। সব পরিবেশে ওকে মেশার সুযোগ করে দিন।

আপনার সাথে আপনার আপনজনের বড় কোন সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু আপনার সন্তানকে সাংসারিক আর সম্পর্কের এসব জটিলতা থেকে দূরে রাখুন। সন্তানের উপর অধিকার সবার। আপনার কথায় প্রভাবিত হয়ে ওরা যেন তার মুরুব্বিস্থানীয় কারও উপর বিরুপ ধারণা পোষণ না করে। কারো সম্পর্কে ওর নিজস্ব মতামত গড়ে তুলতে দিন। চাপিয়ে দিবেন না যেন কিছুই। সব চেয়ে বড় কথা সন্তান যেন সামাজিক হয়ে গড়ে উঠে সেটা খেয়াল করুন। ও যেন সবার সাথে মিশতে পারে।

ব্যস্ত লাইফে অনেক সময় আমরা ঘরের বাইরে যেতে চাই না। ছুটির দিনগুলিতেও তাই বাচ্চার হাতে ট্যাব ধরিয়ে আরাম করে সময় পার করে দেই। কিন্তু আপনার বাচ্চাকে ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস করুন। এতে ট্যাবের বাইরেও যে জগতটা অনেক সুন্দর এটা সে বুঝতে পারবে। ও যেন ঘরকুনো না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

সব শেষে আবার সেই এক কথা তা হল, আপনার সন্তানকে অবশ্যই অবশ্যই মানুষকে সম্মান করতে শেখান। এটার কোন বিকল্প নেই। আর তা শেখাতে গেলে সবার আগে আপনি নিজে মানুষকে সম্মান করুন। কারণ আপনার সন্তান সবার আগে আপনাকেই তার আদর্শ মনে করে। আপনার এই স্ট্যাটাস যদি আপনি তার পরিণত বয়স পর্যন্ত বজায় রাখতে পারেন তবেই আপনি সার্থক। আমার এই দশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একটা জিনিস দেখেছি আর তা হল প্রতিটি সন্তানই ছোটবেলায় আচার আচরণ, সভ্য ভব্যতায় তার বাবা এবং মা এর ক্ষুদ্র সংস্করণ। আপনি যদি বাসায় একটা স্ল্যাংও ইউজ করেন পরিদিন স্কুলে সেটি আপনার সন্তানের মুখে শোভা পায়। আর এর উৎস জানতে চাইলে কিন্তু সে অবলীলায় বলে দেয় তার পিতা অথবা মাতার নাম। কাজেই সাবধান! আপনার নিজের আচরণে সংযত হোন।

আসলে একটি সন্তানকে পৃথিবীতে আনার পেছনে বেচারা সন্তানদের তো কোন ভুমিকা নাই। আমরা যখন তাদের ইচ্ছে অনিচ্ছের মুল্য না দিয়ে এই ধরাতলে এনেছি তাই দায় তো আমাদেরই। আসুন আমরা সেই দায়বোধ থেকেই সন্তানকে সুশিক্ষা দেই। শুধু বিদ্যালয় আর শিক্ষকের উপর সব ছেড়ে না দিয়ে নিজেরা এগিয়ে আসি। পুঁথিগত বিদ্যায় আটকে না রেখে তাদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলি। পরিবারে স্ব স্ব ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করি। আশা করি ফলাফল ভাল বই মন্দ হবেনা মোটেই। হ্যাপি প্যারেন্টিং!

Most Popular

To Top