বিশেষ

কয়েকজন মেটাল কাউবয়জ এবং প্যান্টেরা

কয়েকজন মেটাল কাউবয়েস এবং প্যান্টেরা

“Believe the word
I will unlock my door
and pass the
Cemetery gates”

হেভিমেটাল সঙ্গীতপ্রেমীরা হয়তো এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন আজ যেই ব্যান্ডটি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি তা গ্রুভ/থ্র্যাশ মেটালের “হল অফ ফেম” এর ব্যান্ডগুলোর মধ্যে একটি। বেশ সাড়া জাগানো ব্যান্ডটি ১৯৮১ সালে আমেরিকার টেক্সাসের আরলিংটন শহরে দুই ভাইয়ের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল। জি, আমি “প্যান্টেরা” এর কথাই বলছি।

গ্রুভ ও থ্রাশ মেটালের জন্য ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও এর শুরুটা কিন্তু এরকম ছিল না। ৮০ এর দশক জুড়ে গ্ল্যাম মেটালই চালিয়ে যাচ্ছিলো তারা। এমনকি এ সময়ে ব্যান্ডটি ৪টি এলবামও রিলিজ করে। কিন্তু এধরনের জন্রায় মন বসছিলো না অ্যাবোট ভ্রাতৃদ্বয়ের। তাই তাদের প্রথম এলবাম “মেটাল ম্যাজিক” থেকে তাদের পরবর্তী এলবামগুলো আরো বেশি হেভি হতে থাকে। ১৯৮৬ সালে অ্যাবোট ব্রাদার্স গ্ল্যাম জন্রা থেকে বের হওয়ার জন্য নতুন ভোকালের সন্ধানে বের হয় এবং ব্যান্ডটির তখনকার ভোকাল টেরি গ্লেজ ব্যান্ড থেকে সরে আসে। মনের মতো ভোকাল না পাওয়ায় ব্যান্ডটি তাদের প্রথম ভোকালিস্ট “ডনি হার্ট” কে আবার ফেরাতে চায়। এমনি এক সময়ে নিউ অরলিন্স বাসিন্দা “ফিল অ্যানসেলমো” জানতে পারে যে প্যান্টেরার নতুন ভোকাল খুঁজছে। সেই বছরের শেষ দিকে প্যান্টেরা তাঁকে অডিশনের জন্য ডাকে এবং তারপর থেকেই ১৯ বছর বয়সী অ্যানসেলমো ব্যান্ডে যোগ দেয় নতুন ভোকাল হিসেবেই।

চিত্রঃ- “প্যান্টেরা” এর লোগো

১৯৮৮ সালে প্যান্টেরা তাদের নতুন ভোকাল “ফিল অ্যানসেলমো”, গিটারে “ডাইমব্যাগ ডায়মন্ড ড্যারেল অ্যাবোট”, ড্রামে “ভিনি পল অ্যাবোট” ও বেজে “রেক্স রকার ব্রাউন” কে নিয়ে তাদের “পাওয়ার মেটাল” এলবাম রিলিজ দেয়। আগের ৩টি এলবামের তুলনায় এই এলবামটি ছিল তাদের সবচেয়ে হেভিয়েস্ট এলবাম। ধীরে ধীরে ব্যান্ডটি গ্রুভ মেটালের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। স্পটলাইটের আলোতে আসতে না আসতেই ব্যান্ডটিকে তাদের রেকর্ড লেবেল নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। হারিকেন হুগোর কল্যাণে তাদের পরিচয় হয় অ্যাটকো রেকর্ডসের মার্ক রসের সাথে। প্যান্টেরার পারফরমেন্স দেখে অভিভূত হওয়া মার্ক তাদের সাথে অতিদ্রুত চুক্তিবদ্ধ হয়। এভাবেই মেজর লেবেলের সাথে যুক্ত হয় প্যান্টেরা।

চিত্রঃ- প্যান্টেরা(একদম বাঁদিক থেকে ডাইমব্যাগ, ফীল, রেক্স এবং পল)

১৯৯০ সাল, প্যান্টেরা রিলিজ দেয় তাদের অন্যতম জনপ্রিয় এলবাম “কাউবয়জ ফ্রম হেল”। এই অ্যালবামের মাধ্যমেই ব্যান্ডটি তাদের গ্ল্যাম ভঙ্গিকে সম্পূর্ণ মুছে গ্রুভ মেটাল শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরে। অ্যানসেলমোর হেভি ভোকাল, ড্যারেলের জটিল ও পরাক্রমশালী গিটার সোলো – রিফ, ভিনি পলের ফাস্ট ও ব্লাড পাম্পিং ড্রাম বিটস সবকিছু মিলিয়ে এলবামটি ছিল একটি মাস্টারপিস। এলবামটি খুব দ্রুত তাদের সফলতা এনে দেয়। অ্যালবামের সবচেয়ে জনপ্রিয় “সেমেট্রি গেটস” গানটি মৃত প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের ভালোবাসা নির্দেশ করলেও এক সাক্ষাৎকারে ফিল অ্যানসেলমো বলেন গানটি তার মৃত বন্ধুদের নিয়ে লেখা, যারা প্রত্যেকেই আত্মহত্যা করে।

