নাগরিক কথা

নৈতিকতা? সেটা আবার কি?!?

ভুল করেছি ছাত্রজীবনে ভালোবেসে

নৈতিকতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? – কখনো ভেবে দেখেছেন কি?

কী বুঝি সেটা বলা ততটা কঠিন না, যতটা কঠিন “নৈতিকতা কী?”- এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া। এখানেই নৈতিকতার খেলা। নৈতিকতা কী, সেটার ধারে কাছে না গিয়ে নৈতিকতা বলতে কী বুঝি- সেটাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নৈতিকতা সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণা।

খোলাসা করার চেষ্টা করি। নৈতিকতা বলতে আমরা কী বুঝি, এর উত্তর হাজার ধরণের হতে পারে। এর উত্তর হতে পারে ধর্মের আলোকে, সময়ের আলোকে, স্থানের আলোকে, সমাজের আলোকে। ইসলাম ধর্মের আলোকে নৈতিকতার ধারণা খৃস্টধর্মের আলোকে পুরোপুরি না-ও মিলতে পারে, উপমহাদেশীয় নৈতিকতা আর ইউরোপীয় নৈতিকতা এক না-ও হতে পারে, সদ্য আগুন জ্বালাতে শেখা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের নৈতিকতা আর আজকের মহাকাশে পৌঁছে যাওয়া আধুনিক মানুষের নিকট নৈতিকতার স্বরূপ সম্পূর্ণ এক- এমনটা বলতে প্রয়োজন বুকে পাটা আর মাথায় জৈবসার।

ইসলামের দৃষ্টিতে শূকরের মাংস খাওয়া অনৈতিক, খৃস্টধর্মে অনৈতিক নয়। প্রকাশ্যে চুম্বন উপমহাদেশে নৈতিকতার পরিপন্থী, ইউরোপে তা ব্রেকফাস্টে কফি খাওয়ার মতই স্বাভাবিক। আদিকালে দূর্বল বা বিকলাঙ্গ শিশুকে জন্মের পরপরই হত্যা করা নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল না, বরং সেটাই ছিল এক প্রকার সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি। মাত্র দুইশত বছর আগে আমেরিকায় ক্রীতদাস কেনাবেচা করতে মানুষের বিবেকে বাঁধত না, তখন মানুষ একে গরু-ছাগল কেনাবেচার মতই স্বাভাবিক মনে করত। মাদক বহনের সর্বোচ্চ শাস্তি দেশে থেকে দেশে ভিন্ন, অর্থাৎ নৈতিকতার পাল্লায় তাদের ওজনও ভিন্ন। কোন সমাজে সমকামীতা গ্রহণযোগ্য, কোন সমাজে তা ভীষণভাবে ঘৃণিত।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, নৈতিকতা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত। সে পরিবেশ হতে পারে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় পরিবেশ। নৈতিকতা সম্পর্কে একজন মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিও থাকতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর এক সময় পরিবেশের প্রভাব পড়ে, তখন তাকে আর “দৃষ্টিভঙ্গি” না বলে “ধারণা” বলাই ভালো, একটা সময় মানুষ সেই প্রভাবিত “ধারণা”কে তার নিজস্ব “দৃষ্টিভঙ্গি” বলে ভাবতে শুরু করে।

উদাহরণ দেই। যেসব ধর্মে সমকামীতা নিষিদ্ধ অর্থাৎ অনৈতিক, তাদের অনুসারীরা সমকামীতার বিরোধীতা  করে একে “প্রাকৃতিক নয়”, “মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি স্বরূপ” ইত্যাদি যুক্তিপ্রদান করে। একটু ঘাঁটলে দেখা যাবে তাদের এই মনোভাবের পিছনে যতটা না যুক্তির গাঁথুনি, এর চাইতে বেশি ধর্মবিশ্বাসের জোর। আবার ধর্মে সমকামীতাকে উৎসাহিত করা হলে হয়ত তারাই পৃথিবীর ক্রমর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনে সমকামীতার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করত। আমেরিকায় শেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের হেয় মনে করত কেবল গাত্রবর্ণের ভিন্নতার জন্য নয়, তারা বিশ্বাস করত কৃষ্ণাঙ্গরা বুদ্ধি ও যোগ্যতায় হীন এবং রোগজীবাণুর বাহক। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে সাদারা কালোদের বহুদিন তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে এবং তা মোটেও তাদের নীতিবোধে আঘাত করেনি। দৃশ্যত, সেই শ্বেতাঙ্গদের নীতিবোধের উপর প্রভাব ফেলেছে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা।

