ফ্লাডলাইট

“এটি ম্যারাডোনার মাথা আর ঈশ্বরের হাতের খেলা”

এটি ম্যারাডোনার মাথা আর গডের হাতের খেলা

“আমার মনে পড়ে বিশ্বকাপের আগে দিয়াগোর সমালোচনা করা বিভিন্ন আর্টিকেলের কথা। কারণ আমি প্যাসেলেরার বদলে তাকে ক্যাপ্টেন বানিয়েছিলাম এবং তার হওয়ারও উচিত ছিল না। কারণ ৮২’র বিশ্বকাপে সে যা করেছিল। তারা আমাকে বলেছিল বোচিনি দিয়াগোর চেয়ে ভালো, কিন্তু আমি গায়ে লাগাই নি। দিয়াগো নিজে আমাকে বলেছিল আমরা একা এবং তারপর কি ঘটেছিল তা আপনারা জানেনই” – বিলরাডো (ম্যানেজার, ‘৮৬ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা টিম)।

ফুটবল বিশ্বকাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শো। প্রত্যেক বিশ্বকাপ আসে চমক নিয়ে। ব্যতিক্রম ছিল না ৮৬’র বিশ্বকাপও। ৮৬’র বিশ্বকাপের আসর বসেছিল মেক্সিকোতে। যা ছিল ফিফা বিশ্বকাপের ১৩তম আসর। তবে বিশ্বকাপ বসার কথা ছিল কলম্বিয়াতে। কিন্তু অর্থনৈতিক অসুবিধার কারণে তা হয়ে উঠেনি। ফলে মনোনীত হয় মেক্সিকো। এই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল হয় আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মধ্যে। ম্যাচটি হয় এস্তাদিও অ্যাজটেকায়। এটা সেই স্টেডিয়াম, যেখানে ঠিক ১৬ বছর আগেই আরেকটি বিশ্বকাপে পৃথিবী দেখেছিলো গত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল ম্যাচটি! আর ১৯৮৬ সালের ম্যাচেই হয় Hand of god খ্যাত ম্যারাডোনার গোলটি।

১৯৮৬’র ম্যারাডোনা

যখন ৮৬’র বিশ্বকাপ হয়, ম্যারাডোনা ছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী। তার ক্যারিয়ারের গোল্ডেন সময়ই তিনি পার করছিলেন তখন। ‘৮৪ তে ১১.৭ মিলিয়ন পাউন্ডের রেকর্ড ভাঙ্গা ফিতে বার্সা থেকে যোগ দেন নাপোলিতে। যোগদানের বছরেই নাপোলিকে ৮ নম্বর এবং পরের বছর ৩-এ আনেন তিনি। উল্লেখ্য যে তার যোগদানের আগের বছরই নাপোলি রেলিগেশন জোনে লড়াই করছিল। কিন্তু ম্যারাডোনার আগমনে ক্লাবে নতুন হাওয়া বইছিল। ৮৬’র বিশ্বকাপের পরই তার হাত ধরে নাপোলির হাতে আসে প্রথম কোপা ইতালিয়া।

১৯৮২’র বিশ্বকাপ দূর্বিসহই ছিল আর্জেন্টিনার জন্য। দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালির কাছে হেরে বিদায় হয় তারা। বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে রেকর্ড ২৩ বার ফাউলের শিকার হন ম্যারাডোনা। ৮৬’র বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ছিলেন অনেক পরিপক্ক। ৮৬’র বিশ্বকাপে তখনকার এই বিশ্বসেরা খেলোয়াড় যে কিছু করবেন তা হয়ত সবাই আঁচ করেছিল।

১৯৮৬’র আর্জেন্টিনা দল

আর্জেন্টাইন ম্যানেজার বিলরাডো নতুন ৩-৫-২ ফরমেশন আনেন দলে। যা সেসময়ে যুগান্তকারী ছিল। যেখানে সবাই গটবাধা ৪-৪-২ ফরমেশনে আটকা ছিল সেখানে এমন সিদ্ধান্ত সাহসিকতার পরিচয় দেয়।

কাউন্টার এটাক প্রধান এই ফরমেশনে মিডফিল্ড ছিল পিছনে বাকানো ফলে ৭জনের শক্তিশালী ডিফেন্স সিস্টেম তৈরী হয়। গোলকিপার পুমপিডোর সামনে ছিল তিন ডিফেন্ডার জোসে লুইস ব্রাউন, জেসে লুইস কুকুইফু আর লিবাবিও অাস্কার।  ৫ মিডের সার্জিও বাতিস্তা ছিল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। আর ম্যারাডোনা ছিল সিস্টেমের ইন্জিন, প্লেয়ারদের মধ্যে লিংকআপ।

