নিসর্গ

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটানো কয়েকটি দিন (পর্ব-৩)

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটানো কয়েকটি দিন (পর্ব-৩)

কাশ্মীরঃ মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকে কাটিয়ে দেয়া কয়েকটি দিন (পর্ব-২)

My little horse must think it queer
To stop without a farmhouse near
Between the woods and frozen lake
The darkest evening of the year

রবার্ট ফ্রস্টের Stopping by Woods on a Snowy Evening কবিতাটি যতবারই পড়তাম ততবারই তুষারাচ্ছন্ন একটি বনের মাঝ দিয়ে চলা ঘোড়সওয়ারি কবির রোমাঞ্চও যেন নিজেকে ছুঁয়ে যেত। কেমন এক বিষন্ন ভাল লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতাম প্রতিবার। কিন্তু বাস্তবে যে ঠিক এমন না হলেও তার অনেক টা কাছাকাছি কোন অভিজ্ঞতায় আমার স্মৃতির ভান্ডার পুর্ণ হবে ভাবি নি কখনো।

কাশ্মীরে দ্বিতীয় দিন। যদিও পুর্বের প্ল্যান অনুযায়ী আজ গুলমার্গ যাবার কথা কিন্তু স্ট্রাইকের কারণে নিরাপত্তাজনিত ব্যাপার বিবেচনায় এনে ডেস্টিনেশন গুল্মার্গ থেকে সোনমার্গ এ শিফট করা হল। গ্রুপের ক্ষুদে সদস্যদের ধনু ভাঙ্গা পণ, যেভাবেই হোক আজ তাদের স্নো দেখাতে নিয়ে যেতেই হবে। আমাদের কপাল ভাল এক দিন আগেই স্নো ফল হয়েছে সেখানে, কাজেই স্নো পাওয়া যাবে পর্যাপ্ত। অতএব, যাত্রা হল শুরু আমাদের।

শ্রীনগর থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সোনমার্গ জম্মু এবং কাশ্মীরের একটি অন্যতম টুরিস্ট ডেস্টিনেশন। এখানের মাস্ট ভিজিট প্লেসগুলোর মধ্যে জজিলা পাস, থাজিওয়াজ গ্ল্যাসিয়ার অন্যতম। শ্রীনগর থেকে সোনমার্গের পথে যতই এগিয়ে যাচ্ছিল আমাদের বাহনটি ততই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় নুয়ে আসছিল মাথা, এত অসহ্য সুন্দর কেন সবকিছু! দিগন্ত রেখায় তুষার শুভ্র হিমালয় রেঞ্জ, পাশ দিয়ে কুলকুল রবে বয়ে যাওয়া সিন্ধু নদ যেন পৃথিবীর বাইরে অন্য কোন জগতে নিয়ে যাচ্ছিল আমাদের। এর আগে নেপাল, ভুটানে দূর থেকে তুষার দেখেছি, কিন্তু আজ যে সেই তুষার ধরা দেবে আমাদের হাতের মুঠোয় এই আবেগে রোমাঞ্চিত আমরা। যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই সেই আরাধ্য বরফ তার সকল রহস্যের মোড়ক উন্মোচন করে ধরা দেবার জন্য এগিয়ে আসছিল আমাদের কাছে। অবশেষে প্রায় দুই ঘন্টার ড্রাইভের পর আমরা এসে পৌছলাম সোনমার্গ ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে।

