নাগরিক কথা

ধর্মীয় সম্প্রীতিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ…

ধর্মীয় সম্প্রীতিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

আমাদের পণ্ডিতদের, প্রগতিশীলদের চোখে শুধুমাত্র ‘সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ’ চরিত্রটুকু ধরা পড়ে। অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে তাদের চোখে পড়ে না। সম্ভবত তারা চায় বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডা, এজেন্ডার ফসল নিজেদের ঘরে তুলতে। মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা, এজেন্ডা নতুন কিছু নয়, যা অন্যান্য ধর্ম প্রধান রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে নেই।

আজ বিকেল ৫.৪০ মিনিটের দিকে রুম থেকে বের হলাম কিছুটা হাঁটার উদ্দেশ্যে। সেই সাথে ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে মানুষের ছুটাছুটি দেখতে। একটি দৃশ্য দেখে চোখ আটকে গেলো। ভালো লাগায় মন ভরে গেলো। দৃশ্য বা ঘটনাটা বলার আগে সংক্ষপে বলে নিই, আমি যেখানে থাকি সেই জায়গাটার নাম মদিনা মার্কেট। সিলেট সদরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এর পশ্চিমে সুনামগঞ্জ রোডে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; দক্ষিণে ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; পূর্বে শাহজালাল (র:) মাজার; উত্তরে রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এতেই জায়গাটার গুরুত্বের বিষয়টা ফুটে ওঠে। স্থানীয়দের পাশাপাশি এখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বসবাস।

এতসব বিষয়ের পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা, তা হলো- এখানে মুসলিম হিন্দুর সহাবস্থান অবাক করার মতো। এক ঘর মুসলিম তো অন্য ঘর হিন্দু। এখানে মুসলমান মুসলমানের প্রতিবেশী নয়; এখানে হিন্দু হিন্দুর প্রতিবেশী নয়। এখানে মুসলমান হিন্দুর, হিন্দু মুসলমানের প্রাণের প্রতিবেশী। এখানে চার দিক মসজিদ তো মাঝখানে মন্দির। এখানে সন্ধ্যায় মুয়াজ্জিনের আজান ও বৌদিদের উলুধ্বনি একসাথে এক অনন্য সুরের ব্যঞ্জনায় নিত্যদিন মুগ্ধ করার মতো।

ধর্মীয় ভেদাভেদের রাশ এখানে ধর্মপ্রাণ মানুষেরা টেনে ধরে রেখেছে সম্প্রীতিতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, প্রায় সময় ‘কিছু লোক’ সিলেটকে সাম্প্রদায়িক শহর হিসেবে পরিচিত করে তুলতে মরিয়া। এমনকি ‘জামাত শিবিরের আঁতুড়ঘর সিলেট’ এই অপবাদটুকুও প্রচার করতে তারা ব্যতিব্যস্ত। কারণ দুই চারটে তুচ্ছ ঘটনায় এরা শুধু উপরের দিকটায় দেখেছে সিলেটের ভেতরের দিকটা দেখেনি।

এবার আসি মূল ঘটনায়; আমি যা দেখেছি। মদিনা মার্কেট পয়েন্টের পাশে অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসার প্রধান ফটকের ঠিক পূর্ব পাশেই ফুটপাথের উপর একটি দোকান। বিকেলবেলা যে দোকানে পেয়াজি, সিঙ্গারা, আলুরচপ, বেগুনি, ডালপুরি, ছানা(ছোলাবুট) ইত্যাদি নাস্তা সামগ্রী তৈরি করা হয়। আমিও মাঝেমাঝে দোকানটায় নাস্তা করি।

ভেবেছিলাম রমজান মাসে দোকানটা বন্ধ থাকবে! কিন্তু না, যথারীতি তা খোলা এবং পুরোদমে ইফতারি সামগ্রী বিক্রয় চলছে। রোজাদার মানুষেরা হুমড়ি খেয়ে ইফতার কিনছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও উপচে পড়া ভীড়! প্রশ্ন জাগতে পারে, খাবার দোকানে ইফতার সামগ্রী তৈরি হতেই পারে এবং রোজাদাররা তা কিনতেই পারে। তা নিয়ে এত নাটকীয়তার কী হলো? বন্ধ রাখার ভাবনাই বা কেনো উদয় হয়েছিলো?

হ্যাঁ, তা হতেই পারে এবং এমনটাই হোক তাই চাই। আর এমনটা হচ্ছে দেখেই এত ভালো লেগেছে। কারণ এটাই প্রমাণ করে, উপরে উপরে ‘কিছু লোক’ বাংলাদেশকে যতোই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চেষ্টা করুক না-কেনো সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ভেতরটা ধর্মীয় সম্প্রীতিতে সমৃদ্ধ।

ওই দোকানের পরিচালক বা যিনি খাবার সামগ্রী তৈরি করেন তিনি একজন হিন্দু ভদ্রলোক। রোজা শুরুর দুই দিন আগে শেষবার যখন উনার দোকানে বসে মজাদার পেয়াজি, আলুরচপ খাচ্ছিলাম তখন অবচেতন মনেই ভেবেছিলাম রমজান মাসে হয়তো দোকানটা বন্ধ থাকবে। কেননা, হিন্দু বলে হয়তো তার দোকান থেকে কেউ ইফতার কিনবে না! আজ সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় আরো বেশি ভালো লাগায় মন মজেছে।

আমাদের চারপাশে ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন শত শত ছোট ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আমাদের দৃষ্টি হয়তো সেসব ঘটনা এড়িয়ে বারবার প্রোপাগান্ডা, এজেন্ডায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ধর্মীয় সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশকে ভালোবাসে এমন মানুষের অভাব হয়তো আমাদের দেশে নেই। আবার আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমিকে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীও নেহাত কম নয়। সবার উচিত এদের সম্পর্কে চোখকান খোলা রাখা।

লেখা: আহমেদ মোস্তাক।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top