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ

ইংল্যান্ড তাদের গ্রুপ স্টেজ পার করে ২য় স্থানে থেকে এবং রাউন্ড অফ ১৬’তে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে কোয়ার্টারে ওঠে। অপরদিকে দূর্ধর্ষ আর্জেন্টিনা দল ছিল অপরাজেয় এবং তাদের পথযাত্রায় উরুগুয়েকে বাড়ির টিকিট ধরিয়ে শেষ আটে পৌছায়। এদিকে ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনার মধ্যে কিছু রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। ফকল্যান্ড আইল্যান্ড নিয়ে তাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। যা আরও হাওয়া লাগিয়েছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতায়।

ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনা খেলেছিল ৩-৫-১-১ যেখানে জর্জ ভলদিনের পিছনে খেলেছিলেন ম্যারাডোনা। অপরদিকে ইংল্যান্ড ছিল চিরচায়িত ৪-৪-২ ফরমেশনে। মিডফিল্ডের দুই প্রান্তে ছিলেন দুই কান্ডারি স্টিভ হজ এবং ট্রেভর স্টিভেন।

প্রথম হাফ শেষ হয় গোল শূন্য ভাবে। তবে প্রথমার্ধে ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পেয়েছিল ইংল্যান্ডের পিটার বার্ডসলি। কিন্তু কাজে লাগাতে পারে নাই। কিন্তু বল পজেশনে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। মুহুর্মুহু আক্রমণে ব্যাস্ত রেখেছিল বিপক্ষের রক্ষণভাগকে।

 

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয় চমক দিয়ে; জন্ম হয় দু’টি প্রসিদ্ধ মুহূর্তের, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে।

আর্জেন্টাইন স্কিপার নাম্বার ১০ তার চমক দেখান। গ্লেন হজকে বোকা বানিয়ে বল নিয়ে বিপক্ষের রক্ষণভাগে ঢোকেন। যেখানে থাকা আরও দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বলের অপেক্ষায় থাকা ভালদিনোকে পাস দেন এবং বক্সের মধ্যে নিজের পজিশন নিয়ে নেন। ভালদিনোর শট করা বল হজের ভুলে পেনাল্টি বক্সেই উপরে উঠে, যেখানে ম্যারাডোনা লাফিয়ে ওঠেন এবং হাত দিয়ে বল ঢুকিয়ে দেন গোলে। যেখানে গোলকিপার শিল্টনের দেখা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

কিন্তু অবাক করা বিষয় হল কোন অফিশিয়ালেরই তা চোখে পড়ে নাই। আরও অবাক করা বিষয় ইংল্যান্ডের কিছু প্লেয়ার ছাড়া বিষয়টি কেউ আঁচই করতে পারে নাই। গোল হওয়ার পর আঁচ করতে পাওয়া প্লেয়াররা ছুটে যায় রেফারি আলী বিন নাসেরের কাছে। এমনকি তখন ইংলিশ কমেন্টেটর বেরি ডেভিস অবাক হয়ে বলেছিলেন,

“কেন তারা অফসাইডের আবেদন করছে! যেখান হজের ভুলে বানানো বলেই গোলটি হয়েছে। “

ডেভিস রিপ্লে’তে ম্যারাডোনার হাত উঠানো দেখেছিলেন কিন্তু সন্দেহে ছিলেন ওটি হাতে না মাথায় লেগেছিল। ম্যারাডোনার উদযাপনই হয়ত এখানে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল যা সবার চোখ নিয়ে গিয়েছিল অন্যদিকে।

বিন নাসের বামদিকের ডিবক্সের আউটলাইনের কাছেই দাড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু তার দৃষ্টি শেল্টনের কারণে ব্লক হয়ে গিয়েছিল। তবে বিপরীত পাশে থাকা লাইনসম্যানের পরিষ্কার দেখার কথা ছিল এটি। ফলে গোলটি দিতেই হল আর্জেন্টিনাকে। ইংল্যান্ড হয়ত অযাচিত গোল খেয়ে ফিরে দাঁড়ানোর চেষ্টাই করছিল কিন্তু এর কিছু মিনিট পর ম্যারাডোনার আরেক গোলে লিড ২-০ তে করে আর্জেন্টিনা।

নিজেদের সাইডেই বল পেয়েছিলেন ম্যারাডোনা। এরপর প্রথম টাচে নিজের গোলের দিকে বল নিয়ে যান এবং একজন প্রতিপক্ষকে কাটান। সামনে থাকা আরেক প্রতিকক্ষকে ব্যাকস্পিনে বোকা বানান। এরপর সামনে ফাঁকায় বল নিয়ে স্প্রিন্টে পিটার রেইডকে পিছনে ফেলে ঢুকে যান ইংল্যান্ডের বক্সে।