এছাড়াও এবছর তারা বেশ কয়েকটি ট্যুরে অংশগ্রহন করে। এর মধ্যে অন্যতমটি মেটালিকা ও এসি-ডিসি এর সাথে ১৯৯১ সালে প্রায় ৫০০,০০০ ব্যান্ডমিউজিক ভক্তদের সামনে।

এরপরেই আর পিছনে তাকাতে হয়নি ব্যান্ডটিকে। ১৯৯২ সালে তারা রিলিজ দেয় “ভালগার ডিসপ্লে অফ পাওয়ার”। এই অ্যালবামের জনপ্রিয় দুটি গান “দিস লাভ” ও “মাউথ ফর ওয়ার”। এছাড়া এই অ্যালবামের আরেকটি অন্যতম হিট “ওয়াক”। যা এ পর্যন্ত স্পটিফাইতে শোনা হয়েছে ৭৬ মিলিয়ন বারেরও বেশি। গানটি সম্পর্কে ডাইমব্যাগ ড্যারেল বলেন গানটি তারা তাদের কিছু বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে লেখেন যারা “কাউবয়জ ফ্রম হেল” ট্যুর থেকে আশার পর তাদের সাফল্য ভালোভাবে নিতে পারছিলো না। তাদের উপেক্ষা করে এবছর আবারো তারা জাপান ও ইতালিতে ট্যুর দেয়। ইতালি ট্যুরে তাদের সাথে স্টেজ শেয়ার করে আয়রন মেইডেন ও ব্ল্যাক সাব্যাথ। ১৯৯৪ সালে তারা রিলিজ দেয় “ফার বিয়ন্ড ড্রিভেন” এলবাম যা আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার এলবাম চার্টে ১ম এ অবস্থান করে। এলবামটির “আই অ্যাম ব্রোকেন” গানটি গ্র্যামিতে মনোনীত হয়।

১৯৯৫ সালে অ্যানসেলমোকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে ব্যান্ড সদস্যরা। ঘন ঘন লাইভ পারফর্মেন্সের কারনে অ্যানসেলমোর ব্যাকপেইন ধরা পড়ে। চিকিৎসক তাঁকে ১ বছরের জন্য সঙ্গীতজগত থেকে বিরতি নিতে বললেও সে তা মেনে নেয় না। বরং পেইনকিলার হিসেবে হেরোইন ব্যবহার করা শুরু করেন। যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণে ব্যান্ড সদস্যদের সাথে তার দূরত্বও তৈরি হতে থাকে।

১৯৯৬ সালে প্যান্টেরা তাদের অষ্টম এলবাম “দি গ্রেট সাউদার্ন কিল” রিলিজ দেয়। এই অ্যালবামের একটি সিঙ্গেল “ফ্লাডস” এ ড্যারেলের অত্যন্ত জটিল গিটার সোলোর জন্য তা “গিটার ওয়ার্ল্ড” ম্যাগাজিনের সেরা ১০০ গিটার সোলোর মধ্যে জায়গা করে নেয়। সেই বছরেরই মাঝামাঝি সময়ে অতিরিক্ত হেরোইন গ্রহনের ফলে প্যান্টেরা ভোকালিস্ট অ্যানসেলমোর হার্টফেল হয়। চিকিৎসকদের চেষ্টায় প্রাণে বেঁচে গেলেও ব্যান্ডের বাকি সদস্য ড্যারেল অ্যাবোট ও পল অ্যাবোটের কাছে ব্যাপারটা একটা বড়সড় ধাক্কার মতো লাগে। অ্যানসেলমো তার ভুল বুঝতে পেরে তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও হেরোইন ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প করে। পরের দু’বছর ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে, প্যান্টেরা “অযফেস্ট” এর মঞ্চ কাপিয়ে তোলে। এছাড়াও এসময় তাদের “সেমেট্রি গেটস” ও “সুইসাইড নোট্‌স পার্ট – ১” গান দুটি গ্র্যামিতে মনোনীত হয়। এ সময় অ্যানসেলমো বাইরের বেশকিছু ব্যান্ড এর সাথেও কাজ করা শুরু করে।

