ফ্লাডলাইট

রোনালদো, না লিওনেল মেসি – কে সেরা???

রোনালদো, না লিওনেল মেসি - কে সেরা???

কে সেরা? ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, না লিওনেল মেসি? লিওনেল মেসি’র জন্মদিনেই তুলনাটা করা যাক।

আমরা বিচার বিবেচনা করি যুক্তির বদলে আবেগ দিয়ে। যে কিছু সময় যুক্তিতর্কে যাই তখনও প্রচ্ছন্নভাবে আমরা সেই আবেগ থেকেই যুক্তিগুলো দেখাই। শুধু এই একটা কারণেই ক্রিশ্চিয়ানো ফ্যান হলে আমরা হয়ে যাই মেসি হেটার; আর মেসি ফ্যান হলে ক্রিশ্চিয়ানো হেটার।

আসেন এইবার একটু ক্রিশ্চিয়ানো আর মেসির তুলনা করে নিজেরা একটু কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি করি।

আগেই বলে নেই আমি একজন অন্তপ্রাণ ব্রাজিল সাপোর্টার এবং রিয়াল মাদ্রিদ সাপোর্টার। এই পর্যন্ত পড়েই যদি ভাবেন আমি খেলার কিছুই বুঝি না, কেবল ট্রফি দিয়ে বিচার করি তাহলে কষ্ট করে চলুন কাঁদা ছুড়াছুঁড়ির যুদ্ধে নামি। যেহেতু মাদ্রিদ ফ্যান এবং সাপোর্টার বুঝতেই পারছেন স্বাভাবিক ভাবেই আমার ফেভারেট প্লেয়ার অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো। তাহলে ক্রিশ্চিয়ানোকে দিয়েই শুরু করি।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

পর্তুগিজ ও মাদ্রিদ এই তারকার কথা আমি প্রথম শুনি ২০০৬ বিশ্বকাপের সময়। পর্তুগালের এই তরুণ তুর্কি তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর প্লেয়ার ছিলেন। তখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগটাই আমার কাছে আকর্ষণের যায়গা ছিল। শুনলাম, দেখলাম ছেলেটা খেলে ভালোই। কিন্তু তখনও আমি আহামরি কোন ফ্যান না তার। কারণ নিজে সাপোর্ট করা টিমের রোনালদিনহো আছে না। যাই হোক, তখন তো মোবাইল কিংবা নেট কোনটারই এতো সহজপ্রাপ্যতা ছিল না। তাই খেলার খবর যা রাখা হত হয় খেলা দেখে না হয় পত্রিকা পড়ে। হঠাৎ পত্রিকায় দেখলাম পর্তুগীজ এই তরুণ আস্থা নেদারল্যান্ড এর সাথে খেলায় বাজে ভাবে ইনজুরড। হাটুর উপর স্পাইকের ক্ষতয় শেষ হয়ে যেতে পারে ২০০৬ বিশ্বকাপ। অথচ তিনি ফিরলেন প্রবল আত্মবিশ্বাস আর অদম্য মনোবল নিয়ে। এরপর কত অসংখ্যবার তাকে ভয়াবহ ইঞ্জুরি নিয়ে খেলতে আর দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যেতে দেখেছি তার হিসাব নেই। সেসব কথা থাক। তার অর্জন নিয়ে কথা বলে শেষ করা সম্ভব না।

মেসি রোনালদো নিয়ন আলোয় neon aloy

অপ্রিতরোধ্য গতি, নিখুত ও দুর্দান্ত সব শট, ডজিং, আন-অথোর্ডক্স পাসিং, অসাধারণ ফ্রি-কিক, ভলি, অমানবিক হেড এই সবের মিশেলই গোলমেশিন ক্রিশ্চিয়ানো। কোথায় পাবেন না আপনি তাকে? এট্যাকেও যেমন, দলের প্রয়োজনে ডিফেন্সিং লাইনেও তেমন। যিনি এক কথায় একাই টেনে নিয়ে গেছেন নিজের দলকে। কখনো ইউরোপ সেরার স্বাদ, কখনো বিশ্বকাপের টিকেট কিংবা কখনো চ্যাম্পিয়নস ট্রফি; সব যায়গায় নিজ দলের মূল অস্ত্র কিংবা ভরসা যাই বলুন তা ছিলেন এই অসাধারণ সেনাপতি। ঈর্ষনীয় করেছেন নিজের ক্যারিয়ার আর দলকে। অনেকের কাছে নিজের জন্য খেলা, ব্যাড বয় তকমা পাওয়া প্লেয়ারটাই তাই কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন তার স্বভাবসুলভ খেলা দিয়েই। যারা বলেন ক্রিশ্চিয়ানো নিজের জন্য খেলে তারা হয়তো ফুটবল খেলার মানেটাই জানেন না এবং নিয়মিত খেলা দেখেন না। কিংবা পর্তুগালের মতো একক নৈপুণ্যে টিকে থাকা টিমটি নিয়ে তাদের আদতে কোন ধারণা নেই।

