বিশেষ

বোটক্স থেকে ফেইস লিফটঃ বয়স কমাতে কতকিছুই না করে মানুষ!

বোটক্স থেকে ফেইস লিফটঃ বয়স কমাতে কতকিছুই না করে মানুষ!

“প্রথমে দর্শনধারী,পরে গুণবিচারী” এই প্রবাদবাক্য থেকেই বোঝা যায় আমাদের কাছে চেহারার কদর কতটুকু। চেহারাকে সুন্দর রাখার জন্য মানুষের কতই না প্রচেষ্টা, একটু ব্রণের দাগ হলে, মুখে একটু বলিরেখা দেখা দিলে মনে হয় বয়সটা বুড়িয়ে গেল। আমাদের মত ছা-পোষাদের তো নেহাত চলে যায় কিন্তু মিডিয়ার রঙিন জগতের বাসিন্দাদের চোখের তলায় একটু কালো ছোপ পরলেই যেখানে মাথা খারাপ হয়ে যায় সেখানে মুখে কয়েকটা বলিরেখা বা চোখের কোণা কুঁচকে যাওয়া এসব জিনিস তো রীতিমত সিরিয়াস ইস্যু।

তাই নায়ক-নায়িকাদের আর কোটি টাকার মালিকদের যৌবন ধরে রাখার জন্য কসমেটিক্স কোম্পানি থেকে আরম্ভ করে সংশ্লিষ্ট সবাই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবন করছে। মিডিয়ার লোকেরা সহ অন্য সবাই এসব যৌবন ধরে রাখার প্রযুক্তিগুলো দেদারসে ব্যবহার করছে, তবে সাময়িকভাবে এসব থেকে যতটুকু উপকার পাওয়া যায় তা কি দীর্ঘস্থায়ী হয়? নাকি প্রকৃতির স্বাভাবিক ক্রিয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে এসব প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে দীর্ঘমেয়াদে গিয়ে পস্তাতে হয়?

বয়স কমানোর জন্য বা এজিং ট্রিটমেন্টের জন্য সবচেয়ে পরিচিত নাম হচ্ছে বোটক্স, পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ছয় মিলিয়ন মানুষ বোটক্স ট্রিটমেন্ট নেয়। কিন্তু এই বোটক্স ট্রিটমেন্টের মূল উপাদান যে বটুলিনাম টক্সিন সেটাই বা কয়জন জানেন?

ক্লোসট্রিডিয়াম বটুলিনাম নামক গ্রুপের অণুজীব থেকে তৈরি হয় বটুলিনাম টক্সিন, যাদেরকে একত্রে নিউরোটক্সিন গ্রুপও বলা হয়ে থাকে কারণ তারা স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। মাসলদের সংকোচনের জন্য এসিটাইল কোলিন নামের এক প্রকার রাসায়নিক সংকেতবাহী পদার্থ স্নায়ু থেকে নিঃসৃত হয়। এই এসিটাইল কোলিন মাসল কোষগুলোর রিসেপ্টরদের সাথে যুক্ত হয়ে মাসলের সংকোচন বা প্রসারণ ঘটায়।

অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা ক্লোসট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া

স্নায়ুকে অবশকারী বটুলিনাম টক্সিন আপনার শরীরের নিউরোমাস্কুলার সন্ধিকে আক্রমণ করবে এবং এর ফলে নিউরোট্রান্সমিটার এসিটাইল কোলিন নিঃসৃত হবে না। এসিটাইল কোলিন যেহেতু আপনার মাসলের সংকোচন এবং প্রসারণের জন্য দায়ী পদার্থ, তাই এটি না থাকলে আপনার মাসলের সংকোচন প্রসারণ হবে না এবং এই অবস্থাকে ডাক্তারী ভাষায় “ফ্লাসিড প্যারালাইসিস” বলে।

মাটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবার, কাঁকড়া এবং অন্যান্য শেলফিস(ঝিনুক,শামুক)দের গিল আর অন্যান্য অংশে সাধারণত এই বটুলিনাম গ্রুপের অণুজীবগুলোকে সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে অণুজীবগুলো তেমন ক্ষতিকর অবস্থায় না থাকায় এদের দ্বারা তেমন কোনো সমস্যা হয় না।

তবে বটুলিনাম গ্রুপের তৈরিকৃত এই প্রোটিন জাতীয় বিষগুলোর কিন্তু চিকিৎসাক্ষেত্রে অনেক কদর, পরিমত মাত্রায় এদের ব্যবহারের ফলে মাংসপেশীর অস্বাভাবিক সঙ্কোচন প্রসারণের ফলে সৃষ্ট রোগগুলোর উপশম হচ্ছে। তাই বলে রূপচর্চায় বটুলিনাম টক্সিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিন্তু কখনোই কাম্য নয়।

বোটক্স এর কারিশমা!

যেখানে এক গ্রাম বটুলিনাম এক মিলিয়ন মানুষকে মারতে সক্ষম এবং দুই কেজি বটুলিনাম পুরো পৃথিবীর মানুষকে মেরে ফেলতে পারে সেই ভয়ানক বস্তু শুধুমাত্র নিজের বয়স কমানোর জন্য শরীরে নেওয়ার কি দরকার আমার মাথায় আসে না।

বোটক্সের পরেই আজকাল আসে কসমেটিকস আর প্লাস্টিক সার্জারির কথা। একবার বলিউডের একজন অভিনেতা বলেছিলেন যে অভিনেতা অভিনেত্রীরা মারা যাওয়ার পরে তাদের যদি কবর দেওয়া হয় তবেই বোঝা যাবে যে কে কতটুকু প্লাস্টিক সার্জারি করেছে। কথাটা শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও বাস্তবতা কিন্তু এমনই।

ইউটিউবে সার্চ দিলে এমন অসংখ্য ভিডিও আপনি পাবেন যেখানে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর অতীতের ছবি এবং বর্তমানের ছবির সাথে তুলনা করে তিনি কোন কোন সালে এবং শরীরের কোন কোন জায়গায় প্লাস্টিক সার্জারি আর কসমেটিক সার্জারি করেছেন তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

একবার থ্যাবড়া নাক ঠিক করবেন আরেকবার সরু ঠোঁট ঠিক করবেন, পরের বছর হয়তো বা মুখের চিক বোন এর আকার বদলাবেন। বারবার এসব সার্জারি করতে করতে একসময় তারা “অবসেসড” হয়ে যান এসবের প্রতি এবং সার্জারি করতেই থাকেন। ছোট্টখাট্ট কোনো সার্জারি করার পরেই যেখানে সার্জারি পরবর্তী শারীরিক অসুবিধায় আমাদের নাভিশ্বাস উঠে সেখানে বারবার এসব সার্জারি করার পরে সেলিব্রেটিদের কি অবস্থা হয় তা সহজেই অনুমেয়।

চোয়ালের হাড়ের আকার বদলানোর পরে রবার্ট প্যাটিনসন

শোনা যায় যে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পেছনে তার সার্জারির ব্যাথা কমানোর পেইনকিলারের মাত্রাতিরিক্ত ডোজ ভূমিকা রেখেছিল, এমন আরো অনেক সেলিব্রেটির জীবননাশের পেছনেও বারংবার প্লাস্টিক বা কসমেটিক সার্জারি করা পরোক্ষ কারণ ছিল।

এত টাকা খরচ করে এত কষ্ট করে ছুরিকাঁচির নিচে যাওয়ার পরেও কিন্তু ফলাফল সবসময় ভালো হয় এমনটা না, অনেক সময় সার্জারি করা অংশটুকু চাহিদা অনুযায়ী “শেপ” না নিয়ে অদ্ভুত আকারের হয় যায় যেমনটা হয়েছিল বলিউডের আয়েশা টাকিয়া কিংবা আনুষকা শর্মার ঠোঁটের।