প্যান্টেরা তাদের সর্বশেষ এলবাম নিয়ে হাজির হয় ২০০০ সালে। এলবামটি বিলবোর্ডে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করে। প্যান্টেরার চতুর্থ গান হিসেবে “রেভ্যুলেশন ইজ মাই নেম” গানটি গ্র্যামিতে মনোনীত হয়। এরপর প্যান্টেরা ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে বেশকিছু ট্যুর দিয়ে থাকে।

প্যান্টেরার মেম্বাররা সর্বশেষ একসাথে পারফর্ম করে জাপানের “বিস্ট ফেস্ট” এ। এরপরে দেশে ফিরে একটি মিউজিক ভিডিও ও নতুন এলবাম নিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। ভোকালিস্ট অ্যানসেলমো তার অন্যান্য ব্যান্ডের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে ও প্যান্টেরা ব্যান্ডমেটদের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিলে অ্যাবোট ব্রাদার্স ব্যান্ড ভেঙ্গে দেয়। সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে অ্যানসেলমো ও অ্যাবোট ব্রাদার্সের মধ্যে কথা ছোঁড়াছুঁড়িও হয়। শেষমেশ নানা তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়েই প্যান্টেরা অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

প্যান্টেরা ভেঙ্গে যাওয়ার পর অ্যাবোট ব্রাদার্স “ড্যামেজপ্ল্যান” গঠন করে। ২০০৪ সালে তাদের প্রথম এলবাম রিলিজ হয়। রিলিজের সাথে সাথেই অ্যালবামের ৪৪০০০ কপি বিক্রয় হয়।

এদিকে অ্যানসেলমোর ব্যান্ড “ডাউন” দ্বিতীয় এলবাম “ডাউন-২” রিলিজ দেয়  ও “সুপারজয়েন্ট” রিলিজ দেয় তাদের প্রথম এলবাম “ইউজ ওয়ান্স অ্যান্ড ডিসট্রয়”।

২০০৪ সালের ডিসেম্বরের ৮ তারিখ আমেরিকার কলম্বাস শহরে “ড্যামেজপ্ল্যান” এর একটি শো তে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত এক ভক্তের গুলিতে নিহত হন ইতিহাসের অন্যতম একজন সেরা গিটারিস্ট ডাইমব্যাগ “ডায়মন্ড” ড্যারেল অ্যাবোট। যার ফলে প্যান্টেরা রিইউনিয়নের সম্ভাবনাটাও মুছে যায়।

চিত্রঃ- ডাইমব্যাগ ডায়মন্ড ড্যারেল

প্যান্টেরার একদম সর্বশেষ লাইনআপে ছিলো

ভোকালিস্ট – ফিল অ্যানসেলমো
গিটারিস্ট, ব্যাকভোকাল – ডাইমব্যাগ “ডায়মন্ড” ড্যারেল অ্যাবোট
বেজিস্ট – রেক্স “রকার” ব্রাউন
ড্রামার – ভিনি পল অ্যাবোট

সাবেক সদস্য
ভোকালিস্ট, রিদম গিটার, কিবোর্ড – টেরি গ্লেজ

ডিস্কোগ্রাফী

১. মেটাল ম্যাজিক (১৯৮৩)
২. প্রোজেক্টস ইন দি জাংগল (১৯৮৪)
৩. আই অ্যাম দি নাইট (১৯৮৫)
৪. পাওয়ার মেটাল (১৯৮৮)

চিত্রঃ- প্যান্টেরার এলবামসমূহের প্রচ্ছেদ

৫. কাউবয়জ ফ্রম হেল (১৯৯০)
৬. ভালগার ডিসপ্লে অফ পাওয়ার (১৯৯২)
৭. ফার বিয়ন্ড ড্রিভেন (১৯৯৪)
৮. দি সাউদার্ন ট্রেন্ডকিল (১৯৯৬)
৯. রিইনভেন্টিং দি স্টিল (২০০০)

ডাইমব্যাগ ড্যারেল যেমন আজ আর নেই, ভিনি পল মারা গেলেন মাত্রই গতকাল (২২ জুন, ২০১৮)! একসময় বাকি সদস্যরাও থাকবে না। তখন থাকবে তাদের কাজগুলো। এই কাজগুলো যেমন ড্যারেল না থাকলেও তার অবদানগুলো বিশ্বজুড়ে তার ভক্তদের গিটার বাজানোর অনুপ্রেরনা যোগায়, তেমনই সময়ের সাথে বাকি সব সদস্যও একসময় বিদায় নিলেও তাদের কাজ বিশ্বজুড়ে তাদের ভক্তদের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখবে।

আরো পড়ুনঃ হেভী মেটালের জনক একজন টোনী আইয়োমী এবং তার ব্যান্ড ব্ল্যাক স্যাবাথ

Most Popular

To Top