ফ্লাডলাইট

একটি হোয়াইটওয়াশঃ একটি নতুন সূচনার তাগিদ

একটি হোয়াইটওয়াশঃ একটি নতুন সূচনার তাগিদ

বেশ অনেকটা দিন ধরেই বাংলাদেশের খেলার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। নিদাহাস ট্রফির পর প্রায় ৩ মাস পর বাংলাদেশের সিরিজ ছিল এটি। প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান বলেই কিনা আমাদের মস্তিষ্ক ধরেই নিয়েছিল আমাদের খেলা হবে “জিম্বাবুয়ে” টাইপ কোন দলের সাথে এবং সিরিজটি আমরা ৩-০ ব্যবধানে জিতে নিব। খুব সাদামাটা একটা সিরিজ হবে, এই সুযোগে নিজেদের ঝুলিতে কয়েকটি ফ্রি রেটিং যোগ করবো।

বরাবরই বাস্তববাদিতার পরিচয় দিয়ে আসা এক সাকিব আল হাসান ছাড়া আমরা সবাই ওয়ানডের আফগানিস্তান আর টি২০ এর আফগানিস্তান দলের মধ্যে পার্থক্য ভুলে গিয়েছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম যে আমাদের সাথে আফগানদের টি২০ তে রেটিং ব্যবধান ২০। আরেকটি লজ্জার ব্যাপার কি আপনারা জানতেন? আমাদের সাথে স্কটল্যান্ডের রেটিং ব্যবধান মাত্র ৪, মানে এরকম পারফর্মেন্স বজায় রাখলে আমাদের র‍্যঙ্কিং এ ১১ তে নামা কেবল সময়ের ব্যাপার।

গতকালকে হোয়াইটওয়াশের পর সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে মানুষের ক্ষোভ চোখে পরার মত। আর এই ক্ষোভগুলো গিয়ে পড়ছে সাকিবের ক্যাপ্টেনসির উপর, তামিমের উপর, লিটনের উপর কিংবা রাহি, সাব্বিরদের উপর। অযথা বাড়তি ক্ষোভ দেখাতে গিয়ে বরাবরের মত আমরা প্রকৃত সমস্যাটিকে হারিয়ে ফেলছি।

আমাদের একটা মূল সমস্যা হচ্ছে আমরা হার্ড হিটার খুঁজে পাচ্ছি না। এমন কোন প্লেয়ার পাচ্ছি না যারা ক্রিজে এসে প্রথম বল থেকেই ওভার বাউন্ডারি মারার যোগ্যতা রাখে। টি২০ এর জন্য আপনার ব্যাটসম্যানের মাসল পাওয়ার থাকতে হবে, কব্জির জোর থাকতে হবে। ক্লাসিক্যাল ব্যাটিং করে ৯০-১০০ স্ট্রাইক রেটে রান করা ব্যাটসম্যান এখন টি২০ তে অচল পয়সা।

সাকিব, তামিম, মুশফিক আর রিয়াদ তো আমাদের অটো চয়েজ কেননা ঘুরে ফিরে এরাই আমাদের ম্যাচ উইনার। এদের সাথে একাদশে আরও অন্তত ৩ টা কোয়ালিটি প্লেয়ার দরকার যারা রেগুলার ১৫০+ স্ট্রাইক রেটে রান করতে পারে। কিন্তু হারিকেন দিয়ে খুঁজেও আমরা এমন ৩ টা প্লেয়ার পাইনি, পাইপ লাইন বানানোর কথা তো বাদই দিলাম। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ২ টা প্লেয়ার আমরা পেয়েছিলাম যারা কিনা টি২০ এর সাথে কিছুটা মানানসই- সৌম্য সরকার এবং সাব্বির রহমান। কিন্তু আফসোস তারা অধারাবাহিকতার ট্যাগ লাগিয়ে বসেছেন। কিন্তু একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন তো, অধারাবাহিক দেখে কি আপনি তাদের বসিয়ে একটা ওয়ানডে প্লেয়ারকে দিয়ে ম্যাচ খেলাবেন নাকি ওই অধারাবাহিক প্লেয়ার দুটিকেই ঘষে মেজে ঠিক করবেন? ওয়ানডে প্লেয়ারকে দিয়ে আপনি কখনও টি২০ জিততে পারবেন না কিন্তু ঘষে মেজে সাব্বির সৌম্য কে চকচক করতে পারলে এরা আপনাকে রেগুলার ম্যাচ জিতাবে।