আমাদের দেশের হাই ক্লাসদের বাদে অন্যদের আর্থিক সঙ্গতির সাথে এইসব সার্জারির ব্যয়ভার বেশি হয়ে যায় বলে হয়তো বা এখনো সেভাবে প্লাস্টিক কিংবা কসমেটিক সার্জারির প্রচলন হয়নি। কিন্তু উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্লাস্টিক আর কসমেটিক সার্জারি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, সেখানে টিনএজারদের স্বপ্নই থাকে কবে প্লাস্টিক সার্জারি করতে পারবে। অবস্থা এমন ভয়াবহ হয়ে গিয়েছে যে অনেক দেশে নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করে দেওয়া হয়েছে প্লাস্টিক সার্জারির উপরে।

ফেস লিফটিং এর নাম এখন অহরহ শোনা যাচ্ছে সর্বত্র। মুখের চামড়া ঝুলে গিয়েছে তো ফেস লিফটিং করাও, হাতের চামড়া ঝুলে গিয়েছে তো ফেস লিফটিং করাও, সবখানেই শুধু ফেস লিফটিং এর ধুম পড়ে গিয়েছে। সবাই ফেস লিফটিং করানোর জন্য উন্মাদ কিন্তু ফেস লিফটিং এর অপারেশনের পরে যে মুখের নার্ভগুলোর(ফেসিয়াল নার্ভ) উপরে চাপ পড়ে, হেমাটোমা(নখের উপর ইট চাপা পড়লে রক্ত জমাট বেধে যে কালো দাগ হয়ে যায় সেই অবস্থাটার টারমিনোলজি)তৈরি হওয়া ছাড়াও আর নানা উপসর্গ দেখা দেয় সেগুলোর কথা আর কেউ বলে না।

বোটক্স এবং ফেসলিফটের যৌথ প্রভাবে “ফ্রেন্ডস” টিভি সিরিজের মনিকা চরিত্রে রূপদানকারী কোর্টনি কক্স এর অতীত এবং বর্তমান!

এভাবে ফেস লিফটিং করতে করতে যে একসময় প্রাকৃতিক জিনিসটাই শেষ হয় যাবে সেটা কে শুনবে আর?

আর এতদিন পুরুষরা মেয়েদের রূপচর্চা নিয়ে হাসাহাসি করে বেড়াত কিন্তু এখন ছেলেরাও এসব কৃত্রিম সৌন্দর্য বর্ধনের ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে কোনো অংশে কম যাচ্ছেন না, সাথে নিজের “সিক্স প্যাক এবস” দেখানোর জন্য স্টেরয়েড আর অন্যান্য ক্ষতিকারক ড্রাগস নিচ্ছেন অনেকেই।

স্টেরয়েড আর ড্রাগ ব্যবহার করে “বাইসেপ” “ট্রাইসেপ” বাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে খুবই ফিট দেখানো ব্যক্তিটির মেডিক্যাল রিপোর্ট আর কেউ দেখে না, কিডনীর সমস্যা থেকে শুরু করে আরো নানারকম শারীরিক রোগে তাকে ভুগে ভুগে যে দিন কাটছে সেটা আড়ালেই রয়ে যায়। যে ড্রাগস গুলো ব্যবহৃত হয় কোরবানির হাটে গরু মোটা-তাজা করতে, সেগুলোই কিন্তু মানুষ নিজের শরীরে ঢুকাচ্ছে “ফিট” দেখাতে!

স্টেরয়েডে পোক্ত শরীর

দিনশেষে এসব কৃত্রিম সৌন্দর্য পাওয়ার জন্য মূল্য হিসেবে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো আজীবন বয়ে বেড়াতে হয় সেগুলো দেখলে সত্যিই অনেক খারাপ লাগে। উপরওয়ালা যেভাবে আমাদের বানিয়েছেন সেভাবেই থাক না আমাদের সৌন্দর্যটুকু, এই স্বাভাবিক চেহারা কিংবা শারীরিক গঠন নিয়েই না হয় ভালোবেসে যাক প্রিয়জনেরা।

Most Popular

To Top