ফ্লাডলাইট

স্টিভ রোডসঃ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের নতুন কোচ?

স্টিভ রোডসঃ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের নতুন কোচ

দীর্ঘ অপেক্ষা এবং জল্পনা কল্পনার পর অবশেষে নতুন কোচ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। হেড কোচ নিয়োগ নিয়ে সৃষ্টি হওয়া নাটক এবং জটিলতার সমাপ্তি ঘটতে পারে বৃহস্পতি বা শুক্রবার রাতে। টাইগারদের নতুন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিতে সম্মতি প্রকাশ করেছেন সাবেক ইংল্যান্ড ক্রিকেটার স্টিভ রোডস। বৃহস্পতি বা শুক্রবার রাতে আনুষ্ঠানিকতা সারতে আসছেন ঢাকায়। সব কিছু ঠিক থাকলে টাইগারদের ক্যারিবিয়ান সফরের আগেই দলের দায়িত্ব নিবেন রোডস।

কোচ হিসেবে বিসিবি হাই-প্রোফাইল কাউকে নিয়োগ দিতে চাইছিলো না, বরং কাউন্টি ক্রিকেটে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা আছে এমন কাউকেই খুঁজেছিলো। ঠিক যেভাবে চান্দিকা হাথুরুসিংহকে এনেছিলো বাংলাদেশ। বিসিবির এই চিন্তাকে মাথায় রেখে কিছুদিন আগে গ্যারি কারস্টেন যে কোচের তালিকা বিসিবির কাছে জমা দিয়েছেন তার উপরের দিকেই নাম ছিলো স্টিভ রোডসের।

কে এই স্টিভ রোডস?

প্লেয়ার, কোচ এবং ডিরেক্টর অব ক্রিকেট হিসেবে ৩৩ বছর কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব উস্টারশায়ারের সাথে জড়িত ছিলেন সাবেক ইংল্যান্ড উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান স্টিভ রোডস।

ইয়র্কশায়ার কাউন্টিতে জন্ম নেয়া রোডস ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ১১ টেস্ট এবং ৯ ওয়ানডেতে মাঠে নেমেছিলেন। মূলত সাত নাম্বার ব্যাটসম্যান এবং দক্ষ কিপার হিসেবে সুনাম থাকলেও সেই সময়ের নির্বাচকদের প্রথম পছন্দ ছিলো জনি বেয়ারস্টো’র বাবা ডেভিড বেয়ারস্টো। ডেভিড বেয়ারস্টো’র ছায়ায় ঢাকা পড়েই সংক্ষিপ্ত হয়ে যায় স্টিভ রোডসের ইংল্যান্ড ক্যারিয়ার। ১৯৯৫ সালের এশেজে সর্বশেষ মাঠে নেমেছিলেন তিনি।

১৯৮১ সালে নিজ কাউন্টি ইয়র্কশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে নাম লেখান রোডস, খেলেছেন ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত।১৯৮৫-২০০৪ সাল পর্যন্ত উস্টারশায়ারের প্রথম পছন্দের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা ক্রিকেট খেলেছেন।

প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে ৪৪০ ম্যাচে ব্যাট হাতে রান করেছেন ১৪৮৩৯। গড় ৩২.৮২। ১২ সেঞ্চুরির পাশাপাশি হাফ সেঞ্চুরির সংখ্যা ৭২। আর গ্লাভস হাতে ক্যাচ নিয়েছেন ১১৩৯ বার, স্ট্যাম্পিং এর সংখ্যা ১২৪। উস্টারশায়ারেও খেলেছেন মূলত সাত নাম্বার ব্যাটসম্যান হিসেবে।

কোচিং অভিজ্ঞতা এবং সাফল্য

কোচ হিসেবে বিসিবি যাদের শুরুতে চেয়েছিলো তাদের অন্যতম টম মুডি। তবে টম মুডিকে না পেলেও পেতে যাচ্ছে তার সাবেক সহকারী স্টিভ রোডসকে। ২০০৪ সালে ক্রিকেট থেকে অবসরের পর উস্টারশায়ারের তৎকালীন কোচ টম মুডির সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান স্টিভ রোডস। ২০০৫ সালের মে মাসে টম মুডি শ্রীলংকা জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করলে হেড কোচ হিসেবে নিয়োগ পান স্টিভ রোডস। দায়িত্ব নেয়ার বছরই উস্টারশায়ারকে ডিভিশন ২ থেকে ডিভিশন ১-এ তুলে আনেন।