ঢাকায় বসে যখন সোনমার্গ নিয়ে স্টাডি করছিলাম তখন জেনেছিলাম যে থাজিয়াজ গ্ল্যাসিয়ার এ যেতে পনি অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে যেতে হয়, গাড়িতে করে গেলে শেষ পয়েন্ট পর্যন্ত যাওয়া যাবে না। আর জজিলা পাসে গাড়িতে যাওয়া যাবে। গ্রুপের ক্ষুদে দের কথা চিন্তা করে পনির ধারনা আগেই বাদ দিয়েছি। আসলে বাচ্চারা উছিলা, আমাদের নিজেদের ই সাহস আছে নাকি পাহাড়ি পথে ঘোড়ায় চড়ার? কিন্তু বিধি বাম, একদিন আগে তুষারপাত হওয়ায় জজিলা পাসে এত বেশি পুরু বরফ যে ওখানে যাওয়া যাবেনা। আর গ্ল্যাসিয়ারের লাস্ট পয়েন্ট পর্যন্ত না গেলে পর্যাপ্ত বরফ অর্থাৎ যেখানে বাচ্চারা খেলতে পারবে এমন বরফ পাওয়া যাবেনা। এখন উপায়? হে হে, রবার্ট ফ্রস্ট হতেই হবে । অতঃপর কি করলাম তা বলার আগে কিছু অম্লদায়ক কথায় আসি। কাশ্মীরের প্রতিটি এই ধরনের ট্যুরিস্ট স্পটে একটি নিয়ম আছে আর তা হল আপনি যে গাড়িতে করে এসেছেন সেটাতে করে আপনি আপনার কাংখিত পয়েন্ট গুলোতে যেতে পারবেন না। আপনাকে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গাড়িটি রেখে এখান থেকে অন্য গাড়ি অথবা ঘোড়া ভাড়া করতে হবে এবং আপনি যখন এই ধরনের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডগুলোতে এসে হাজির হবেন তখন আপনাকে আপনার ট্যুরের সবচেয়ে জঘন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হতে হবে। কাশ্মীরের পনি ওয়ালাদের মত এত নাছোড়বান্দা এবং বিরক্তিকর প্রাণী আর পুরো পৃথিবীতে আছে কিনা সন্দেহ। এখানে পৌছতেই তারা আপনার গাড়িকে ছেকে ধরবে এবং তাদের ডিঙ্গিয়ে আপনি আপনার সুবিধাজনক জায়গায় গাড়ি পার্ক ই করতে পারবেন না। আমি জেনে গিয়েছিলাম যে এখানে দুইটি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড আছে, প্রথম টিতে না থেমে পরেরটি তে গেলে নির্ধারিত ভাড়ায় যেতে পারব, বার্গেইনিং এর স্কোপ থাকবে না। কিন্তু প্রথম স্ট্যান্ডেই ওরা এমন ভাবে গাড়ি আটকে দিল যে আমাদের ড্রাইভার ও আর কিছু না বলে ওখানেই থামাল। আমি বারবার বলা সত্তেও ড্রাইভার আমাদের বলল যে সামনের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড বন্ধ এবং এটা যে সম্পুর্ন মিথ্যা তা পরে নিজের চোখে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম। তারপর শুরু হল পনিওয়ালাদের সাথে যুদ্ধ। প্রতিটি পনি তারা ২২০০ রুপি চাইল এবং প্রায় আধা ঘন্টা বার্গেইনিং এর পর তা ১০০০ রুপিতে এসে ঠেকল। ভাবলেন যন্ত্রনা শেষ হয়েছে? ধীরে বন্ধু, আরো আছে সামনে। কিন্তু এখন বললে সব ছন্দপতন ঘটবে বলে পরে বলব।

প্রতিটি সদস্যের জন্য একটি করে পনি। শুধু গ্রুপের পাঁচ বছরের সদস্য ছাড়া সবাই আমরা আলাদা পনি নেয়ায় মোট নয়টা পনি লাগল আমাদের। বরফে পরার উপযোগী জুতা ভাড়া করলাম প্রতি জোড়া একশ রুপিতে। আমাদের সাথে শুধু দুইজন লোক থাকল দেখা শুনা করার জন্য। অতঃপর জীবনের সম্পুর্ণ নতুন এক থ্রিলিং অভিজ্ঞতার জন্য আমরা প্রস্তত হলাম। আমার সাত বছরের কন্যাও ছোট্ট একটা পনিতে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। আমাদের মুখে ভয়ের ছাপ থাকলেও ওর মুখে তার বিন্দুমাত্র নেই, চরম আনন্দে আছে সে। আর আমি মনে মনে দোয়া পড়ছি। শুরু হল আমাদের পাহাড়ি পথে পনি ভ্রমণ।

প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন কিছু অভিজ্ঞতা থাকে যা তাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার শুধু সমৃদ্ধই করেনা, এক অদ্ভুত ভাল লাগায় আর রোমাঞ্চে আচ্ছন্নও করে প্রতিবার। আমার কাছে থাজিয়াস গ্লাসিয়ার যাওয়া পথের সেই আট কিলোমিটার পনি রাইড ঠিক সেইরকম এক অভিজ্ঞতা। দুই পাশে সুর্যকিরণ গায়ে মেখে নানা বর্ণের দ্যুতি ছড়ানো, শুভ্র তুষার মুকুট শোভিত পর্বত মালা, উইলো, পাইন, প্যাপিরাসের সারি আর তার মাঝে বরফের হিমস্পর্শে সিক্ত পথে পনির পিঠে চলেছি আমরা। সৃষ্টিকর্তার এমন অপার সৃষ্টির বর্ণনা দিব এমন ক্ষমতা আমার মত এত ক্ষুদ্র প্রাণির কোথায়? সন্দেহ নেই, এমন একটি অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য পারি দেয়া যায় সহস্র ক্রোশ দুরত্ব।

