গল্প-সল্প

হলুদ হিমু নীল সাদা আর্জেন্টিনা

হলুদ হিমু নীল সাদা আর্জেন্টিনা

“আসতে পারি?”

মিসির আলী চোখ তুলে তাকালেন। একজন হলুদ পান্জাবী পরা যুবক এসেছেন।

“জী, ভিতরে আসুন, বসুন” মিসির আলী বললেন।

যুবকটি মিসির আলীর সামনে থাকা কাঠের চেয়ারে এসে বসলো।

– “আমি হিমু, ভালো নাম হিমালয়। আমি আপনার কাছে একটা প্রশ্ন নিয়ে এসেছি। উত্তর পেলেই আমি চলে যাবো।”

– “আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না শুধু যুক্তির মাধ্যমে কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। বলুন আপনার কি প্রশ্ন?”

– “আর্জেন্টিনা  দলটি গত ২৮ বছরে কোনো কাপ পায় নি তবুও মানুষ আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট করে। কেন? এর কি কোনো লজিক্যাল ব্যাখ্যা আছে?”

মিসির আলী  হিমুর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “একটু অপেক্ষা করুন।”

বলে তিনি পেপারটা নিয়ে দেখতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর হিমু বলল, “আমার একটু তাড়া আছে। আমি আপনার কাছে উত্তরটা জেনেই চলে যাবো।”

– “আপনার জন্য কি কেউ অপেক্ষা করছে?”

– “জি, কিভাবে বুঝলেন?”

– “আপনি আসার পর থেকে বারবার চলে যাওয়ার কথা বলছেন। আপনার অস্থিরতা দেখে আন্দাজ করলাম। বাইরে কি আপনার প্রেমিকাকে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছেন?”

– “না, ও আমার প্রেমিকা না। জাস্ট ফ্রেন্ড। ওর নাম রুপা, ওই আমাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে।”

– “ওকে। একটু অপেক্ষা করুন।” বলে মিসির আলী আবার পেপারটা মুখের ওপর নিয়ে বসলেন। ২০ মিমিট পর হিমু কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো অস্পস্ট স্বরে। মিসির আলী চোখ তুলে তাকালেন, “কিছু বলবেন?”

– “জী, আমার প্রশ্নের উত্তরটা জানতে চাচ্ছিলাম?” হিমু বলল।

– “আপনি কি ব্রাজিলের সাপোর্টার?”

– “জি না।”

– “সরি, আপনার গায়ে হলুূদ পান্জাবী দেখে ভেবেছিলাম আপনি ব্রাজিল সাপোর্টার। কিছু মনে করবেন না।”

– “আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিলে উপকৃত হতাম।” হিমুর কন্ঠে চাপা বিরক্তি প্রকাশ পেল।

– “আর কিছুক্ষন অপেক্ষা করুন। চা নিয়ে আসি চা খান তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।” বলে মিসির আলী কিচেনের দিকে গেলেন। একটু পর দুই কাপ চা নিয়ে এসে এক কাপ হিমুর সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বাসায় চিনি শেষ হয়ে গেছে আনার কথা মনে ছিল না। তাই আপনাকে চিনি ছাড়া চা দিতে হচ্ছে।”

– “জী, ধন্যবাদ।” হিমু বলল।

– “আচ্ছা হিমু সাহেব আপনার জন্য রুপা কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে?”

– “জী, প্রায় একঘন্টা।”

– “আপনি কতক্ষণ থাকার কথা বলে এসেছেন?”

– “পনেরো মিনিট।”

এবার মিসির আলী একটু হেসে প্রশ্ন করলেন “কেন রুপা অপেক্ষা করছে জানেন?”

