ফ্লাডলাইট

মাইকেল বালাকঃ এক রানার্সআপের ইতিকথা

মাইকেল বালাকঃ এক রানার্সআপের ইতিকথা

“রানার্স-আপ” শব্দটি সৃষ্টিকর্তা হয়তো তার কপালে নিজ হাতে খোদাই করে দিয়েছিলেন। বার বার কাপটি ছুঁতে চেয়েও অধরাই থেকে গেছে তার।

২০০২ সাল বায়ার্ন লেভারকুসেনকে নিজ হাতে ফাইনালে ওঠান। কিন্তু জিদানের কারিশমায় পরাজয় বরণ করতে হয় তাকে। রিয়াল জিতে চাম্পিয়ন্সলীগ। এর মাত্র ১ মাস পরে তার হাত ধরেই ফাইনালে জার্মানি। আবার ব্রাজিলের কাছে ২-০ তে হেরে রানার্স-আপ তিনি। এর ঠিক চার বছর পরের কথা, জার্মানি আবার কোয়ার্টারে। ইতালির কাছে হেরে ট্রফি স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি তার। সাল ২০০৮, চেলসির হয়ে চাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে ওঠেন তিনি। তবে আবার সেই ভাগ্যদেবতার খেলা। ম্যানইউ’র কাছে পেনাল্টিতে হেরে ওই রানার্সআপ ট্রফি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে।

হ্যাঁ, আর কেউ নয়, জার্মান টিমের এককালের প্রানভোমরা মাইকেল বালাক এর কথাই বলছি। জন্ম ২৬ শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে, পূর্ব জার্মানির গরলিটসে। পিতামাতার একমাত্র সন্তান হিসেবে আদরেই শৈশব পার হয় তার। বাবা স্টিফেন বালাক পেশায় ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। তবে তার আরেকটি প্রতিভাও ছিল। তিনি ফুটবলার হিসেবে জার্মান দ্বিতীয় বিভাগে খেলেছিলেন। ৭ বছর বয়সেই চেমিনিতজারের ইয়ুথ টিমে ভর্তি করানো হয় তাকে। বাবা ফুটবলার ছিলেন আর জহুরি রত্ন ঠিকই চিনতে পারে। তাই হয়তো ছেলের সেরা হওয়ার আভাসটাই পেয়েছিলেন তিনি। ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন তেমনই।

দলের মিডফিল্ডে সেনাপতির মতো পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা তাকে করে সবার পছন্দের করে তুলেছিল। বলের ওপর কন্ট্রোল এবং পাস একুরেসি তাকে যেন মধ্যমাঠের মার্কসম্যান করে তুলেছিল। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লিটল কাইজার (কাইজার নামে ডাকা হতো ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারকে) উপাধিটা পেয়ে যান। জাতীয় দল কিংবা ক্লাব পর্যায় দুই জায়গায়ই ছিলেন তিনি মোটামুটি সফল। ছিলো না শুধু ভাগ্যের ছোঁয়া, না হলে উচিয়ে ধরতে পারতেন বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফি। তবে তিনি প্রমাণ করে গেছেন ফুটবলে অমর, কিংবদন্তী হতে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রফির দরকার নেই। তিনি ফুটবল সম্রাট পেলের ১২৫ সেরা ফুটবলার‘-এর তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। ফিফা ঘোষিত ‘১০০ সেরা জীবিত ফুটবলার’-এর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ।

তার প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৯৫ সালে চেমনিটজার এফসির মূল দলের হয়ে বুন্দেসলীগার দ্বিতীয় বিভাগে। দুই সিজন কাটান এই চেমনিটজারে। দলের চরম খারাপ পারফর্মেন্সের পরও নিজের ধারাবাহিক ভালো খেলার ফল দ্রুতই পেয়ে যান তিনি। নজরে পড়েন বুন্দেসলীগায় সদ্য ২য় বিভাগ থেকে ১ম বিভাগে নাম লেখানো কাইজারস্লটার্নের কোচ অট্টো রেহাগালের চোখে। তিনি বালাককে নিয়ে আসলেন কাইজারস্লটার্নে। কোচের আস্থার প্রতিদানও ঠিক দিলেন বালাক। ১৯৯৮ সালের ২৮ মার্চ বুন্দেসলীগায় কাইজারস্লটার্নের হয়ে অভিষেক হয় এই কিংবদন্তির। ইতিহাসের প্রথম নবাগত দল হিসেবে বুন্দেসলিগা জিতিয়েছিলেন কাইজারস্লটার্নকে, যার পেছনে এক বিশাল অবদান ছিল তার। ১৯৯৭-৯৮ সিজনে কাইজারস্লটার্নের হয়ে ১৬ ম্যাচ খেলেন। পরের সিজনে ৩০ ম্যাচ খেলে করেন ৪ গোল। ৯৮-৯৯ মৌসুমে কাইজারস্লটার্নকে নিয়ে যান চ্যাম্পিয়ন্স লীগের কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপরের গল্প শুধুই উত্থানের।