এবার সামনে আসেন বুচার এবং ট্যাকেলে যান কিন্তু ম্যারাডোনা যেন উড়ছিলেন। ট্যাকেলে বল আর ম্যারাডেনা কিছুরই নাগাল পান নি তিনি। যখন ডিবক্সে পৌছান তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন টেরি ফেনউইক। সামনে থাকা বল এবং ম্যারাডোনাকে ভড়কে গিয়ে ফাউলের চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। তিনিই ছিলেন শেষ বাউন্ডারি ইংলিশ গেলরক্ষক শেলটনের মুখোমুখির আগে।

ম্যারাডোনা এবং গোলের মাঝে একজনই ছিলে শুধু শেলটন। শেলটন ভেবেছিল ম্যারাডোনা কোনায় শট নিবেন। তাই নিচু হয়ে কোনায় ঝাপ দেন তিনি। কিন্তু ম্যারাডোনা সুন্দরভাবে বাম পায়ে বল কাটিয়ে নেন যেমনটি করেছিলেন ফেনউইকের সাথে এবং বল জালে জড়ান।

এবার অফিশিয়ালদের দেখার কিছু ছিল না। ভাষ্যকার চিৎকার করে বলে উঠেন,

“আপনাকে এটি চমৎকার বলতেই হবে”।

তবে শেষে গ্যারি লিংকার একটি গোল শোধ দিলেও জেতা হয়ে ওঠেনি ইংল্যান্ডের।

২০১৬ সালে এক সাক্ষাতকার নেওয়া হয় ম্যারডোনার। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয় হাত দিয়ে গেল করার জন্য তিনি নিজেকে দোষী মনে করেন কিনা। ম্যারাডোনা বলেন,

“এটিই একটি হ্যান্ডবল যার জন্য আমি কখনও ক্ষমা চাইব না। আমি হাত দিয়ে গোল করার জন্য অনুতপ্ত নই, একটুও না। তখনও ছিলাম না, এখনও নেই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনও হব না।”

ইংরেজ গোলকিপার শিল্টনের বিপক্ষে এই গোল সম্পর্কে তিনি আরও বলেন,

“বলটি যেন বেলুনের মত আমার দিকে এগিয়ে এসেছিল, আহ কি সুস্বাদু খাবার! মনে মনে বলছিলাম, এটি আমার। আমি জানি না আমি এটি করতে পারব কিনা কিন্তু ঝুকি নিতে আমি প্রস্তুত। যদি সে ফাউল দেয় তাহলে তাই। আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম যা শিল্টন আশা করে নাই। সে মনে করেছিল আমি তার দিকে যাব। ছবিতে দেখুন আমার কি অবস্থা ছিল। আমি শিল্টনকে পরাস্ত করতে পেরেছিলাম কারণ আমি ছিলাম জীবনের সবচেয়ে ফিট সময়ে। সেও লাফিয়েছিল কিন্তু আমি তার আগে লাফ দিয়েছিলাম। কারণ তার চোখ ছিল বন্ধ আর আমার চোখ ছিল বলে। যখন আমার মাটিতে পা পড়ে আমি উৎযাপনের জন্য দৌড় দেই। বলটি জোড়ে বাউন্স খেয়েছিল। আমি ঘুষি মেরেছিলাম। কিন্তু বলটি এমনভাবে ঢুকেছিল যেন আমি বলটি কিক করেছিলাম। রেফারি, লাইন্সম্যান, শিল্টন সবাই ধাঁধাঁর মধ্যে ছিল। শুধু একজনই বুঝেছিল কি হয়েছে, সে হল ফেনউইক, একমাত্র ব্যক্তি আমি এবং আমার গোলের মাঝে ছিল। কিন্তু সে বাদে! আর কিছুই না, কেউ না। ভালডানো এসে বলেছিল, “তুমি কি হাত দিয়ে বল মেরেছো!” আমি তাকে বলেছিলাম চুপ কর এবং উৎযাপন কর। আমরা শঙ্কায় ছিলাম তারা গোলটি বাতিল করে কিনা, কিন্তু তারা করেনি। খেলা শেষে প্রেস কনফারেন্সে আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না, কেমন করে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাব সেটি খুজছিলাম। প্রথমে আমি বলছিলাম বলটি আমি হেড করেছিলাম। কারণ আমি স্টেডিয়ামে ছিলাম এবং ভয়ে ছিলাম যে গোলটি যদি বাতিল হয়! কিন্তু যাওয়ার পথে আমি কাকে যেন বলেছিলাম এটি ম্যারাডোনার মাথা আর ঈশ্বরের হাতের খেলা। আর পত্রিকা আমার কথাটিই প্রকাশ করে এবং গোলটি নাম পায় Hand of God নামে।”

গোলটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা অনেক। তবে গোলে ভর করেই যে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় এবং ম্যারাডোনার অমরত্ব লাভ তা হয়ত কেউই অস্বীকার করবে না।

Most Popular

To Top