– “জি না। এই ব্যাপারে ভাবিনি।” হিমু বলল।

– “কারণ রুপা বিশ্বাস করে আপনি ফিরে যাবেন। আপনি আজ সারাদিন না গেলেও রুপা দাঁড়িয়ে থাকবে আপনার আপেক্ষা করবে। এটার নাম ভালোবাসা।”

– “আপনি ভুল বললেন। আমাদের মধ্যে কোনো প্রেম ভালোবাসা নেই। আমরা জাস্ট ফ্রেন্ড।”

– “আচ্ছা। তাহলে আজ বিকেল পর্যন্ত আপনি এখানে বসে থাকুন। এক্সপেরিমেন্ট হয়ে যাক? দেখুন ও আপনার জন্য অপেক্ষা করে কি না? কি বলেন?”

হিমুর মাথায় জিদ চেপে গেল। এই বুড়ো লোক নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। হিমু ঠান্ডা গলায় বলল, “আচ্ছা বসলাম। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আপনি দিলেন না?”

– “আমার লজিক ঠিক থাকলে আমনি আপনার এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন বলে আশা করছি। এমনি অপেক্ষা করুন আমি  চিনি কিনে নিয়ে আসি। অপেক্ষা করতে সাথে চায়ের প্রয়োজন হবে।” এই বলে মিসির আলী বাইরে চলে গেলেন। চিনি নিয়ে এসে মিসির আলী চা করে হিমুর দিয়ে বললেন, “মেয়েটা এখনো আপনার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে।”

চায়ের কাপ নিয়ে হিমু বারান্দায় এলো। দোতালা বারান্দা থেকে রুপাকে দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা ব্যাগ হাতে নিয়ে রোদে দাঁড়িয়ে আছে। রোদে মেয়েটার মুখ লাল হয়ে গেছে। কিন্তু মেয়েটার কোনো বিকার নেই। হিমু অবাক হলো। ওর তো চলে যাওয়ার কথা। আসার সময় রাগী রাগী গলায় রুপা বলেছিল, “উত্তরটা জেনেই চলে আসবেন। পনেরো মিনিট সময়। বেশি দেরী করবেন না। বেশি দেরী করলে কিন্তু আমি বাসায় চলে যাবো।” তাহলে এই মেয়ে যাচ্ছে না কেন?

মিসির আলী রুমাল দিয়ে চশমা মুছতে মুছতে হিমুর পাশে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।

হিমু বলল, “ওর এভাবে রোদে দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস নেই। আপনি উত্তরটা দিন। আমার যাওয়া উচিত।”

– “আচ্ছা বলি। আপনি হলেন এখানে আর্জেন্টিনা দল আর রুপা হলো আর্জেন্টিনা দলের সাপোর্টার। ও আপনাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। এই ভালোবাসা থেকে আসে বিশ্বাস। তাই ও নির্দ্বিধায় আপনার ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা করছে। ‘বিশ্বাস’ জিনিসটা আসলেই খুব সুন্দর।”

– “তাহলে আপনি বলছেন ভালোবাসাটাই এখানে লজিক হিসেবে কাজ করছে?”

মিসির আলী হাসলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “আপনার এখন রুপার কাছে যাওয়া উচিত। ওকে বাসায় পৌছে দিয়ে আসুন। বিকেল হয়ে গেছে।”

হিমু বলল, “আমাকে একটা সিগারেট দিতে পারবেন? আর আপনার বাসার পিছনের দরজাটা কোনদিকে? আমি এখন রুপার সামনে যেতে চাই না।”

মিসির আলী একটা সিগারেট প্যাকেট থেকে বাড়িয়ে দিয়ে বিস্মিত হয়ে বললেন “পিছনের দরজা এদিকে। কিন্তু কেন?”

– “আমি ভালোবাসার খুব কাছাকাছি যেতে চাই না। মিসির আলী সাহেব সিগারেটটার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।” বলে হিমু পিছনের দরজা দিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল। হিমু কথা দিয়েও রাখলো না।

রুপা এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে যেমন অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা।

লিখেছেনঃ ফাহিম রুশদান

 

 

Most Popular

To Top