ফ্লাডলাইট

রুমানার হাতে তামিমের ব্যাট চাইনা আর!

রুমানার হাতে তামিমের ব্যাট চাইনা আর!

নারী দলের অলরাউন্ডার রুমানা আহমেদ। আর সব ক্রিকেটারের মতো রুমানার নিজেরও ভালো ব্রান্ডের একটি শখের ক্রিকেট ব্যাট ছিলো। সেই ব্যাটটি একদিন চুরি হয়ে যায়। ঘটনাটা নারী দলের সাউথ আফ্রিকা সফরের আগের। ক্রিকেট কিটসের জন্য জোহানসবার্গ খুব বিখ্যাত জায়গা। দামি দামি ব্রান্ডের ব্যাট, প্যাড, গ্লাভস পাবেন সেখানে। আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের কোন ব্যাট বা হেলমেট লাগলে তারা জোহানসবার্গ অথবা ওয়েলিংটন থেকে আনিয়ে নেন। কিন্তু সাউথ আফ্রিকা সফরে গেলেই কি আর রুমানারা ক্রিকেট ব্যাট কিনতে পারেন?

মেয়েদের ক্রিকেটে যারা চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় তারা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন (ছেলেদের সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা)। মেয়েদের ওয়ানডে ম্যাচ ফি ৮৩০০ টাকা (ছেলেদের ২ লাখ), মেয়েদের টি-টুয়েন্টি ম্যাচ ফি ৬২২৫ টাকা (ছেলেদের ১ লাখ ২৫ হাজার)। মেয়েদের ঘরোয়া ক্রিকেট বলতে জাতীয় লীগ, যেখানে ম্যাচ ফি বলতে কিছু নেই। আছে ভ্রমণ ভাতা ১০০০ টাকা মাত্র। ছেলেদের ম্যাচ ফি ৩৫ হাজার, ভ্রমণ ভাতা ২৫০০ টাকা। সুতরাং লাখ র‍্যান্ডের (আফ্রিকা মুদ্রা) দামি ব্যাট হুট করে কেনাটা রুমানাদের জন্য অনেক কঠিন।

রুমানার সমস্যার সমাধান করেছিলেন তামিম, গত বছর সাউথ আফ্রিকা সিরিজের সময় কেনা একটি ব্যাট রুমানাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। রুমানা অবশ্য সময় সুযোগ বুঝে দাম পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তামিম রাজি হননি। তামিমের সেই ব্যাট রুমানার হাতে হেসেছে। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান এবং উইকেট রুমানার। ফাইনালেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রান করেছেন তিনি।

টুর্নামেন্টে রুমানার সংগ্রহ ১০, ৪২* এবং ২২। তিন ইনিংস ব্যাট করেই ভারতের বিপক্ষে দুটি জয়ে অসামান্য ভুমিকা রাখেন ব্যাট বল হাতে।

রুমানা, ফারজানা হক, নিগার সুলতানাদের ব্যাট কথা বলেছে দলের দরকারের সময়। ৫০-৫০ ম্যাচটা আজকে বাংলাদেশের পক্ষে অনেকটাই চলে আসে যখন নিগার সুলতানা অভিজ্ঞ ঝুলন গোস্বামীকে টানা তিনটি চার মারেন।

ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল জয় ছিলো স্বপ্নের মতো, শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ছিলো উত্তেজনা। ৩ বলে ৩ রান দরকার, ভেবেছিলাম ছেলেদের মতো মেয়েরাও কি তীরে এসে তরি ডোবাবে। কিন্তু পেশাদারিত্বের দূর্দান্ত এক নিদর্শন দেখিয়ে জয় পায় মেয়েরা।

এই জয় থেকেই ঘুরে দাঁড়াক বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট। এই মেয়েদের হাত ধরেই আসলো আমাদের প্রথম বহুজাতিক টুর্নামেন্ট ট্রফি। টানা ছয় বারের চ্যাম্পিয়ন ছিলো ভারত, নারী বিশ্বকাপের রানার্স-আপ দল। এই এশিয়া কাপেই তারা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড করেছিলো যা ভেঙে দেয় বাংলাদেশ।

ঐতিহাসিক এই ফাইনালের মুহুর্তগুলো দেখুন এখানেই!