নিজের ইচ্ছাতেই বেছে নিয়েছিলেন আনলাকি-১৩ জার্সিটি। প্রতিটি জায়গায়ই গায়ে চাপিয়েছেন ১৩ নাম্বার জার্সি।

১৯৯৯-০০ মৌসুমের শুরুতেই  €৪.১ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফী র বিনিময়ে বালাককে দলে ভেড়ায় বায়ার্ন লেভারকুসেন। কোচ ক্রিশটপ ডম বালাককে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে খেলার সুযোগ করে দেন, যার ফলস্বরূপ ৩ মৌসুমে তার পা থেকে আসে অবিশ্বাস্য ৩৬ গোল। তবে তিন মৌসুমে লেভারকুসেনের ঘরে তুলতে পারেননি কিছুই।                                       

২০০১-০২ মৌসুম ছিল তার ও ক্লাবের স্বর্ণযুগ। তার ও লেভারকুসেনের সামনে ছিল ট্রেবল জয়ের সুযোগ। ২০০২ সালে লেভারকুসেন বুন্দেসলীগার শেষ তিন ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট হারিয়ে রানার্স আপ হলো বুন্দেসলীগায়, জার্মান কাপের ফাইনালে শালকের কাছে হার, চ্যাম্পিয়ন্স লীগে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে, ওয়াল্ড কাপ ফাইনালে জার্মানিকে তুললেন কিন্তু খেলতে পারলেন না ফাইনালে সাসপেনশনের কারণে আর জার্মানি হারলো ২-০ গোলে। ব্যাক্তিগত সেরা মৌসুম ছিলো তার ওই মৌসুম। ২০০২ সালে নির্বাচিত হন ‘জার্মান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’।

ক্যারিয়ারের যেন সেরা সময়টিই পার করছিলেন তিনি। ২০০২ বিশ্বকাপে চোখ ধাঁধাঁনো পারফরমেন্স তার। এরপর অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন তিনি হতে যাচ্ছেন রিয়াল মাদ্রিদ পরিবারের সদস্য। তবে সবাইকে অবাক করে €১২.১ মিলিয়ন ট্রান্সফারের বিনিময়ে যোগ দিলেন বায়ার্ন মিউনিখে। বায়ার্ন মিউনিখে কাটান ৪ মৌসুম। এই চার মৌসুমে ৩ বার জেতেন ডাবল (লীগ ও কাপ)। বায়ার্নের হয়ে ১০৭ ম্যাচে করেন ৪৪ গোল।

২০০৬-০৭ মৌসুমে ফ্রি ট্রান্সফারে যোগ দেন চেলসিতে। চেলসিতে সেন্টার মিডফিল্ডের বদলে উইংয়ে খেলানো হতো তাকে। চেলসিতে যোগ দেওয়ার পরে প্রথম দিকে মানিয়ে নিতে অনেক কাঠ খড় পুড়াতে হয়েছিল। সাথে ইন্জুরি সমস্যাও ব্যাপক ভোগায় তাকে। ফলে ফর্ম হারাতে থাকেন তিনি। জায়গা হয় সাবস্টিটিউড বেঞ্চে। তবে আস্তে আস্তে ফিরে পেতে থাকেন নিজেকে। ২০০৭-০৮ মৌসুমে চেলসিকে তোলেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে কিন্তু এবারো বিধাতা মুখ তুলে চাননি। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে হেরে চাম্পিয়ন্স লীগের স্বপ্ন আবারও চুরমার হয় তার। চার মৌসুমে জেতেন মাত্র একটি লীগ শিরোপা, একটি লীগ কাপ শিরোপা, তিনটি এফএ কাপ ও একটি কমিউনিটি শিল্ড। চেলসির হয়ে ১০৫ ম্যাচে করেন মাত্র ১৫ গোল ।

চেলসির হয়ে তার পারফরমেন্স ছিল গড়পড়তা মানের, সাথে ইনজুরি সমস্যা তো ছিলোই। একবার ইনজুরি’র কারণে প্রায় ৮ মাস ছিলেন মাঠের বাইরে। ২০১০ সালে চেলসির সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চেলসি আর চুক্তি নবায়ন করেনি।