এভাবেই, নৈতিকতার প্রকৃত স্বরূপ না জেনে, যাকে নৈতিক বলা হয়েছে তাকে নৈতিক বলে মেনে নেয়াই আমাদের কাছে নৈতিকতা। মূলত, নৈতিকতা অত্যন্ত জটিল একটা বিষয়। নৈতিকতার ভিত্তি যে ঠিক কী, সেটা নির্ণয় করা অত্যন্ত দুরুহ। একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা যে অনৈতিক, এটা মেনে নিতে আমাদের তেমন বেগ পেতে হয় না। একটা নিরপরাধ কুকুরকে হত্যা করাও নিশচয়ই অনৈতিক? আর আমি যদি একটা নিরপরাধ পিঁপড়াকে হত্যা করি, সেটাকে কি “হত্যা” বলে মেনে নেয়া হবে? যদি হয়ও, সেটাকে কি সেই কুকুর হত্যার সমপর্যায়ের অপরাধ বলে গণ্য হবে? যদি না হয়, কেন হবে না? কিসের উপর ভিত্তি করে আমরা ঠিক করলাম যে, একজন মানুষকে আমরা চাইলেই হত্যা করতে পারি না, একটা কুকুরকেও হত্যা করা “উচিৎ নয়”, এবং একটা পিঁপড়াকে হত্যা করা যেতেই পারে? (প্রাণীর আকার বা Size কে যদি নির্ণায়ক হিসেবে ভেবে থাকেন, তবে চিন্তা করে দেখবেন হাতি হত্যা মানুষ হত্যার চাইতে বড় অপরাধ কি না?)

কিংবা, “প্রকৃতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে” বলে সমকামীতা অনৈতিক, কিন্তু মানুষ যে প্রকৃতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে যান্ত্রিক ডানায় ভর করে আকাশে ওড়ছে, সেটা কি নীতিবিরুদ্ধ নয়? প্রকৃতির যদি চাইত মানুষ আকাশে উড়ুক, তবে সে কী মানুষের শরীরে কি পাখা জুড়ে দিত না?

আসুন, নৈতিকতাকে একবারে বিবর্তনবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। তবে তার আগে বলে রাখি, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ধর্মগুলোর সাথে বিবর্তনবাদের যথেষ্ট সংঘর্ষ রয়েছে এবং তারা উভয়েই “নৈতিকতা”কে নিজ নিজ সন্তান বলে দাবী করে। বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, মানুষের আদি পূর্বপুরুষেরা যখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে চলা শুরু করল, তখন তারা দেখল যে, একসাথে চলতে গেলে কিছু নিয়ম মেনে চলা সুবিধাজনক, সারভাইভালের খাতিরেই। যেমন, আমি যদি আমার দলের একজনকে হত্যা করি, তখন আমাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে দলের অন্য কারও কোন বাধা নেই। আবার আমি যদি সবার এমন একটা ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পারি যে, কাউকেই হত্যা করা উচিৎ নয়, তখন আমাকেও কেউ হত্যা করতে আসবে না। এভাবেই আমি টিকে থাকব। কেবল হত্যা সম্পর্কিত মূল্যবোধ নয়, জীবনযাপন সহজ ও “সম্ভব” করতে প্রয়োজন ছিল আরও অনেক নিয়ম-কানুন। এই নিয়মকানুনগুলো সহস্র-লক্ষ বছর ধরে মানুষের মগজে গাঁথা হয়ে গেছে, ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রূপ পেয়েছে, একসময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “নৈতিকতা” বা “মূল্যবোধ” হিসেবে। মানুষের উপর ভর করে এভাবেই বিবর্তন ঘটেছে নৈতিকতার।

তারপর অসংখ্যবার পাল্টেছে এই নৈতিকতার সংজ্ঞা। তবে মনে রাখা উচিৎ, নৈতিকতাকে ধর্মীয় অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় আইন কিংবা ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ- কোনওটার দ্বারাই কাঠামোবদ্ধ করা যায় না। আমার ব্যক্তিগত মত হল, “ভালো” ও “মন্দ” সম্পর্কে পরিশুদ্ধ ব্যক্তিক উপলদ্ধিই নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারে।

আবার, এবসল্যুট বা পরম “পরিশুদ্ধ” বলতে কি আদৌ কিছু আছে?

Most Popular

To Top