বিশেষ

কবি জীবনানন্দ দাসের মহীনের ঘোড়াগুলি

কবি জীবনানন্দ দাসের মহীনের ঘোড়াগুলি

কিছু কিছু শিল্পীর গান আছে যেসব গান আগে কখনো না শুনলেও প্রথম শোনাতেই অসম্ভব পরিমাণের ভালো লেগে যায়। এমনই এক ব্যান্ড হচ্ছে “মহীনের ঘোড়াগুলি”। যেকোন সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের প্রথম শোনাতেই ভালোবাসা অর্জন করে নেবার মতো একটি ব্যান্ড এই মহীনের ঘোড়াগুলি। এই ব্যান্ডের জন্ম পশ্চিম বাংলার কলকাতায় ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বব ডিলান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফোক এবং ইন্ডি রক জনরার মিশ্রণে বাংলা গানে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলো মহীনের ঘোড়াগুলি। তখনকার সময়েই মহীনের ঘোড়াগুলি তাদের গান এবং লিরিক্সে রাজনীতি, ভালোবাসা, দারিদ্র্য, স্বাধীনতা বা বিপ্লবী সব চেতনার যোগান দিয়ে গিয়েছে।

দুই বাংলা মিলে পাইওনিয়ার যে কয়টা রক ব্যান্ড আছে তাদের মধ্যে অন্যতম মহীনের ঘোড়াগুলি। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এই যে ব্যান্ডটি বেশীদিন সক্রিয় ছিলো না। যে কয়দিন ছিলো, শ্রোতাসমাজকে শুধু সুন্দর সুন্দর একগাদা গান উপহার দিয়ে গিয়েছে।

একদম প্রথমে মহীনের ঘোড়াগুলির যাত্রা শুরু হয় সাতজনকে নিয়ে। ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গৌতম চট্টোপাধ্যায় এবং তিনিসহ তার ভাই প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জন ঘোষাল, তাপস দাস, এব্রাহাম মজুমদার, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় এই সাতজনকে নিয়ে ১৯৭৫ সালের শেষদিকে শুরু হয়েছিলো এই ব্যান্ডের যাত্রা।

প্রথমে ব্যান্ডের নাম ছিলো “সপ্তর্ষি”। এই সপ্তর্ষি ১৯৭৫ সালেই পর্ণশ্রী ক্লাবে তাদের প্রথম শো করে এবং শ্রোতাদের মন জুটিয়ে নেয়। তারপর তাদের অন্য কোন এক শো’তে হঠাৎ করেই তাদের ব্যান্ডের নাম “গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায়” হয়ে যায়। তারপর কোন একদিন কোন এক আড্ডায় রঞ্জন ঘোষাল কবি জীবনানন্দ দাসের ‘ঘোড়া’ কবিতাটি পড়ে কবিতার দ্বিতীয় লাইন থেকে পাওয়া একটা শব্দ “মহীনের ঘোড়াগুলি” ব্যান্ডের নতুন নাম হিসেবে প্রস্তাব করেন এবং বাকি সবারও এটি পছন্দ হয়ে যায় এবং ব্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে মহীনের ঘোড়াগুলি করা হয়। কবিতার দ্বিতীয় লাইনটি এমনটা ছিলো যে,

“মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে!”

মহীনের ঘোড়াগুলি

১৯৭৯ সালে রবীন্দ্র সদনের কনসার্টে মহীনের ঘোড়াগুলি। বাঁ দিক থেকে রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় (বুলা), তাপস দাস (বাপি), প্রণব দাসগুপ্ত, গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও রঞ্জন ঘোষাল।

গৌতম চট্টোপাধ্যায় নিজে বিখ্যাত সব নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন৷ এর জন্য তাকে জেলও খাটতে হয়েছে বেশ কিছুদিন এবং তার সেই বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা মহীনের ঘোড়াগুলির গানগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে৷