এদিকে জার্মানির অধিনায়ক হিসেবেই তার পরিচিতি ছিল বেশ। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে জার্মানির পক্ষে অভিষেক হয় তার । ২০০০ সালের ইউরো ব্যর্থতার পর ২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানিকে ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। ২০০২ বিশ্বকাপের মত ২০০৬ বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন অসাধারণ এবং ওই বিশ্বকাপে ছিলেন দলনেতার ভূমিকায়। জার্মানির ৩য় স্থান অর্জনের পেছনে তার মূখ্য ভুমিকা ছিল। ২০০৮ ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপে জার্মানিকে আবার তোলেন ফাইনালে তবে আবারও সেই রানার্স আপ।

জার্মানির হয়ে কিছুই না জিততে পারলেও ওইসব টুর্নামেন্ট তার পারফরমেন্স ছিল ঈর্ষনীয়। প্রতিটা টুর্নামেন্টের সেরা একাদশে জায়গা ছিল তার। জায়গা পেয়েছিলেন ২০০২ বিশ্বকাপ, ২০০৬ বিশ্বকাপ, ২০০৮ ইউরোর সেরা একাদশে, হয়েছিলেন ২০০২ উয়েফা মিডফিল্ডার অব দা ইয়ার, জিতেছিলেন ২০০২, ২০০৩, ২০০৫ সালে জার্মান ফুটবল অব দা ইয়ারের পুরষ্কার। সর্বশেষ ২০১০ সালের মার্চে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে পরাজিত জার্মানির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। ২০১০ বিশ্বকাপেও জার্মানির নেতৃত্বে থাকার কথা ছিল তার। কিন্তু বিশ্বকাপের পূর্বমূহুর্তে এফএ কাপের ফাইনালে চেলসির হয়ে মাঠে নেমে কেভিন প্রিন্স বোয়েটেং এর মারাত্মক ট্যাকলের শিকার হন। গোড়ালির ওই ইনজুরি তাকে ছিটকে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে। তখনই ফিলিপ লামের কাছে অধিনায়কত্বও হারান। বিশ্বকাপের পর আবারো পড়েছিলেন শিন ইনজুরিতে। আর তখনই জোয়াকিম লো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বালাক নেই।

জার্মান জার্সি গায়ে খেলেছেন ৯৮ টি ম্যাচ, গোল করেছেন ৪২ টি। হয়তো খেলতে পারতেন আরও কিছুদিন। তবে ঘন ঘন ইনজুরির কারণে জার্মান দলে হারান তার জায়গা। ২০১১ সালে জোয়াকিম লো তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ব্রাজিলের সাথে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলে অবসরে যেতে। কিন্তু এই প্রস্তাব তিনি মেনে নেন নি। তাই জাতীয় দলের হয়ে আর ফেয়ার ওয়েল ম্যাচ খেলা হয় নি বালাকের।

চেলসি চুক্তি নবায়ন না করায় বাধ্য হয়ে ফিরতে হয় শৈশবের ক্লাব বেয়ার্ন লেভারকুসেনে। লেভারকুসেনে ফেরার পরও সেই চিরাচরিত ইনজুরি সমস্যা তার পিছু ছাড়ে নি। লেভারকুসেনে যোগ দেওয়ার ৩ মাসের মাথায় বিদায় জানান ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলকে। যদিও ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবসর  কাটিয়ে ফিরেছিলেন ক্লাব ফুটবলে তবে এবার  আর মূল দলে জায়গা হয়নি, জায়গা হল বেঞ্চে। ২রা অক্টোবর ২০১২ সালে সকল ধরনের ফুটবলকে বিদায় জানান এই লেজেন্ড।

মাইকেল বালাকের রানার্সআপ ইতিহাস

১. বুন্দেসলীগা (২): ২০০১-০২, ২০১০-১১
২.জার্মান কাপ: ২০০১-০২
৩. চাম্পিয়ন্সলীগ (২): ২০০১-০২, ২০০৭-০৮
৪. বিশ্বকাপ: ২০০২
৫. প্রিমিয়ার লীগ (২): ২০০৬-০৭,২০০৭-০৮
৬. লীগ কাপ: ২০০৭-০৮
৭. ইউরোপিয়ান চাম্পিয়ন্সশীপ: ২০০৮

নিজের অজান্তেই হয়তো ফ্যানদের দেওয়া “লুজার” ট্যাগটি গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছেন। তবে শুধু ট্রফিই যে সেরার মানদন্ড নয় তা তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন।   ট্রফির ফুলঝুড়ির লেজেন্ডের মধ্যে তার জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই। বেঁচে থাকুন অনেকদিন লিজেন্ড মানুষের মনের প্রাচীরে, ফুটবলের পাতায় পাতায়।

Most Popular

To Top