ফ্লাডলাইট

বিশ্বকাপ ২০১৮: ফিফা আসলে নৈতিকভাবে কতটা স্বচ্ছ?

বিশ্বকাপ ২০১৮: ফিফা আসলে নৈতিকভাবে কতটা স্বচ্ছ?

অদ্ভুত এক বিশ্বকাপ দেখছি আমরা, ৩২টা দল বিশ্বের সবচেয়ে সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্টটায় লড়ছে, কোনটা বড় দল কোনটা ছোট দল বোঝাই যাচ্ছে না।

শুরুর আগে বিভিন্ন বেটিং ওয়েবসাইট ফেভারিট ছিল ব্রাজিল, আশেপাশেই ছিল জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স। তারপর আসতো আর্জেন্টিনা আর পর্তুগালের নাম। তারপর ইংল্যান্ড- বিশ্বকাপের পর বিশ্বকাপ ফ্যানদের হতাশ করা এক টিম, তাদেরকে নিয়েও স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, ১৯৬৬-এর পুনরাবৃত্তি হবে হয়তো।

কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হবার পর সবারই মুখ হা হয়ে গেছে। কারোরই আর নাকানিচুবানি খাওয়া বাকি নেই এবার। তবে তারা কেউ আজকে আমাদের আলোচ্য নয়, আমাদের আলোচ্য এই বিশ্বকাপের আয়োজক, অর্থাৎ ফিফা। বিতর্ক যাদের পিছু হটছে না বিগত কয়েক বছর ধরে।

ফিফা এবং ফিফাকে ঘেরা বিতর্ক

বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ফুটবল খেলাটি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি অর্জন করতে শুরু করে। সে সময়েই ফিফা অর্গানাইজেশনটি তৈরি হয়, সম্পূর্ণ খেলাটির দেখভাল করার জন্য। আন্তর্জাতিকভাবে ফুটবলকে পরিচালনা করার পাশাপাশি ফুটবলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোও তারাই আয়োজন করে।

তবে সমস্যা সেখানে নয়, সমস্যা হচ্ছে, কাগজে কলমে ফিফা একটি ননপ্রফিট অর্থাৎ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যারা কিনা সমগ্র বিশ্বের ফুটবলের উৎকর্ষের জন্য কাজ করে। অথচ এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছরই কয়েকশ কোটি টাকার লাভ গুনে থাকে।

এসব নানান ইস্যু থেকেই ২০১৫ সালে ফিফার মুখোমুখি হতে হয় জোরালো তদন্তের এবং তখন দেখা যায় ফিফার সর্বোচ্চ পদধারী অনেকেই ভয়ংকরভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ। ঘুষ আর দুর্নীতির সাক্ষাৎ প্রমাণ মেলে অনেক। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ৪১ জন ফিফা অফিশিয়াল এবং বিভিন্ন দেশের সরকারী নেতাদের অভিযুক্ত করে। তাদের মধ্যে ছিলেন কোস্টারিকা, এল সাল্ভাদোর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, পানামার সাবেক ও তখনকার বর্তমান রাষ্ট্রপতিরা। জালিয়াতি, আত্মসাৎ, কালোবাজারির অভিযোগে অভিযুক্ত হন তারা, বলা হয় এটা ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের ২৪ বছরের দীর্ঘ পরিকল্পনা। এফবিআই এরপরের বছর গুলোতেও চালিয়ে গেছে ফিফার উপর নিজেদের তদন্ত।

২০১৫ এর তদন্তে অভিযুক্ত ফিফা অফিসিয়ালরা

ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি ছিল রাশিয়াকে ২০১৮ বিশ্বকাপ আর কাতারকে ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ দেয়া নিয়ে। বলা কিছু সুবিধার বদলে অনৈতিকভাবে ফিফা দিয়েছে এই সুযোগ। ফিফা নিজেই এই অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করতে ২০১৪ সালে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে। সেই তদন্তের কোনো বিস্তারিত রিপোর্ট তারা প্রকাশ না করে শুধু বলে যে তদন্তে তারা নির্দোষ প্রমাণিত। অথচ এই তদন্তের মূল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে ফিফা যাকে নিয়োগ দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডেরাল প্রসিকিউটর মাইকেল গার্সিয়া, তিনি-ই বলেন যে তদন্ত আসলে সম্পূর্ণ হয়নি।