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

এর আগে গৌতম ষাট দশকে কলকাতার বিভিন্ন হোটেলে “দ্যা আর্জ” নামক একটি ব্যান্ডে স্যাক্সোফোন বাজাতেন এবং তিনিই বাকি সদস্যদের বিভিন্ন নতুন ধরনের গান এবং বাদ্যযন্ত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তার মাধ্যমেই গীটার, ড্রামস, স্যাক্সোফোন, ভায়োলিন, বাঁশি, কিবোর্ড ইত্যাদির একসাথে সংমিশ্রন ঘটে। জ্যাজ, ব্লুজ, ল্যাটিন, বাউল, রক সব জনরার মিশ্রণে তৈরি করলেন নতুন আরেক গানের ধাঁচ এবং সঙ্গীত ধারা। একটা গান গাওয়া, তার লিরিক্স, তার সুর সহ সব মিলিয়ে এক একটা গানকে তিনি দিয়েছিলেন মায়াবী এক রূপ যাতে মানুষের প্রথম শোনাতেই প্রেমে পড়তে বাধ্য হয় তার যেকোন গানের সাথে। কিন্তু তৎকালীন কলকাতায় মানুষ রক বলতে পাশ্চাত্য সঙ্গীত এবং বব ডিলান, জিম মরিসন এবং দ্যা বিটলসের মতোন শিল্পীর বাইরে খুব কম গান শুনতে চাইতো। এই কারণে তৎকালীন সময়ে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র শ্রোতাপ্রিয়তা এখনকার মতোন ছিলো না কিন্তু যে একবার তখনকার সমইয়ের মহীনের ঘোড়াগুলির কোন গান শুনেছে সেই প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছিলো তাদের কাজের সাথে।  যাত্রার প্রথম চার বছরেই তারা তিনটা এলবাম মুক্তি দেয়।

১৯৭৭ সালে গাথানি রেকর্ডস থেকে তাদের প্রথম এলবাম ‘সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক’ বের হয়। এই এলবামটি ধূর্জটি চট্টোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করেছিলো তারা। তাদের প্রথম এলবাম রেকর্ডের পর গাথানি রেকর্ডের টাকা শোধ করা হয়েছিলো তাদের এক বান্ধবী সঙ্গীতার থেকে টাকা ধারদেনা করে। পরবর্তীতে রঞ্জন ঘোষালের সাথে সঙ্গীতার বিয়ে হয়েছিলো।  “ভেসে আসে কলকাতা”, “মেরুন সন্ধ্যালোক”, “সংবিগ্ন পাখিকূল” এবং “হায় ভালোবাসি” এই মোট চারটি গানের এই এলবামের প্রতিটা গানেই ফোক (আরবান) এর ছোঁয়া ছিলো। এখানে ‘ভেসে আসা কলকাতা’ গানে তারা একটা শহরের একটা প্রতিচ্ছবি এঁকেছিলো, ‘সংবিগ্ন পাখিকূল’ গানে একাকীত্ব ও বিহ্বলতার প্রতিচ্ছবি এঁকেছিলো। ‘হায় ভালোবাসি’ গানে ব্যান্ডের আকুলতা, ভালোলাগা ভালোবাসার সব কথা বলা হয়েছিলো। তাদের নৈতিক সঙ্গীতদর্শনের জলন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলো গানগুলো।

তারপর ১৯৭৮ সালে কলকাতায় হিন্দুস্তান রেকর্ডস থেকে বের হয় তাদের দ্বিতীয় এলবাম “অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব”। মাত্র দুইটি গান ছিলো এটিতে। একটি এলবামের টাইটেল ট্র্যাক “অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব” এবং আরেকটি “সুধীজন শোনো” এবং ১৯৭৯ সালে ভারতী রেকর্ডস থেকে তাদের তৃতীয় এ্যালবাম ‘দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি’ বের হয়েছিলো। এই এ্যালবামেও আগেরবারের মতো মাত্র দুইটি গান ছিলো। গান দুটি হলো “এই সুরে বহুদূরে” এবং “চৈত্রের কাফন”। এখানে “এই সুরে বহুদূরে” ছিলো কিছুটা ইন্ডি রক ধাঁচের গান আর ‘চৈত্রের কাফন’ ছিলো একটি রাজনৈতিক গান। গৌতমের নকশালের আন্দোলনের সময়ে যে বন্ধুদের সেখানে ফেলে চলে আসতে হয়েছিলো রাজপথে বা অলি-গলিতে বা এখানে-সেখানে, তাদের স্মরণে লেখা হয়েছিলো এই গানটি।