যারা নারী ক্রিকেটের সামান্যতম খবর রাখেন তারা জানেন একই টুর্নামেন্টে পাকিস্তান-ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে খেলাটাই যেখানে বড় প্রাপ্তি হতে পারতো সেখানে ট্রফি জেতাটা কত বড় অর্জন।

মেয়েদের ক্রিকেটে এক সময় অনেক বাধা বিপত্তি ছিলো, সামাজিক বাধা ছিলো, পারিবারিক বাধা ছিলো। সেসব সমস্যার সবটা সমাধান না হলেও মেয়েদের ক্রিকেটে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্রিকেটার আসছে। বছর দশেক আগেও যেখানে নারী দলের প্রায় সব ক্রিকেটার খুলনার একটা এলাকা থেকে বা বড়জোর খুলনা শহরের আশেপাশের এলাকা থেকে উঠে এসে যাত্রা শুরু করেছিলো বর্তমানে সেই অবস্থা নেই। সারা দেশ থেকেই ক্রিকেটার উঠে আসছে। বাবা-মারাও আর আগের মতো বাধা দেন না।

কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা আর্থিক। বেতন, ম্যাচ ফি কম। বিসিবির কথা, পাওয়া যায় না স্পন্সরশীপ। এর সমাধান আছে, অন্য দেশের মতো প্যাকেজ করে দিতে হব সব।

# যারা জাতীয় দলের স্পন্সর হবে তাদের নারী দলের স্পন্সরশীপ একই প্যাকেজে নিতে হবে।

# গাজি টিভি হোক আর যেই হোক, ব্রডকাস্টিং চুক্তি করার সময় মেয়েদের খেলা দেখানোকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। সব না হলেও অন্তত যেকোন সিরিজের অন্তত এক ম্যাচ, বছরে অন্তত দুটি সিরিজ এইভাবে। যখনই খেলা টিভিতে দেখাবে তখনই অন্যসব স্পন্সরশীপ পাওয়া যাবে। আয়ের পথ সুগম হবে।

# নিয়মিত সিরিজ আয়োজন করা লাগবে। মেয়েদের ডিপিএল যে বার বার ঝুলিয়ে রাখা হয় সেটার সমাধান করা লাগবে। নিয়মিত হতে হবে। তাহলে কিন্তু আর্থিক সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়।

আর ম্যাচ ফি এবং বেতন? এটা বিসিবি চাইলেই বাড়াতে পারে, পঞ্চম ধনী বোর্ড বিসিবি। ছেলেদের থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের কিছুটা মেয়েদের পেছনে গেলে সমস্যা কি? এটাও বিনিয়োগ।

প্রথম কোন শিরোপা এনে দিলো মেয়েরা, এই এশিয়া কাপ ছেলেরা জিতলে বিসিবি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় বড় রকম পুরষ্কার দিতেন? সেটা কি মেয়েরা পাবে? মেয়েরা একটা বার্তা দিয়েছে, তারা পারে। পারে বলতে খুব ভালোভাবে পারে।

বিসিবি বার্তাটা নিক, যেসব প্রতিষ্ঠান ক্রিকেটে বিনিয়োগ করে তারা বার্তাটা নিক। পত্রিকার এক কোনায় না প্রথম পাতায় দেখতে চাই মেয়েদের এই সাফল্যের খবর। অন্তত এইরকম অবস্থায় মেয়েদের ক্রিকেটকে দেখতে চাই না যাতে কারো ব্যাট হারালে তামিম ইকবালদের এগিয়ে আসতে হয়, এইরকম দুই চারটা ব্যাট যেন রুমানাদের কিটস ব্যাগে সবসময় থাকে, আর সেটা নিজেদের আয় করা অর্থেই।

তাহলে এবার কি অন্তত নিজেদের প্রাপ্যটা বুঝে পাবেন আমাদের বাঘিনীরা?

Most Popular

To Top