ক্ষমতা

পরিবার থেকে সন্তানদের আলাদা করে দিচ্ছে ট্রাম্পের “জিরো টলারেন্স” ইমিগ্রেশন পলিসি

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের আমেরিকা থেকে ইমিগ্রেশন বিলীন করে দেবার চেষ্টা স্পষ্ট। তাদের নির্বাচনী প্রচারণার-ই অন্যতম হাতিয়ার ছিল কঠোর ইমিগ্রেশন পলিসির প্রতিশ্রুতি, মেক্সিকো-আমেরিকা বর্ডারে দেয়াল বানানোর বার্তা পরিণত হয়েছিল ট্রাম্পের শ্লোগানে। যদিও আমেরিকা বলতে গেলে তৈরিই হয়েছে ইমিগ্র্যান্টদের দিয়ে, তবুও শ্বেতাঙ্গ ধনী আমেরিকানদের মাঝে বর্ণবাদের শেষ নেই, এক অদ্ভুত ধরনের কট্টর জাতীয়তাবাদ তাদের মধ্যে। আর এই আবেগটাকে পুঁজি করেই ক্ষমতায় গেলেন ট্রাম্প, আর এখন তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন প্রতিটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।

প্রথমে মুসলিমদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন, সেটা করে অবশ্য টেকাতে পারেননি। তারপর ভিসা কমিয়ে দিলেন, শরণার্থীদের তাড়িয়ে দিলেন হাজারে হাজারে। মানে আমেরিকায় ইমিগ্র‍্যান্ট হিসেবে থাকাটাই রীতিমত একটা ভয়ংকর বিষয় হয়ে বানিয়ে ফেলছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রতিটি নতুন নতুন পলিসির মাধ্যমে আমেরিকা যেন “ব্ল্যাক প্যান্থার”-এর ওয়াকান্ডায় রূপ নিচ্ছে। তাদের সর্বশেষ পলিসিটাই বোধহয় ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর এর মধ্যে। কিন্তু এর বাস্তবায়নের পর কিছুটা বিড়ম্বনায়ই পড়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

পলিসির নাম “জিরো টলারেন্স।” পলিসিতে বলা হচ্ছে মেক্সিকো আমেরিকার বর্ডারে যত প্রাপ্তবয়স্কদেরকে পাওয়া যাবে, তৎক্ষণাৎ তাদেরকে অভিযুক্ত করে ভরা হবে জেলে। এমনকি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে আসলেও, জেলেই ঢুকতে হচ্ছে তাদের। তবে ভয়ংকর ব্যাপার সেটা না। প্রশাসন এই কাজ করতে গিয়ে বর্ডারের ফ্যামিলিগুলোকে তাদের সন্তান থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। কারণ বাচ্চাকাচ্চাগুলো তো আর প্রাপ্তবয়স্ক না! বাবা-মাকে জেলে পাঠিয়ে, ছেলে মেয়েকে আমেরিকার সরকার কিছুদিন বর্ডারে খাঁচার মত একটা জায়গায় আটকে রেখে ভরে দিচ্ছে ডিটেনশন সেন্টারে। গত ছয় সপ্তাহেই দুই হাজারেরও বেশি শিশুকে তাদের বাবা মা থেকে আলাদা করে দেয়া হয়েছে এভাবে।

পরিবারগুলোকে এভাবে আলাদা করা হচ্ছে

আলাদা হওয়া শিশুগুলোর অবস্থা

ঘটনার তীব্রতা বুঝতে হলে, ওয়াশিংটন স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রমীলা জয়পালের কথাগুলো উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি একটি রাষ্ট্রীয় ডিটেনশন সেন্টারের মহিলাদের সাথে কথা বলেছেন সম্প্রতি। তিনি বলছিলেন সেখানকার মহিলারা তাকে জানিয়েছেন, বর্ডারে তারা তাদের সন্তানকে আলাদা করার ব্যাপারটির প্রতিবাদ করতে গেলে তাদেরকে ধর্ষণ বা রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয় দেখানো হয়। অনেকের সন্তানের বয়স হয়তো মাত্র ১২ মাস, অথচ তাঁরা জানেন না তাদের সন্তানকে এখন কোথায় রাখা হয়েছে। কাউকেই এভাবে আলাদা করে দেবার আগে একটি বিদায় জানাবারও সুযোগ দেয়া হয়নি।