চিত্রঃ- মহীনের ঘোড়াগুলির স্টুডিও এলবামসমূহের প্রচ্ছদ

ব্যান্ডের যাত্রা শুরুর পর থেকে মাত্র ছয় বছর পরে ১৯৮১ সালেই ব্যান্ডটি থেমে গেলো হঠাৎ করেই। থেমে যাবার আগে মাত্র তিনটা এলবাম বের করেছিলো তারা যেখানে মাত্র আটটি গান ছিলো সব মিলিয়ে। আরো অনেক অনেক গান পড়ে ছিলো রেকর্ডের জন্য, কিন্তু সেসব আর রেকর্ড হয়নি। কিন্তু এই কয় বছরেই মহীনের ঘোড়াগুলো শেষেরদিকে এতো নাম করে ফেলেছিলো যে তাদের প্রতিটি কনসার্ট হতো হাউজফুল এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে তাদের কনসার্টের টিকেটগুলোও হতো অন্যরকম। কখনো সেগুলো ছিলো ডাকটিকিটের মতো অথবা কখনো সেখানে থাকতো সকল সদস্যের আঙুলের ছাপ৷

সেই ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পযন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর থেমে থাকার পর ১৯৯৫ সালে আবার তাদের ভক্তকুলকে অবাক করে তারা ফিরে আসে কিন্তু থেমে থাকার পর থেকে নব্বই দশকের শুরুতে কলকাতায় তখন গানের ধারার পরিবর্তন এসে তাদের থেমে থাকা সময়ের তুলনায় অন্যরকম গান প্রচলিত ছিলো। তাই তারাও তাদের গানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে ফিরে আসার পর।

১৯৯৯ সাল পযন্ত তাদের সম্পাদনায় চারটি এলবাম বের করে এবং এবারের গানগুলো শ্রোতাসমাজে এতো বেশী সাড়া পায় যে তারা শেষদিকে বাংলা কিংবদন্তী ব্যান্ডগুলোর তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়ে নেয় তাদের কাজগুলোর কারণে শেষ অবধি। আগের যেসব গান শ্রোতাসমাজে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি, সেসকল গানকে গৌতম নতুন রূপ দিয়ে ফিরিয়ে আনে শ্রোতাসমাজে আর এবার সেগুলো আরো বেশী সাড়া ফেলে। কিন্তু এবার আর তারা নিজস্ব এলবাম না, গৌতম সিদ্ধান্ত নেয় যে মহীনের ঘোড়াগুলির কথা-সুরে অন্যন্য নতুন এবং সম্ভাবনাময় সব ব্যান্ড/শিল্পীদের আত্মপ্রকাশ করাবেন।

যেই ভাবা, সেই কাজ। ১৯৯৫ সালেই কলকাতার বইমেলায় আশা অডিও থেকে তাদের নতুন এলবাম “আবার বছর কুড়ি পর” মুক্তি পায়। যেখানে অন্য অনেক শিল্পীর গলা ছিলো বিভিন্ন গানে। এগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলঃ

১। “পড়াশোনার জলাঞ্জলি ভেবে” (লক্ষীছাড়া)
২। “ধাঁধার থেকে জটিল তুমি” (গড়ের মাঠ)
৩। “কথা দিয়া বন্ধু” (অনুপ বিশ্বাস, বাদল সরকার)
৪। “এলো কি এ অসময়” (অন্তরা চৌধুরী)
৫। “গঙ্গা” (ঋতুপর্ণা দাস, চন্দ্রিমা মিত্র, পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবীর দাস)
৬। “আমি ডান দিকে রই” (সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়)
৭। “আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি”(দিব্য মুখোপাধ্যায়)
৮। “পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে” (ক্রস উইন্ডস)

এখানে “পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে” গানটি গৌতমের লেখা হলেও সুর করেছিলো পল্লব আর গাওয়ানো হয়েছিলো ক্রস উইন্ড নামে তৎকালীন একটি নতুন ব্যান্ডের ভোকালকে দিয়ে। এই গানটি মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কাজ। তাদের নৈতিক সংগীতদর্শন এখানে এই কাজটিতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এখানে টেলিভিশন কিভাবে শহরে প্রকোপ সৃষ্টি করে তুলে ধরা হয়েছে। এই গানটার সর্বপ্রথম শ্রোতা হচ্ছে অরুনেন্দু দাস এবং তিনি এই গান প্রথম শোনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে যে,

“ইয়াং জেনারেশন কিছু কিছু শুনেছে গৌতমের গান। সেদিনই গৌতম বলল ‘একটা নতুন গান শোনাচ্ছি। গিটারটা তো বাজানো হয় না আর, তবুও চেষ্টা করছি।’ গানটা আমায় নাড়িয়ে দিল। আরেকবার যখন শুনতে চাইলাম, ও বলল ‘তাহলে তোমরাও আমার সঙ্গে যোগ দাও।“

এই গানটি হচ্ছে আজ পযন্ত সবচেয়ে বেশী কভার হওয়া গান এবং অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান তাদের। মহীনের ঘোড়াগুলিদের প্রায় প্রতিটি এ্যালবামের সাথেই বুকলেট বের হতো। সেই বুকলেটে এ্যালবামগুলো নিয়ে বিস্তারিত লেখা থাকতো, থাকতো লিরিকও। এই গান নিয়ে তাদের বুকলেটে গৌতম লিখেছিলো

”এই আকাশ ফোড়া টিভি এন্টেনা, এই স্যাটালাইট, এই কেবল, এই বোকাবাক্সে বন্দী ছোটো পৃথিবীতে কী গাবো আমি? কি শোনাবো? তোমার আমার ফারাকের এই নয়াফন্দিতে শোনাবো কোন গান? আ হা হা হা ”

পরবর্তীতে এই গানটির সুর বলিউডের মিউজিক ডিরেক্টর প্রীতম তার “গ্যাংস্টার” সিনেমার গান “ভিগি ভিগি”তে ব্যবহার করে যেটায় গলা দিয়েছিলো নগরবাউলের জেমস।

তারপর থেকে সামনে আর মহীনের ঘোড়াগুলিদের ব্যান্ডটির আর কোন ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়নি। প্রত্যাবর্তনের পরে ১৯৯৬ সালে আশা অডিও থেকে তাদের দ্বিতীয় এলবাম ‘ঝরা সময়ের গান’ বের হয়। এ্যালবামের গানগুলো হচ্ছে,

১। “মানুষ চেনা দায়” (সুব্রত ঘোষ, বনি)
২। “সংবিগ্ন পাখিকূল” (বনি)
৩। “কীসের এত তাড়া” (ঋতুপর্ণা দাস, চন্দ্রিমা মিত্র)
৪। “গাইব শুধু গান” (সুব্রত ঘোষ, বনি, ঋতুপর্ণা দাস, চন্দ্রিমা মিত্র)
৫। “কে কে যাবি রে” (সুব্রত ঘোষ, বনি, ঋতুপর্ণা দাস, চন্দ্রিমা মিত্র)
৬। “বিনীতা কেমন আছ?” (নীল মুখোপাধ্যায়)
৭। “সারা রাত” (সুব্রত ঘোষ, বনি, নীল মুখোপাধ্যায়)
৮। “সেই ফুলের দল” (ঋতুপর্ণা দাস, চন্দ্রিমা মিত্র)
৯। “ময়মনসিংহ গীতিকা” (অনুপ বিশ্বাস, বাদল সরকার)
১০। “তোমায় দিলাম” (সুব্রত ঘোষ)
১১। “আমার প্রিয়া কাফে” (গৌতম চট্টোপাধ্যায়)

