টুকিটাকি

সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের অন্ধকার যত সংস্কৃতি

সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের অন্ধকার যত সংস্কৃতি

সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। জাপান নিয়ে আমাদের সবার মনে একটা ধারণা রয়েছে যে খুবই সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও টেকনোলজিতে উন্নত একটি দেশ। সত্যিকার অর্থেই জাপান দেশটি অনেক বেশি সুন্দর। শুধু সুন্দর বললেই ভুল হবে জাপানের প্রত্যেকটি জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এছাড়াও জাপানীরা তাদের নিয়মানুবর্তিতা ও শিষ্টাচারের জন্য বিখ্যাত। এককথায় বলতে গেলে জাপানকে আমরা আদর্শ দেশ হিসেবেই ধরতে পারি। এখানে ছোট থেকেই যেমন বাচ্চাদের নিজের কাজ নিজে করা শেখানো হয় তেমনি নিজের লক্ষ্যে পৌছানের জন্য সকল রকমের সম্ভাব্য ব্যবস্থা ও সুযোগ সুবিধাও তৈরি করে দেওয়া।

কিন্তু আদতেও কি জাপান পুরোপুরি ভাল? সব জিনিসেরই যেমন ভাল খারাপ দিক থাকে ঠিক একইভাবে সকল দেশেরও ভাল এবং খারাপ দুটি দিক থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা সেসকল দেশগুলোর ভাল দিকে এত বেশি লক্ষ্য রাখি যে খারাপ গুলো আমাদের চোখের সামনে সহজে ভেসে উঠে না। কিন্তু এর ফলে হয়ত আমাদের কাছে যেই দেশটাকে অনেক বেশি ভাল মনে হচ্ছে, একদিন যখন পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে তখন আমরাই তার পেছনের কারণ খুজে বেড়াবো।

দুইদিন আগে ইউটিউবে সাজেশনে একটা ভিডিও আসলো জাপানের ভাল ভাল দিক ও টেকনোলজি নিয়ে। কি ভেবে যখন কমেন্ট বক্সে ঢুকলাম বেশ কিছু কমেন্ট দেখতে পেলাম জাপানের খারাপ দিক নিয়ে। কৌতুহলবশত খোজাখুজি করতে করতে বেশ কিছু ভয়ংকর তথ্য ও পেলাম জাপান সংক্রান্ত। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হচ্ছে জাপানে এমন কিছু রীতি এবং নিয়ম প্রচলিত আছে যা সভ্যদেশ গুলোতে একটা অপরাধের সমান।

জাপান খারাপ দিক গুলোর মধ্যে প্রথমেই এবং সবচেয়ে বীভৎস যেটাকে মনে হয়েছে তা হচ্ছে Child Pornography। শুনতে খুবই আজব লাগলেও বেশ কিছুদিন আগ পর্যন্ত জাপানে এটি বৈধ ছিল। জাপানে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে টাকার বিনিময়ে সুযোগ পাওয়া যায় স্কুলের মেয়েদের হাত ধরা থেকে শুরু করে কোলে শুয়ে থাকার এবং সেটা বৈধ। জাপানে পর্ণগ্রাফির ইন্ডাষ্ট্রিগুলো আলাদা ভাবে ছোট বাচ্চাদের দিয়ে পর্নগ্রাফি তৈরি করে আর সেগুলো দোকানে সকলের সামনে বিক্রি পর্যন্ত করা হয়। অনেক ছোট বাচ্চাদের মডেল ক্যারিয়ার শুরু হয় সুইমসুট পড়ে কিংবা বিভিন্ন জিনিস হাতে বড় মডেলদের মত করে পোজ দিয়ে। অনেক সময় ছোট বাচ্চাদের আপত্তিজনক পোশাক পড়িয়ে তাদের দিয়ে এসব কাজ করানো হয়। যদিও পরবর্তীতে তারা বড় হয়ে বুঝতে পারে যেটা একসময় তাদের মানসিক পীড়া দেয়।