লিওনেল মেসি

আমার পছন্দের দল ব্রাজিল, ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ, ফেভারিট প্লেয়ার ক্রিশ্চিয়ানো। কিন্তু আমি কখনই মেসি হেটার ছিলাম না এখনও নই। আমি বরাবরই মেসির একজন বড় ফ্যান। যিনি নেক্সট ম্যারাডোনার তকমা লাগিয়ে দলে ভিড়েছিলেন সেই তিনি বিশ্বকাপটা হাতে না তুললেও আমার কাছে ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। হয়তো আমি ম্যারাডোনার খেলা দেখি নাই সেটাও কারণ হতে পারে। কিন্তু মেসির যেটুকু খেলা আমি দেখেছি তাতে আমার কাছে আর্জেন্টিনা কিংবা প্রিয় রাইভাল বার্সেলোনার কিংবদন্তী এই মেসিই। ইন্টারন্যাশনাল ট্রফি বাদ দিলে ব্যাক্তিগত অর্জনে তিনিও কোন অংশেই কম নন।

মেসি রোনালদো নিয়ন আলোয় neon aloy

শৈল্পিক সব ড্রিবল, নিখুঁত পাসিং, দারুণ সব ডজ, শট, ফ্রি-কিক, পজিশন সেন্স মেসিকে করেছে একজন শিল্পী। নিজ দল আর্জেন্টিনায় অনেক নামি প্লেয়ার থাকতেও তিনিই মূল কাণ্ডারি, তার উপরই ভরসা করতে হয় আর্জেন্টিনাকে। খোদ ব্রাজিলের সাপোর্টার হয়েও ২০১৪ এর ফাইনালে চেয়েছিলাম আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হোক; জাস্ট মেসির হাতে একটা ট্রফি দেখার জন্য। কারণ আমার মনে হয়েছিল বিশ্বকাপ জেতার সেটাই তার সুবর্ণ সুযোগ এবং শেষ সুযোগ। আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা হয়তো ক্ষেপে যাবেন। নিজেরাই চিন্তা করে দেখুন ক্লাব গুলোয় ভালো করা এতো নামী দামী প্লেয়ারগুলোকে নিয়ে গড়া টিমটাকে বিশ্বকাপের টিকেটটা কিন্তু দিয়েছে এই ব্যাক্তি একক নৈপ্যুণেই। ভালো প্লেয়ারদের মিশেলে টিমটা হলেও টিম প্লে’টা ঠিক হয়ে উঠছে না। তাই বলে তিনি বদলে যাবেন না। ট্রফি হাতে উঠুক আর না উঠুক; মেসি, মেসিই থাকবেন। দিনশেষে মেসিই তাই ত্রাতা আর্জেন্টিনার।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে ক্রিশ্চিয়ানো আমার ফেভারেট প্লেয়ার হওয়া সত্বেও আমি কেন মেসির প্রশংসা করছি? দুই দলকেই খুশি করার জন্য? আর কেনই বা ক্রিশ্চিয়ানো আমার ফেভারেট মেসির এতো গুনাবলী থাকতেও।

ফেভারেট শব্দটার সাথে আমার কাছে ক্রিশ্চিয়ানো নামটাই আসবে। যদি বলেন কেন? সবার প্রথম কথা ভালো লাগে তাই। দ্বিতীয়ত আর্জেন্টিনা টিমে মেসির পেছনে অনেক ভারী ভারী নাম আছে; যদিও এই বিশ্বকাপের টিকিটে মেসি একাই টেনেছেন আর্জেন্টিনাকে। তবুও তার পেছনে আগুয়েরো, ডি বালা, ডি মারিয়া, মাশ্চেরানো, ওট্টামেন্ডির মত ভারী নামগুলো থাকলেও এর মতো অর্ধেক নাম আপনি পাবেন না ক্রিশ্চিয়ানোর পেছনে। বলতে পারেন কেবল এই কারণেই? না ভাই ব্যাক্তিগত ভাবে আমার ক্রিশ্চিয়ানোর খেলা বেশি ভালো লাগে। আর সবচেয়ে বড় কথা যার যার নিজস্ব পছন্দ রয়েছে তাই না?? কাজেই এই দিকে আর না যাই।