টি২০ তে ভাল টিম হতে হলে পাইপ লাইনে অন্তত ৫-৬ টি হার্ড হিটার থাকতে হবে। যেই টিমের পাইপ লাইন যত স্ট্রং সেই টিমের ভাল করার সুযোগ তত বেশি। কিন্তু আফসোস! আমাদের তো একাদশে খেলানোর মতই প্লেয়ার নেই।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে আমাদের কোয়ালিটি বোলারের অভাব। সাকিব, মুস্তাফিজ আর রুবেল ছাড়া উল্লেখ করার মত আর কোন বোলারকে দেখছি না। এর মধ্যে আবার আমাদের মুস্তাফিজ আইপিএল খেলতে ব্যস্ত, জাতীয় টিমের খেলা আসলে তিনি ইনজুরিতে থাকেন। আব্দুর রাজ্জাকের পর কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও স্টেবল একটা স্পিনার পেলাম না। আরাফাত সানি, সোহাগ গাজি কিংবা হালের নাগিনরা কেবল আশা জাগিয়েই নিভে যায়। লেগ স্পিনারের হাহাকার তো চলছেই। অথচ কিছুদিন আগেও মাশরাফি, আলামিন আর তাস্কিনদের ভিড়ে রুবেল একাদশে সুযোগ পেত না, ফলাফল স্বরূপ টি২০ এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলি আমরা। যেখানে অন্যান্য দেশের পাইপ লাইন দিন কে দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে সেখানে আমাদেরটা আর সংকুচিত হচ্ছে। হোয়াইটওয়াশ আমরা হবো নাতো কে হবে?

যতদিন পর্যন্ত এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারি ততদিন সাকিবের ক্যাপ্টেনসির দোষ দিয়ে লাভ নেই। হাতে প্লেয়ার না থাকলে শুধু ক্যাপ্টেনসি দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। বাংলাদেশের এখন কার টি২০ দলের ক্যাপ্টেন যদি পন্টিং, গাঙ্গুলি কিংবা ধোনিও হতো তাও তাদের ম্যাচ হারতেই হত।

ক্যারিয়ারের ১০ হাজার রান আর ৫০০ উইকেট পাবার পরও সাকিবকে আমরা এখনো কাঠগড়ায় নিয়ে যাই। সাকিবের ডেডিকেশন নিয়ে এখনো প্রশ্ন তোলা হয়। ১ম ম্যাচে ক্যাপ্টেনসির জন্য ধুয়ে দিলেও ২য় ম্যাচে ১৩০+ রানকে যেভাবে ডিফেন্স করছিলাম সেটার জন্য কাউকে ক্যাপ্টেনের প্রশংসা করতে দেখলাম না। আমরা এমন কেন? কিছুদিন আগেও আমরা মুশফিকের উপর ক্ষেপেছিলাম, তাকে টি২০ টিম থেকে সরানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলাম। নিদাহাস ট্রফির ম্যাচগুলো দিয়ে মুশফিক জবাব না দিলে এতদিনে হয়ত উইকেটের পিছনে লিটন কিংবা সোহানকে দেখতাম। এখন আবার ক্ষেপেছি তামিমের উপর। তামিমকে আবার হয়ত পাকিস্তান সিরিজের মত আঙ্গুল নাড়িয়ে জবাব দিতে হবে আমাদের সমালোচনা থেকে বাঁচার জন্য।

আমরা কেন ভুলে যাই যে ঘুরে ফিরে আমাদের ম্যাচ উইনার এরাই। এরা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে যা অন্যরা পারবে না। এদের উপর আমরা ১০ বছর ইনভেস্ট করেছি, এখন আমাদের এদের থেকে লভ্যাংশ আদায় করায় সময়। এদেরকে টিমের বাইরে রাখার কথা চিন্তা করাও পাপ এখন। এদের বদৌলতেই মাঝে মাঝে ২-১ টা টি২০ সিরিজে ভাল করি আর আশায় বুক বাধি। তথাপি, যতদিন টি২০ এর জন্য মানানসই প্লেয়ারের পাইপ লাইন তৈরি করতে না পরব ততদিন এভাবেই ইরেগুলার পারফর্মার হয়ে থাকতে হবে, রেগুলার ম্যাচ জিততে আর পারব না।

দেশের অর্থনীতি কিংবা ক্রিকেট উভয়ের স্বার্থেই টি২০ তে ভাল টিম হয়ে উঠা অত্যাবশ্যক। আফগানদের সাথে হোয়াইটওয়াশ আমাদের জন্য একটা আগাম বার্তা। আমরা যদি টি২০ তেও ওয়ানডের মত সাফল্য দেখতে চাই তাহলে এখনি আমাদের উপরের সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিত।

ভাবতেও অবাক লাগে যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রিফুজি ক্যাম্প থেকে রশিদ খান আর নবীরা বের হয়ে আসে কিন্তু ১৬ কোটির একটা স্বাধীন দেশ থেকে আমরা ১১ টা প্লেয়ার খুঁজে পাই না, একটা বিশ্বমানের লেগি খুঁজে পাই না। অবশ্য পাবই বা কিভাবে? টি২০ প্লেয়ার বের করার একমাত্র প্লাটফর্ম বিপিএলে আমরা দেশীদের সুযোগ না দিয়ে ৫ বিদেশি খেলানোয় ব্যস্ত। এজন্যই হয়ত আমরা দেশী প্লেয়ার প্রডিউস না করতে পারলেও টাইমাল মিলস কিংবা আরচারদের মত বিদেশী প্লেয়ার ঠিকই প্রডিউস করেছি।

Most Popular

To Top