Embed from Getty Images

বিশেষজ্ঞদের মতে জাপানের child pornography অবসেশনের থাকার মূল কারণ হল তারা সবকিছুকে কিউট হিসেবে দেখতে চায়। যেহেতু ছোট বাচ্চারা দেখতে কিউট হয় তাই তাদের child pornography অবসেশন বেশি। জাপানের কমিক অথবা ম্যাঙ্গাগুলোতেও child pornography আছে। ২০১৪ সালে জাপানে child pornography এর উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সকল ধরনের child pornography নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তার মধ্যে জাপানিজ কার্টুন এনিমে ও ম্যাঙ্গাও ছিল কিন্তু ম্যাঙ্গা এনিমে লেখক ও এডিটরদের তোপের মুখে এনিমে ও ম্যাঙ্গা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা সড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।

বেশকিছুদিন আগে আমার চাচা একটা কাজে জাপানে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে জাপানের ব্যাপারে তার প্রথম কথা ছিল যে জাপানের মানুষ খুবই বন্ধুত্বপরায়ন। তারা প্রত্যেকের সাথে হাসি হাসি মুখে কথা বলে এছাড়াও যে কোন কাজে বাহির থেকে আসা মানুষদের সাহায্য করে। জেনে খুব ভাল লাগলো কিন্তু যখন আমি সেদিন জাপানের কিছু খারাপ দিকের ব্যাপারে দেখছিলাম তখন দেখলাম যে ব্যাপারটা পুরোপুরি ঠিক নয়। জাপানের মানুষ অবশ্যই বিদেশি মানুষ কিংবা টুরিস্টদের সাহায্য করে কিন্তু একই সাথে তারা পুরোপুরি ভিন্ন। প্রথমত জাপানের নিয়ম হচ্ছে যার সাথেই কথা বলুক না কেন সেটা হাসি মুখে বলতে হবে। এমনকি কোন দুঃখের খবর দিতে হলে তাদেরকে যথেষ্ট হাসিমুখে থাকতে হবে। যেই কারণে বাহির থেকে যাওয়া অনেকেই মনে করে যে তা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ।

অপরিচিতদের সাথা জাপানীরা কথা বলে না। কথা বলার চেয়ে তারা চুপ থাকাকে শ্রেয় মনে করে। এছাড়াও জাপানীরা প্রচন্ড রকমের জাতিবিদ্বেষী। যেখানে পুরো পৃথিবীতে এক দেশের মানুষ আরেক দেশে যাচ্ছে এবং অন্য দেশ গুলো তাতে উৎসাহ দিচ্ছে সেখানে জাপান মোটেও এগিয়ে নেই। জাপানে গেলে আপনাকে অবশ্যই জাপানি ভাষা জানতে হবে নতুবা চলা ফেরা করা কঠিন হয়ে যাবে কারণ জাপানী ভাষা ছাড়া কেউ অন্য ভাষায় কথা বলে না। অন্যদেশের মানুষের প্রতি তাদের সহানুভূতি থাকলেও নিচের চেয়ে নিচু অবস্থানে থাকা মানুষদের প্রতি তাদের ধারনা খুবই খারাপ। জাপানের অফিসগুলোতে গেলে পুরোপুরি ভাবে এই চিত্র দেখা যায়।

জাপানের ভাল দিক হিসেবে আমরা আরেকটা জিনিস জানি সেটা হল কাজ পাগল। কিন্তু এই কাজ পাগলই তাদের জন্য এক সময় মৃত্যু বয়ে নিয়ে আসে। জাপানীদের প্রচন্ড কাজ করতে হয়। অনেকে কাজ করতে করতে কোন বন্ধও পায় না। এমন অনেক জাপানী কর্মচারী আছে যারা কাজ করতে করতে মারা গিয়েছে। প্রত্যেক সপ্তাহেই জাপানীদের প্রায় ৬০-৭০ ঘন্টা কাজ করতে হয়। অনেকে তাদের পরিবারকে ঠিকমত সময়ও দিতে পারে না। শুধু কাজ নয়, কাজের পরে তারা ওভারটাইম করতে থাকে। কাজ পাগল হওয়াও বেশি কাজ করা ভাল কিন্তু যখন তা অতিরিক্ত অবস্থায় চলে তখন তা আর ভাল থাকে না বরং সমস্যা হয়ে যায়।