এই সমালোচনা শুধু রাশিয়ার বিশ্বকাপ আয়োজনের যথার্থতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কথা উঠেছিল, যে ফিফা আসলে পুতিন এবং তার মিত্রদের সহযোগিতা করছে। উদাহরণস্বরূপ পুতিনের মিত্র চেচেন রিপাবলিক বা চেচনিয়ার স্বৈরাচারী নেতা রামজান কাদিরভের কথা আনা যাক। এই দুর্নীতিবাজ নেতাকে প্রতিযোগিতার একজন পৃষ্ঠপোষক হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। মিশরের বিশ্বকাপ দলের প্রস্তুতির নির্ধারিত জায়গা পরে চেচনিয়ায়। পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে উঠে আসে কীভাবে কাদিরভ এই পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ নিয়ে মিশরের সুপারস্টার মোহাম্মদ সালাহকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে শক্ত করে নিচ্ছেন। কিছুদিন আগেই এই চেচনিয়ার শাসককে নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলে,

“তার শাসনে বিচারবহির্ভুত হত্যা, নির্যাতন, গুম নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সমালোচক এবং সাংবাদিকদের নিপীড়নে তার প্রশাসন সদা তৎপর।”

নিউ ইয়র্ক টাইমস যখন ফিফাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে, ফিফা থেকে তখন একটি মেইল আসে, যেখানে বলা হয়,

“ফিফার কার্যক্রম কোনো শাসন ব্যবস্থাকে বিধিসম্মত করে না, তাই এই সমালোচনা অমূলক।”

রামজান কাদিরভের সাথে মোহাম্মদ সালাহ

এবার এই বিশ্বকাপকে আমরা একটু অর্থনৈতিক দৃষ্টি থেকে দেখি।

বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল খরচ বহন করেন কারা?

স্বাগতিক দেশ কোনো কোয়ালিফাইং রাউন্ড ছাড়াই সরাসরি বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করে তা সত্য। কিন্তু এর বিপরীতে স্বাগতিক দেশকে একটা বড় অংকই গুনতে হয় যা দেশের অর্থনীতির উপর সত্যিকার অর্থে নেতিবাচক প্রভাবই ফেলে।

প্রথমত, স্বাগতিক হবার বিডে সব দেশকেই ফিফা এবং তাদের কর্পোরেট পার্টনারদের জন্য কর প্রত্যাহার অফার করতে হয় যে দেশ যত বেশি কর প্রত্যাহার করবে ফিফার এবং তার কর্পোরেট পার্টনারদের জন্য সে দেশ এগিয়ে থাকবে রেসে। ২০০৬ এ জার্মানী ২৭২ মিলিয়ন কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়ে বিশ্বকাপের স্বাগতিক হবার সুযোগ পায়। ২০১০ আর ২০১৪ এ দক্ষিণ আফ্রিকা আর ব্রাজিলের কর প্রত্যাহারের পরিমাণ গোপন রয়েছে।

স্বাগতিক দেশ হিসেবে ব্রাজিল ২০১৪ তে খরচ করেছিল ১৫ বিলিয়ন ডলারের মত, স্টেডিয়াম আর ট্রান্সপোর্টেশন এবং অন্যান্য ইনফ্রাস্ট্রাকচারের জন্য। “মানে গারিঞ্চা স্টেডিয়াম” ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল, তৈরিতে খরচ হয়েছিল ৫৫০ মিলিয়ন ডলার, সেটা এখন ব্যবহৃত হয় বাসের পার্কিং লট হিসেবে।