২০০৬ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রোডস উস্টারশায়ারের “বস” অর্থাৎ ডিরেক্টর অব ক্রিকেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে স্টিভ রোডস ২০১৯ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ পান তবে “অনাকাঙ্ক্ষিত” ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আর তাকে সেই দায়িত্ব দেয়া হয়নি । কোচ হিসেবে স্টিভ রোডসের অধীনে উস্টারশায়ার ২০১৭ সালে ডিভিশন টু চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া ২০০৭ সালে “Pro 40 League” চ্যাম্পিয়ন হয় (৪০ ওভারের “ওয়ানডে”) প্লেয়ার এবং কোচ হিসেবে মোট ছয়বার কাউন্টি টাইটেল জিতেছেন স্টিভ রোডস।

নতুন প্লেয়ার খুঁজে বের করা, প্লেয়ারদের ট্যালেন্ট আবিষ্কার করা এবং তাদের সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা এবং ব্যাটসম্যান-উইকেটকিপারদের টেকনিক্যাল দিক নিয়ে কাজ করার জন্য ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় এবং দক্ষ কোচ হিসেবে পরিচিত স্টিভ রোডস।

বাংলাদেশের টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ২০১০ সালে উস্টারশায়ারে খেলেছিলেন স্টিভ রোডসের আগ্রহেই। স্টিভ রোডসের অধীনে বেড়ে ওঠা ক্রিকেটারদের ভেতর অন্যতম হচ্ছেন মঈন আলী, জো লিচ, রস হোয়াইটলি, ব্রিট ডি’অলিভেরা, ভিক্রম সোলাঙ্কি।

যেভাবে শেষ হয়েছিলো উস্টারশায়ারের সাথে ৩৩ বছরের সম্পর্ক

এলেক্স হেপবার্ন, ২২ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার যিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট থাকার সুবাদে উস্টারশায়ারে ক্রিকেট খেলে থাকেন। ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর দুইটি ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন হেপবার্ন এবং তার বিপক্ষে চার্জ গঠন করে উস্টারশায়ার পুলিশ। কিন্তু বিষয়টি ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশ করেননি তৎকালীন ডিরেক্টর অব ক্রিকেট স্টিভ রোডস। এমনি ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছেও গ্রেপ্তার হবার বিষয়টা অনেক বিলম্বে জানিয়েছিলেন স্টিভ রোডস। হয়তো বিষয়টা জানাজানি হবার ভয়ে গোপন রেখেছিলেন হেপবার্নের ক্যারিয়ের এবং কাউন্টির সম্মানের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু বিষয়টা মিডিয়ায় আসলে আভ্যন্তরীণ তদন্তের ঘোষনা দেয় উস্টারশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব। প্লেয়ারদের ডিসিপ্লিনজনিত অভিযোগের দায় নিজে নিয়ে ডিরেক্টর অব ক্রিকেটের পদ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন স্টিভ রোডস। যেহেতু তার বিরুদ্ধে তদন্ত করার ঘোষনা দিয়েছিলো উস্টারশায়ার তাই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচের দায়িত্ব থেকে রোডসের নাম প্রত্যাহার করে নেয় ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) স্বাভাবিকভাবেই তদন্তে স্টিভ রোডসের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ অনিয়ম খুঁজে পায়নি উস্টারশায়ার।

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য হাই-প্রোফাইল কোচের বদলে কাউন্টি/শেফিল্ড শিল্ডে কোচিং করানো মিডিয়াম-প্রোফাইলের কোচ বেশি উপযুক্ত হবে যার নিজের আন্তর্জাতিক কোচিং ক্যারিয়ার গড়ার তাড়না থাকবে। সেই বিবেচনায় বিসিবি এবং গ্যারি কারস্টেনের মতে স্টিভ রোডস হতে পারেন আদর্শ কোচ। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে তাই ক্যারিবিয়ান সফরের আগেই দায়িত্ব নিতে পারেন স্টিভ রোডস।

Most Popular

To Top