টুকিটাকি

ওকিনোশিমা: শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য যে দ্বীপ

ওকিনোশিমা: শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য যে দ্বীপ

আপনি কি ভাবতে পারেন একুশ শতকের এই আধুনিক যুগে নারীরা যখন সব বাধা -বিপত্তি পার করার এবং দুর্গম পরিবেশে টিকে থাকার যোগ্যতা বারবার প্রমাণ করেছে সেই যুগে এমন কোনো স্থান হওয়া সম্ভব যেখানে তারা নারী হওয়ার কারণেই কখনও প্রবেশ করার অধিকার পায় নি? বলছি, জাপানের ‘ওকিনোশিমা’ দ্বীপের কথা। এ ধরণের লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে সবসময় থেকেই এই দ্বীপ বেশ বিতর্কিত। তবে ২০১৭ সালে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ইউনেস্কো এমন একটি বিতর্কিত দ্বীপকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।

এখন প্রশ্ন হল- এই দ্বীপে এমন কী আছে যে একে ইউনেস্কো এই স্বীকৃতি প্রদান করল? আর পুরুষ  হলেই কি যখন ইচ্ছা তখনই গোটা দ্বীপ ভ্রমণের সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া যায়? চলুন  আজকে তাহলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটু খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।

প্রথমেই  ‘ওকিনোশিমা'(沖ノ島 Okinoshima) দ্বীপের একটু বর্ণনা দিই। এটি জাপানের মুনাকাটা শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে কিউশু ও কোরিয়ান পেনিনসুলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। ধারণা করা হয় যে, ৪র্থ শতক থেকেই এই দ্বীপ নিরাপদ সমুদযাত্রার জন্য প্রার্থনার কাজে ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে সতের শতকে ওকিনোশিমায় আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মঠ নির্মিত হয় যা এই প্রার্থনার কাজেই ব্যবহৃত হয়। এখানে প্রায় ৮০,০০০ আর্টিফ্যাক্টস বা হস্তনির্মিত বস্তু রয়েছে যা যুগে যুগে  বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ‘শিনতো’ অনুসারীরা নিজেদের উন্নতি এবং সুষ্ঠ নৌযাত্রার আশায় দ্বীপের দেব-দেবীদের নিকট উৎসর্গ করেন। এই আর্টিফ্যাক্টসের মধ্যে চীনের আয়না, কোরিয়ান পেনিনসুলার সোনার আংটি, পারস্যের কাঁচের পানপাত্র বেশ পরিচিত। ঐতিহ্য ও শিল্পের এক অপূর্ব মিলন লক্ষ্য করা যায় এই ছোট্ট ভূখণ্ডটিতে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মানুষের তৈরী সৃজনশীল কাজের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই দ্বীপ।

‘ওকিনোশিমা’ জাপানের অন্যতম একটি প্রাচীন দ্বীপ যা ‘শিনতো’ (神道 Shintō) ধর্মানুসারীদের নিকট একটি পবিত্র তীর্থস্থান। ‘শিনতো’ ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ছিল। ওকিনোশিমায় স্থায়ীভাবে একজন প্রধান ধর্মযাজক থাকেন যিনি পারম্পারিকভাবে দ্বীপের সকল পূজা পরিচালিত করেন এবং তার সাথে আরও কয়েকজন যাজকও থাকেন যারা মঠ পরিচালনায় তাকে সহায়তা করেন। শুধুমাত্র ‘মুনাকাটা তাইশা'(宗像大社-Munakata Taisha)-এর শিনতো যাজকরাই এই কাজে নিয়োজিত থাকতে পারবেন। ‘মুনাকাটা তাইশা’ বলতে মুনাকাটা শহরের তিনটি শিনতো মঠকে একত্রে বোঝানো হয়।