যেখানে “সংবিগ্ন পাখিকূল” গানটি রিক্রিয়েট করা হয় এই এ্যালবামে নতুনরূপে।

১৯৯৭ সালে আবারো আশা অডিও থেকে বের হয় মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত ৩য় এ্যালবাম ‘মায়া’। এলবামের গানগুলো হচ্ছে,

১। “হায় ভালোবাসি” (রাজা, বনি, ঋতুপর্ণা দাস, গৌতম চট্টোপাধ্যায়)
২। “যখন ধোঁয়া মেঘে” (সুব্রত ঘোষ)
৩। “দিশেহারা যে মোর মন” (ঋতুপর্ণা দাস)
৪। “দক্ষিণ খোলা জানলা” (ঋতিকা সাহানি, দেবজ্যোতি মিশ্র)
৫। “কত কি করার আছে বাকি” (বনি)
৬। “এই মুহূর্তে” (রাজা, গৌতম চট্টোপাধ্যায়, বনি)
৭। “এ কী কথা শুনি হায়” (লক্ষীছাড়া)
৮। “ভিক্ষেতে যাবো” (নীল মুখোপাধ্যায়)
৯। “টেলিফোন” (গৌতম চট্টোপাধ্যায়)
১০। “যাও ছেড়ে চলে” (বনি)

এই এলবামে “হায় ভালোবাসি” গানকে নতুন ভাবে ফিরিয়ে আনা হয়  এবং গৌতমের ‘টেলিফোন’ গানটি বাউল এবং ব্লুজের সংমিশ্রণের এক অসামান্য রূপ।

১৯৯৯ সালে আবারো সেই আশা অডিও থেকে তাদের চতুর্থ ও শেষ এ্যালবাম ‘ক্ষ্যাপার গান’ বের হয়। এ্যালবামের গানগুলো হচ্ছে,

১। “শোন সুধীজন” (ক্রস উইন্ডস)
২। “ক্রিকেট” (অর্ণব চট্টোপাধ্যায়)
৩। “সাততলা বাড়ি” (প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়)
৪। “বাঙ্গালি করেছে ভগবান” (গৌতম চট্টোপাধ্যায়)
৫। “ঘরে ফেরার গান” (চন্দ্রানী বন্দ্যোপাধ্যায়)
৬। “তাকে যত তাড়াই দূরে” (তাপস দাস)
৭। “সবাই তো ইনসান” (অনুপ বিশ্বাস, বাদল সরকার)
৮। “তাই জানাই গানে” (অরুণেন্দু দাস)
৯। “পাখিদের সুরে গান” (ক্রস উইন্ডস)

এখানে এই এলবামের ‘সুধীজন শোন’ গানটি ছিলো তাদের নিজস্ব স্টুডিও এ্যালবাম থেকে রিমেক করা আর “বাঙ্গালি করেছে ভগবান” গানটি একটি প্রচলিত সাঁওতালি গান “সান্তাল করেছে ভগবান” এর বঙ্গরূপ।

এবং দুঃখের কথা এই যে সেই বছরেই ১৯৯৯ সালেই ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন এবং ব্যান্ডটিও শেষবারের মতোন থমকে দাঁড়ায়। তারপর বাকি ব্যান্ড সদস্যরা সঙ্গীতের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত থাকলেও অনেকেই দেশ-বিদেশ চলে যায় এবং ব্যান্ডটি চিরকালের মতোন সেখানেই থেমে যায়।