এবার আসি থাজিয়াস গ্লাসিয়ার প্রসঙ্গে। এটি হল সেই জায়গা যেখানে বাজরাঙ্গি ভাইজানের লাস্ট দৃশ্যর স্যুটিং হয়েছিল। সম্ভবত যেখানে অনেক মানুষের উপস্থিতিতে ছোট্ট মেয়েটিকে কাঁটা তারের বেড়া পার করে পৌছে দেয়া হয় তার মায়ের কাছে। পথে যেতে যেতে পনিওয়ালারা আমাদের আরো বেশ কয়েকটি মুভির স্যুটিং স্পট দেখালো, সাত্তা পে সাত্তা, রাম তেরি গঙ্গা মাইলি ইত্যাদি। এইসব দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম আমরা বাজরাঙ্গি ভাইজানের কাছে। বরফে ঢাকা পর্বত। জীবনে প্রথম এমন জায়গা দেখছি। কিন্তু একি ! হাটতে গেলেই শুধু ধড়াম ধড়াম আছাড় খেয়ে পরছি সবাই। এত পিচ্ছিল কেন বরফ? বুটের মধ্যে বরফ ঢুকে একাকার। কি যন্ত্রণা! একটু পরে খাপ খাইয়ে নিলাম। ঐ যে তখন বলেছিলাম যন্ত্রণা শেষ হয়নি। এবার নতুন যন্ত্রণা, স্লেজ ভাড়া নেয়ার জন্য ঘ্যান ঘ্যান। আপনাকে এক মুহুর্ত নিজের মত আপন জনের সাথে সময় কাটাতে দিচ্ছে না তারা। ওদের হাত থেকে বাঁচার জন্য রাজী হয়ে গেলাম। কিন্তু যখন উঠতে গেলাম দেখলাম এ যে এক অমানবিক ব্যাপার। কাঠের তৈরি ছোট্ট পাটাতনে আমরা বসব আর তারা দড়ি দিয়ে তা টেনে টেনে তুলবে উপরে। একবিংশ শতাব্দিতে এসে মানবতার এমন অবমাননা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমরা। উপরে উঠা তো দূরে থাক, একটু উঠেই তাড়াতাড়ি করে নেমে গেলাম। প্রতি স্লেজ আড়াইশ করে ২২ শ রুপি ভাড়া করেছিলাম যা পুরোটাই এমনি এমনিই দিয়ে দিলাম তাদের। তবে এখানে একটি কথা, এই এলাকার মানুষগুলি কিন্তু খুবই দরিদ্র যাদের ইনকামের একমাত্র উৎস টুরিজম। বছরে ছয়মাস এই এলাকাগুলো যখন বরফে ঢাকা থাকে তখন তাদের কোন ইনকাম ই থাকেনা তাই ট্যুরিস্ট সিজন গুলোতে তারা মরিয়া হয়ে উঠে। এছাড়াও আরো একটি ব্যাপার আছে, এদের প্রত্যেকেই বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে এক অঙ্গার যা অনবরত উদ্গিরনের জন্য মুখিয়ে রয়েছে। থাক এই ব্যাপারগুলো এই লেখার সুরের সাথে যায়না। এগুলো নিয়ে না হয় অন্য একদিন বলব, অন্য কোন জায়গায়।

আবার সেই একই পথে ফেরার পালা। ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে আবার আমাদের পুর্বের বাহনে করে শ্রীনগরের পথে যাত্রা। উদ্দেশ্য পথে লাঞ্চ করার। আমার ভাইয়ার হঠাৎ ইচ্ছে হল সে বিফ খাবে কিন্তু বিধিবাম। মুসলিম এলাকা কিন্তু কোন হোটেলেই বিফ নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ ট্যুরিস্ট সনাতন ধর্মাবলম্বি হওয়ায় বিফ তারা রাখে না। তাই বাধ্য হয়ে আবার আমাদের জাতীয় খাদ্য চিকেন দিয়েই লাঞ্চ সেরে শ্রীনগরের পথে। সুর্য্য পশ্চিমাকাশে কিন্তু অন্ধকার হয়নি, আসার পথে হযরত বাল মসজিদ দেখলাম বাইরে থেকে। অতঃপর আবার আমাদের ড্রাইভার আমাদের না জানিয়েই কাশ্মীরের আর একটি শাল এবং কার্পেট ফ্যাক্টরির সামনে গাড়ি থামাল। আমাদের শপিং করতে না দেখলে তার মনে খুব দুঃখ হয়। আমরাও তার মনে দুঃখ না দিয়ে লাফাতে লাফাতে ভিতরে ঢুকলাম। দাম ও মাশাল্লাহ দুই তিনবার স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার মত। অনেক কস্টে হার্ট বাঁচিয়ে বের হলাম এবং সন্ধ্যার পরে হোটেলে প্রবেশ করতেই দেখি সব দোকান খোলা। খুশিতে আত্ম হারা আমরা। যাক সন্ধ্যার পর ঘুরাঘুরির উছিলা পাওয়া গেল। রুমে এসে ফ্রেস হয়েই আধা ঘন্টার মধ্যে বের হয়ে দেখি সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ঐ বন্ধ দোকান গুলির সামনেই অযথা একটু হাঁটাহাঁটি করে হোটেলে ফিরে জঘন্য সাউথ ইন্ডিয়ান ফুড দ্বারা ডিনার করে ঘুমের তোড়জোড়। আগামীকাল ডেস্টিনেশন গুলমার্গ। হঠাৎ মনে পরল দেশে ত আগামীকাল বৈশাখ, কতই না ডামাডোল চলছে তার। সেইসাথে মনে পরল আজ থেকে ১১ বছর আগের পহেলা বৈশাখের কথা। কি হয়েছিল সেই দিনে? সেটা না হয় সাসপেন্স ই থাক। এখুনি সব বলে দিলে পরের পর্বে বলব কি?

(চলবে)

Most Popular

To Top