মেসি রোনালদো নিয়ন আলোয় neon aloy

আমাদের সাপোর্টারদের স্বভাবসুলভ সমস্যা রয়েছে। ক্রিশ্চিয়ানো পেনাল্টিতে গোল করলে আমরা বলি পেনাল্ডো আর মেসি মিস করায় মাছি। দুইটাই বাজে ধরনের মানসিকতার পরিচয় দেয়। যেখানে ক্রিকেটে খারাপ করলে নিজের দেশের প্লেয়ারদের ছাড়ি না সেখানে এরা আর কোথাকার কে। মুর্খ আমারই; তাই বুঝে না বুঝে যা খুশি আমি তাই বলব?

মেসি রোনালদো নিয়ন আলোয় neon aloy

পেনাল্টিতে গোল করা এতোই সোজা হলে দুনিয়ার মহা মহা তারকাদের এতো পেনাল্টি মিসের রেকর্ড থাকত না। আবার পেনাল্টি মিস করাও আহামরি কোন ঘটনা নয়। মেসি বলেই ব্যাপারটা নিয়ে এতো মাতামাতি। গতবারও পেনাল্টি মিস করেছে এবারও যখন করল তখনও ধারাভাষ্যকার বলছে ইট’স মেসি। কারণ তার উপর প্রত্যাশাটা বরাবরই বেশি। সব সময় সব কিছু তাদের ইচ্ছা মতো হয় না। আবার ক্রিশ্চিয়ানোর গোল নিয়ে মন্তব্য অনেকের যে ভাগ্যের জোড়েই গোল পাচ্ছেন তিনি। জনাব মনে রাখবেন ভাগ্য তাদেরই সহায়তা করে যারা সাহসী এবং পরিশ্রমি। ক্রিশ্চিয়ানো কিংবা মেসির পায়ে যখন বল থাকে তখন গোলকিপারর রোবট হলেও তার ভেতর বোধহয় নার্ভাসনেস কাজ করবে, শংকা কাজ করবে। যেখানে নিজ দলের ডিফেন্ডেররা, গোলকিপাররা যারা তাদের সাথে বছরের পর বছর খেলেও প্র‍্যাক্টিস ম্যাচেও তাদের মুখমুখি হতে চায় না।

যেখানে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিৎ যে আমরা এমন একটা প্রজন্ম যারা এই দুই মহারথীর খেলা একই সময়ে উপভোগ করতে পারছি। সেখানে আমরা ব্যাস্ত কাদা ছুড়াছুঁড়িতে। বলতে পারবেন শেষ কোন দুজন প্লেয়ার সম্পূর্ন বৈপরীত্য নিয়ে এমন উত্তেজনার ছোয়া দিতে পেরেছে। কবে আলোচনা হয়েছে এতো বেশি দুই রাইভাল টিমের দুইজন প্লেয়ারকে নিয়ে? বা পরবর্তীকালে কারাই বা তাদের যায়গা দখল করে ফুটবলপ্রেমিদের এতোটা রোমাঞ্চ দিতে পারবে?? নাম বললে প্রথম দিকে নেইমার আর গ্রিজম্যানের কথাই আসবে। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো এবং মেসির দ্বৈরথ উপহার দিতে তাদের পারফর্মেন্স ধরে রাখতে হবে আরও বহু বছর, পাড়ি দিতে হবে বহু পথ আর সৃষ্টি করতে হবে অসংখ্য মহাকাব্যের। সেটা হয়তো সময়ই একদিন বলে দিবে। তার আগ পর্যন্ত উপভোগ করুন আর ভালোবাসুন ফুটবলের এই দুই শিল্পীকে, দুই ম্যাজিশিয়ানকে।

তাই কার গার্লফ্রেন্ড কয়টা, আর কে কেমন ড্রেস পড়ে এওয়ার্ড অনুষ্ঠানে গেল সেসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, তাদের খেলাটা উপভোগ করুন। কারণ “গ্রেটেস্ট শো অন দ্যা আর্থ” বর্তমান সময়ে কথাটা তো তাদের জন্যই।

দিনশেষে আপনার আমার কাছে তারা সর্বকালের সেরা হওয়ার দৌড়ে দুই প্রতিযোগী হলেও আমার মতে ক্রিশ্চিয়ানো এবং মেসি একজন আরেকজনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাও। তারা ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশায় মত্ত থাকবেন একে অপরকে নয় বরং নিজেদেরকেই। এবং ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিবেন আরও অসংখ্য ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বসন্ত।

 

Most Popular

To Top