ডিস্কোগ্রাফিঃ-

এই কয় বছরে মহীনের ঘোড়াগুলি সর্বমোট সাতটি এলবাম প্রকাশ করেছিলো সেগুলো হলো,

স্টুডিও এলবামঃ-

১। সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক (১৯৭৭)
২। অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব (১৯৭৮)
৩। দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি (১৯৭৯)

সম্পাদিত এলবামঃ-

১। আবার বছর কুড়ি পরে (১৯৯৫)
২। ঝরা সময়ের গান (১৯৯৬)
৩। মায়া (১৯৯৭)
৪। ক্ষ্যাপার গান (১৯৯৯)

মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত এলবামসমূহের প্রচ্ছদ

লাইনআপঃ-

সব ব্যান্ডের মতোই সময়ের সাথে মহীনের ঘোড়াগুলির লাইনআপেও অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং অনেক সময় অনেক এলবামের অনেক গানে অনেকেই ব্যাক ভোকাল দিয়েছে। সেসব সব নিচে তুলে ধরা হলোঃ

১। গৌতম চট্টোপাধ্যায় (মনি’দা) – কন্ঠ, কথা, লিড গিটার, স্যাক্সোফোন
২। প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় (বুলা)- কন্ঠ, বেজ গিটার, বাঁশি
৩। তাপস দাস (বাপি)- কন্ঠ, কথা, গিটার
৪। রঞ্জন ঘোষাল- কথা, মিডিয়া রিলেশান
৫। আব্রাহাম মজুমদার- পিয়ানো, ভায়োলিন, ভায়োলা
৬। বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় (বিশু)- ড্রামস, বেস ভায়োলিন, গিটার
৭। তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (ভানু)- কন্ঠ, গিটার (১৯৭৬-৭৮)
৮। রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়- গিটার (১৯৭৮-৮১)
৯। প্রণব সেনগুপ্ত- ড্রামস
১০। তপন চট্টোপাধ্যায়
১১। প্রবাল হালদার
১২। শর্মিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়
১৩। সঙ্গীতা ঘোষাল

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় (বুলা)

তারপর ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি কলকাতায় ‘আবার বছর ত্রিশ পরে’ নামে তাদেরকে ট্রিবিউট দিয়ে একটি কনসার্ট হয়েছিলো যেখানে অর্কেস্ট্রা এবং জ্যাজের আলাদা দুটো সেগমেন্টে বিভিন্ন মিউজিসিয়ানরা পারফর্ম করেছিলেন। এরপর আরো বেশ কয়েকটি ট্রিবিউট কনসার্ট হয়েছিলো সেখানে যেটায় কলকাতার সব মিউজিসিয়ানরা পারফর্ম করেছিলো। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে গৌরব ওরফে গাবু’র (লক্ষীছাড়া ব্যান্ডের) তত্বাবধানে মহীনের সদস্যদের নিয়ে একটি কনসার্ট হয়েছিলো। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া রেডিও সাক্ষাৎকারে প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো মহীন সফল কিনা? তিনি বলেছিলেন,

“মহীনের ঘোড়াগুলি চেয়েছিল একটা পরিবর্তন, যেটা পুরাতনকে ভেঙ্গেচূড়ে নতুন কিছু নিয়ে আসবে। এবং মহীনের ঘোড়াগুলি সেটা করতে পেরেছে!”

এবং আসলেও, বাংলাদেশ এবং কলকাতায় দুই বাংলাতেই এখনো অনেক ব্যান্ডই মহীনের ঘোড়াগুলি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে। গৌতম চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর পর মহীনের ঘোড়াগুলো ব্যান্ডটিও মারা যায় বলা যায় কিন্তু গৌতম এবং তার ব্যান্ড মহীনের ঘোড়াগুলো আজও দুই বাংলার অনেক মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে এবং থাকবে তার কাজের জন্য।

 

তথ্যসূত্রঃ
১. পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে… দু’চার কথা
২. মহীনের ঘোড়াগুলি

Most Popular

To Top