রাশিয়ার খরচও এবার হচ্ছে ১২ মিলিয়নের কাছাকাছি। যদিও বলা হয়, বিশ্বকাপ জাতীয় অর্থনীতিতে অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কিন্তু বাস্তবে জিনিসটা আসলে সেভাবে দেখা যায় না। রাশিয়ার সরকার দাবি কর্রেছে বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই তাদের জিডিপিতে ১৪ বিলিয়ন ডলার যোগ করেছে, কিন্তু কিভাবে করেছে তা বলে নি। তবে পর্যটন খাতে একটি দেশের ভালোই আয় হয় স্বাগতিক হিসেবে, তবে তার বিপরীতে খরচটাও কম গুনতে হয় না। রাশিয়ার সরকার বলছে, এই বিশ্বকাপ রাশিয়ার ইকোনমিকে একটা গতি এনে দিবে, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে আসলে তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না রাশিয়ার ইকোনমিতে।

অথচ ফিফার খরচের হিসাব করতে গেলে, তাদের মূল খরচটা হচ্ছে প্রাইজমানিতে। ফিফার ভাষ্যমতে, দলগুলোর জন্য সব মিলিয়ে প্রাইজমানি থাকছে ৪০০ মিলিয়ন ডলার, অংশগ্রহণ করা প্রতি দলের জন্য ৮ মিলিয়ন থেকে শুরু করে বিশ্বকাপজয়ী দলের জন্য ৩৮ মিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছে সে হিসাব। তাহলে সবচেয়ে বেশি খরচটা আসলে কাদের হচ্ছে, তা অনুমান করা নিশ্চয়ই কঠিন কিছু না।

মূলত কে আয় করে বিশ্বকাপ থেকে?

২০১৪-তে শুধু টিভিতেই বিশ্বকাপ দেখেছিল ৩.২ বিলিয়নের মত মানুষ, বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেকের কাছাকাছি। ফাইনালের দর্শক ছিল ১.১০১৩ বিলিয়ন, সেটাও শুধু টিভিতেই। অনলাইনেও স্ট্রিম করেছিল ২৮ কোটি মানুষ। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিযোগিতাটায় সম্প্রচার, টিকেট বিক্রয়, পর্যটন আর স্পন্সরশিপের সাথে জড়িতদের আয় হয় কোটি কোটি ডলার। আর সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য ফিফার।

সত্যিকার অর্থে আমাদের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফিফাই আসলে একেকটি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি লাভ লুফে নেয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ফিফার আয় হয় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২.৬ বিলিয়ন ডলার লাভ হয় অর্গানাইজেশনের জন্য। সম্প্রচার খাতে আয় হয় ২.৪৩ বিলিয়ন, আর স্পন্সরশিপ আর টিকেট বিক্রির থেকে আয় হয় যথাক্রমে ১.৬ বিলিয়ন আর ৫২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বলা হয় ফুটবলের উৎকর্ষ সাধনে ব্যবহৃত হবে এ অর্থ, কিন্তু সেরকম জবাবদিহিতা কিন্তু ফিফার নেই।

এই বিশ্বকাপে ফিফার আনুমানিক আয় ৬ বিলিয়ন ডলার, গতবারের থেকে শতকরা ২৫ ভাগ বাড়ার সম্ভাবনা এবার। সম্প্রচার খাতে ফিফার আয় হবে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার, ৩.২ বিলিয়ন মানুষ থাকবে এবার দর্শক হিসেবে। অথচ এই বিশ্বকাপ আয়োজনের অর্থটা কিন্তু গুনতে হয়েছিল রাশিয়ার জনগণকে। যেই ফিফার বিশ্বকাপকে আমরা এতটা ভালোবেসে দেখি, সে ফিফা আসলে কতটুকু নৈতিক, সে ব্যাপারটি ভেবে দেখার সময় হয়েছে আমাদের।

Most Popular

To Top