দুঃখজনক হচ্ছে, এই মানুষগুলো কিন্তু মেক্সিকো থেকে পালিয়ে আসা অপরাধী বা দুর্বৃত্ত এমন কিন্তু নয়। এদের বেশিরভাগই আসছেন এল সালভাদোর, গুয়াতেমালা বা হন্ডুরাস থেকে যৌন পাচার, সহিংসতা হতে নিজেদের বাঁচাতে। তাঁরা আমেরিকার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ের জন্য আবেদনের আশায়ই এসেছেন, কাগজে কলমে যা অবৈধ নয়। আসার পর তাদেরকে বর্ডার পেট্রল মিথ্যা কথা বলে সন্তানদের কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে, বলছে, আপনার সন্তানকে “গোসল দেওয়ানো” হবে, কিংবা ক্ষুদ্র “জিজ্ঞাসাবাদ” করা হবে- এইসব বলে সন্তানকে যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মা আর দেখাই পাচ্ছেন না সেই সন্তানের। এই মে মাসে একজন হন্ডুরানের কাছ থেকে তার তিন বছর বয়সী সন্তানকে কেড়ে নেবার পর তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তার সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে লোকটি আমেরিকান সরকারের কাছে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে এসেছিলেন।

বর্ডার পেট্রোলের নির্দেশনা অনুযায়ী মেয়ের জুতোর ফিতা খুলে নিচ্ছেন মা, এরপরই মেয়েকে তার থেকে কেড়ে নেয়া হবে

প্রশ্ন আসে, আগে কি করা হত? পলিসির নতুনত্বটা কোথায়? সাধারণত, যারা অভিযুক্ত হন, তাদেরকে বিচারকের সামনে পাঠানো হত আগে, অভিযুক্তের আমেরিকায় প্রবেশ অবৈধ প্রমাণিত হলে তাদেরকে দেশান্তরিত করে দেয়া হত। এখন “জিরো টলারেন্স” পলিসি এসবের ধার না ধেরে সোজা জেলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ইমিগ্র্যান্টদের, বাচ্চাকাচ্চাগুলো পরিবার থেকে বলতে গেলে বিনা কারণেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই বাচ্চাগুলোকে যেখানে রাখা হচ্ছে, খাঁচার মত দেখতে সেসব জায়গা। পরিবার ছাড়া সেইসব অবরুদ্ধ জায়গায় নিরপরাধ শিশুগুলো কিভাবে আছে, তা ভাবাটাও কষ্টকর।

এই পলিসির বিরুদ্ধে কথাও তাই কম উঠছে না, রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট দুই পক্ষ থেকেই নিন্দা আসছে এর বিরুদ্ধে, অমানবিক এবং নিষ্ঠুর বলছেন তাঁরা ব্যাপারটিকে।

আমেরিকার সাবেক ফার্স্ট লেডি লরা বুশ ব্যাপারটাকে বলছেন অনৈতিক। বর্তমান ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ব্যাপারটা নিন্দা জানালেও ট্রাম্প প্রশাসনকে তিনি দোষ দেননি। এছাড়াও অনেক রিপাবলিকানই নিন্দা জানাচ্ছেন ব্যাপারটার।

বিল ক্লিনটনও ব্যাথিত, জানিয়েছেন টুইটের মাধ্যমে। হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, “যেকোন মানুষ, যার নূন্যতম সহানুভূতি এবং শিষ্টাচার আছে, সে-ই এরকম ঘটনায় ক্ষুব্ধ হবে।”

পোপের গত সপ্তাহের টুইটটিও এ ঘটনাটিকেই ইঙ্গিত করে-

যে কারোরই এ ব্যাপারে মর্মাহত হবার কথা, এর প্রতিকারের চিন্তা করার কথা। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন তা না করে একে অপরকে দুষে চলেছেন। ট্রাম্প নিজেই বলছেন ডেমোক্রেটদের করা আইনের জন্যই আজ এই অবস্থা। তাঁরা যদি ইমিগ্র্যান্টদের দিয়ে দেশ ভরিয়ে না ফেলত, তবে আজ এমন হতো না। কেমন অদ্ভুত তাই না? তিনি একের পর এক টুইটে বলছেন ডেমোক্র্যাটরা কিভাবে তাকে সহায়তা করছে না, তাই এর কোনো প্রতিকারও হচ্ছে না। এটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স এই পলিসিকে আবার সমর্থন করছেন বাইবেলের রেফারেন্স টেনে।

ট্রাম্প এভাবেই দুষে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটদের, অথচ কাজের কাজ কিছু করছেন না

অস্থিরতা বেড়েই চলছে। রাজনীতির কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে, মাঝখান দিয়ে শিশুর পর শিশু হারিয়ে ফেলছে নিজেদের পরিবারকে। সবদিক থেকে সমালোচিত হয়ে গতকালই জরুরী ভিত্তিতে একটি নির্বাহী আদেশে সাক্ষর করেছেন ট্রাম্প, যাতে বলা হয়েছে গ্রেফতারকৃত প্রাপ্তবয়স্কদের তাদের সন্তানের কাছ থেকে আলাদা রাখা যাবে না। এখন সময়ই বলে দেবে, ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে এই ইমিগ্র্যান্টদের জন্য।

Most Popular

To Top