চিত্র: ওকিনোশিমায় প্রবেশের পূর্বে পবিত্র হওয়ার জন্য স্নান করছে পর্যটকেরা।

চিত্র: হাদাকা মাতসুরি

যাজকদের ছাড়া প্রতিবছর ২৭ মে শুধুমাত্র দুই ঘণ্টার জন্য এই  দ্বীপ পরিদর্শনে কোনো আগন্তুক আসতে পারেন। ২৭ মে এর এই উৎসবকে বলা হয় ‘হাদাকা মাতসুরি’(裸祭り“Naked Festival”)। এই অনুষ্ঠানে প্রতি বছর ২০০ জনের বেশি পর্যটক আসতে পারে না এবং তাদেরকে দ্বীপে প্রবেশের পূর্বে ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে উলঙ্গ হয়ে সমুদ্রে স্নান করে নিজেকে পাক-পবিত্র করে নিতে হয়। এর জন্য অর্থাৎ পুরুষ হলেই যে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে যেকোনো সময় নিজের পছন্দমত সাজে এই দ্বীপে প্রবেশ করতে পারবেন তা নয়। আবার সমুদ্রপথে এত কষ্ট করে ভ্রমণ করে ফিরে গিয়ে কাউকে বলতেও পারবেন না আপনার মজাদার অভিজ্ঞতাগুলো। এমনকি নিজের আপনজনের জন্য একটি ফুল কিংবা পাতাও  নিয়ে যেতে পারবেন না এই দ্বীপ থেকে। অর্থাৎ যা দেখলেন তা সারাজীবন নিজের মনের মধ্যেই রেখে দিতে হবে; এই বিষয়ে কোনো জ্ঞান কিংবা অভিজ্ঞতার বিতরণ চলবে না।        

চিত্র: হাদাকা মাতসুরি-এর আরেক অংশ।

এবার আসি নারীদের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে। এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত কিছু মতবাদ বা বিশ্বাস সম্পর্কে একটু বলি। অনেকের মতে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় শারিরীকভাবে দুর্বল হওয়ায় তাদের পক্ষে এত বড় সমুদ্রযাত্রা করে ওকিনোশিমায় যাওয়া কষ্টকর হবে। তাই নারীদের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই তাদের উপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আবার অনেকে বলেন, নারীরা সন্তান-জন্মদানকারী বলে তাদেরকে যেকোনো ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ সফর এবং সমুদ্রযাত্রা করতে বারণ করা হয়। সেই সুবাদে এই দ্বীপেও আসা তাদের জন্য নিষিদ্ধ। ওকিনোশিমার মঠের এক মুখপাত্রের মতে, ঐ দ্বীপে কারা যেতে পারবে কিংবা কারা পারবে না তা নিয়ে কখনই কোনো নিয়ম-কানুন ছিল না। মূলত সেখানকার শিনতো ধর্মযাজকেরাই এসকল নিয়মের প্রচলন শুরু করেন।

তবে এসকল মতবাদ ও ধারণা বেশিরভাগ ইতিহাসবিদই মানতে নারাজ। কেননা, সনাতন শিনতো ধর্মে রক্তকে অপবিত্রতার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ দেওয়া হয়। এই ধর্মানুসারে, কোনো নারীর ঋতুঃস্রাব হলে সে অপবিত্র হয়ে যায়। শিনতো ধর্মাবলম্বীরা বৌদ্ধদের ‘দ্য বুদ্ধিস্ট ব্লাড পন্ড সূত্র’ মতবাদে বিশ্বাসী যা প্রচার করে যে, “রক্তের মাধ্যমে দূষণের পাপের জন্য নারীদের একটি রক্ত পুকুরের নরকে নিন্দা করা হয়; একমাত্র প্রার্থনাই তাদের বাঁচাতে পারে”। নারী বিদ্বেষী এরকম কিছু মতবাদের জন্য শিনতো ধর্ম আগে থেকেই বেশ বিতর্কিত। সেজন্য ওকিনোশিমায় নারীদের নিষেধাজ্ঞা যে কোন কারণে হতে পারে তা তো আন্দাজ করা যায়।

ওকিনোশিমা ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও পর্যটকদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ সম্পর্কে মুনাকাটা তাইশার প্রধান ধর্মযাজক তাকাউকু আশিজু বলেন, “যদিও ওকিনোশিমার নাম ইউনেস্কোর ঐতিহাসিক স্থানের লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে, তাও আমরা সাধারণ জনগণের নিকট এটি উন্মুক্ত করব না”। এমনকি তার ভাষ্য মতে, প্রতি বছর ২০০ জনকে সেখানে যেতে দেওয়ার সুযোগও বন্ধ করা হতে পারে। কারণ মুনাকাটা তাইশার ধর্মযাজকদের মধ্যে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, এভাবে প্রতি বছর এই লোকসমাগমের ফলে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আর্টিফ্যাক্টসের ক্ষতি হতে পারে। তবে শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের উপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হবে না। তারা ওকিনোশিমায় গিয়ে নিজেদের গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার এবং সেখানের সৌন্দর্য রক্ষার নতুন নতুন পন্থা বের করার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ নিজেদের কল্যাণই শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নি।

এখন আপনার কী মনে হয় ওকিনোশিমায় নারীদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার কারণ যুক্তিসংগত? কিছু সংখ্যক মানুষ নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য এই দ্বীপকে পুঁজি করে রাখছে না তো?

জাপানীদের আরো কিছু অদ্ভুত কার্যকলাপের কথা জানতে চান? জেনে নিন সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের অন্ধকার যত সংস্কৃতি!

Most Popular

To Top