ক্ষমতা

হোয়াইট হাউজে ইফতার নিয়ে ট্রাম্পের যত কেচ্ছাকাহিনী

হোয়াইট হাউজে ইফতার নিয়ে ট্রাম্পের যত কেচ্ছাকাহিনী

মার্কিন ইতিহাসে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের জন্য হোয়াইট হাউজে প্রীতিভোজ সর্বপ্রথম আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন। ১৮০৫ খ্রীষ্টাব্দে তিউনিশিয়ার কূটনৈতিক প্রতিনিধি সিদি সোলেমান মেলিমলীর আপ্যায়নে এই আয়োজন করা হয়। সেসময় রমজান মাস চলছিলো বিধায় মুসলমান অতিথিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে রাতের খাবারের আয়োজন এগিয়ে ইফতারের সময় নিয়ে আসা হয়।

হোয়াইট হাউজে বার্ষিক ইফতার আয়োজনের সূচনা করেন হিলারী ক্লিনটন। সেই আয়োজনে অংশ গ্রহন করেন প্রমুখ মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ আমেরিকান মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশ। এরপর থেকে বিল ক্লিনটন প্রতি বছরই এই আয়োজন করেন। জর্জ ডব্লিউ বুশ এই রীতির ব্যতিক্রম না করে নিজের দু-টার্মেই আয়োজন করেন ইফতারের। তার প্রথম ইফতারের আয়োজন ছিল ২০০১ সালে, ৯/১১-এর ঠিক পরপরই। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এই প্রথা থেকে সরে আসেন নি। ২০০৯ সালে শুরু করে প্রতি বছরই আয়োজন করেন ইফতার ডিনারের।

৯/১১ পরবর্তী হোয়াইট হাউজ ইফতার ডিনারে বক্তব্য রাখছেন জর্জ ডাব্লিউ বুশ

২০১৭ সালে বিশ বছর পুরাতন এই প্রেসিডেন্সিয়াল প্রথা বর্জন করে ট্রাম্প প্রশাসন। শুধুমাত্র একটি লিখিত প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্টে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানানো হয় গোটা মুসলিম বিশ্বকে। সেখানে মার্কিন মুসলিমদের প্রতি বিশেষ সম্ভাষণ অনুপস্থিত ছিল। ইতোমধ্যেই ইসলাম বিদ্বেষী চিন্তাধারা এবং ৬টি মুসলিম রাষ্ট্র থেকে মুসলামানদের আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ট্রাম্প তুমুল সমালোচনার পাত্রে পরিণত হন। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেট্যারি শন স্পাইসারের কাছে ইফতার ডিনার আয়োজন না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন “আমার কার্যত জানা নেই।”

এই বছর বিষয়টা পুরোপুরি ভিন্ন ভাবে সামলে নিয়েছে হোয়াইট হাউজ। ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমবারের মত ইফতার ডিনারের আয়োজন করে গতকাল। ৩০-৪০ জন অতিথিদের আমন্ত্রণ করা হবে বলে জানান প্রেস সেক্রেট্যারি সারাহ স্যান্ডার্স। তবে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা প্রকাশ করেনি প্রশাসন। জানা গেছে আয়োজনটি ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইফতারের প্রথা পালন করা হলেও গেস্ট লিস্টে সাধারণ মুসলিম জনতা, বুদ্ধিজীবী ও ইসলামিক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়টা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

মার্কিন মুসলিমদের অনেকেই ট্রাম্পের সাথে এক টেবিলে বসতে অসম্মতি জানিয়েছেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমাম ইয়াহিয়া হেন্দী “আমাদের ইফতারের প্রয়োজন নেই। নিজেদের যথাযথ সম্মান রক্ষা করাটা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়” বলে বিরক্তি প্রকাশ করেন। ২০০৯ সালে ওবামার আয়োজিত ইফতার ডিনারে অংশ গ্রহণ করেছিলেন হেন্দী। কিন্তু এই বছরের আয়োজনে তাকে নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়নি বলে তিনি জানান। তবে পাঠানো হলে তিনি তা উপেক্ষা করতেন বলে স্পষ্ট মত প্রকাশ করেছেন।

অনেকের ধারণা আয়োজনটি আসলে বিদেশে মার্কিন প্রতিচ্ছবি পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। মার্কিন মুসলিমদের সাথে সম্পর্ক রক্ষার শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যটি চাপা পড়ে গেছে বলে অভিমত অনেকের।

ইমামে হেন্দী’র সুরে একই ভাবে ইফতারে অংশগ্রহণ না করার কথা বলেন ডালিয়া মোজাহেদ। সামাজিক নীতিমালা অধিদপ্তরের গবেষণা বিষয়ক পরিচালক হিসেবে তিনি আরও বলেন,

“এরকম সময়ে আমাদের অংশগ্রহণ ট্রাম্প প্রশাসনের অনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়ার মত দেখাবে।”

আমেরিকান-ইসলামিক কাউন্সিল ট্রাম্পের আয়োজনের বিপরীতে “NOT Trumps Iftar” নামে একটি ইফতার আয়োজন করবে হোয়াইট হাউজের সামনে।

গত বছরের সমালোচনার পর এবছর ইফতার আয়োজন ইতিবাচক ভাবে নেওয়া হবে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন ইসলামিক যুবসমাজের প্রতিনিধি জিয়াদ আহমেদ বলেন ”মুসলিমরা আমেরিকানদের ঘৃণা করে, ধাঁচের কথাবার্তার জন্য ক্ষমা না চাইলে আসলে কোন কিছুই ইতিবাচক ভাবে নেওয়া সম্ভব না।”

 

মুসলিম জনগোষ্ঠী কাউন্সইলের ভাইস প্রেসিডেন্ট উমর নুরুদ্দীন বলেন,

”বিগত ১০ বছরের রিতী অগ্রাহ্য করে এবার আমাদের কাউন্সিলের কেউই নিমন্ত্রণ পান নি।”

প্রাক্তন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উপদেষ্টা কামার-উল-হুদার মতে এই আয়োজন মধ্য-প্রাচ্যের সম্পর্ক রক্ষার্থে করা হয়েছে। এখানে আমেরিকান মুসলিমদের অবস্থা কোন চিন্তার বিষয়ে পড়ে না। এই ধরণের মনোভাব ইসলামকে একটি বিদেশী ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে যা তিনশ বছরের আমেরিকান মুসলিম ইতিহাসের প্রতি অপমানজনক। এই মতামত পোষণের পরও তিনি ইফতারে অংশ গ্রহণ করতেন বলে তিনি জানান, যদি তাকে নিমন্ত্রণ পাঠানো হত।

জাতিগত বিদ্বেষ আর ইসলামভীতি নিরসনের ব্যাপারে এই ইফতার আয়োজন কোন প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্বাস করতে নারাজ অধিকাংশ মার্কিন মুসলিম। এমনকি ট্রাম্পের জন্য ভোট দেওয়া ৮% মুসলিমদের মধ্যেও এই ধারণা প্রকট।

Most Popular

To Top