কাজ থেকে ফেরার পথে এভাবে ট্রেনেই ঘুমিয়ে পড়েন ক্লান্ত অনেক জাপানিজ

এছাড়াও জাপানের কাজের জায়গায় মেয়েদেরকে যথেষ্ট মর্যাদা দেওয়া হয় না। যত ভালই কাজ করুক না কেন বরং তাদেরকে দমিয়ে রাখা হয়। অনেক জাপানীদের মতে মেয়েরা শুধু ঘরবাড়ি আর বাচ্চা কাচ্চাই সামলাবে। তারা কখনই তাদের ছেলে কর্মীদের সমকক্ষ হতে পারবে না। তাই যত ভালই কাজ করুক না কেন কখনই তাদের আগাতে দেওয়া হয় না।

এসকল সমস্যার পাশাপাশি জাপানের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে এখনো আত্মহত্যার সংখ্যা খুবই বেশি। শুরুতে আত্মহত্যা এখানে এক প্রকার সম্মানের চোখে দেখা হত। কিন্তু দিনে দিনে এটা বিরাট আকার ধারণ করেছে। জাপানীরা নিজেদের কথা নিজেদের কাছে রাখতেই পছন্দ করে। যদি কেউ কখনো তাদের সমস্যাগুলো অন্যদের সাথে আলোচনা করে তখন তাকে অসামাজিক মনে করা হয়। প্রচন্ড কাজের চাপ, নিজেকে প্রকাশ করতে না পারা, আরো নানা বিধ কারণে জাপানীরা অনেকেই মানষিক সমস্যায় ভোগে। আর এই বিষয়ে কারো সাথে খোলাখুলি ভাবে কথা বলতে না পারার কারণে এক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। জাপানে প্রতিবছর অনেক লোক আত্মহত্যা করে। সরকার এই আত্নহত্যা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আইন জারি করেছে কিন্তু তাও আত্মহত্যার পরিমাণ কমেনি। এমনকি বিখ্যাত মাউন্ট ফুজি’র পাদদেশে অবস্থিত আওকিগাহারা বনের দুর্নামই হয়ে গেছে “সুইসাইড ফরেস্ট” হিসেবে!

জাপানে বাচ্চাদের ছোটবেলায় একটা ফর্ম দিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় যে বড় হয়ে কে কি হতে চায়। প্রত্যেকই তার পছন্দমত তা পূরণ করে। জাপানী শিক্ষাব্যবস্থাও তাদের সেভাবে গড়ে তোলে। এবং পরবর্তীতে তারা সেভাবেই চাকরি ক্ষেত্রে যোগদান করে। কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় যে তাদের সেই কাজটি পছন্দ হচ্ছে না কিন্তু তাকে সারাজীবন ধরে সেই কাজটিই করে যেতে হবে কারণ তাকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে। কেউ যদি চাকরি ছেড়ে দেয় তবে তার অন্য কোন কাজে ঢুকতে কিংবা অন্য কোন পেশায় যেতে অনেক সময় লাগে নতুবা আর কিছুই করার থাকে না। আবার অনেকে সিধান্ত নিতে পারে না যে পরবর্তীতে কি করবে তখন হাই স্কুল শেষে তাদের আর কিছু করার থাকে না। শুধু তাই নয়, জাপানী স্কুল গুলোতেও পড়ালেখার প্রচন্ড চাপ।প্রতিদিন অনেক অনেক বেশি হোমওয়ার্ক তাদের দেওয়া হয় স্কুল থেকে। এছাড়া স্কুল শেষ তাদেরকে নানা ধরনের ক্লাবের কাজ ও করতে হয়। শুধু তাই নয় আরো ভাল পড়ালেখার জন্য তাদেরকে ক্র্যাম স্কুলে পাঠানো হয়। এছাড়াও পিয়ানো শেখা কিংবা সাতার শেখানো তো রয়েছে। এসব শেষে খুব কম সময়ই থাকে কোন ছাত্র-ছাত্রীর কাছে খেলাধুলা অথবা নিজের পছন্দমত কিছু করার জন্য। অনেক বাবা-মা সম্পূর্ণভাবে টিচারদের উপরে নির্ভর থাকে।

জাপানের ৪০% এর বেশি মানুষের ৬০ বছরের বেশি বয়স। জাপানে জন্ম বৃদ্ধির হার খুবই কম। অতিরিক্ত কাজের চাপ, মেয়েদেরকে ঠিকমত সম্মান না দেওয়া, child pornography, জীবন যাত্রার ব্যয় বেশি হওয়ার অনেকেই বিয়ে কিংবা সন্তান জন্মগ্রহণে আগ্রহী নয়। জাপানে জীবনযাত্রার ব্যয় খুবই বেশি তাই খুব পরিশ্রম না করলে কখনই ঠিকভাবে থাকা যাবে না।

জাপানের কমিক বুক স্টোরগুলোতে বাথরুমের ব্যবস্থা খুবই ভাল যে সেখানে গোসল পর্যন্ত করা যায়। অনেক ঘরছাড়া মানুষ আছে যারা ওইসব কমিক বুক স্টোর গুলোতে রীতিমত বসবাস করে। সারাদিন বাইরে অফিস করে এসে এখানে রাতে ঘুমায়। জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক মানুষ আছে যারা বিয়ে কিংবা ভালবাসার চিন্তা বাদ দিয়ে দিয়েছে। এনিমে কিংবা ম্যাঙ্গা পড়েই তারা সময় কাটায়। জাপানের জীবনব্যবস্থা দেখে তাদেরকে অনেক ধনী মনে হলেও আদতে তাদের GDP এর চেয়ে তাদের ঋণের পরিমান বেশি।

জাপানের আরেকটি বিরাট সমস্যা হল তারা যে কোন কিছুকে কমার্শিয়ালাইজ করে ফলে। পশ্চিমা বিশ্বকে অনুকরণ করে ক্রিসমাস সহ আরো নানা ধরনের উৎসব উদযাপন করে যদিও এসকল দিন গুলোতে কোন বন্ধ থাকে না বরং তাদের কাছে ক্রিসমাস ডে মানে ফ্রাইড চিকেন আর কেক খাওয়া। শুনে হাসি পেলেও এসকল উৎসবের দিন মানে তাদের কাছে এগুলা খাওয়া আর কিছুই নয়।

সবশেষে জাপানে অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। ছোট থেকেই সবাইকেই এইসকল নিয়মের মধ্যে দিয়ে বড় করা হয়। ফলে চাইলেই তারা নিয়ম ভেঙে ফেলতে পারে না বরং একসময় তাদের কাছে বোঝা মনে হয়। জাপানী বসবাসকারী অনেকের মাঝেই এরকম মতভঙ্গী রয়েছে।

সব দেশের মাঝেই ভাল খারাপ আছে। সেরকমই জাপানের ভাল দিকের পাশাপাশি খারাপ দিক ও আছে। সেই সকল খারাপ দিকগুলোকে দিয়ে জাপানকে বিচার না করে আমাদের উচিত তাদের ভাল দিকগুলোকে সামনে তুলে আনা। এর পাশাপাশি এর খারাপ দিকগুলোকে দূর করার জন্য যথাসম্ভব সাহায্য করা যাতে করে যখন আমাদের নিজেদের কোন সমস্যা হবে,আমাদের পাশে আমাদের প্রয়োজনে যেন আমরা তাদের পাই।

Most Popular

To Top